এদিকে গেরিলারা আরো কিছু দুঃসাহসিক অভিযান চালায় ঢাকার বুকে। যেমন, 1. উলন পাওয়ার স্টেশন অপারেশন, 2.ওয়াপদা পাওয়ার হাউজ রেইড, 3.গুলবাগ পাওয়ার স্টেশন অপারেশন, 4. কাটাবন মসজিদের উত্তরে বৈদু্যতিক স্টেশনে হামলা, 5 এনেগ্রা রকেট লাঞ্চার দিয়ে এমপি হোস্টেলে হামলা, 6. হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে দ্বিতীয় দফা হামলা।
11 আগস্ট গেরিলারা সন্ধ্যা 5টা 5 মিনিটে হোটেল ইন্টারকনে প্রচণ্ড এক বিস্ফোরণ ঘটান। হোটেল লাউঞ্জ, শপিং আর্কেড ও আশেপাশের রুমগুলোর কাঁচ টুকরোটুকরো হয়ে যায়, দরজা ছিটকে পড়ে দূরে। রুমের ভেতর, কার ও লাউঞ্জের দেওয়াল ভেঙে যায়। বেশ কজন লোক আহত হয়। বাংলাদেশে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতার সংবাদ বিশ্বজুড়ে সংবাদপত্রগুলোয় কাভারেজ পায়।
ঢাকায় বেশ কিছু সফল অপারেশনের ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি অবরুদ্ধ নগরবাসীও উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। 2 নং সেক্টর থেকে 52 জন গেরিলার একটি দল তিতাস নদীপথে ঢাকার দিকে রওয়ানা হয়। আখাউড়া ব্রাক্ষণবাড়িয়া সড়কের একটি ব্রিজের নিচে গভীর রাতে তিতাসে পৌছেন তারা। সেখানে 7দিন 7 রাত অতিবাহিত করে ধামরাই থানার এক গ্রামে নৌকা ভেড়ান। রেশন ফুরিয়ে যাওয়ায় গেরিলার 48 ঘণ্টা স্রেফ নদীর পানি খেয়েই পেট ভরান। এরপর তারা রাত্রে ক্যামপ করেন রোহা গ্রামের বাজারে। কিন্তু তাদের আসার খবর পৌছে যায় পাকবাহিনীর কাছে। রাতে আক্রমণ করে তারা গেরিলাদের। এই সংঘর্ষে 19 জন হানাদার নিহত হয়। নিরূপায় হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয় তারা। আর গেরিলারা রোহা ছেড়ে ক্যামপ করেন শিংগাইর থানা এলাকার কাছাকাছি একটি গ্রামে। এখানে তারা পাকহানাদারদের একটি র্যাশনিং কোরকে আক্রমণ করে সবাইকে হত্যা করেন। সফল অপারেশন শেষে শিমুলিয়ায় ক্যামপ স্থানান্তর করেন তারা।
এই পর্যায়ে 23 জনের একটি দল ঢাকায় ঢোকেন। এই দলটি ছাড়াও শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে আরো একটি দল ঢাকার দক্ষিণের কিছু এলাকায় সফল গেরিলা তৎপরতা চালান। এরা বুড়িগঙা ও আশেপাশের এলাকা জুড়ে বিভিন্ন সময়ে শত্রুদের ওপর হামলা চালান (এই দলেই ছিলেন আযম খান ও জসিম)।
প্রথম দলটি কাকরাইলের মোড়ে যে পেট্রলপামপটি ছিল তা ধ্বংস করে দেয়। এরপর ডিআইটি ভবনের চুড়ার নিচে 5 পাউন্ড প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ লাগিয়ে বিস্ফোরণ ঘটান। বিস্ফোরকের পরিমাণ কম হওয়ায় চুড়াটি পুরো ধ্বংস হয়নি, তবে তাতে ফাটল ধরে।
সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে সাভার রোড ও স্টেশন থেকে মানিকগঞ্জের বড়াল ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় 30 মাইল এলাকাজুড়ে অপারেশন চালান। এতে তারা 319 জন রাজাকারকে আত্মসমর্পনে বাধ্য করেন এবং প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র তাদের হাতে আসে। অক্টোবরের প্রথম দিকে সাভার রোড ও স্টেশনের সামনে তিনটি পাকিস্তানী লরিতে আক্রমণ করে 37 জন পাকসেনা খতম করেন গেরিলারা।
অক্টোবরে সামরিক সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাশ চালুর চেষ্টা চালায়। গেরিলারা বিশ্ববিদ্যালয় ভবনের সাইকোলজি বিভাগে একটি ও তিন তলা ও চার তলায় কিছু বিস্ফোরণ ঘটান। এতে বন্ধ হয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয় চালুর অপচেষ্টা। কিছু গেরিলা এর মধ্যে ঢাকা মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাঙ্কে অপারেশন করেন। গেরিলা মুনির (অভিনেতা রাইসুল ইসলাম আসাদ ছিলেন সঙ্গে) একটি খেলনা পিস্তল দিয়ে সফলভাবে বেশ কিছু নগদ অর্থ সংগ্রহ করেন। নভেম্বরের শুরুতে গেরিলারা হাইজ্যাক করা একটি গাড়ি নিয়ে বায়তুল মোকাররমে পার্ক করা পাক বাহিনীর দুটো সৈন্য বোঝাই লরির মাঝখানে রেখে তাতে বিস্ফোরণ ঘটান- মারা যায় 16 জন হানাদার।
নভেম্বরেই মালিবাগ রেলক্রসিংয়ের কাছে রেললাইন উড়িয়ে দিতে গিয়ে ভোর চারটায় পাকবাহিনীর সঙ্গে প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয় গেরিলাদের। এতে তাদের একটি সেকশান নিহত হয়। এই মাসেই শাহবাগের মোড়ে হামলা চালিয়ে বেশ কিছু পাকসেনাকে হত্যাকরেন গেরিলারা। 14 নভেম্বর তারা এক উল্লেখযোগ্য অপারেশন করেন। যার নাম ছিল ভায়াডুবি ব্রিজ অপারেশন। এই সফল আক্রমণে ব্রিজে পাহারারত 20 জন হানাদার নিহত হয়। ব্রিজটি দখল করে নেন গেরিলারা। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই মানিকগঞ্জের 700 পাকসেনার একটি দল তিনটি গাড়িতে ব্রিজ অভিমুখে রওনা দেয়। গভীর রাতে তারা আক্রমণ করে মুক্তিযোদ্ধাদের। এই যুদ্ধে প্লাটুন অধিনায়ক মানিক শহীদ হন এবং আহত হন আরো ক'জন মুক্তিযোদ্ধা। ফলে পিছু হটেন গেরিলারা। 4 দিন পর 18 নভেম্বর ব্রিজটি আবারো দখল করেন তারা এবং উড়িয়ে দেন। ধামরাই এলাকা সমপূর্ণ শত্রুমুক্ত করে গেরিলারা মূল ক্যামপ সাভারের জিরাবতে স্থানান্তর করেন। আর 150 জনের একটি দল রয়ে যায় ধামরাইয়ে। সাভার মহাসড়ক গেরিলাদের নিয়ন্ত্রনে চলে আসায় উত্তর বঙ্গ থেকে বিচিছন্ন হয়ে পড়ে ঢাকা। সাভারে পাকবাহিনীর একটি বড় ক্যামপ ছিল, নভেম্বরের শেষ দিকে এক ঝটিকা আক্রমণে তা দখল করে নেন গেরিলারা। পরে সাভার থানাও চলে আসে তাদের নিয়ন্ত্রনে।
এদিকে 30 জুন ক্র্যাকপ্লাটুনের 9 জন গেরিলা পাক হানাদারদের হাতে ধরা পড়েন। এদের 7 জনকে অকথ্য নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। গেরিলারা ছিলেন- হাফিজ, জুয়েল (ক্রিকেটার), বদি, আজাদ (আনিসুল হকের 'মা' যাকে নিয়ে), বাকি, রুমি (জাহানারা ইমামের ছেলে) ও আলতাফ (সম্ভবত আলতাফ মাহমুদই, তার বাড়ির বাগান থেকেই দুই ট্রাঙ্ক অস্ত্র ্র গোলাবারুদ উদ্ধার করে পাকবাহিনী)।
16 জুলাই '71 রাত 9 টায় 6 জন গেরিলা ঢাকার বৃহত্তম রামপুরা পাওয়ার স্টেশন উড়িয়ে দেন। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে রিকশাচালকের ছদ্মবেশে দুইজন গেরিলা কলাবাগান থেকে আসার সময় একটি সামরিক ভ্যানের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। এতে ড্রাইভার ছাড়া বাকি সৈন্যরা নিহত হয়। বকশিবাজারে মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের গেটের কাছে অবস্থানরত একটি রাজাকার ক্যামপে হামলা চালান গেরিলারা প্রকাশ্য দিবালোকে, যাতে মারা যায় দুই রাজাকার। নারায়নগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে পাহারারত 5জন রাজাকারকেও একই কায়দায় হত্যা করেন তারা। এর মাঝে এসএসসি পরীা চলাকালে সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুলে বিস্ফোরণ ঘটান গেরিলারা। সেই সঙ্গে মতিঝিল বানিজ্যিক এলাকায়ও। যাত্রাবাড়িতে ক্র্যাক প্লাটুনের সঙ্গে পাকবাহিনীর মুুখোমুখি এক সংঘর্ষ হয় যাতে নিহত হয় অনেক শত্রুসেনা। গেরিলারা যাত্রা বাড়িতে একটি পুল উড়িয়ে নারায়নগঞ্জ থেকে ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন করে দেন। (চলবে)
ছবি : 1.অপারেশনে যাচ্ছেন মু্িক্তবাহিনীর বীর যোদ্ধারা
2. মেজর খালেদ মোশাররফ (2 নম্বর সেক্টর কমান্ডার ও ঢাকায় গেরিলা কার্যক্রমের প্রধান উপদেষ্টা)
3. বীর মুক্তিবাহিনী
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ৭:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




