
নির্বাচন নিয়ে এমন উত্তেজনা আমি অনেক দিন অনুভব করি নি। আমি বুঝতে শেখার পর থেকে ২০০১ আর ২০০৮ সালের নির্বাচন আমি দেখেছি ভাল ভাবে। সেই সময়ে মানুষের উন্মাদনা দেখেছি। মিছিল মিটিং আরও কত কি! সেই সময়ে ভোট মানেই ছিল উৎসব। সেই সময়ে তো ফেসবুক ছিল না তাই গুজব বা মারামারির খবর এতো সহজে পাওয়া যেত। নিজ এলাকার ভেতরেই সব কিছু সীমাবদ্ধ থাকত। সব কিছু ছাপিয়ে উত্তেজনাটাই কাজ করত বেশি। তারপর মানুষ যেন ভোটের এই আনন্দের কথা ভুলেই গিয়েছিল। ভোটের দিন যে এমন উৎসব মূখর একটা পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে সেটা বুঝি মানুষ ভুলে গিয়েছিল লম্বা একটা সময়ে।
এবার নির্বাচনেও যে শঙ্কা ছিল না সেই কথা অস্বীকার করা যাবে না। তবে পুরো দিন জুড়ে সামান্য কিছু বিছিন্ন ঘটনা ছাড়া সব কিছু ঠিক ছিল। সব থেকে বড় ব্যাপার ছিল মানুষ আগ্রহ নিয়ে ভোট দিতে গেছে। আনন্দ মূখর পরিবেশ নিয়ে নিয়ে গেছে ভোট কেন্দ্রে। এই দৃশ্য আমরা সেই ২০০৮ সালের পর আর দেখি নি।
এবার ভোটের আগে অনলাইনে জামাতের লম্ফ-জম্ফ দেখে সত্যি বলছি যে আমার মনের ভেতরে একটা ভয় ঢুকে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল যে এবার বুঝি জামাত ক্ষমতাই চলেই এল! এমন ভাবে তাদের পোস্ট আমার সামনে এসেছে নির্বাচনের আগে আমার মনেই হল যে এবার তাহলে খবরই আছে। তারপর পরিচিত একজনের সাথে এই ভয় নিয়ে কথা বললাম। সে আশ্বস্ত করে বলল, এটা নিয়ে চিন্তার কারণ নেই। সন্দেহ নেই যে আগের থেকে তারা বেশি আসন পাবে, পাওয়াটাই স্বাভাবিক তবে সংখ্যা গরিষ্ঠ বিএনপিই পাবে। সংখ্যাটা ২০০ এর বেশি। তার কথায় একটা আশ্বস্ত হলেও মনের ভেতরে একটু কুকু ডাকছিল। তারপর ঠিক নির্বাচনের আগের দিন জামাতিদের টাকা নিয়ে ধরা পড়া দেখে মনে হল যে বেশ জোড়ে শোরেই ওরা টাকা ঢালছে।
ভোট হল। মনে মনে ঠিক করলাম যে কোন ফল দেখব না। বাকিটা সময় বই পড়ে কাটাব তারপর রাতে খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়ব। কিছু সময় বই পড়ার চেষ্টা করলাম বটে কিন্তু কাজ হল না। বারবার মন চলে যাচ্ছিল মোবাইলের দিকে। তারপর যখন ফেসবুকে একের পর খবর আসতে লাগল যে সব জায়গায় জামাত জোট এগিয়ে যাচ্ছে, তখন সেই ভয়টা আবারও ফিরে এল। মনে হল, যাহ এইবার আর রক্ষা হল না। এইবার জামাত ক্ষমতায় চলেই এল!
নয়টার দিকে আমি মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম যে জামাতই ক্ষমতায় আসছে। ঠিক তখনই একজনের স্টাটাস আমার চোখে এল। সেখানে লেখা টিভিতে সব ফলাফলে বিএনপি এগিয়ে আর ফেসবুকে জামাত এগিয়ে। তখনই আমার মাথায় এল। এতো সময় আমি কেন ব্যাপারটা খেয়াল করলাম না। ফেসবুকের বট বাহিনী স্টাটাসে তো এমনই মনে হবে! এরপর টফি চালু করে টিভি দেখতে লাগলাম। তখনই ব্যাপারটা টের পেলাম! ফেসবুক আর টিভির খবরে আকাশ পাতাল পার্থক্য। কোথায় জামাত এগিয়ে? জামাতের ভাত কোথায়! টিভির সব খবরে বিএনপি এগিয়ে এবং প্রতিনিয়ত সেটা বাড়ছে।
রাতে আমি বারোটার ভেতরেই ঘুমিয়ে পড়ি। তবে গতকাল আর ঘুম এল না। রাত তিনটা পর্যন্ত জেগে জেগে নির্বাচনের ফল দেখতে লাগলাম। যখন রাতে চোখ বন্ধ করলাম তখন এই নিশ্চয়তা নিয়ে ঘুমাতে গেলাম যে এই জামাত আসবে না ক্ষমতায়। সকালে ঘুম ভেঙ্গে দেখলাম সংখ্যাটা দুইশ পার হয়ে গেছে।
এই নির্বাচনে সার্জিস আলম হেরে গেছে। ব্যাপারটা ভাল লেগেছে। ২৪এর পরে সার্জিসের পা যেন মাটিতে পড়ছিল না। এবার মাটিতে পড়বে। পাটুয়ারি হেরেছে। এটাও ভাল লেগেছে। নির্বাচন ক্যাম্পেইনের ভেতরে পাটুয়ারির ক্যাম্পেন ছিল সব থেকে জঘন্য। যখনগুলো খবর আর ভিডিও দেখেছি বিরক্তি ততই বেড়েছে পাটুয়ারির প্রতি। তাসনিম জারার জয়টা চেয়েছিলাম খুব বেশি করে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে যে জিতেছে হাবিবুর রশিদ। সত্যি বলতে কি বিএনপির যদি একজন ক্লিন ইমেজ প্রার্থী থাকে তাহলে এই হাবিব সাহেবই আছেন। তাই জারার জন্য কষ্ট লাগলেও হাবিবুর রশিদের জন্য আনন্দিত। অন্য দিকে আরও চেয়েছিলাম যেন বরিশাল-৫ এ মনীষা চক্রবর্তী যেন জেতেন। কিন্তু উনি জেতেন নি। জিতলে ভাল লাগত অনেক। এছাড়া আমাদের ব্লগের মনিরা আপার হাজব্যান্ড এমপি হয়ে গেছেন। তার জয়টা চেয়েছিলাম খুব করে।
আমার এলাকার মমিনুল হক হেরে গেছেন। যদিও ভেবেছিলাম ববি হাজ্জাজ মমিনুল হককে হারাতে পারবে না তবে হারিয়ে গিয়েছে। ভাল হয়েছে। এই লোক যে সংসদে যাবে এটা আনন্দের ব্যাপার। রুমিন ফারহানাকে আমি পছন্দ করি না। বিএনপি যখন তাকে নমিনেশন দিল না তখন খুশি হয়েছিলাম কিন্তু যখন সে দমে না গিয়ে যে নিজে নির্বাচন করে জিতেছে এটা ভাল লাগল। মেয়েদের এমন জেদ করে জয়ী হওয়াটাকে আমি সম্মান করি খুব। ইলিয়াস আলির স্ত্রী জিতেছে। এটা একটা আনন্দের ব্যাপার। হাসনাত আবদুল্লাহ যে জিতবে সেটা তো আগে থেকেই জানা ছিল। আরও কত জনের কথা বলা যায়! এদিকে আমাদের নিজের এলাকার দুই সিটেই জামাত জিতেছে। এই দুঃখ কই রাখব। এক সময়ে আমাদের এলাকা বিএনপির ঘাটি হিসাবে পরিচিত ছিল। আর এবার দুই আসনই জামাতের দখলে। সব থেকে বেশি মেজাজ খারাপ হয়েছে আমির হামজার মত মোল্লার জেতায়। খুব করে চেয়েছিল এই ব্যাটা যেন সংসদে না যাক কিন্তু যাচ্ছে। সাথে এক রাজাকার আর দুই রাজাকার পুত্রও যাচ্ছে! কী আর করা! এটাই গনতন্ত্রের সিদ্ধান্ত। মেনে নিতেই হবে।
এবার তো বিএনপি জিতে গেল। তবে যদি সেই তারা নিজেদের পরিবর্তন না করে, যদি সেই ২০০১ সালের মত করেই দেশ চালায় তবে সামনের বার আর জিতবে না, এই টুকু নিশ্চয়তা দিতে পারি। তারেক রহমান আশা করি তার ভুল থেকে শিক্ষা নিবেন। আগের ভুল ভুলো আর রিপিট করবে না।
সবাইকে ভোট মোবারক।

সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




