somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মিন্টু রোডের বিষন্ন মেয়েটি ( প্রথম পর্ব)

০৭ ই মার্চ, ২০১২ রাত ৯:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নামটা আরো একবার পড়লাম । AL-BAIK. কি পদের নাম রে বাবা ! তারপর পকেটে রাখা কাগজটা আবার বের করলাম ।
"আগামী কাল বিকাল সাড়ে চারটার সময় বেইলীরোডের AL-BAIK এ আসবে । বামদিকের কোনার টেবিলে বসবে "
ব্যস এইটুকুই । আর কোন কথা নাই । গতকাল মোবারক সাহের যখন আমাকে কাগজটা দিল আমি সত্যিই খুব অবাক হয়েছিলাম । আমার বিশ্ময় এখনও কাটেনি । আমি কথনও ভাবি নি সে আমার সাথে এমন নাটকীয় ভাবে দেখা করতে চাইবে ।
আর সব থেকে অবাক করার বিষয় হল আমি তার নাম পর্যন্ত জানি না । আর তার সাথে দেখা করতে চলে এসছি । তাও আবার এমন একটা জায়গায় ।
কাঁচ ঠেলে ভিতরে ঢুকে পড়লাম । ভিতরের পরিবেশটা অন্য রকম । মনে হল যেন অন্য জগতে চলে এসেছি । আসলে এর আগে এমন আমি এরকম কোন জায়গায় আসি নি তো তাই অন্য রকম লাগছে । হয়তো এটাই স্বাভাবিক ।
ভিতরে ঢুকে বাকদিকটা কোনদিক তাই ভাবছি এমন সময় কোটটাই পরা এক ইয়াং লোক আমার দিকে এগিয়ে এল ।
“গুড আফটারনুন স্যার” ! আমি হাসার চেষ্টা করলাম । আসলে এরকম ভাবে কেউ আমাকে সম্বোধন করেনি তো তাই অস্বস্থি লাগছে ।
“আপনি আসুন আমার সাথে” ।
আমি অস্বস্থি নিয়ে লোকটার পিছু নিলাম । লোকটা একদম কোনার দিককার একটা টেবিলে আমাকে বসতে বলল । আমি বসে পড়লাম গোবেচারার মত । আল্লাহই জানে আজ কপালে কি আছে ?
“কি খাবেন স্যার” ?
“আসলে একজনের আসার কথা । ও আসলে তারপর বলি” ?
“জি । ম্যাডামের আসতে আসতে হালকা কিছু খান । উনি আমাকে খুব ভাল করে বলে গেছেন আপনার দিকে লক্ষ্য করতে” ।
মনের মধ্যে অস্বস্থিটা আরো বেশি করে জানান দিলো । জানি না আমাকে এরা কার সাথে গুলিয়ে ফেলছে ।
কপালে আজ কি আছে কে জানে ?
“পপকর্ন আনি ? ম্যাম আসা পর্যন্ত সময় কাটান” ।
“আচ্ছা” ।
“এসিটা কি আর একটু বাড়াবো” ?
“না ঠিক আছে । আপনার এতো ব্যস্ত হতে হবে না” ।
লোকটা হাসল । বলল “আমি আসেপাশেই আছি । দরকার হলে ডাক দিবেন” ।
“আচ্ছা ঠিক আছে” ।
আমি পড়লাম আবারও চিন্তায় । সব কিছু ঠিক মত হচ্ছে তো ? অবশ্য ভুল হবার কথাও না ।
মেয়েটা মিন্টু রোডের বাংলোতে থাকে । তারমারে তার বাবা প্রশাসনের বড় কর্মকর্তা । প্রভাব তো থাকতেই পারে ! আমি ঠিক এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না যে সত্যি সত্যি আজ তার সাথে আমার দেখা হচ্ছে ।
কয়দিন আগে তারসাথে আমার পরিচয় । পরিচয় আমি কেবল জানি মেয়েটা মিন্টু রোডের চুয়াল্লিস নম্বর বাড়ির পাশের বাংলোতে থাকে । তার নাম পর্যন্ত আমি জানি না । কি ভাবে যে তার সাথে আমার কথা হয়েছে , হবার কোন সম্ভাবনাই ছিল না ।
সেদিন টিউশনির জন্য একটু আগে আগেই বের হয়ে গেছিলাম । তাই সময় কাটানোর জন্য মিন্টু রোডটাতে হাটতে লাগলাম । পুরো ঢাকার মধ্যে কেবল এই এলাকাটাই আমার পছন্দ । সরকারের সব বড় বড় লোকেরা এখানে থাকে । হাটতে খুব ভাল লাগে ।
আজও হাটতে হাটতে সেই বাংলোটার সামনে এসে দাড়ালাম । এই বাংলো টা আমার খুব পছন্দের । কিন্তু এই বাংলোটার কোন নম্বর দেওয়া নেই । ৪৪ নম্বর বাড়ির পাশের বাড়ি এটা ।
অনেকটা আমাদের এলাকার মত । বাড়ির সামনে বিশাল এলাকা । সবুজ ঘাসে ভরা । যেটা শহুরে পরিবেশের সাথে মিশে না । খুব ইচ্ছা হল একটু এই সবুজ ঘাসের উপর একটু খালি পায়ে হাটি । তাহলে খুব ভাল লাগতো ।
একটু সাহস সঞ্চয় করে এগিয়ে গেলাম গেটের দিকে । একজন পুলিশ পাহারায় রয়েছে । নেমপ্লেটে দেখলাম মোবারক ।
“ভাই সাহেব একটু শুনবেন” ! মোবারক সাহেব এগিয়ে আসলো ।
“কি চাই” ?
“একটু ভিতরে আসতে দিবেন ? একটু হাটতাম” ।
আমার কথা যেন ঠিক মত বুঝতে পারল না লোকটা । সরু চোখে তাকালো আমার দিকে ।
“কি বলতাছেন এসব ? হাটবেন মানে কি ? হাটার জন্য এতো জায়গা রয়েছে এর মধ্যে কি” ?
আমি জানি আমি যা বলব এ লোক তা বুঝবে না । বললাম "একটু ঘাসের উপর বসতাম” !
লোকটা এবার বিরক্ত হল ।
“ঘাসের উপর বসবেন পার্কে গিয়া বসেন । জানেন এইটা কার বাসা । স্যার দেখলে আমার চাকরি থাকবে না” ।
“তাহলে ভাই দরকার নাই” । আমি হাটা দিলাম । মনটা একটু খারাপও হল ।
একটু দুরে গেছি তখন পিছন থেকে কে যেন ডাক দিল মনে হল । যদিও ঢাকা শহরে পিছন থেকে ডাক দেওয়ার মত আমার কেউ নাই তবুও পিছন ফিরে তাকালাম । দেখলাম মোবারক সাহেব আমাকেই ডাকছেন । আমি এগিয়ে গেলাম ।
মোবারক বললেন “বেশি বাড়ির দিকে যাবেন না । এই দিকটায় হাটা হাটি করেন” ।
তাৎক্ষনিক এই মত পরিবর্তনের কারন বুঝলাম না । তবে আমি অনেক খুশি হলাম । তাই মত পরিবর্তনের আগেই ঘুকে পড়লাম । বেশি ভিতরের দিকে গেলাম না । পায়ের চপ্পলটা খুলে ঘাসের উপর হাটলাম খানিকক্ষন ।
সত্যিই কি চমৎকার । কোন কৃত্রিম কিছু নাই । একেবারে অরিজিনাল । একেবারে প্রাকৃতিক । কতদিন এরকম তাজা ঘাসের উপর হাটি নি । একটু হাটার পর হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়লাম ।
ইস যদি একটু শোয়া যেত ! কিন্তু এটা করা যাবে না । মোবারক সাহেব নিশ্চয় চেয়ে আছে । সারা দিনের সব ক্লান্তি দুর হয়ে গেল এখানে এসে । যদি প্রতিটা দিন এখানে আসা যেত !
হঠাৎ পিছনে পায়ের আওয়াজ পেলাম । নিশ্চই মোবারক সাহেব । এখন চলে যেতে বলবে । কিন্তু ঘুরে দাড়িয়ে দেখলাম অন্য কেউ । ধবধবে সাদা চাদর গায়ে একজন মেয়ে দাড়িয়ে । মেয়েটার চেহারার মাঝে কি জানি একটা মায়া ছিল । একটা বিষন্নতা ছিল ।
আমি মুখের কথা হারিয়ে ফেললাম । কি বলব বুঝতে পারছিলাম না ।
আমার বিব্রত আবস্থা দেখে মেয়েটা বলল “আপনি দাড়ালেন কেন” ?
“না মানে এখন মনে হয় আমার চলে যাওয়া উচিত্” ।
“কেন ? আমি এসেছি বলে” ?
আমি কিছু বললাম না ।
মেয়েটা বলল “কোন সমস্যা নাই । বরং আমি মোবারক সাহেব কে বলেছি আপনাকে এখানে ঢুকতে দিতে” ।
আমি খানিকটা কৌতুহলী হলাম ।
“আচ্ছা । ধন্যবাদ” । মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন জাগলো যে কেন এমন ইচ্ছা হল তার । প্রশ্নটা করতে হল না । মেয়েটা বলল “আপনি যখন মোবারক সাহেবের সাথে কথা বলছিলেন আমি এখন ঐ পাশটায় ছিলাম । আপনার কথা শুনে খুব মজা লাগলো । কেউ ঘাসের উপর হাটতে চাইবে কেন ? খানিকটা কৌতুহল হল । তাই আপনাকে ভিতরে আসতে বললাম । আচ্ছা কারনটা বলবেন” ?
আমি হাসলাম । বললাম “আসলে আমি গ্রামের ছেলেতো । এই রকম তাজা ঘাসের উপর দৌড়াদৌড়ি করে বড় হয়েছি । ঢাকা শহরে সেই পরিবেশ কোথায় পাবো বলুন ? মাঝে মাঝে তাই দম বন্ধ হয়ে আসে । আপনাদের এই এলাকাতে আসলে একটু শান্তি লাগে” ।
মেয়েটি হাসল । তখনই আমার মনের মাঝে কেমন যেন একটা ধাক্কা লাগলো । মেয়েটার হাসিতে কেমন যেন একটা বিষাদের ভাব আছে । কেমন যেন একটা বিষন্নতা আছে । আমি অবাক হয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম । মেয়েটার চোখের মধ্যেও কি এক দুঃখ আর বিষন্নতার ছায়া ।
এমন সময় আজান দিয়ে দিল । টিউশনীতে যেতে হবে ।
“আমি আজকে যাই ! টিউশনীতে যেতে হবে” ।
“কোথায় আপনার টিউশনী” ?
“এইতো কাজীর গলিতে । ভিএনএসের পাশে” ।
“আচ্ছা আপনার সাথে কথা বলে ভাল লাগল” ।
মেয়েটা আবার হাসল । আমি আবার সেই বিষন্নতা দেখতে পেলাম ।
কি মনে হল আমি জিঞ্জেস করলাম “আচ্ছা আপনার মনে এতো কিসের কষ্ট” ?
আমার কথাটা শুনে মেয়েটা যেন একটু চমকালো । মেয়েটা আমার প্রশ্নের জবাব দিলো না । খানিকক্ষন আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল “ভাল থাকবেন” ।
তারপর চলে গেল । আমি বিষন্ন মন নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম ।
বারবার মনে হল মেয়েটায় মনে এতো কিসের কষ্ট ? তারপরের সারাটা রাত আমি কেবল এই ভেবে কেটে গেল যে মেয়েটার মনে এতো কিসের কষ্ট ?
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই মার্চ, ২০১২ রাত ১০:০৯
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইরানে হিজাব আন্দোলন এবং আমাদের হিজাবী সমাজ

লিখেছেন সোহানী, ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ ভোর ৬:৫২




পুলিশী হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইরানে চলছে হিজাব প্রটেস্ট, রাস্তায় নেমেছে হাজার হাজার নারী পুরুষ। জোর পূর্বক চাপিয়ে দেয়া হিজাব রাস্তায় রাস্তায় পুড়ছে নারীরা। ক'দিনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুঃসময় টিকটিকিও আমাকে ছাড় দিচ্ছেনা!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ সকাল ১১:৩৫

আমাদের ঘরে বেশ কয়েকটা টিকটিকি এসেছে। লাইটের পিছনে লুকিয়ে থাকে। সুযোগ মতো বেরিয়ে শিকার ধরে খায়। ওদের থাকা খাওয়ায় আমার কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু ইদানিং টিকটিকিও আমাকে ছাড় দিচ্ছেনা.......... ...বাকিটুকু পড়ুন

'নারী নেতৃত্ব হারাম' - হাদিসটির ভুল ব্যাখ্যা হচ্ছে কি?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ দুপুর ১:১২



আমার আজকের পোস্টের উদ্দেশ্য কারো জীবনী আলোচনা করা নয়। গুগল মামার কাছে জিজ্ঞাসা করলেই মুসলমানদের ভূমিতে মহান নারী ব্যক্তিত্বদের সম্পর্কে আরও ভালো ভাবে জানা যাবে। বরং, আমি জিজ্ঞাসা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গত ৫২ বছর আমাদের শিক্ষার মান নীচের দিকে গেছে!

লিখেছেন সোনাগাজী, ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ সন্ধ্যা ৬:১৭



আমাদের প্রাইম মিনিষ্টার, শিক্ষামন্ত্রী কিংবা প্রেসিডেন্ট একবারও প্রশ্ন করেননি যে, আমাদের শিক্ষার এই অবস্হা কেন, কেন আমাদের পড়ালেখার সুনাম নেই? কেন ঢাকায় ভারতীয় ও অন্য বিদেশীরা এত... ...বাকিটুকু পড়ুন

এভাবে বেঁচে থাকার কোন মানে নেই

লিখেছেন জিএম হারুন -অর -রশিদ, ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ সন্ধ্যা ৬:৪৬



ছেলেবেলা আমরা খুব গরিব ছিলাম বলা যাবেনা,
তবে তিনবেলা পেট ভরে সবাই খেতে পারতাম না,
রোজকার খাবারে সংসারের কারো পেটই ঠিকমতো ভরতো কিনা জানিনা।
আমার পেট ভরে খাওয়া হয়নি কখনোই ছেলেবেলায়।

জামা কাপড়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×