টাইগারপাস থেকে হসপিটালে যাচ্ছি।
সঙ্গে আম্মু। রিক্সাওয়ালারা সচরাচর
যেতে চায় না। একটা রিক্সা রাজি হল,
কিন্তু সে নতুন। উপায় না পেয়ে নতুন
রিক্সাওয়ালার রিক্সাতেই উঠে
পড়লাম। জিইসি মোড়ে এসে গাড়িগুলোর একটা ছোটখাটো জটলা পাকিয়েছে।
রিক্সাওয়ালাকে বললাম- সামনের
ডানদিকের রাস্তাটায় যেতে হবে।
লোকটা রিক্সা নিয়ে এগোবে, এমন সময়
ট্রাফিক পুলিশ এল। বলা নেই কওয়া নেই
হঠাত করে ট্রাফিকের হাতের রাবারের পাইপটা দিয়ে কষে এক বাড়ি বসাল
রিক্সাওয়ালার হাতে। তার অপরাধ- সে
না বুঝে, সরাসরি রাস্তা পাড়ি
দিচ্ছিল। রিক্সাওয়ালা আমাদের দিকে
তাকিয়ে বলল- ভাই আপনেরা একটু
বুঝাইয়া কইবেন না যে, এইদিক দিয়া যাওন যাইব না। সত্যি কথা বলতে কি-
আমরা নিজেরাও আসলে জানতাম না যে
ওদিক দিয়ে চলাচল রেস্ট্রিক্টেড করে
দেয়া আছে। রিক্সাওয়ালাকে
সানমারের সামনে দিয়ে অনেকটা পথ
ঘুড়ে তারপর ঐ রাস্তায় আসতে হয়েছে। আর তার হাতের যে জায়গায় বাড়িটা
লেগেছে সেখানে ফুলে রক্ত জমাট বেঁধে
গিয়েছে। লোকটাকে বললাম হাতের ঐ
জায়গায় বরফ-ঠান্ডা পানি লাগাতে।
সানমারের সামনে কয়েকটা ভ্যানে
ফিল্টারের জারে করে লেবুর সরবত বিক্রি করে। জারগুলোর ওপরের
চেম্বারে বরফ থাকে। রিক্সাওয়ালার
সঙ্গে আমিও গেলাম। ভ্যানওয়ালাদের
কয়েকজনকে বললাম এক টুকরা বরফ
দিতে। ভ্যানওয়ালাগুলোর এক জনের
কাছেও বরফ পেলাম না। এমনকি টাকার বিনিময়েও না। রিক্সাওয়ালা আবার
রিক্সা চালাতে শুরু করল। তার চোখের
পানি মুছতে মুছতে আর এক ধরনের চাপা
কান্নার শব্দে বাঁকি পথটা রিক্সা
চালাল। হসপিটালের সামনে নামলাম। হসপিটাল হল আরেক বৈচিত্রময় জায়গা।
আমার গ্যাসের সমস্যা। আউটডোরের
টিকিট কাটলাম। সিরিয়ালে আমার
সামনে বেশ কয়েকজন অপেক্ষা করছেন।
ইনাদেরই একজন অত্যন্ত বৃদ্ধ, এসেছেন
তার স্ত্রী এবং ভাইয়ের স্ত্রীর সাথে। লোকটা খুবই অসুস্থ। দম যায় যায়
অবস্থা। এরই মধ্যে একবার তিনি চোখ
উল্টিয়ে ফেললেন। উনার সঙ্গের
মহিলারা ত তখন চিৎকার চেচামেচি
শুরু করে দিলেন। সবার দিকে তাকিয়ে
তাকিয়ে বলতে লাগলেন- ও বাজি, এক কানা দরন না বাজি, আরারে এক কানা
সাহায্য করন না বাজি। ডাক্তারের
চেম্বারের সামনে যে এসিসট্যান্ট
থাকে তাকে বললাম- লোকটার অবস্থা ত
খারাপ, উনাকে এক্ষুনি ডাক্তার
দেখানো দরকার। এসিস্ট্যান্ট বলে- উনার সিরিয়াল এখনও দেরী আছে।
বললাম- উনি মরার পর সিরিয়াল আসলে ত
আর লাভ নাই। এ কথা বলে আর দেরি
করলাম না, উনাকে নিয়ে উনার
রিলেটিভদের ডাক্তারের চেম্বারে
ঢুকে যেতে বললাম। ডাক্তার সাহেব খুবই ভাল, উনি বললেন- রোগীর অবস্থা ত
খারাপ, উনাকে ইমারজেন্সিতে ভর্তি
করতে হবে। চেম্বার থেকে বের হয়ে
ইমারজেন্সিতে নিয়ে যাব, এখন হেঁটে
হেঁটে যেতে গেলে রোগীর অবস্থা আরও
খারাপ হয়ে যাবে। এসিস্ট্যান্টের ডেস্কের নিচে ভাজ করা একটা হুইল
চেয়ার দেখতে পেলাম। শুরুতে গরিমসি
করলেও হুইল চেয়ার দেয়া নিয়ে
এসিস্ট্যান্ট আমার সাথে আর ভেজাল
করলেন না। এদিকে, ইমারজেন্সী
সম্ভবত চার তলায়। লিফটে করে যাব, এখন এসিস্ট্যান্ট আর যেতে দেয় না।
বলে- তাদের চেয়ার নাকি নিয়ে যাওয়া
যাবে না। রোগীর রিলেটিভরা বলল-
আরা ত তোয়ারার চেয়ার আবর হিরাই দি
যাইয়ুম দে, লই ন যাইয়ুম (মানে, আমরা ত
তোমাদের চেয়ার আবার ফিরিয়ে দিয়ে যাব, নিয়ে চলে যাব না)। এসিস্ট্যান্ট
তবুও মানতে নারাজ। এ ফাকে, আমার আম্মু
এদিকে এগিয়ে এসে এসিস্ট্যান্টকে
বলল- মাসি, এদের অবস্থা ত খারাপ,
আপনি একটু এদের দিয়ে আসেন, দরকার
হলে আপনাকে চা খাওয়ার কিছু পয়সা দিয়ে দিবে। মাসী রাজি হলেন।
ইমারজেন্সী থেকে একটা টিকিট আনতে
বললেন। রোগীর ভাইয়ের স্ত্রী টকিট
আনতে গেলেন। এদিকে সিরিয়ালে আমার
ডাক পড়ে গেলো। আমি ডাক্তারের
চেম্বারে গেলাম। বের হবার পর আর তাদের দেখা পেলাম
না। হয়ত ততক্ষণে রোগী পরপারে চলে
গেছে, বা ভাগ্য ভাল থাকলে
ইমারজেন্সী পর্যন্ত পৌছতে পেরেছে।
বের হবার পর আম্মুর কাছ থেকে যা
জানলাম- রোগীদের বাসা পাহাড়তলীতে। উনার তিন ছেলে এক
মেয়ে। মেয়ে বিয়ে দিয়ে ফেলেছে, আর
ছেলেরাও বড়। ছেলেদের ডাক্তার
দেখানোর কথা বলতে বলতেও কেউ
ডাক্তার দেখায় না। তাই উনার স্ত্রী-ই
উনাকে নিয়ে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে এসেছেন। এমনকি, এখানে আসার পরও
যখন ছেলেদের কাছে ফোন করা হয়েছে,
তখনও তারা ব্যাস্ত।
উপরের এত কথা-বার্তার উদ্দেশ্য শুধু
এটুকু একটু স্মরণ করিয়ে দেয়া যে, কোথায়
হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের মনুষ্যত্ব, কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের দয়া
মায়া। ঐ পুলিশ কি পারত না
রিক্সাওয়ালাকে বাড়ি না দিয়ে বলে
দিতে- এ রাস্তা বন্ধ, ঐদিক দিয়ে ঘুরে
আস। ভ্যানওয়ালা কি পারত না- একটা
টুকরা বরফ দিয়ে রিক্সাওয়ালার যন্ত্রণার সাময়িক অবসান ঘটাতে।
রিক্সাওয়ালার মৃদু গোঙ্গানি কি কারও
কর্ণ স্পর্শ করে না। করে, করে। আসলে
আমরা সবাই নিরব দর্শকের ভূমিকায়
অভিনয় করতে পছন্দ করি। নইলে কেন
অসুস্থ রোগীর স্বজনকে সাহায্যের জন্য চীৎকার করতে হয়। কেন সেবায়
নিয়োজিত কর্মী সেবা দিতে বিরক্তবোধ
করেন। কিংবা, উপযুক্ত সন্তান থাকতে
কেন বৃদ্ধ মা-কে তার বাবার জন্য
সাহায্য চেয়ে কাঁদতে হয়? আমাদের
নিরব দর্শক-কে কি সক্রিয় করার সময় আসে নি?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


