somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

অপু দ্যা গ্রেট
নিজেকে জানতে চাই,ছুটে চলেছি অজানার পথে,এ চলার শেষ নেই ।এক দিন ইকারাসের মত সূর্যের দিকে এগিয়ে যাব,ঝরা পাতার দিন শেষ হবে ,আর আমি নিঃশেষ হয়ে যাব ।

দেশ ভাগ, সীমানা ও এক গল্পকারের কথা - কালো সীমানা

১৮ ই মে, ২০২১ রাত ৮:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :







মান্টো, সাদত হাসান মান্টো। না জেমস বন্ডের মত কোন বৈশিষ্ট্য এনার নেই। তবে এনার যেই শক্তি ছিল সেটা হচ্ছে কলমের। আমরা প্রবাদ পড়েছি অসির চেয়ে মসি বড়, মানে তলোয়ারের চেয়ে কলমের শক্তি অনেক বেশি। কিন্তু সেই শক্তির কথা সাধারণত কেউ প্রকাশ করতে পারে না। আবার অনেকের সাহস হয় না। তবে এক্ষেত্রে মান্টো সবার চেয়ে আলাদা। তিনি তার লেখালিখির জীবনে মাথা নত করেননি।
.
এখানে সমাধিতলে শুয়ে আছে মান্টো আর তার বুকে সমাহিত আছে গল্প বলার সব কৌশল আর রহস্য।
.
এই কথাগুলো সাদত হাসান মান্টোর সমাধিস্থলের এপিটাফে লেখা! অন্য কেউ নয়, মান্টো নিজেই মৃত্যুর বছরখানেক আগে তার এপিটাফের জন্য লিখে রেখেছিলেন। ভেবে দেখুন তো একজন লেখক তার চিন্তা কতদূর এগিয়ে রেখেছিলেন। তার মৃত্যুর আগেই তিনি তার এপিটাফ লিখে গিয়েছেন। এই দুইটি লাইন যেন কত বিশাল ভাবে তার চিন্তা ভাবনার বর্ননা দিয়েছে তা বোঝানো সম্ভব নয়।
.
মান্টোকে নিয়ে আলোচনা হয়েছে আবার তাকে নিয়ে তারচেয়ে বেশি সমালোচনা হয়েছে। তার লেখা এবং বই নিষিদ্ধ হয়েছে। বৃটিশরা তার বই নিষিদ্ধ করেছিল। দেশ ভাগের পর তিনি ভেবে ছিলেন তার পরিবর্তন আসবে। কিন্তু সেটা হয়নি।
.
এখন কে মান্টো কে নিয়ে আলোচনা হয় সেটা হয়ত ভাবার বিষয়। কারণ আর কিছুই নয় তার লেখার ধরন। তিনি যদি চাইতেন তবে শুধু সাহিত্যের জন্য লিখে জীবন পার করে দিতে পারতেন। কিন্তু সেটা তিনি করেননি। তিনি তার লেখায় সমাজের অমানবিকতার গল্পগুলো নিজের আবেগের সাথে না মিলিয়ে সোজাসাপ্টাভাবে তুলে ধরা, যেন অদূর ভবিষ্যতে লেখাগুলো ইতিহাসের জন্যও কাজে দেয়। তিনি চারপাশের নিন্দ ঝড় সমালোচনা আলোচনা কিছুর পরোয়া করেননি, কলমের মাধ্যমে তুলে এনেছেন জীবন। আর তাই আজ তাকে নিয়ে এত লেখা এবং গবেষণা হয়।
.
এই যে মান্টোকে নিয়ে বলছি তার কারণ তার গল্প লেখার ধরণ। সাদত হাসান মান্টো এর “কালো সীমানা” বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালে। বইটিতে গল্প আছে ৩২টি। তবে এই গল্প গুলো সেই সময়ের যখন ভারত ভাগ হয় বা বলা যায় দেশ ভাগের সময়ের লেখা। এছাড়া বইটির আরও একটি বৈশিষ্ট্য আছে, তা হচ্ছে গল্প গুলো বড় নয়। কোনটা দুই লাইন এক লাইন বা কোনটা দেড় পৃষ্ঠা। এর বড় কোন গল্প নেই।
.
কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে এই দুই এক লাইনের গল্প গুলোতে যে বিশাল অর্থ তিনি বুঝিয়েছেন তাতে সেই সময়ের পরিস্থিতি খুব সহজেই আন্দাজ করে নিতে কারো কষ্ট হবে না। দাঙ্গার যে চেহারা সেগুলো লেখক নিজ চোখে দেখেছেন, আর তাই তিনি উঠিয়ে এনেছেন তার কলমে। তিনি দেখেছেন কি সেই ভয়ংকর সময় যখন মানুষ তার সব কিছু ভুলে গিয়েছিল। তখন তারা আর মানুষ ছিল না। শুধু রক্ত মাংসের একটা পুতুল রকম ছিল বলে মনে হয়।
.
বইটির কোন ভূমিকা নেই। এই প্রসঙ্গে মান্টো বলেন, “তার পরিচয় সবাই জানে, আলাদা ভাবে পরিচয় দেয়ার কিছু নেই। তার যা বলার তিনি সেটা লেখাতেই বলে দিয়েছেন। আর যারা অন্যের বইয়ের ভূমিকা লেখে তাদের কে তার বরযাত্রী আগে বা ঘোড়ার পিছনে বসিয়ে দেয়া লোকদের মত হাস্যকর মনে হয়”।
.
“কালো সীমানা” বইটির শুরু গল্পটি একটা চমৎকার তথ্য দেয়। বইটির প্রথম গল্প একলাইনের, যেটা লেখা হয়েছে মহাত্মা গান্ধীর মৃত্যুর উপর। এভাবে লিখেছেন যে, মহাত্মা গান্ধীর মৃত্যুর পর ভারতের অনেক জায়গাতে মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়। যে অনেকেই গান্ধীর বিরোধীতা করেছেন।
.
এবার অন্য একটি গল্প দেখি। একটা বাড়ি লুট করতে যাচ্ছে দশ পনেরো জন। তাদের মধ্যে একজনের কাছে কোন হাতিয়ার নেই। দরজায় তালা, ভাঙ্গার আগেই সেই ব্যক্তি বলল আমি খুলে দিচ্ছি। এরপর সবাইকে ধীরে ধীরে সব কিছু নিতে বলল। সব শেষে দেখা যায়, এই লোকটা ঘরের মালিক।
.
আবার দুই লাইনের একটি গল্প দেখা যাক,

আগুন লাগল যখন, সারা মহল্লা জ্বলে ছাই হলো। কেবল একটা দোকান বেঁচে গেল, সেই দোকানের ওপর সাইনবোর্ড তখনও পড়া যাচ্ছিল, "এখানে বাড়ি বানানোর মাল-সামান পাওয়া যায়।”
.
উপরের গল্পটির নিগূঢ় অর্থ বের করা কঠিন কিছু নয়। তবুও সেটা আমি পাঠকের কাছে ছেড়ে যাচ্ছি। যদি অর্থ বের করতে পারেন তবে জানাবেন।
.
আর একটি অনুগল্পের দিকে চোখ ফেরাই,

সকাল ছয়টায় বরফের ঠেলাওয়ালা কে মেরে ফেলা হয়েছে। সাতটার সময় পুলিশ এসেছে। এর আগেই বরফ গলে গিয়েছে। লাস নিয়ে চলে যাবার পর এক মা তার বাচ্চা কে নিয়ে সে পথ দিয়ে যাচ্ছিল, বাচ্চাটা সেই দিকে তাকিয়ে বলল, মা জেলি।

কত নির্মম সত্য এভাবেই উঠে এসেছে। তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তিনি শুধু তুলে এনেছেন দাঙ্গার সেই পরিস্থিতি যেখানে সাধারণ মানুষ অসহায় ছিল। যেখানে তারা নিজের জীবন বাচানোর একটা উপায় শুধু খুজে বেড়াচ্ছিল। শুধু বাচতে।
.
বইটিতে “সরি” নামে একটা গল্প রয়েছে। গল্পটি এমন –

পেট ফাঁক করে দিয়ে নাভি পর্যন্ত নেমে এলো ছুরি। পাজামার ফিতে কেটে গেল। ছুরি চালানো লোকটা সঙ্গে সঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করে বলল, “ছি, ছি, ছি, ছি, মিস্টেক হয়ে গেছে!”

কি ভুলই হয়ে গিয়েছে। সত্যি তো অনেক বড় মিস্টেক হয়ে গিয়েছে। পাজামার ফিতে কাটার তো কোন কথা ছিল না। মাত্র দুই লাইনে অনেক গুলো শব্দ কত চিন্তা ভাবনার জন্ম দেয়। অথচ মানুষের জীবনের চেয়ে বড় কিছু হতে পারে না এটাই কিন্তু তিনি বলতে চেয়েছিল। সাদত হাসান মান্টো দেখেছেন নিজের জীবন। দেখেছেন তার আশে পাশের মানুষকে, তারপর প্রতিবেশীদেরও যে মানুষ ভয় পেতে পারে, বা ভয়ের কারণ হতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। লেখক যেন ইতিহাসকে আমাদের সামনে তুলে এনেছেন। বলেছেন তার ব্যথার কথা, তুলেছেন অমানবিকতা আর বিবেকহীন মানুষের কথা।

অপর দিকে সামাজিক অসংগতির সাথে মানুষের দ্বিমুখীতাও উঠে এসেছে। সেও আমরা এক গল্পে দেখতে পাই যে, যেখানে দেখা যায় দুই বন্ধু মিলে একটি মেয়েকে কিনে আনে! তারপর রাত শেষ হলে এক বন্ধু মেয়েটির নাম জানতে চেয়ে অবাক হয়ে যায়, কারণ মেয়েটি তাদের ধর্মের নয়! অথচ এমন অপকর্ম সমাজ এবং ধর্মে নিন্দনীয় হিসেবেই দেখা হয়। তারপর তারা মেয়েটিকে ফেরত দিয়ে টাকা ফেরত নেয়ার কথা ভাবে।
.
এই গল্পটিতে আমরা দেখতে পাই যে, মানুষ ধর্মের নামে সব কিছুই করছে কিন্তু ধর্মটাই তারা ঠিকমত পালন করতে পারছে না। আসলে মানুষের এই দ্বিমুখী আচরণ বা পরিবর্তন যে কত দ্রুত হয় সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। নিজের সুবিধামত যেকোন সময় যেকোন জায়গাতে সে তার মত নিজেকে পরিবর্তন করে নেয়। এটাই হয়ত মানুষের জীবনের চরিত্র।
.
যখন সমাজ অন্ধকারে ডুবে যায়, তখন মানুষের স্বাধীনতাও অনেক দুর্লভ হয়ে ওঠে। সাদত হাসান মান্টো সেই সব কথাই বলে গিয়েছেন। লড়াই করেছেন এই অন্ধকারের বিরুদ্ধে। তিনি এটাও বলেছেন যে সমাজে আমরা নিরাপদ নই তখন যেটা থাকে সেটা আসলে অন্ধকার সমাজ। তার কোন দরকার নেই।
.
“কালো সীমান” বইটির প্রতি শব্দ প্রতিটি গল্প পাঠককে ভাবিয়ে তুলতে বাধ্য করবে। দাঙ্গা, অমানবিকতা, পাশবিকতা যাই বলি না কেন সমাজের অন্ধকার দিক গুলোর কথা ও তার ব্যথ্যা গুলো অনুভব করতে সহায়তা করবে। পাঠক যে শুধু অনুভব করবে তাই নয়, তার চিন্তার জগতে একটু হলেও নাড়া দিয়ে যাবে। সময়ের সাথে হয়ত অনেক কিছুর পরিবর্তন এসেছে তবুও আমরা কি সেই জায়গা থেকে নিজদের সামনে এগিয়ে নিতে পেরেছি?

শেষ করব মান্টোর লেখা প্রবন্ধ “কাফনের গলা” এ ব্যবহার করা মির্জা গালিবের লেখা দিয়ে,

“ভেবো না আমি নিভে গেছি, ভোরের সূর্যের মতো
প্রেমের দাগ আমার কাফনের গলায় অলংকার হয়ে আছে।”


সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই মে, ২০২১ রাত ৮:২১
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মিলাদুন্নবী: ভালোবাসার নবী, মানবতার শ্রেষ্ঠ আদর্শ

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৮


মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মদিন বা মিলাদুন্নবী শুধু একটি ঐতিহাসিক স্মরণদিন নয়; এটি মানবতার জন্য এক মহান আদর্শের কথা স্মরণ করার উপলক্ষ। তাঁর আগমন ছিল এমন এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ একটি পরিচ্ছন্ন শৌচাগার

লিখেছেন রাজসোহান, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৮



বাড়িটা দেখতে বাড়ির মতো না, যেনো একটা ঘোষণা। দ্যাখো, আমি কে।

গেটে দুইটা সিংহ, পাথরের, মুখ হাঁ করা; সিংহ দুইটা কী পাহারা দিচ্ছে তারা নিজেরাও জানে না। ভিতরে উঠান... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মক্তব চালু করলে শিশুরা ফিরে আসবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৪২


ববি হাজ্জাজ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। মুসা বিন শমসেরের ছেলে। মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে পুরো দেশ চষে বেড়াচ্ছেন। নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন, নতুন নতুন আইডিয়া দিচ্ছেন। মনে হয়,... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঁধনের কেন ফেমিকন লাগে !!!

লিখেছেন অপলক , ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৩৪



বাঁধন এখন বন্ধন মুক্ত। মিডিয়া পাড়ায় সরব উপস্থিতি। উপর মহলের ডাকে সারা দিতে হয়। কাজেই ফেমিকন লাগতেই পারে। মানে ফেমিকনের এ্যাড করা লাগতেই পারে। মিডিয়া আইকন হিসেবে জনসচেতনাতা বাড়াতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“উন্নয়নের দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশ”

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৮



বাং/লাদেশের মূর্খ জনগণ উন্নয়নের চেয়ে কথিত ফ্যাসিবাদকে বড় করে দেখেছে কিন্তু “উন্নয়নের দুর্ভিক্ষ” কি জিনিস তা দেখেনি।

দেখতে থাকুক….। আর ভাতের দুর্ভিক্ষ শুরু হলে বলে…..।

ফ্যাসিবাদ দূর করতে গিয়ে উন্নয়নই "নাই"... ...বাকিটুকু পড়ুন

×