
আজ দুপুরটা নিঃসঙ্গতায় অস্থির। এলেবেলে ভাবনাগুলো খোলা জানালায় প্রবেশ করে মাথায় গিজগিজ করে। বাড়ীর চারপাশটায় যেন শরনার্থীর কোলাহল তবুও সে একা। একাকীত্ত্বে তাঁর ভাবনাগুলো বারেবারে লাল সরল ঠোঁট বাকিয়ে দেয়। এ যেন তৃপ্তির হাসি, পূর্ণতার হাসি। মনসাবালা ভাবে, তাঁর মতো পরিতৃপ্ত নারী ক’জন আছে আর। দুপুরের তপ্ত রোদ বেড়ার ফাঁক দিয়ে খেল খেলে মনসাবালা’র মুখের উপর স্থির হয়ে পড়ে আছে। সোনালী আভা তাঁর রুক্ষ মুখের লালচে রংয়ের সাথে লেপ্টে আছে অকৃত্রিম মায়া নিয়ে।
খিরকির পাশে বৃদ্ধ আম গাছের ঢেউ খেলানো দেহ থেকে বের হওয়া ডালটায় দাড় কাক কা-কা করছে। ছোট বেলায় মা বলতেন দুপুর বেলার কাকের এই কা-কা ডাক মানেই বিপদ সন্নিকটে। তবে মনসাবালা’র বিপদের কোন আভাস নেই। কেনই বা থাকবে। এমন সুখের সংসার এই গ্রামে ক’টা আছে। বিত্তবানরাই পৃথিবীর একমাত্র সুখী মানুষ নয়। মানুষের অতৃপ্ত মনকে পাহাড় সমান সম্পদ দিয়েও তৃপ্ত করা অসম্ভব। যার মন যত বড় সে তত অল্পতেই তুষ্ট। মনসাবালা এই নীতিকথা আজন্ম বুকে ধারণ করে রেখেছে। কী নেই তাঁর! সৎ করিৎকর্মা স্বামী জগদ্বীশ, ফুটফুটে ছেলে সাগর আর আছে তাদের সকলের চোখের মণি দেশাই।
ভর দুপুরে লাঙ্গল-জোয়াল মাটিতে ফেলার শব্দ কানে আসতেই মনসাবালা’র টমক নড়ে। মাথার লম্বালম্বি সূর্যটা কখন যে পশ্চিমে বাঁক নিয়েছে সেদিকে খেয়াল নেই। শব্দটা কানে আসতেই খেয়াল হলো স্বামী জগদ্বীশের ঘরে ফেরার সময় এটা। গ্রামের অন্য বাড়ীর বউরা এই দুপুরে তাদের স্বামীর জন্য নিজ হাতে খাবার নিয়ে মাঠে যায়। কিন্তুু জগদ্বীশ তা পছন্দ করে না। তাঁর একটাই কথা, বউ হচ্ছে ঘরের শোভা, মাঠে থাকবে পুরুষ মানুষ। তবে এই যুক্তির আড়ালে জগদ্বীশের অন্য একটা গোপন কামুক মতলব রয়েছে তা টের পেয়ে মনসাবালা লাজুক হাসি হাসে।
সাগর। তাদের একমাত্র ছেলে। পুরো হাওয়রের মানচিত্র তাঁর মাথায় খিলবিল করে। কার ক্ষেতের আইল লম্বা লম্বা ঘাসে ভরপুর এটা তাঁর ভালভাবেই জানা। আইলের উর্বর মাটি ভেদ করে উঁকি দেওয়া নানান জাতের ঘাস সংগ্রহ করা তাঁর নেশা। বিকালে স্কুল ছুটির পর সবাই দল বেঁধে যখন মাঠে খেলায় ব্যস্ত তখন সাগর সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে পাটের বস্তা নিয়ে জমির আইলে মাথা নিচু করে একমনে ঘাস কাটে। খুশিতে চিকন সুরে গান ধরে- ‘কাউয়ায় কমলা খাইতে জানে না, ইলিশ মাছ কি বিলে থাকে, কিলাইলে কি কাঁঠাল পাঁকে, পোড়া মন পোড়া থাকে, মলম দিলে ছাড়ে না।’
গ্রামের দুলাল মহাজন চিকন বুদ্ধির মানুষ। সুঁইয়ের মতো চিকন। একেবারে সোনামুখি সুঁই। ঘরে তাঁর পক্ষাঘাতগ্রস্ত সন্তানহীন স্ত্রী সাম্যলতা। ধুকে ধুকে জীবন কাটছে ছাড়পোকা সঙ্গে নিয়ে। পাশের গ্রামের মোনালীকে রাখা হয়েছে তাকে দেখভালের জন্য। যদিও সাম্যলতা মোনালীকে দুচোখের দুশমন মনে করেন। তাঁর চোখের আড়ালে দুলাল মহাজন কখন কী করে কে জানে। ইদানিং মোনালীর উদ্দেশ্যহীন সাজগোজ করার বাতিক ধরেছে। অকারণে কথা কয়, অকারণে হাসে।
দুলাল মহাজন নদীর পাড় ঘেসে ক্ষীরা চাষ করেছেন। চালকুমড়ার দিকে অজান্তেই যেমন মানুষের নজর যায় তেমনি ক্ষেতের টসটসে ক্ষীরা কারো নজর এড়াতে পারে না। দুলাল মহাজন তাঁর চিকন বুদ্ধি দিয়ে মোটা গলার একজন পাহাড়াদার জোগার করেছেন। গভীর রাতে শিয়ালের ডাকের সাথে পাহাড়াদারের ‘সাবধান,খবরদার’ আওয়াজটা গ্রামের ঘুমন্ত মানুষের কানে এসে ধাক্কা দেয়। তাঁর কর্কশ আওয়াজ শুনে সাগর তড়তড় করে কাঁপে। দু’হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে তাঁর কেঁপে উঠা শরীর।
সাগর দেশাইকে নিয়ে গোধুলীর নিবুনিবু আলোতে বাড়ী ফিরে। এবারের শীতে গ্রামের খোলা মাঠ সবুজ ঘাসের পরিবর্তে মানুষের আগ্রাসী মনের করাল গ্রাসে আতংকিত। গতবছর যেখানে তরতাজা দূর্বা ঘাসের কচি কুড়ি পুরো মাঠ সবুজে পরিপূর্ণ করেছিল সেই মাঠ আজ মানুষের ঘরবাড়ি আর সবজি বাগানের বেড়ার ফাঁদে আটকে আছে। সবুজ টসটসে ক্ষীরা দেশাই’র চোখে লাগে। তার পেটে ক্ষুদার জালা মোচর দিয়ে উঠে। ক্ষেতের বেড়া ভেঙ্গে আছড়ে পড়ে ক্ষীরার বাগানে। এক নিমিষেই সাবার করে নেয় দুলাল মহাজনের ক্ষীরার বাগান। সাগর সজোরে বাঁধা দেয়। চিৎকার করে উঠে দেশাই দেশাই বলে। তখন সে বুঝতে পারে বয়সের তফাৎ বেশী হলেও দেশাই’র সাথে পেরে উঠা সম্ভব নয়। অবলা দেশাই কেন জানি হিংস্র হয়ে উঠে। পাহাড়াদার হাতে লাঠি নিয়ে চিৎকার করতে করতে চোখের পলকে তাদের কাছে ছুটে আসে। অবলা দেশাই’র পিঠে গায়ের জোড়ে চপাত চপাত করে লাঠি চালায়। সাগরকে গলা ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে পেছনে লাথি মারে ইচ্ছে মতো।
বাঁশঝারের পাকা-পোক্ত বুড়া বাঁশ দিয়ে গোল করে খোয়াড় তৈরী করেছেন দুলাল মহাজন। এটা অবলা পশুদের জেলখানা। মানব কর্তৃক বিচারের শাস্তিস্বরূপ অবলা পশুদের এখানেই ঠেসে দেওয়া হয়। এই জেলখানায় পশুদের মধ্যে কোন বিভাজন নেই। গরু, মহিষ, ছাগল-ভেড়াসহ সব পশুদের জায়গা এই একটি খোয়াড়। শাস্তির নেই কোন ভেদাভেদ। ধান খেলেও এই খোয়ার, সবজি খেলেও এই খোয়াড়। ক্ষীরা খাওয়ার অপরাধে দেশাই’র জায়গা হয় এই খোয়াড়ে। এই বিচারের বিচারক মনুষ্য জাতি, স্বাক্ষী মনুষ্য জাতি, কিন্তুু শাস্তি পায় অবলা পশুরা !
সাগর খোয়াড়ের বাঁশের বেড়া ধরে দাঁড়িয়ে আছে। দেশাই ভিতর থেকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে সাগরের চোখের দিকে। টলটল করে চোখের পানি দেশাইর চোখ বেয়ে কালো হয়ে তাঁর মুখের চামড়ার সাথে চুপসে যাচ্ছে। সাগরের মনের ভিতরে যেন আগুনের গোলা খেলা করে। নির্মল বাতাসে যেন আগুনে পোড়া গন্ধ! বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেশাই’র মুখটা ছোঁয়ার চেষ্টা করে সে, কিন্তু পারেনি। এ যেন যোজন যোজন দূর। পাহাড়াদার হাঁক দেয়, এইখানে কেডা রে। সাগার দৌড়ায়। ভয়ে, আতংকে বন্দী দেশাইকে পেছনে ফেলে দৌড়ায় সাগর।
রাতে মনসাবালা ছেলের মাথায় জলপট্টি দিচ্ছেন। এমন জ্বর আগে কখনও উঠেনি সাগরের। মনসাবালা জগদ্বীশকে বলে-
- পোলাডার এমন জ্বর উঠছে আর তুমি নিশ্চুপ হইয়া বইসা আছ !
- আমি কী করুম মনসা। আমার কী করার আছে! আমার কাছে একটা কড়িও নেই যা দিয়া দেশাইকে ছাড়াই আনি।
মনসাবালা স্বামীর এই অক্ষমতা ভাল ভাবেই জানে। আজ দুদিন হলো দেশাই খোয়াড়ে আটক। যে দেশাইকে হালের জন্য ভাড়া দিয়ে ওদের সংসার চলে সেই দেশাই আজ বন্দী। ছেলের জন্য ঔষধ যোগাবে নাকি দেশাইকে ছাড়িয়ে আনবে। জীবনের হিসাব মিলাতে না পেরে সাগরকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে জগদ্বীশ। মনসাবালা খেয়াল করে বাপ-বেটার এমন জড়াজড়িতে ছিকায় রাখা ভাতের শূন্য পাতিল এদিক-সেদিক ঝুলছে। শূন্যতা আছড় করেছে বাড়ীর আনাচে-কানাচে।
জগদ্বীশ সিদ্ধান্ত নেয় এভাবে আর বসে থাকলে চলবে না। তাঁর প্রাণ প্রিয় সন্তান আজ বিছানায় ধুকে ধুকে নিস্তেজ হচ্ছে আর সন্তান সমতুল্য দেশাই বাঁশের বেড়ার মধ্যে মানুষের মনের মারপ্যাচের কাছে বন্দী। না, এবার একটা এদিক-সেদিক করতেই হবে। সমাজের মহাজনদের কাছে নিজেকে এভাবে বিকিয়ে দেওয়া যাবে না। তবে কী আছে তাঁর? এক বেলা মানুষের বাড়ীতে কামলা না খাটলে যেখানে ভাতের পাতিল শুন্যে ঝুলে সেখানে দেশাইকে ছাড়িয়ে আনতে এত টাকা কোথায় পাবে সে! কে তাঁর পাশে দাঁড়াবে আজ ! কিন্তুু মানুষের অসাধ্য কিছু নেই। সেটা হোক সোজা পথে অথবা বাঁকা পথে। সিদ্ধান্ত আজ রাতেই নিতে হবে। জগদ্বীশ চোয়াল শক্ত করে। শরীরে যেন অশরীরি কোন শক্তি ভর করেছে। বউকে বলে- তুমি দরজা লাগিয়ে শুইয়া থাকো মনসা। আমার আইজ আইতে একটু দেরী হইবো। বউ দৌড়ে এসে জগদ্বীশের হাত ধরে। তুমি কই যাও সাগরের বাপ ?
পাশের বাড়ির মল্লিকার ডাক শুনে ঘুম ভাঙ্গে মনসার। তুমি এখনও ঘুমাইতাছ! ঐদিকে তোমার সর্বনাশ হই যাইতাছে। কী হইছে মল্লিকা ? মল্লিকার হাত ধরে দৌড়ায় মনসা।
পাশের বাড়ির দুলাল মহাজনের বাড়িতে মানুষ গিজগিজ করছে। সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মনসা ভীড় ঠেলে ভিতরে ঢুকার চেষ্টা করতেই দুলাল মহাজনের কণ্ঠ কানে বাঁজে,
- কতবড় সাহস ! সে খোয়াড় ভাঙ্গতে চায়! আমাদের বাপ-দাদা চৌদ্দ গোষ্ঠী এই খোয়ার দখলে রাখছে আর সে এই খোয়াড় ভাঙ্গতে চায়! তোমরা কী কও ভাইয়েরা? এই হারামজাদার শাস্তি কি হইবো?
- মহাজন সাব, সে যেহেতু খোয়ার ভাঙ্গতে চাইসে তাইলে ওরে শাস্তিস্বরূপ খোয়াড়ে ঢুকাই দেওয়া হোক। নে বাবা, গরু মানুষ এক সাথে থাক্ !
মনসা জগদ্বীশের দিকে তাকাতেই তাঁর চোখ দু’টা স্থির হয়ে যায়। হাটুর নিচে একটা বর্শা বিধে আছে। দুলাল মহাজনের বাড়ীর তৃষ্ণার্ত মাটি ফোঁটা ফোঁটা রক্ত চুষে নিচ্ছে। দু’হাত পেছনে নিয়ে রশি দিয়ে বাঁধা। এ কি জগদ্বীশ! বর্বর, পিশাচ আদিম মানুষ যেন শিকারকে আক্রমন করেছে। তাঁর এ কী বেহাল দশা! এক রাতের ব্যবধানে মানুষটার শরীরে এমন ফারাক !
- ‘তাহলে এইটাই থাক্। ওরে খোয়ারের মধ্যে ঢুকানো হোক।’ খিলখিল করে হেসে বলে দুলাল মহাজন।
কয়েকজন জগদ্বীশকে টেনে তুলে। তাকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করলেও সে দাঁড়াতে পারেনি। ধপাস করে মাটিতে পড়ে যায়। কেঁপে উঠে ধরণী। কেঁপে উঠে মনসাবালার ভীত মন। মহাজনের দু’পায়ে জড়িয়ে ধরে বলে, ছাইড়া দেন বাবু, আমার স্বামীরে ছাইড়া দেন আপনি।
দাঁড়ান!
গর্জে উঠে এক মেয়ে কণ্ঠ। হাস্যজ্জ্বল মানুষগুলো যেন সজোরে ধাক্কা খেল। সবার নজর শব্দের উৎসমূলের দিকে।
মোনালী ! ঔ মোনালী, তুই কি কইতে চাস ? চিৎকার করে বলে দুলাল মহাজন।
আমার পেটে তোমার বাচ্চা আইছে এইডা কী চিৎকার কইরা কইতে অইবো মহাজন ?
মহাজনের মাথায় যেন হাজার বছরের পুরানো শেওলা জমা পাথর ভাঙ্গলো কেউ। গৌরবর্ণ মুখে ফ্যাকাসে ছায়া ভর করেছে। যারা জগদ্বীশকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তাঁরা ঠাই দাঁড়িয়ে রইল। বাতাস যেন থমকে আছে। মনসাবালা তাঁর ভালবাসার মানুষটিকে জড়িয়ে ধরার সুযোগ পেল শেষবেলায়। যেন হাজার বছর ধরে এমন একান্তভাবে তাকে পাওয়া হয়নি। ভালবাসায় সিক্ত মনসাবালা।
ঘরের ভিতর সাম্যলতা মুচকি হাসে। এতদিন তিনি যা অনুমান করেছেন তা আজ সত্যি প্রমাণ হলো। বুকের ভেতর থেকে জমানো গোলকবাধা বাতাসের ডলাটা নির্মম ভাবে বের হচ্ছে। সজল চোখের কোনে অজান্তেই শীতল ছোঁয়া টের পেলেন তিনি। আহ! শান্তি! এবার মরেও শান্তি পাবেন সাম্যলতা !
ছবি: গুগল
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই এপ্রিল, ২০১৫ সকাল ১০:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




