জিঞ্জিরা :
2 এপ্রিল সকালে কুখ্যাত ব্রিগেডিয়ার বশীরের নির্দেশে পাক জল্লাদ বাহিনীর নরপশুরা কেরানিগঞ্জে ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য হামলা চালায়। তারা গ্রামের পর গ্রাম লুন্ঠন করে, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়। বর্বররা জিঞ্জিরা, শুভাড্যা ও কালিন্দি ইউনিয়নে নির্বিচারে গুলি চালায়- আক্রান্ত হয় প্রতিটি গ্রামের প্রতিটি ঘর। ধর্ষিতা হয় এলাকার প্রতিটি মা-বোন। রক্তের গঙা বইয়ে দিল ওরা কেরানিগঞ্জে। প্রতিটি ঘরবাড়ি, ঝোপঝাড়, নালানর্দমা, পুকুরডোবা আর কাশবন থেকে পাওয়া গেল অসংখ্য লাশ। খোলা মাঠেও পড়ে ছিল হাজার লাশ। শহর থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় পালানো বহু অপরিচিত মানুষও ছিল এদের মধ্যে। মান্দাইল ডাকের সড়কের সামনের পুকুর পারে পশুরা একসঙ্গে 60 জনকে গুলি করে মারে। কালিন্দির এক বাড়িতে পিশাচরা পাশবিক অত্যাচার করার পর হত্যা করে 11 জন নারীকে।
মধুদা :
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী সকলের মধু দা, মধুসুদন দে বিখ্যাত মধুর ক্যান্টিনের মালিক। আর এই ক্যান্টিনই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতির সূতিকাগার। এখান থেকে বেরিয়ে অনেকেই জীবনের সিড়ি বেয়ে প্রতিষ্ঠার পথে, খ্যাতির শীর্ষে, বিভিন্ন মহকুমা ও জেলা প্রশাসক হয়েছেন, অনেক দেশবরেণ্য নেতাও আছেন এই তালিকায়। '52 সালের স্মৃতিচারণে মধুদা বলেছিলেন, 'বরকত চা খেয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল, আর একদিন আসাদও এমনি চা খেয়ে ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে মিছিলে গিয়েছিল। আর ফেরেনি।'
এই মধুর ক্যান্টিনে অনেক শহীদের স্মৃতি তর্পন হয়েছে। কিন্তু সবার প্রিয় মধুদা রয়ে গেছেন 25 মার্চের প্রতীক্ষায়। মধুদা সপরিবারে থাকতেন জগন্নাথ হলের পাশে শিববাড়িতে থাকতেন। 26 মার্চ সকালে আক্রান্ত হলো শিববাড়ি, হানাদাররা নির্মমভাবে হত্যা করল মধুদার ছেলে রণজিৎ ও পুত্রবধু রানীকে। এই বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের স্বাক্ষী পরিবারের একটি মেয়ে রানু। ছোট দাদাবাবু ও বৌদিকে বাঁচাতে ছুটে গিয়েছিল সে। হানাদাররা তাকে গুলি করে যার একটি তার চোয়ালে লাগে অন্যটি বুক ভেদ করে যায়- কিন্তু তারপরও বেচে যায় রানু। এরপর বর্বররা মধুদাকে গুলি করে। তাকে বাঁচাতে গিয়ে গুলির আঘাতে লুটিয়ে পড়লেন তার অন্তঃস্বত্ত্বা স্ত্রী। গুলি খেয়েও মধুদা অনেকক্ষণ বেচে ছিলেন।
গুলি করে চলে যাওয়ার ঘণ্টা খানেক পর আবার ফিরে এসে তাকে আহতবস্থায় তুলে নিয়ে যায়। জগন্নাথ হলের মাঠে হত্যা করা হয় সবার প্রিয় মধুদাকে। ঘটনার 14 দিন পর পর্যন্ত শিববাড়িতে পড়েছিল মধুবাবুর ছেলে, ছেলেবউ ও স্ত্রীর লাশ। এমনি করেই নিমর্ূল করা হয় সংগ্রামের এই জীবন্ত প্রতীককে।
পাঁচদোনার সংঘর্ষ :
4 ও 5 এপ্রিল পাকবাহিনী নরসিংদীর ওপর গোলা বর্ষণ করে। 13 এপ্রিল স্বয়ংক্রিয় ও অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে কয়েক'শ পাক সেনা বাবুরহাট থেকে যাত্রা করল নরসিংদীর উদ্দেশে। শত্রুসেনা বহনকারী ট্রাকের কনভয় পাঁচদোনায় পেঁৗছলে অতর্কিতভাবে আক্রান্ত হয়। প্রথমে মর্টার ও পরে কয়েক ঝাঁক মেশিনগানের গুলির শিকার হয় তারা। দুঘণ্টা ব্যাপী এই যুদ্ধে হানাদারদের তিন ট্রাক সৈন্য হতাহত হয়। এদের সংখ্যা 100-র বেশি। তাদের তিনটি ট্রাকও অকেজো হয়ে যায়। তাই হতাহতদের অন্যট্রাকে উঠিয়ে অকেজো গাড়িগুলো ফেলে পালিয়ে যায় হানাদাররা। যে মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র আক্রমণে একটি সুসজ্জিত ও সুশিক্ষিত সেনাদলকে অত্যাধুনিক অস্ত্রের অধিকারী হওয়ার পরও পালাতে হলো তাদের সংখ্যা ছিল মাত্র 18 জন। তাদের অস্ত্রের মধ্যে ছিল শুধু একটি মর্টার ও একটি মেশিন গান! (চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ৭:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




