আলো জলমলে স্টেশনটা আজ অনেকটাই বিবর্ণ। চড়ুই পাখিগুলো বিবর্ণ এই রেল স্টেশনের চাউনিতে আশ্রয় নিয়েছে। একে তো যাত্রীদের চেচামেচি সাথে চলছে নিরীহ এই ক্ষুদ্র পাখিগুলোর কিচিরমিচির। চড়ুই পাখির কিচিরমিচির ভালোই লাগে আমার। ছোটবেলা এই পাখিগুলোর জন্য খুবই মায়া হতো। তবে আজ এই মুহুর্তে নয়। ভালো লাগার জিনিসগুলো মাঝে মাঝে যন্ত্রনার কারণ হয়ে দাড়ায়,এটা এখন ভালভাবেই টের পাচ্ছি আমি। ছাত্রজীবনে রক্-ব্যান্ড-হিন্দি গানে নিজেকে মাতিয়ে রাখতাম কিন্তু এখন লালন, রবিঠাকুর আমাকে খুবই টানে। সবকিছুই পরিবর্তনশীল। রাতের ট্রেনটা যখন তার সামনের আলোর দমকা জ্বালিয়ে হুইসেল দিতে দিতে স্টেশনে প্রবেশ করে তখন চড়ুই পাখিগুলোর মধ্যে এক ধরনের চঞ্চলতা আমার নজর কাড়ে। আমি তাকিয়ে থাকি ট্রেনের বাতাসে উড়ে যাওয়া পাখিদের বাসার খড়খুটো আর তাদের পুরানো পালকগুলোর দিকে।
আজ অনেকদিন পর বাড়ি যাচ্ছি। চাকরী সূত্রে সিলেট থাকা। অফিসের শত কাজের চাপে যখন হাপিয়ে উঠি, তখন বৃহস্পতিবারের রাতের ট্রেনে চেপে বাড়ী যাওয়ার জন্য সবসময় উদগ্রীব থাকি আমি। হঠাৎ পাখিগুলোর এই কিচিরমিচিরের সাথে মেয়েলি এক কণ্ঠ আমার কানে প্রবেশ করল।
- এটা কি ঢাকাগামী ট্রেন ?
- হুম।
আমার এই উত্তর শুনে মেয়েটি আর এক সেকেন্ড সময় নষ্ট করার প্রয়োজন মনে করল না। খেয়াল করলাম সে ট্রেনে উঠার জন্য খুবই ব্যস্ত। আমার স্ট্যান্ডিং টিকিট তাই সীট খোঁজার ঝামেলা একেবারেই নাই। একটু দাঁড়ানোর ঠাই পেলেই চলবে। ট্রেন ছাড়ার বাঁশী যখন আমার দু’কানে আঘাত করলো তখন আমি ট্রেনে উঠার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করলাম।
সপ্তাহের এই দিনটিতে যাত্রীদের ভীড় একটু বেশীই হয়। আমি কোনরকম ভীড় ঠেলে একটা বগিতে উঠে দাঁড়ানোর জন্য একটু জায়গা পেয়ে গেলাম। আমার ডান দিকে চোখ পড়তেই দেখি ঐ মেয়েটি জানালার পাশের সীটটায় বিষন্ন মনে বসে আছে। তাঁর পাশের ফাঁকা সীটে অনেক যাত্রী বসতে চাইলে সবাইকে লোক আছে বলে উঠিয়ে দিচ্ছে। আমি দৃশ্যটা দেখে কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। ট্রেন ছাড়ার কিছুক্ষণ পর মেয়েটি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ইশারায় বলল- আপনি বসুন !
- আমি!
-হ্যাঁ, আপনি।
আমি তখন ইতস্তত বোধ করলাম। এতো ভীড়ের মাঝে নিজেকে বড় একা মনে হলো। চুপচাপ বসে পড়লাম। যেন একশ পরীক্ষার্থীর মাঝে আমি একাই পাশ করেছি। তাই পাশ করার আনন্দ মনে চেপে রাখতে বাধ্য। পৃথিবীর সব নীরবতা আচ্ছন্ন করেছে আমাকে। আমি পরিবেশটা একটু স্বাভাবিক করতে চাইলাম। মেয়েটিকে কাপা স্বরে বললাম- আপনি কোথায় যাবেন ?
- ঢাকা।
এক শব্দের উত্তর, তাই বুঝলাম আর আগানো উচিত নয়। কিন্তু এটা কি সম্ভব ? একটা মেয়ে পাশে বসে থাকবে আর আমি তার মতো বোবার অভিনয় করবো ! একটু পর আমি আবার বললাম- আপনি কি একাই যাচ্ছেন ?
- হুম। কেন, কোন সমস্যা ?
- না, না, তা হবে কেন। আসলে আমি বুঝতে পারছি আমি যে সীটে বসে আছি সেটা আপনারই। কিন্তু আপনি একাই যাচ্ছেন। তাই.....
মেয়েটি আমার কথা শেষ করতে না দিয়ে বলে উঠল- ও তাই। আপনি যেহেতু সৌভাগ্যবশত বসার সুযোগ পেয়েছেন তাই অনর্থক প্রলাপ বকে সুযোগ হারাবেন না। কার সীট এটা নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না প্লীজ।
উত্তরটা শুনে আমি মোটামোটি বড় রকমের ধাক্কা খেলাম। তারপর আড় চোখে তাকিয়ে দেখি সে নিরব, নিশ্চুপ। আমি আবার তাঁর নিরবতা ভাঙ্গার চেষ্টা করলাম।
- আপনার নামটা কি জানতে পারি ?
- দেখুন, আপনাকে বসতে দিয়েছি তার মানে এই নয় যে,আপনি কুড়ে কুড়ে সব জানতে চাইবেন। তাছাড়া আমার মনটা খুবই খারাপ। তাই এইমুহুর্তে আপনার সাথে কথা বলার তিল পরিমান ইচ্ছা আমার নাই। অনুগ্রহ করে ঢাকা পৌছার আগ পর্যন্ত কথা না বললেই ভাল লাগবে।
আমি শুধু আস্তে করে বললাম- স্যরি । পাশে দাড়িয়ে থাকা লোকগুলো আমার এমন অপমানের দৃশ্য ভালই উপভোগ করল।
কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বুঝিনি। বাসায় সাধারনত পিন পতনের শব্দেই আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। কিন্তুু ট্রেনের ঝাকঝাক শব্দের মধ্যে কীভাবে এত ঘুম আসে, জানি না। গভীর রাতে কোথাও ট্রেন থামলেই ঘুম ভেঙ্গে যায় আমার। এটা অনেকটা ছন্দ পতনের ফল।
-আপনি কী ঘুমাচ্ছেন ?
শব্দগুলো কানে আসতেই চমকে উঠি আমি। জেগে দেখি এতসব যাত্রী, কিন্তু সবাই যেন যুদ্ধ ফেরত সৈনিকের মত ঘুমাচ্ছে। সবার চোখে মুখে বিষন্নতার ছাপ।
আমি শান্তা। আপনি কখনও হাওর পাড়ের গল্প শুনেছেন ? শুনেননি হয়তো। বর্ষায় বাড়ির চারদিকে পানির থৈ থৈ। আপনারা বাসা বলতে যা বুঝেন তা হচ্ছে আমাদের দু’চালা টিনের ঘর। এই দু’চালা টিনের ঘরটাতেই আমার জন্ম, আমার বেড়ে উঠা। আট দশটা গ্রামের ছেলেমেয়েরা মিলে আমরা একই স্কুলে পড়তাম। আমার কৃষক বাবা কেন জানি আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন। আর আমিও বাবার স্বপ্ন পূরণের তাগিদ সব সময় অনুভব করেছি। একটা সময় গ্রামের পড়াশুনার পাঠ চুকিয়ে শহরে ভর্তি হলাম নামিদামী এক কলেজে। বাবাকে বললাম- বাবা, শহরে পড়তে গেলেতো অনেক টাকা লাগবে। তুমি কোথায় পাবে এত টাকা ? বাবা বললেন- মা, আমি বেঁচে থাকতে টাকা নিয়ে তুই চিন্তা করিসনেতো।
কথাগুলো বলতে বলতে নিশ্চুপ হয়ে গেল শান্তা। আমি খেয়াল করলাম তাঁর চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। সে জানালার দিকে তাকিয়ে অশ্রুভেজা চোখ দুটি লুকানোর চেষ্টা করল।
- আপনি ঢাকা যাচ্ছেন কেন ?
- চাকরীর জন্য। আপনি হয়তো ভাবছেন আমার মতো একটা মেয়ে একা একা কিভাবে ঢাকা যাচ্ছি। আর আমার এত সাহসই বা এলো কোথা থেকে। হ্যাঁ, আমি এই সাহসটুকু আমার বাবার কাছ থেকেই পেয়েছি। আপনি কি এটা জানেন, এই ঢাকা শহরে এসে বিভিন্ন প্রতিযোগীতামুলক পরীক্ষা দেওয়ার ভয়ে অনেক মেয়েরাই পরীক্ষায় অংশগ্রহন করে না, অথবা মা-বাবারা তাদের মেয়েদের অজানা এক ভয়ের কারনে একা ছাড়েন না। আমার ক্লাশে অন্তত বিশ জন মেয়ে আছে যারা ভাল কোন চাকরীর আশা ছেড়েই দিয়েছে। তাই আমাদের স্বপ্নগুলো ঝরা পাতার মতই ঝরে পড়ছে।
আমার বাবা আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন তাই আমি স্বপ্ন দেখেছি। এটাইতো ভালো ছিল- সেই কুঁড়ে ঘর, মা-বাবা, কয়েকটা পাতিহাঁস আর সংসারের টুকটাক কাজ। আমার স্বপ্নগুলো ছিল কুঁড়ে ঘরের চার বেড়ার ভেতরে আবদ্ধ অথবা তার কাছাকাছি। শহরে এসে আমার স্বপ্নের পরিধি বেড়েছে কিন্তু সামর্থ্য বাড়েনি।
শান্তার কথা শুনে আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। আসলেইতো ! কখনও তো এসব ভাবিনি আমি। আমারও তো পরিচিত অনেক মেধাবী মেয়েরা আছে যারা সঠিক জায়গায় পৌঁছতে পারেনি !
ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে মাত্র। কাচের জানালাটা উঠিয়ে দিলাম আমি। সদ্যফোটা ভোরের আলো আর মিষ্টি বাতাস যখন শান্তার চোখে মুখে উপছে পড়ল তখন তার মুখটি দেখে খুব মায়া হলো আমার। আমি একটু নরম সুরে বললাম- শান্তা, আমি আমার গন্তব্যে প্রায় চলেই এসেছি। সামনের এয়ারপোর্ট স্টেশনেই নেমে পড়ব। আর মাত্র ৫/৬ মিনিটের পথ।
- ও, তাই ? চলুন আপনাকে নামিয়ে দেই।
- হ্যাঁ, চলুন।
আমরা দু’জন দরজার কাছে চলে এলাম। ট্রেনটি এয়ারপোর্ট স্টেশনে হর্ন দিয়ে দিয়ে প্রবেশ করছে। আমি হঠাৎ কৌতুহল নিয়ে জানতে চাইলাম- আচ্ছা শান্তা, আপনার সাথেতো আরেকজন আসার কথা ছিল , তিনি কে ?
আমার কথাটি শুনে যেন কেঁপে উঠল শান্তা। রাজ্যের সব কষ্টের ছায়া যেন তার চেহারায় ভর করেছে। তারপর শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আস্তে করে বলল- বাবা।
আপনার বাবা ? তাহলে আসেননি কেন ?
- তিনি আর নেই। চারদিন আগে আমাদের জন্য টিকিট কাটতে এসে বাসায় ফেরার পথে তিনি এক্সিডেন্ট করেন। তারপর হাসপাতালে আমার হাতে টিকিট দিয়ে বাবা বললেন- ‘শান্তা, তুই কিন্তুু পরীক্ষা দিতে ভুলিসনে মা।’ জানেন, যতবারই আমি কোন পরীক্ষা দিতে ঢাকায় এসেছি ততবারই বাবা আমার সাথে ছিলেন। আজ আমি একা। তাই আমার আর হয়তো পরীক্ষার জন্য ঢাকায় আসা হবে না!আমার স্বপ্ন তাই অধরাই থেকে যাবে ।
তার এই শব্দগুলো আমার কানে বজ্রপাতের মত আঘাত করল। আমি পাথরের মত দরজায় দাড়িয়ে আছি। কিছু যাত্রী আমাকে ধাক্কা মেরে ট্রেনে উঠতে চেষ্টা করল। কেউ কেউ চেচিয়ে বলল, আরে ভাই নামেন না কেন। শান্তা তাঁর চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল- নামুন প্লীজ।
আমি ফ্ল্যাটফর্মে দাড়িয়ে রইলাম। হর্ন বাঁজাতে বাঁজাতে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা শান্তাকে নিয়ে ট্রেন চলে যাচ্ছে কমলাপুরের ঊদ্দেশ্যে। শান্তা যাচ্ছে তাঁর মৃত বাবার স্বপ্ন পূরণের আশায়। আমি দাড়িয়ে আছি মনের মাঝে নতুন এক প্রশ্ন নিয়ে। আচ্ছা, এই দেশে মানুষ কতকিছুইতো তাঁর প্রিয় মানুষটিকে দান করে। মানুষ কখনও কি তাঁর চাকরীটা প্রিয় কোন মানুষকে দান করেছে অথবা আদৌ কি করা যায়? আমার আজ এমন কাউকে আমার নতুন চাকরীটা দান করতে খুব ইচ্ছে করছে! খুব।
উৎসর্গ : এমন হাজারো শান্তাদের জন্য।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুলাই, ২০১৪ সকাল ১১:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




