পঞ্চম নিয়ম- বৈজ্ঞানিক ফ্যাশান
কোনো একটা ঘটনার বিবরণ শোনামাত্র, সেটাকে অতি-প্রাকৃতিক, অস্বাভাবিক ও সুপারন্যাচারাল বলিয়া একদম উড়াইয়া দেওয়া উচিত নহে। স্বীকার করি, এই জগৎটা নিয়মের রাজ্য, এবং সে নিয়মের যে ব্যাভিচার ও ব্যতিক্রম হইতে পারে না, অনেক বৈজ্ঞানিকই এ কথা বলিয়া থাকেন। তাহাদের বহি-কেতাব পড়িয়া, বা যাহারা পড়িয়াছেন তাহাদের মুখে শুনিয়া, আমরাও গম্ভীরভাবে বলিতে আরম্ভ করিয়াছি- হযরতের অমুক মোজেজায় আমরা বিশ্বাস করিতে পারি না।
পল্লীগ্রামের ডোম-চামারেরা যেমন বাবুশ্রেনীর আদর্শ-মনুষ্যদের দেখাদেখি 'এলবার্ট ফ্যাশান' কাটিতে ব্যাগ্র হয়, অথচ তাহা দ্বারা তাহারা যে কি সুখলাভ করিবে; তাহা তাহারা জানে না- সেইরূপ আমরা অনেক সময় 'নিজেরা কিছু জানিবার-শুনিবার চেষ্টা না করিয়াও, কেবল ঐরূপ 'বৈজ্ঞানিক ফ্যাশানের' খাতিরে বৈজ্ঞানিক অপেক্ষা ডাবল জোরে বলিয়া থাকি যে, আমরা ঐসকল বিবরণে বিশ্বাস করি না। কারণ ঐগুলি অতি-প্রাকৃতিক ব্যাপার- প্রাকৃতিক নিয়মকানুনের বিপরীত, সুতরাং উহা কখনো ঘটিতে পারে না।
আমরা এই শ্রেনীর বন্ধুদিগকে বিজ্ঞানের সহিত লড়াই করিতে কখনই বলি না। বরং তাহাদিগের নিকট আমাদের বিনীত প্রার্থনা-তাহারা অনুগ্রহ করিয়া বিভিন্নপন্থী প্রাচীন ও আধুনিক বৈজ্ঞানিকগনের আলোচনা মনযোগ দিয়া পাঠ করুন। আমাদের বিশ্বাস, তাহা হইলে অবিলম্বেই তাহাদিগকে সংযতবাক হইতে হইবে। তখন তাহারা হিউম ও টেন্ডালের প্রতিকুলে ওয়ালাস, হক্সলি, ক্রুকস ও লজের ন্যায় বৈজ্ঞানিকদের মত দেখিতে পাইবেন।
তখন বৈজ্ঞানিকদের সহিত একমত হইয়া তাহাকেও বলিতে হইবে- 'মনুষ্যের অভিজ্ঞতা যখন সীমাবদ্ধ, তখন এইটা প্রকৃতির নিয়ম, উহার কোথাও ব্যাভিচার নাই বা হইতে পারে না, এইরূপ নির্দেশ অন্যায়, অসঙ্গত, অসমীচীন ও অবৈজ্ঞানিক, এরূপ দুঃসাহসিকতা বুদ্ধিমানকে সাজে না।'
'মধ্যাকর্ষনের সার্বভৌমিকত্ব, জড়ের অনশ্বরতা, শক্তির অনশ্বরতা প্রভৃতি কয়েকটি ঘোরতর প্রাকৃতিক নিয়ম লইয়া কিছুদিন হইতে বৈজ্ঞানিক পন্ডিতরা বড়ই বাকদূকতা প্রদর্শন করিতেন। আজকাল অনেকে সাবধান হইয়া কথা কহেন। ঐসকল নিয়মের ব্যাভিচার অকল্পনীয় নহে, অসম্ভবও নহে। প্রকৃতির নিয়ম ভঙ্গ করিয়াছে, অতএব উহা অসম্ভব-একথা কোনো কাজের কথাই নয়। প্রাকৃতিক নিয়ম কি তাহাই যখন পুরাসাহসে বলিতে পারি না, তখন ঐ উক্তি হঠোক্তি মাত্র। প্রকৃতির এক দেশের সহিত আমার পরিচয়, লেনাদেনা কারবার রহিয়াছে; কিন্তু সেই প্রদেশের বাহির হইতে যদি কোনো নতুন ঘটনা আসিয়া হঠাৎ ইন্দ্রিয়গোচর হয়, তাহাকে প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধ বলিবার কাহারো অধিকার নাই।' (বিজ্ঞানাচার্য রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী প্রনীত 'জিজ্ঞাসা' পুস্তকের অতি-প্রাকৃত শীর্ষক সন্দর্ভ হইতে গৃহীত)
আমাদের সীমাবদ্ধ জ্ঞানের হিসাবে, এই বিষয়টা অত্যদ্ভুত, সুতরাং অতি-প্রাকৃত, সুতরাং অসম্ভব- এই যুক্তিটি যে কতদূর ভুল, বহু ধীমান বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের দ্বারা তাহা নিঃসন্দেহরূপে জানিতে পারিয়াছেন। ফিজিকাল রিচার্স সোসাইটির কার্যপ্রণালী ও ঐ সমিতি কতর্ৃক প্রকাশিত তদন্তের ফলাফল সংক্রান্ত পুস্তকগুলি পাঠ করিলেও সন্দেহ ও সংশয়াবিষ্ঠ ব্যক্তিগন অনেকটা শান্তিলাভ করিতে পারিবেন। (এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, 13শ সংস্করণ, 22 খণ্ড, 544-547 পৃঃ)
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই মে, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



