somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যাদের রক্তে মুক্ত এদেশ (ধারাবাহিক)-20

৩১ শে মার্চ, ২০০৬ সকাল ৯:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

27 মার্চ '71 হানাদার বাহিনী 6টি জিপে ঢাকা থেকে নদীবন্দর নারায়নগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। তারা 10 মাইল দীর্ঘ রাস্তার দুপাশে জনগনকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। মর্টার শেল ও কামানের গোলায় জ্বালিয়ে দেয় অসংখ্য ঘরবাড়ি। শহরের উপকণ্ঠে জেটি মাসদাইরে প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয় তাদের। হানাদাররা জামিল ডকইয়ার্ডের মালিক ও মাসদাইরের বাসিন্দা জসিমুল হক ও তার স্ত্রীকে গুলি করে হত্যা করে। 29 মার্চ শহরে প্রবেশ করে তারা। টানবাজারের ছাত্রলিগ সভাপতি 18 বছরের তরুন মোশাররফ হোসেন মনা ও বন্দর হাইস্কুলের সাধারণ সমপাদক কর্মবীর চিত্তকে ছাত্রলীগ কার্যালয়ে হত্যাকরে।

জিঞ্জিরা :
2 এপ্রিল সকালে কুখ্যাত ব্রিগেডিয়ার বশীরের নির্দেশে পাক জল্লাদ বাহিনীর নরপশুরা কেরানিগঞ্জে ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য হামলা চালায়। তারা গ্রামের পর গ্রাম লুন্ঠন করে, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়। বর্বররা জিঞ্জিরা, শুভাড্যা ও কালিন্দি ইউনিয়নে নির্বিচারে গুলি চালায়- আক্রান্ত হয় প্রতিটি গ্রামের প্রতিটি ঘর। ধর্ষিতা হয় এলাকার প্রতিটি মা-বোন। রক্তের গঙা বইয়ে দিল ওরা কেরানিগঞ্জে। প্রতিটি ঘরবাড়ি, ঝোপঝাড়, নালানর্দমা, পুকুরডোবা আর কাশবন থেকে পাওয়া গেল অসংখ্য লাশ। খোলা মাঠেও পড়ে ছিল হাজার লাশ। শহর থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় পালানো বহু অপরিচিত মানুষও ছিল এদের মধ্যে। মান্দাইল ডাকের সড়কের সামনের পুকুর পারে পশুরা একসঙ্গে 60 জনকে গুলি করে মারে। কালিন্দির এক বাড়িতে পিশাচরা পাশবিক অত্যাচার করার পর হত্যা করে 11 জন নারীকে।

মধুদা :
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী সকলের মধু দা, মধুসুদন দে বিখ্যাত মধুর ক্যান্টিনের মালিক। আর এই ক্যান্টিনই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতির সূতিকাগার। এখান থেকে বেরিয়ে অনেকেই জীবনের সিড়ি বেয়ে প্রতিষ্ঠার পথে, খ্যাতির শীর্ষে, বিভিন্ন মহকুমা ও জেলা প্রশাসক হয়েছেন, অনেক দেশবরেণ্য নেতাও আছেন এই তালিকায়। '52 সালের স্মৃতিচারণে মধুদা বলেছিলেন, 'বরকত চা খেয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল, আর একদিন আসাদও এমনি চা খেয়ে ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে মিছিলে গিয়েছিল। আর ফেরেনি।'

এই মধুর ক্যান্টিনে অনেক শহীদের স্মৃতি তর্পন হয়েছে। কিন্তু সবার প্রিয় মধুদা রয়ে গেছেন 25 মার্চের প্রতীক্ষায়। মধুদা সপরিবারে থাকতেন জগন্নাথ হলের পাশে শিববাড়িতে থাকতেন। 26 মার্চ সকালে আক্রান্ত হলো শিববাড়ি, হানাদাররা নির্মমভাবে হত্যা করল মধুদার ছেলে রণজিৎ ও পুত্রবধু রানীকে। এই বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের স্বাক্ষী পরিবারের একটি মেয়ে রানু। ছোট দাদাবাবু ও বৌদিকে বাঁচাতে ছুটে গিয়েছিল সে। হানাদাররা তাকে গুলি করে যার একটি তার চোয়ালে লাগে অন্যটি বুক ভেদ করে যায়- কিন্তু তারপরও বেচে যায় রানু। এরপর বর্বররা মধুদাকে গুলি করে। তাকে বাঁচাতে গিয়ে গুলির আঘাতে লুটিয়ে পড়লেন তার অন্তঃস্বত্ত্বা স্ত্রী। গুলি খেয়েও মধুদা অনেকক্ষণ বেচে ছিলেন।
গুলি করে চলে যাওয়ার ঘণ্টা খানেক পর আবার ফিরে এসে তাকে আহতবস্থায় তুলে নিয়ে যায়। জগন্নাথ হলের মাঠে হত্যা করা হয় সবার প্রিয় মধুদাকে। ঘটনার 14 দিন পর পর্যন্ত শিববাড়িতে পড়েছিল মধুবাবুর ছেলে, ছেলেবউ ও স্ত্রীর লাশ। এমনি করেই নিমর্ূল করা হয় সংগ্রামের এই জীবন্ত প্রতীককে।

পাঁচদোনার সংঘর্ষ :
4 ও 5 এপ্রিল পাকবাহিনী নরসিংদীর ওপর গোলা বর্ষণ করে। 13 এপ্রিল স্বয়ংক্রিয় ও অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে কয়েক'শ পাক সেনা বাবুরহাট থেকে যাত্রা করল নরসিংদীর উদ্দেশে। শত্রুসেনা বহনকারী ট্রাকের কনভয় পাঁচদোনায় পেঁৗছলে অতর্কিতভাবে আক্রান্ত হয়। প্রথমে মর্টার ও পরে কয়েক ঝাঁক মেশিনগানের গুলির শিকার হয় তারা। দুঘণ্টা ব্যাপী এই যুদ্ধে হানাদারদের তিন ট্রাক সৈন্য হতাহত হয়। এদের সংখ্যা 100-র বেশি। তাদের তিনটি ট্রাকও অকেজো হয়ে যায়। তাই হতাহতদের অন্যট্রাকে উঠিয়ে অকেজো গাড়িগুলো ফেলে পালিয়ে যায় হানাদাররা। যে মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র আক্রমণে একটি সুসজ্জিত ও সুশিক্ষিত সেনাদলকে অত্যাধুনিক অস্ত্রের অধিকারী হওয়ার পরও পালাতে হলো তাদের সংখ্যা ছিল মাত্র 18 জন। তাদের অস্ত্রের মধ্যে ছিল শুধু একটি মর্টার ও একটি মেশিন গান! (চলবে)

সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ৭:৪৭
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মাজার থেকে নৌকাবাইচ- এরপর কোথায়?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১০

মাজার থেকে নৌকাবাইচ- এরপর কোথায়?
মাজার বিদ্বেষ, বাউলগান বিদ্বেষ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আপত্তি- এরপর কিছুদিন ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কলেমা লেখা পতাকা টানানো; আর এখন সিলেটের বিয়ানীবাজারে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে ঐতিহ্যবাহী... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা - 'সত্য বলার সনদ'

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৮



রাত দুটায় রাকিবের ফোন বেজে উঠলো।

—ভাই, আপনার মুক্তিযোদ্ধা সনদটা কোথায়?

—কেন?

—একজন আমেরিকা-প্রবাসী ব্লগার বলেছেন, আপনি নাকি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা।

রাকিব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—আমার সনদ তো আলমারিতে। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাবিতে "মব সায়েন্স" পড়তে হলে কী কী যোগ্যতা লাগে?

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:১৮



- রাজনৈতিক সুবিধার জন্য তৌহিদী জনতার ব্যবহার করা জানতে হবে।

- রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও মবকে থামাতে না পারলে সেটাকে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা না বলে "জনতার শক্তি" বলতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ রক্ত ঋণ

লিখেছেন ইসিয়াক, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫৪




আমাদের পরিবারে সাব্বির নামটা উচ্চারণ করা নিষিদ্ধ । সাব্বির ভাইয়া আব্বুর প্রথম সংসারের একমাত্র সন্তান আর আমরা দুই ভাই -বোন তার দ্বিতীয় সংসারের।
সাব্বির ভাইয়ার মা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আর্কাইভ থেকে: আহ প্রিয়তমা, মিলনের গল্প জানো না

লিখেছেন অর্ক, ২৩ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:১৫



ফেলে আসা এক সড়কের কথা মনে পড়ে। হলুদ নিয়ন বাতির ম্লানাভ সন্ধ্যেবেলা। পলেস্তারা খসা বয়োজীর্ণ দেয়াল। দুয়েকটি রিক্সা। সিটের ’পর পা তুলে আঁটোসাটো ঝিমানো চালক। খেলা শেষে ঘরে ফেরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×