somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার শেষ কর্পোরেট চাকরির ইন্টারভিউয়ের অভিজ্ঞতা

১৩ ই আগস্ট, ২০২১ দুপুর ১:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গতদিনের ভাইভা অভিজ্ঞতা লিখেছিলাম ফেসবুকের মেমরির কারণে । ফেসবুক আমাদের জানান দেয় একই দিন কয়েক বছর আগে আমরা কী কী লিখেছিলাম । অভিজ্ঞতা লেখার পর মনে হল প্রথমটা যখন লেখা হয়েছে শেষটাও লেখা হোক । সালটা ২০১৮ । আমি গিয়েছি কক্সবাজারে । একা । দুইদিন পরে আরও দুইজন আমার সাথে যোগ দিবে । তারপর সবার একসাথে ঢাকা ফিরবো। তাদের আসার আগেই আমার মোবাইলে মেসেজটা এসে হাজির হল । আমাকে ডাকা হয়েছে উত্তরা ব্যাংকে ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য । একটু অবাক না হয়ে পারলাম না । কারণ এইটাতে আমার ভাইভা কল আসার কথা না ।

শুনেছিলাম এমসিকিউতে যারা যারা অংশ নিয়েছিলো সবাইকেই রিটেন পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিলো । যারা ব্যাংক নিয়োগ পরীক্ষা সম্পর্কে জানেন না তাদেরকে বলি, সরকারী এবং বেসরকারী ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষার প্রথমে মোট তিনটা ধাপ অতিক্রান্ত করতে হয় । এমসিকিউ হয় প্রথমে । সেখান থেকে কাট মার্ক নিয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যক পরীক্ষার্থীকে লিখিত পরীক্ষার জন্য ডাকা হয় । এবং লিখিত পরীক্ষাপাশ করলে তাদেরকে ডাকা হয় ভাইভাতে । যেহেতু যারা এমসিকিউতে অংশ করেছিলো সবাইকেই লিখিত পরীক্ষা দিতে দেওয়া হয়েছিলো সেহেতু অনেক পরীক্ষার্থী ছিল । তার টিকতে হল দরকার ছিল ভাল পরীক্ষা দেওয়া । কিন্তু আমার পরীক্ষা এতোটাও ভাল হয় নি । অন্তত ডাক পাওয়ার মত পরীক্ষা দেই নি । আমার এখনও মনে আছে যে মোট চারটা ম্যাথ এসেছিলো । যার ভেতরে দুইটা করেছিলাম ভালোভাবে । একটা করেছিলাম অর্ধেক আর একটাতে হাতই দিতে পারি নি । সেই হিসাবে ডাক পাওয়ার কথা না । তখন ব্যাপারটা এমন ছিল যে বেসরকারী ব্যাংকের লিখিত পরীক্ষা পার করতে ম্যাথের ব্যাপারটা খুব গুরুত্বপূর্ন ছিল । ম্যাথ গুলো ভাল ভাবে করতে পারলে ডাক নিশ্চিত ছিল ।

যাই হোক, ডাক যখন পেয়েছি আরও একবার ঘুরে আসি । এইবার ভাইভা দিতে গিয়েছিলাম একেবারে স্যুট টাই পরে । বান্ধবীর বিয়ে উপলক্ষ্যে কিছুদিন আগে একটা স্যুট বানিয়েছিলাম । সেই স্যুট পরেই হাজির হলাম উত্তরা ব্যাংকের হেড অফিসে । এখানে বলে রাখা ভাল যে প্রথম ইন্টারভিউ দেওয়ার সময় যে টাইটা ধার করে এনেছিলাম এইবারও সেই টাইটা পরেই হাজির হলাম । নতুন করে আর কোন টাই কেনা হয় নি ।

নির্দিষ্ট সময়ে আমাদের বসানো হল । তারপর একে একে ডাকা হল । আমি একটু অবাক হলাম এই দেখে যে এতো জলদি ইন্টারভিউ শুরু হওয়া নিয়ে । পরে অবশ্য বুঝতে পারলাম যে এটা আসলে আসল ইন্টারভিউ না । আমাদের আগে অন্য একজনের সাথে কথা বলতে হচ্ছে । তাকে সব সার্টিফিকেট দেখাতে হচ্ছে । আমিও ভেতরে ঢুকলাম । সেই আমার নাম জিজ্ঞেস করলো । আমি নাম বলতে একটা কাগজ এগিয়ে দিল । নাম সই করতে হল । সে আমার সার্টিফিকেট সহ আরও কাগজপত্র চেক করতে শুরু করলো । তারপর আমার কাছে জানতে চাইলো যে আমার সার্টিফিকেটের ফটোকপি সত্যায়িত করা নেই কেন ! আমাদের মেইলে বলা হয়েছিলো যাতে আমরা এককপি করে ফটোকপি নিয়ে আসি এবং সেগুলো যাতে সত্যায়িত করা থাকে । আমি সেটা করি নি । ঢাকাতে আমার কোন পরিচিত মানুষ ছিল না যার কাছ থেকে সত্যায়িত করা যায় । অবশ্য চাইলে নীলক্ষেত থেকে করানো যেত কিন্তু এতো প্যারায় যায় নি । তিনি আর কিছু জানতে চাইলেন না । আমি আমার চেয়ারে গিয়ে বসলাম । কিন্তু কিছু সময়ে পরে আমার ডাক পড়লো আবার । যে সার্টিফিকেট চেক করেছিলো সে আমাকে ডেকে নিয়ে গেল অন্য একটা রুমে । সেখানে এক ভদ্রলোক বসে । কোর্ট টাই পরা । একটু বয়স্ক ।
ভদ্রলোক আমাকে বললেন যে আমি কেন সার্টিফিকেট সত্যায়িত করি নি । বললাম যে আমি আসলে কাউকে চিনি না যে সত্যায়িত করতে পারি । সে তারপর বলল যে আমার ভার্সিটির শিক্ষকরা কি ছিলেন না । তাকে জানালাম যে ভার্সিটির শিক্ষকরা সত্যায়িত করতে পারেন না । বিসিএস পাস ফার্স্টক্লাস অফিসাররা পারেন । দেখলাম আমার উপর অসন্তুষ্ট হলেন । তার চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছিলো । তারপর বললেন যে এই ব্যাপারটা ইন্টারভিউবোর্ডে তাকে জিজ্ঞেস করা হবে ।

আরও প্রায় এক ঘন্টা পরে আসল ইন্টারভিউ শুরু হল । আমরা বসে ছিলাম বড় একটা অফিস রুমের ভেতরে । কর্পোরেট অফিস রুম গুলো যেমন হয় । সাধারন এপ্লোয়ীদের ডেস্ক গুলো অল্প উচু কার্ডবোর্ড দিয়ে আলাদা করা থাকে সেই রকম একটা বড় রুমে । মাঝে আমরা বসে ছিলাম । সই করার সময় দেখেছিলাম মোট ৫০টা নাম । তবে সবাই আসে নি ভাইভা দিতে ।
কিছু সময় পরে দেখলাম আমাদের সবাইকে চা দেওয়া হচ্ছে । সাথে বিস্কিট । আমি চায়ের সাথে বিস্কিট নিলাম । আস্তে আস্তে আমার নার্ভাসনেস বাড়ছে । আমার এই রোগ এখনও আছে । ইন্টারভিউভীতি সম্ভবত আমার কোন দিন কাটবে না ।

আবারও সেই শরীরে খানিকটা কাঁপন নিয়েই আমি ভাইভা বোর্ডে ঢুকলাম । সালাম দিলাম । এবার ভাইভা বোর্ডে ছিল তিনজন । তবে একজন ছিল মুল টেবিল থেকে দুরে । আমাকে যে টেবিলের সামনে বসতে দেওয়া হল তার বিপরীতে দুইজন বসে । পাশের আরেকটা টেবিলের পেছনে একজন বসে রয়েছে । সে চুপচাপ বসে ছিল । সে কোন প্রশ্ন করে নি । যা প্রশ্ন করেছিলো এই দুইজনই । দুইজনের একজন স্বয়ং ব্যাংকের এমডি সাহেব ! আগের দিন আমি উত্তরা ব্যাংকের ওয়েব সাইট থেকে কিছু তথ্য ঘেটেছিলাম । সেখানেই এমডি সাহেব ছবি পরিচয় ছিল । এই জন্য চিনতে পারলাম । অন্যজন কে ছিল জানি না ।

এমডি সাহেবই প্রশ্ন শুরু করলেন । আমাদের কাছ থেকে আগেই আমাদের সার্টিফিকেটের ফটোকপি নিয়ে নেওয়া হয়েছিলো । সেইটাই সম্ভবত তার হাতে ছিল । সেটার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন যে পাশ তো অনেক আগে করেছি, এখনও আমি কিছুতে ঢুকি নি কেন ?
এই প্রশ্নের উত্তরে যে কিভাবে দেব আমি বুঝলাম না । একটু ক্যাবলা হাসি দিলাম । তারপর আরও কী কী যেন জানতে চাইলেন । সব প্রশ্ন মনে নেই । তবে সেগুলো একটাও পড়াশুনা রিলেটেড ছিল না । একটা সময় জানতে চাইলেন যে এটাই কি আমার প্রথম ইন্টারভিউ কি না । আমি বললাম যে না । তারপর জানতে চাইলেন যে আমি আগে কোন কোন টা পরীক্ষা দিয়েছি । বললাম কোথায় কোথায় দিয়েছি । তখন সে বলল যে ওগুলোতে কেন চাকরি হয় নি বলে আমার মনে হয় । মানে আমার কাছেই তিনি জানতে চাইছেন যে আমার কী মনে হয় ! আমার কি ভুল ছিল ! মনে হল যে যদি বলি আমার চাকরি হয়েছিলো কিন্তু জয়েন করি নি তাহলে হয়তো এটা কিছুটা বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে । হয়তো এটা একটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল । সত্য বলা উচিৎ ছিল । তবে আমি আংশিক মিথ্যা বললাম যে আসলে আমি ভাইভা দিতে গিয়ে একটু নার্ভাস ফিল করি । তাই হয়তো !
এমডি সাহেব হাসলেন । তারপর বললেন, কই আপনাকে তো বেশ কন্ফিডেন্ট মনে হচ্ছে । নার্ভাসতো মনে হচ্ছে না একদম । আমার ভেতরে তখন কী চলছে তখন কেবল আমি জানি । বুকের ভেতরে ধুকধুক করছে । এমডি সাহেব আর কিছু জানতে চাইলেন না । এবার পাশের লোকটা আমাকে একটা একাডেমিক প্রশ্ন করলেন । তবে সেটা যে কি সেটা এখন আর আমার মনে নেই । প্রশ্নটা আমাকে লিখতে বলা হয়েছিলো এবং ইংরেজিতে । আমার সামনেই একটা খাতা আর কলম রাখা ছিল । আমি সেটার উত্তর লিখে তার দিকে এগিয়ে দিলাম । এর ফাঁকে দেখলাম সেই বয়স্ক লোকটাকে ভেতরে ঢুকতে যে আমাকে সার্টিফিকেট সত্যায়িত করি নাই কেন জানতে চেয়েছিলো । সে কি যেন বলল এমডি সাহেবকে ।

আমাকে যে প্রশ্নটা লিখতে বলা হয়েছিল সেটা লিখে আমি সামনে এগিয়ে দিলাম । দ্বিতীয় লোকটা লেখা টা দেখলেন তারপর আর কিছু জানতে চাইলেন না । আমাকে এবার চলে যেতে বলা হল । যাওয়ার আগে সালাম দিয়ে বের হয়ে এলাম । সব মিলিয়ে মিনিট তিনের মত ছিলাম ভেতরে । কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছিলো যেন কত যুগযুগ ধরে আমি সেখানে ছিলাম । বের হয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম ।

মনের ভেতরে একটা আশা ছিল যে হয়তো ডাক আসবে । পরে খোজ পেয়েছিলাম যে মোট ৪০০ জনকে ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকা হয়েছিলো । নেবে ১০০ জনকে । বেশ বড় নিয়োগ। পোস্টও ভাল । প্রোভেশনাল অফিসার। বেশ কয়েকদিন পরে রেজাল্ট দিল । তখন ঈদের সময় । আমি গিয়েছি বাড়িতে । ঈদের ঠিক আগের দিন আমার এক বন্ধু ফোন দিয়ে জানালো যে উত্তরা ব্যাংকের রেজাল্ট দিয়েছে । আমি রেজাল্ট দেখতে ওয়েব সাইটে ঢুকলাম । মোট ৯৯ জনের নাম রয়েছে । তবে সেখানে আমার নাম নেই । চাকরি হয় নি ।

এটাই মূলত আমার দেওয়া শেষ কর্পোরেট ইন্টারভিউ ভাইভা । অবশ্য এর পরে আমি আর কোন ইন্টারভিউ দেইও নি ।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই আগস্ট, ২০২১ বিকাল ৫:০৭
৮টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আওয়ামীলীগ ও তার রাজনীতির চারটি ভিত্তি, অচিরে পঞ্চম ভিত্তি তৈরি হবে।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ০১ লা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৩


বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতি মূলত চারটি বিষয়ের উপর মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পায়।
প্রথমত, মানুষ মনে করে এ দলটি ক্ষমতায় থাকলে স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব রক্ষা পায়। এটা খুবই সত্য যে ১৯৭১ সালে আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৯০

লিখেছেন রাজীব নুর, ০১ লা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৯



আমাদের ছোট্র বাংলাদেশে অনেক কিছু ঘটে।
সেই বিষয় গুলো পত্রিকায় আসে না। ফেসবুকেও আসে না। অতি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মানুষ মাতামাতি করে না। কিন্তু তুচ্ছ বিষয় গুলো আমার ভালো... ...বাকিটুকু পড়ুন

সনদ জালিয়াতি

লিখেছেন ঢাকার লোক, ০১ লা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫২


গতকাল দুটো সংবাদ চোখে পড়লো যার মূল কথা সনদ জালিয়াতি ! একটা খবরে জানা যায় ৪ জন ইউনিয়ন চেয়ারম্যানকে বরখাস্ত করা হয়েছে জাল জন্ম মৃত্যু সনদ দেয়ার জন্য, আরেকটি খবরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কঠিন বুদ্ধিজীবী

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০১ লা মে, ২০২৬ রাত ৮:৪৪




বুদ্ধিজীবী হওয়া এখন খুব কঠিন কিছু না- শুধু একটু সুন্দর করে কথা বলতে পারলেই হলো। মাথার ভেতর কিছু আছে কি নেই, সেটা বড় বিষয় না; আসল বিষয় হলো,... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেষ বিকেলের বৃষ্টি

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০১ লা মে, ২০২৬ রাত ১০:৩৭


বিকেলের শেষে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে
জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলে চুপ,
তোমার ওমন ঘন মেঘের মতো চুলে
জমে ছিল আকাশের গন্ধ,
কদমফুলের মতো বিষণ্ন তার রূপ।

আমি তখন পথহারা এক নগর বাউল,
বুকের ভেতর কেবল ধোঁয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

×