
ফুটবল খেলা কখনো দেখেন নি বা খেলাটি সম্পর্কে অজ্ঞ একজন ব্যক্তি প্রথমবারের মতো গ্যালারীতে উপস্থিত হলেন একটি ফুটবল ম্যাচ সরাসরি উপভোগ করার জন্য। খেলা শুরু হতেই ব্যক্তিটি তাঁর বন্ধুর কাছে জানতে চাইলেন, গোলাকার বস্তুটি নিয়ে খেলোয়াড়’রা ছুটছেন এর ভবিষ্যৎ কি। উত্তরে বন্ধুটি বললেন- বলটি দিয়ে গোল করা হবে। এ শুনে অবাক হলেন অজ্ঞ ব্যক্তিটি, বিস্ময় প্রকাশ করলেন- বলটা তো গোলই আছে আবার গোল করার কি আছে ! হাহ হাহ হা। কৌতুকটি হয়তো অনেকেরই জানা।
গ্রিক দার্শনিকেরা ধারনা করেছিলেন পৃথিবী গোলাকার। এরপর ১৯৬৯ সালে মানুষ যখন চাঁদে পৌঁছলও; মহাশূন্য থেকে আমরা চাক্ষুষ প্রমাণ পেলাম প্রায় গোলাকার পৃথিবীর। বাংলায় ‘গোল’ শব্দটি নির্দেশ করে বৃত্ত আকৃতির বা গোলকসংক্রান্ত। এছাড়া চিৎকার, জোর শব্দ, চেঁচামেচির গোলমাল তো রয়েছেই। ইংরেজি `Goal’ বলতে লক্ষ্য/লক্ষ্যবস্তু/উদ্দেশ্য বোঝানো হয়ে থাকে। তবে গোল শব্দটি মাঠে ব্যবহার করার অর্থ- লক্ষ্যপুরণ! বিশেষ করে পৃথিবীর অতি প্রাচীন গ্রিক খেলা ‘এপিসকায়রোস’ বা চাইনিজদের ‘সুওচিই’ থেকে রূপান্তরিত হওয়া ফুটবলের আক্ষরিক লক্ষ্যই হলো গোল করা। একটি গোলাকৃতির বলকে গোল করতে এবং গোল হওয়া ঠেকাতে বাইশ জন খেলোয়াড়ের চেষ্টা/উদ্যম/লক্ষ্য/প্রয়াসের সামগ্রিক চিত্রটি আমাদের বিশ্বের সর্বাধিক জনপ্রিয় ও প্রচলিত খেলা ফুটবল।

গোল হওয়ার এই যজ্ঞ নিয়ে প্রতি চার বছর পরপর ফুটবলের মহা আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। বাছাই পর্ব উতরে চূড়ান্ত পর্বে ৩২টি জাতীয় দল অংশ নেয়। বিজয়ী দলের হাতে তুলে দেওয়া হয় ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি। ১৯৩০ সালে ফিফা যে বীজ রোপণ করেছিল, সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বীজটি আজ বিশালাকার এক বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। ৭০০ কোটি মানুষের বিশ্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও নানা সমস্যায় জর্জরিত আমাদের আজকের পৃথিবী। জলবায়ুর পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ক্ষুধা-দারিদ্র্যতার পাশাপাশি ভয়াবহ রকম আকার ধারণ করছে হিংসা-বিদ্বেষ, দ্বন্ধ-সংঘাত, যুদ্ধ-হানাহানি, অস্ত্রের ঝংকার প্রভৃতি। গোলাকার গ্লোবাল ভিলেজের এহেন সাংঘাতিক অবস্থা সামাল দিতে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসছে ফুটবলের তীর্থস্থান ব্রাজিলে। কিন্তু কি আশ্চর্য ! দেশটির আমজনতা, ব্রাজিল সরকারের এই আয়োজনকে জনবিচ্ছিন্ন বলে দাবি করছে। ব্রাজিলীয়দের চিকিৎসা আবাসন ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ইত্যাদি উপেক্ষা করে সরকার প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি টাকায় ৮৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি) খরচ করেছে দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থকে গোল বানাতে। কিছু পেতে হলে কিছুতো দিতেই হয়; দক্ষিণ আমেরিকার সর্ববৃহৎ রাষ্ট্রটি তার জাতি-গোষ্ঠীর চিন্তা-চেতনা, বিশ্বাস, ঐতিহ্য-ইতিহাস বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে আরও একবার। কোরকোভাদো মাউন্টেইনের চূড়ায় ক্রাইস্ট দ্য রেদিমার স্ট্যাচুটি হাত ছড়িয়ে আহবান জানাচ্ছে অনন্য দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ব্রাজিলের প্রাণপ্রাচুর্যে লুটোপুটি খেতে। অল ইন ওয়ান রিদম স্লোগানে বিশ্বসেরা ক্রীড়া আসরের আয়োজন করতে কোনও কমতি রাখছে না দেশটি। যদিও বেশকিছু দৃশ্যমান সমস্যা আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে ব্রাজিলের পর্যটনমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য সঠিক হলে বটবৃক্ষের ছায়া থেকে বঞ্চিত হবে না ব্রাজিল-বাসীগণ।
২০১৪’র ফিফা বিশ্বকাপের অফিসিয়াল সং ‘ওলে ওলা (আমরা এক)’ তে সাম্বার ছন্দে দুলছেন পীটবুল, জেনিফার লোপেজ ও ব্রাজিলের ক্লাউদিয়া লেইত্তে-
One night watch the world unite
Two sides, one fight and a million eyes
Full heart's gonna work so hard
Shoot, fall, the stars
Fists raised up towards the sky
Tonight watch the world unite, world unite
পুরো বিশ্ব কাঁপছে ফুটবল-জ্বরে। কিক দ্যা বল, মেক ইট গোল। সর্বস্তরের এই উদযাপন কে সমাজবিজ্ঞানীরা দারুণ ইতিবাচক বলেই মত দিয়েছেন। উন্মাদনা উচ্ছ্বাস উত্তেজনাপূর্ণ বিশ্বকাপ ফুটবল আনন্দ আমরা কতখানি উপভোগ করছি আর কতোটা ভোগের জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিচ্ছি এ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। গোল পরবর্তী উৎসব অথবা গোল হজমের বেদনা যদি গ্যালারী বা টিভি সেটের সামনে থাকা দর্শক/সাপোর্টাদের মধ্যকার হাতাহাতি গালাগালিতে রূপ নেয় তবে সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ববোধ ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশের আশায় আশান্বিত আমরা গোলাকার পৃথিবীর বৃত্তে এক হতে পারলাম কই !
কুইড্যু- ছি ! আমি চললাম ব্রাজিল …
অন্ধবিন্দু | সামহোয়্যার ইন...ব্লগ
চিত্রটি অন্তর্জাল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ১১:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



