ঢাকার বুকে যতগুলো নারী নির্যাতন কেন্দ্র ছিল, রাজারবাগ পুলিশ লাইন তারই অন্যতম। 25 মার্চের কালোরাতে হানাদাররা যখন পুলিশলাইন আক্রমণ করে তখন এসএফ ক্যান্টিনে রাবেয়া খাতুন নামের একজন মহিলা সুইপার উপস্থিত ছিলেন। তিনি রাজারবাগ নারী নির্যাতনের প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বাক্ষী। তার বক্তব্য এখানে তুলে ধরা হলো :
'হামলার দিন আমি রাজারবাগ ব্যারাক ঝাড়ু দিয়ে সেখানেই ছিলাম। কামানের গোলা, বোমা আর ট্যাঙ্কের অবিরাম কানফাটা গর্জনে আমি ভয়ে ক্যান্টিনে কাত হয়ে পড়ে থেকে থরথরিয়ে কাপছিলাম। 26 মার্চ সকালে ওদের কামানের গোলার মুখে টিকতে পারেনি ততক্ষণ পর্যন্ত প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলা বীর পুলিশরা। সকালে ওরা এসএফ ব্যারাকের চারদিকে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং ব্যারাকে প্রবেশ করে বাঙালী পুলিশদের নাকে মুখে, সারাদেহে বেয়নেট ও ব্যাটন চার্জ করতে করতে, বুটের লাথি মারতে মারতে বের করে নিয়ে আসছিল। ক্যান্টিনের কামরা থেকে বন্দুকের নলের মুখে আমাকেও বের করে আনা হয়।
আমাকে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে কয়েকজন আমার ওপর প্রকাশ্যে পাশবিক অত্যাচার করছিল ও অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিল।
উপর্যপুরি অত্যাচারে আমি যখন মৃতপ্রায় তখন প্রাণ বাঁচানোর জন্য ওদের কাছে কাতর মিনতি জানাচিছলাম। হাঁউমাউ করে কাঁদছিলাম আর বলছিলাম আমাকে মেরো না। আমি সুইপার। আমাকে মেরে ফেললে তোমাদের পায়খানা ও নর্দমা পরিষ্কার করার জন্য কেউ থাকবে না। এই পুলিশ লাইন রক্ত ও লাশের পচা গন্ধে মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। তোমাদের পায়ে পড়ি আমাকে মেরোনা। তখন এক পাঞ্জাবী কুকুর আমার কোমরের ওপর বসে আমাকে নির্যাতন করছিল, আমাকে মেরে ফেললে পুলিশ লাইন পরিষ্কার করার কেউ থাকবে না এই উপলব্ধিতে আমাকে ছেড়ে এক পাঞ্জাবী সেনা ধমক দিয়ে বলতে থাকে- ঠিক হ্যায়, তুমকো ছোড় দিয়া জায়েগা জেরা বাদ। তুম বাহার নেহি নিকলেগা। হার ওয়াক্ত লাইনপর হাজির রাহেগা।
পাঞ্জাবী সেনারা রাজাকার ও দালালদের সহযোগিতায় রাজধানীর স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও অভিজাত জনপদ থেকে বহু বাঙালী যুবতী মেয়ে, রূপসী মহিলা ও সুন্দরী বালিকাদের জিপ ও মিলিটারি ট্রাকে করে পুলিশ লাইনের বিভিন্ন ব্যারাকে জমা করতে থাকে। আমি ক্যান্টিনের ড্রেন পরিষ্কার করছিলাম। দেখলাম আমার সামনে দিয়ে জিপ ও ট্রাক থেকে লাইন করে বহু বালিকা, যুবতী ও মহিলাকে এসএফ ক্যান্টিনের মধ্যে দিয়ে ব্যারাকে রাখা হলো। বহু মেয়েকে হেডকোয়ার্টার বিল্ডিংয়ের ওপর তলার ব্যারাকে রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। আর অবশিষ্ট যাদের ব্যারাকে ঠাই হলো না তাদের বারান্দায় দাঁড় করিয়ে রাখা হলো। অধিকাংশ মেয়ের হাতে বইখাতা দেখলাম। অনেক রূপসী যুবতীর দেহে অলঙ্কার দেখলাম। তাদের অধিকাংশের চোখ বেয়ে অঝোরে কান্না ঝরছিল।
এরপর আরম্ভ হলো বাঙালী মেয়েদের ওপর বীভৎস পাশবিক নির্যাতন। লাইন থেকে পাঞ্জাবি সেনারা উন্মত্ত অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে ব্যারাকের মধ্যে প্রবেশ করতে লাগল। ব্যারাকে ঢুকেই ওরা প্রতিটি মেয়ের পরনের কাপড় খুলে একেবারে উলঙ্গ করে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে মেতে উঠল পাশবিকতায়। আমি ড্রেন পরিষ্কার করার অভিনয় করছিলাম আর দেখছিলাম ওদের বিভৎস পৈশাচিকতা। ওদের মত্ত উল্লাসের সামনে কোনো মেয়ে টুশব্দটি পর্যন্ত করতে পারেনি।
দেখলাম বর্বর পাঞ্জাবি পশুরা এই নিরীহ মেয়েদের শুধু ধর্ষন করেই ছেড়ে দেয়নি। সেই সঙ্গে রাক্ষসের মতো ধারালো দাঁত দিয়ে স্তন ও গালের মাংস কামড়ে রক্তাক্ত করে দিচ্ছে। ওদের নির্দয় কামড়ে অনেক কচি মেয়ের স্তন মাংসসহ উঠে আসছিল। মেয়েদের গাল-পেট-ঘাড়, বুক, ঠোট, পিঠ ও কোমড়ের অংশ ওদের অবিরাম কামড়ে রক্তাক্ত। যেসব বাঙালী যুবতী ওদের পাশবিকতার শিকার হতে অস্বীকার করল, দেখলাম তৎক্ষণাৎ পাঞ্জাবীরা ওদের চুল টেনে এনে স্তন ছোরা মেরে টেনে ছিড়ে ফেলে দিয়ে গুপ্ত স্থানে বন্দুকের নল, বেয়নেট ও ধারালো ছুরি ঢুকিয়ে দিয়ে সেই বীরাঙ্গনাদের পবিত্র দেহ ছিন্নভিন্ন করে দিচিছল। অনেক পশু ছোট ছোট বালিকাদের ওপর পাশবিক অত্যাচার করে ওদের অসাড় রক্তাক্ত দেহ বাইরে এনে দুজনে দু'পা ধরে দুদিকে টেনে চড়চড়িয়ে ছিড়ে ফেলছিল।
আমি সব দেখছিলাম সেখানে বসে বসে আর ড্রেন পরিষ্কার করছিলাম। পাঞ্জাবীরা মদ খেয়ে যার যে মেয়ে ইচছা তার ওপরই পাশবিক নির্যাতন চালাচিছল। শুধু যে সাধারণ পাঞ্জাবী সেনারাই এই পাশবিকতায় যোগ দিয়েছিল তা নয়, সকল উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসাররাও মদ খেয়ে সারাক্ষণ এই অসহায় মেয়েদের ওপর নির্যাতন চালাতো। কোনো মেয়ে এক মুহূর্তের অবসর পায়নি। এদের অবিরাম অত্যাচারে বহু কচি বালিকা সেখানেই কাতরাতে কাতরাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। পরদিন এসব মেয়ের লাশ বাকিদের সামনে ছুরি দিয়ে কুচিকুচি করে কেটে বস্তায় ভরে বাইরে ফেলে দিত।
এসব মেয়েদের নির্মম পরিণতি দেখে অন্যরা আরো ভীত সন্তস্ত্র হয়ে পড়ত। এবং স্বেচ্ছায় বর্বরদের লালসার কাছে আত্মসমর্পন করত। যেসব মেয়ে প্রাণে বাঁচার জন্য ওদের সাথে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করে তাদের পেছনে ঘুরে বেরিয়েছে, তাদেরকেও রেহাই দেয়া হয়নি। পদস্থ সামরিক অফিসাররা তাদের ওপর সম্মিলিত নির্যাতন চালিয়ে হঠাৎ একদিন একজনকে ধরে ছুরি দিয়ে তার স্তন কেটে, গুপ্ত স্থানে ধারালো অস্ত্র ঢুকিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়তে পড়তে ট্রিগার টেনে দিত।
মেয়েদের পশুর মতো লাথি মারতে মারতে এবং পেটাতে পেটাতে হেড কোয়ার্টারের দোতলা, তেতলা ও চারতলায় উঠিয়ে উলঙ্গ অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রাখা হত। পাঞ্জাবী সেনারা নিজেদের কাজে যাওয়ার আগে মেয়েদের লাথি মেরে আবার কামরায় ঢুকিয়ে তালা মেরে চলে যেত। বহু মেয়েকে হেড কোয়ার্টারের ওপর তলায় বারান্দার মোটা লোহার তারে চুলের সাথে বেধে ঝুলিয়ে রাখা হতো। প্রতিদিন পাঞ্জাবিরা সেখানে যাতায়ত করত। কেউ কেউ অসহায় মেয়েদের উলঙ্গ শরীরে ব্যাটন দিয়ে পিটিয়ে আনন্দ পেত, আবার কেউ স্তনের অংশ ধারালো দাত বা অস্ত্র দিয়ে কেটে নিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ত। (এইজন্য মুহাহাহা শব্দটা শুনলেই মনে হয় খানকির পোলার পুটকিতে নাইনএমএম ঢুকাইয়া পুরা ম্যাগাজিনটা খালি করি)। কোনো মেয়ে এসব অত্যাচারে কোনো প্রকার চিৎকার করার চেষ্টা করলে তার গুপ্তস্থানে লোহার রড ঢুকিয়ে তৎক্ষণাৎ হত্যা করা হতো।
প্রতিটি মেয়ের হাত বাধা ছিল পেছনের দিকে এবং তাদের শূন্যে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। অনেক সময় পাঞ্জাবী সেনারা এসে ওই ঝুলন্ত মেয়েদের এলোপাথারি বেদম প্রহার করে যেত। প্রতিদিন এরকম বিরামহীন অত্যাচারে মেয়েদের শরীরের মাংস কেটে রক্ত ঝরত। কারো মুখের সামনের দাত ছিল না, ঠোটের দুদিকের মাংস টেনে ছিড়ে ফেলা হয়েছিল। লোহার রডের অবিরাম পিটুনিতে প্রতিটি মেয়ের আঙুল, হাতের তালু ভেঙে গুড়ো হয়ে গিয়েছিল। এসব অত্যাচারিত মেয়েদের একমুহূর্তের জন্য হাতের ও চুলের বাধন খুলে দেওয়া হতো না- এমনকি পায়খানা প্রস্রাবের জন্যও না। হেড কোয়ার্টারের ওপরতলায় বারান্দায় তারা হাত বাধা অবস্থায় পায়খানা প্রস্রাব করত। আমি প্রতিদিন সেখানে গিয়ে সেসব পরিষ্কার করতাম।
আমি অনেকবার দেখেছি নির্মম অত্যাচারের শিকার এসব মেয়েরা অনেকেই ঝুলন্ত অবস্থাতেই মৃতু্য বরণ করেছে। প্রতিদিন সকালে সেই বাধন থেকে বাঙালী যুবতীদের বিভৎস মৃতদেহ পাঞ্জাবীদের নামাতে দেখেছি। আমাকে দিনের বেলায় সেখানে সেই বন্দী মহিলাদের পুতিগন্ধময় বর্জ্য পরিষ্কার করার জন্য সারাদিন উপস্থিত থাকতে হতো। প্রতিদিন রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ব্যারাক থেকে ও হেডকোয়ার্টার অফিসের ওপরতলা থেকে বহু নির্যাতিতার ক্ষত বিক্ষত বিকৃত লাশ ওরা পায়ে রশি বেধে ছেচড়ে নিয়ে যেত। এবং সেই জায়গায় রাজধানীর নানা এলাকা থেকে ধরে আনা নতুন মেয়েদের চুলের সাথে ঝুলিয়ে বেধে উলঙ্গ করে নতুন উদ্যমে নির্মম নির্যাতন চালাতো।
এসব উলঙ্গ নিরীহ মেয়েদের পাঞ্জাবী সেনারা সারাক্ষণ প্রহরা দিত। কোনো বাঙালীকে সেখানে ঢুকতে দেয়া হতো না। আর আমি ছাড়া অন্য কোনো সুইপারেরও সেখানে প্রবেশাধিকার ছিল না। মেয়েদের হাজারো কাতর আহাজারিতে আমি ইচছা থাকা স্বত্বেও তাদের বাঁচানোর কোনো ভূমিকা পালন করতে পারি নাই। 1971 সালের এপ্রিল মাসের শেষ দিকে খুব ভোরে হেড কোয়ার্টারের ওপর তলায় সারারাত ঝুলন্ত মেয়েদের মলমূূত্র পরিষ্কার করছিলাম, এসময় এক মেয়ের করুণ আর্তিতে ব্যথিত হয়ে পড়ি এবং মেথরের কাপড় পড়িয়ে তাকে মুক্ত করে পুলিশ লাইনের বাইরে নিরাপদে দিয়ে আসি। সঙ্গত কারণেই তার নামঠিকানা প্রকাশ করলাম না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই মেয়েকে আর দেখিনি।
1971 সালের ডিসেম্বরে মুক্তি বাহিনী ও মিত্র বাহিনী ঢাকা প্রবেশের আগ পর্যন্ত পাঞ্জাবীরা এসব মেয়েদের ওপর একই কায়দায় পাশবিক অত্যাচার চালিয়ে গেছে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মিত্রবাহিনী ঢাকায় বোমা ফেলার সাথে সাথে পাঞ্জাবী সেনারা এইসব মেয়েদের বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে হত্যা করে। রাজারবাগ হেডকোয়ার্টার অফিসের ওপর তলায় সমস্ত কক্ষ ও বারান্দায় এসব বীরাঙ্গনার তাজা রক্ত জমাট বেধে ছিল।
ডিসেম্বরে মুক্তি বাহিনী ও মিত্র বাহিনী বীর বিক্রমে ঢাকায় প্রবেশ করলে রাজারবাগের ওইসব বর্বর হায়েনার দল আত্মসমর্পন করে। (চলবে)
ছবি : 1. ধর্ষণের পর হত্যা
2. মৃতদেহ সরিয়ে নেওয়া হতো ভ্যানে
3. বীরাঙ্গনাদের কয়েকজন
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ৭:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




