রাজারবাগের আর্মড সাবইন্সপেক্টর জনাব আব্দুস সোবহান 25 মার্চ '71 মীরপুর 10 নম্বরে জরুরী টহলে ছিলেন। তিনি 37 জন পুলিশের এক প্লাটুন নিয়ে মীরপুর থানায় যান। রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পাকবাহিনীর হামলার খবর ততক্ষণে তারা পেয়ে গেছেন। মোহাম্মদপুর আসাদগেটের দিকে ভীষন গোলাগুলি শুরু হয়ে গেছে, জ্বলছে রাজধানী ঢাকা। আব্দুস সোবহানের নেতৃত্বে 37 জনের দলটি মীরপুরের ইটখোলার ভেতরে পজিশন নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। মীরপুরের ইপিআর ক্যামপের জোয়ানদের সঙ্গে হানাদারদের একঘণ্টা ধরে তুমুল সংঘর্ষ চলে। এরপর পাকসেনারা ইপিআরদের বন্দী করে তিনটি ট্রাকে করে নিয়ে যাচিছল। এদের সঙ্গেই সংঘর্ষ শুরু হয় 37 পুলিশের। পুলিশদের প্রত্যেকের কাছে ছিল 20 রাউন্ড করে গুলি। তা ফুরিয়ে এলে, তারা পিছু হটতে বাধ্য হন। পরে তারা কল্যানপুরে বাঙালী এলাকায় গিয়ে পুলিশের পোষাক ছেড়ে ছাত্র-জনতার সঙে মিশে যান। 26 মার্চ শুক্রবার কারফিউর মধ্যে অসংখ্য বিহারী বাঙালী কলোনিতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে লুটপাট ও নানা অত্যাচার শুরু করে। তখন ছদ্মবেশি পুলিশরা তাদের ওপর গুলি চালায়। এতে দুজন বিহারী ঘটনাস্থলে মারা যায়। বাকিরা পালায়।
ঢাকার পিলখানা :
'71-এর মার্চের প্রথম সপ্তাহে 22 বেলুচকে পিলখানাতে আনা হয়। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে বাঙালী ইপিআররা প্যারেড গ্রাউন্ডের বটগাছের মাথায় প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। আর এরাই হচেছন বাংলাদেশের সামরিক ও প্রতিরক্ষা বিভাগগুলোর মধ্যে প্রথম যারা এই দুঃসাহস দেখান। বাংলার বীর সন্তান ল্যান্স নায়েক বাশার এই পতাকা উত্তোলন করেন। পরে তাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়।
25 মার্চ রাত 1টা 5 মিনিটে 22 বেলুচ রেজিমেন্ট পিলখানা আক্রমণ করে। পিলখানার 2500 বাঙালী জওয়ান ও অফিসারদের মধ্যে ছয় শতাধিক অন্ধকারে পালিয়ে যেতে সম হন। বাকী সবাইকে আটক করে মোহাম্মদপুর বন্দী শিবিরে পাঠানো হয়। এদের মধ্যে সাত শতাধিককে বেয়নেট চার্জ ও গুলি করে হত্যা করা হয়। বাকিরা পালিয়ে গিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেন। দীর্ঘ সাড়ে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে প্রায় 1 হাজার ইপিআর সদস্য দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেন।
পিলখানায় হানাদারদের সঙ্গে বাঙালীদের এক খন্ড যুদ্ধ হয়। এতে একজন লেফটান্যান্টসহ 6 জন পাকসেনা নিহত হয়। একজন পাঞ্জাবী ইপিআর মোহাম্মদ খানকেও হত্যা করা হয়। এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন গার্ডকমান্ডার নায়েক জহিরুল হক।
বংশাল ফাঁড়ির প্রতিরোধ :
25 মার্চের কালো রাতে কিছু সংখ্যক পাকসেনা বংশাল ফাঁড়ি আক্রমণ করতে গিয়ে দারুণ প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়। অবিশ্বাস্য হলেও ফাঁড়ির ভেতর থেকে মেশিনগানের গুলি তাদের অভ্যর্থনা জানায়। (এ নিয়ে দুর্দান্ত একটা কাহিনী আছে)। দুপক্ষে যুদ্ধ শুরু হয়। কিছুক্ষণ গোলাগুলির পর হানাদাররা বাধ্য হয়ে পালিয়ে যায়। এই প্রতিরোধের নায়ক ছিলেন সুপরিচিত কাদের গুন্ডা ও তার কজন সাগরেদ। মেশিনগানটি ছিল তারই!
ঢাকা শহরে সশস্ত্র প্রতিরোধ :
লেঃ আনোয়ার হোসেনসহ 16 জন যুবক 27 মার্চ ঢাকা সেনানিবাস থেকে পালিয়ে যান। তেজগাঁ ড্রাম ফ্যাক্টরির কাছে ইপিআর, আনসার, পুলিশ, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষকরা মিলে মুক্তি বাহিনী গঠন করে। এদের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিনশোর ওপর। লেঃ আনোয়ার এই দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তেজগাঁ রেললাইনের অপরদিকে হানাদারদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। এতে নিহত হয় 126 জন পাকসেনা। আহত হয় অনেক। ধ্বংস হয় হানাদারদের 3টি গাড়ি। বহু অস্ত্র দখলে আসে মুক্তি বাহিনীর।
30 মার্চ '71 লেঃ আনোয়ার সহ 10 জন মুক্তিযোদ্ধা মহাখালিতে রেকি করতে যান, সেখানে তারা হানাদারদের অ্যামবুশে পড়েন। ইপিআর শামসুল আলম এখানে শহীদ হন, বাকীরা খোদার অশেষ রহমতে অক্ষত দেহে ফিরে আসেন। 31 মার্চ রাত 3টায় আসাদ গেটের কাছে হানাদারদের অবস্থানে আক্রমণ করে মুক্তিবাহিনী। এতে 5 জন শত্রুসেনা নিহত হয়।
1 এপ্রিল ভোর 5টায় প্রচুর অস্ত্র ও সৈন্য নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা করে। বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে শহীদ হন অনেক মুক্তিযোদ্ধা। লেঃ আনোয়ারসহ 7 জন পাকসেনাদের হাতে বন্দী হন। (চলবে)
ছবি : প্রতিরোধের প্রস্তুতি
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ৭:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



