
(১)
নিকষ কালো রাত। বিদগুটে অন্ধকার বাইরের মিটিমিটি জােনাকীর আলো ঢেকে দিয়েছে। হেমন্তের রাত তাই শীতের আগমনী বার্তা গায়ের লােমে দোলা দেয়। শব্দহীন রুমে আমার নিশ্বাস আমাকে কাঁপিয়ে তোলে। দরজাটা বন্ধ করে বিছানায় গা বুলিয়ে দিতেই কেমন জানি অজানা ভয় আশ্রয় করেছে। নিঃশব্দ বাড়িতে আমার একাই বাস। গত মাসে বকশিস পাওয়া সিন্দুকটায় শুয়েছিলাম। গিজগিজে কালো সিন্দুক। সারাদিনের ক্লান্তিতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝিনি।
শব্দহীন ঘরে পিঁপড়া হাটার শব্দ কানে আসছে। সিন্দুকের ভিতরে জীবন্ত প্রাণীর অস্তিত্ত্ব টের পাচ্ছি। কেমন যেন কেঁপে উঠছে সব। পুরো পৃথিবী কাঁপছে যেন। ভয়ে আমার শরীর বেয়ে ঘাম ঝড়ছে। কাউকে ডাক দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছি আমি। না, পারছি না। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে আমার। গলা শুকিয়ে গভীর জঙ্গলে শিকড় উপড়ে পড়া নাম না জানা কােন বৃহৎ বৃক্ষের চামড়ার মতো শুকনো হয়ে গেছে। পানি চাই পানি। শুধু পানি। হােক লবনাক্ত,মিষ্টি অথবা কােন ভাগাড়ের পানি অথবা কারো শরীর নিঃসৃত নোনা পানি।
কালো সিন্দুকের কপাট খুলে বের হয় একজন। মুখে কালো মুখোশ। সর্বশক্তি দিয়ে আমার গলা চেপে ধরে। আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। প্রশ্বাস নেয়ার শক্তি নেই। গলার মধ্যে কে যেন পাথর চেপে ধরেছে। ছােট বেলায় মামার বাড়ীতে কুকুরের বিষ দাঁত ফেলার জন্য ছােট্ট একটা কুকুরকে সবাই চেপে ধরতো। আমি ভয় পেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরতাম। আমাকে সে এভাবেই চেপে ধরেছে। কিন্তু কেউ দেখার নেই। আমি তাকে বলার চেষ্টা করি- ভাই, আমাকে মেরো না। কিন্তু আমার শেষ কথা সে শেষ করতে দেয়নি। আমার প্রাণের অব্যক্ত দাবী তাঁর প্রাণ স্পর্শ করেনি। আমি ভিক্ষা চাই। আমি করজোড়ে তাঁর কাছে ভিক্ষা চাই। প্লীজ, আমাকে বাঁচতে দিন। আমি একটা স্বাভাবিক মৃত্যু চাই। মায়ার এই ধরণীকে ছেড়ে যেতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। প্লীজ, আমাকে বাঁচতে দিন।
না, আমাকে সে বাঁচতে দেয়নি। আমার জীবন প্রদীপ নিবুনিবু করে নিভে যায় তখন। আমার প্রাণ পাখি সোনার পিঞ্জিরা খুলে উড়াল দেয় অজানায়।
কিন্তু কে আমার প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল ? আমাকে গলা টিপে হত্যা করেছিল কে ?
সে কথায় পরে আসছি। তার আগে আমার পেশা সম্পর্কে একটু বলে নেই।
শহরের মানুষ যখন সকালের গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে তখন তাদের জাগিয়ে দেয়াই ছিল আমার মূল কাজ। তখন তাে আর মানুষের ঘরে ঘড়ি ছিল না। মানুষ সময়ের হিসাব করতো সূর্যের হেলে পড়া ছায়া দেখে। তবে আমার মনের ঘরে একটা ঘড়ি ছিল, যেটা সঠিক সময়ে এলার্ম দিতো। ঘুমন্ত মানুষকে জাগিয়ে দিয়ে তাদের মুখের দিকে তাকালে মনেহতো এ যেন সদ্য ফোঁটা শিশির ভেজা শিমুল ফুল। ঘরের দরজায় টকটক করে ঠোকা দিয়ে বলতাম- শুভ সকাল।
সমস্যা হতো দু’তলায় ঘুমন্ত কাউকে জাগিয়ে তুলতে। তখন আমি একটা লাঠির সাহায্য নিতাম। নিচ থেকে লাঠি দিয়ে জানালায় টকটক করে আঘাত করতাম আমি। কােন কােন বাসার ছােট বাচ্চারা জানালা খুলে আমার আদর পাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়তো। তখন তাদের ইনিয়ে বিনিয়ে গল্প বলতাম। ভৌতিক গল্প, ডাকাতের গল্প, পরীদের গল্প। তারপর ছুটতাম এ দরজা থেকে ঐ দরজায়।
মধ্য শহরের যে মােড়টায় বৃদ্ধ জারুল গাছটা দাঁড়িয়ে আছে তার ঠিক দক্ষিণ দিকটায় কাঠের তৈরী একটা দু’তলা বাড়ি। এত বড় বাড়িতে মাত্র তিনজনের বাস। স্বামী-স্ত্রী আর তাদের সন্তান জেনি। জেনির বয়স পাঁচ কিংবা ছয়। ষাটোর্ধ্ব আমি জেনির সামনে দাঁড়ালেই আমার অতীত আমাকে গ্রাস করে ফেলতো। আমার ছােটবেলা, আমার মেয়ের ছােটবেলা, সব স্মৃতি আমাকে আচ্ছন্ন করে তুলতো। দুটো পয়সা কামানোর জন্য এই শহরের কােন এক গুমোটবাধা ঘরে দিন কাটতো আমার। একাকীত্বই ছিল আমার একমাত্র সঙ্গী। তবে জেনির মিষ্টি হাসিতে এক অকৃত্রিম ভাললাগার পরশ পেয়েছিলাম।
জেনি আমাকে একদিন বলে- অ্যাংকেল, আমাকে একটা পুতুল কিনে দিবেন ?
- কি পুতুল লাগবে তােমার বাবু ?
- হু... আমার একটা ননীর পুতুল লাগবে ।
- ননীর পুতুল !!
তাঁর বাবা পাশ থেকে বললেন, ননীর পুতুল বলতে তাে কিছু নেই মা। তুমিই তাে আমাদের ননীর পুতুল। জেনি বুঝ মানে না। তাঁর ননীর পুতুল চাই-ই চাই।
এক সকালে পাখির কিচির মিচির শুনে ঘুম ভাঙ্গে। শীতের সকাল। কুয়াশা তখনও ভালভাবে কাটেনি। টকটক করে দরজা নক করছি কিন্তুু কারো সাড়াশব্দ পাচ্ছি না। মনের মধ্যে টেনশন কাজ করছে। কী হলো বাড়ীর লােকের। অতি উৎসাহ নিয়ে পেছনের জানালা দিয়ে উঁকি মারতেই লজ্জ্বায় আমার মুখ লাল হয়ে উঠলো। এমন নির্জনতায় সদ্য বিবাহিত দম্পতির নির্ভেজাল ভালবাসার মাঝে ব্যাঘাত ঘটানো কারো উচিত নয়। শুধু মনেমনে বললাম- হে করুণাময়, তাদের সুদীর্ঘ জীবন প্রবাহে এই নির্মল ভালবাসা নিরন্তর প্রবাহিত হোক।
আমার বাসার ঠিক উত্তরে পুকুরটার পাড় ঘেসে যে রাস্তাটা চলে গেছে তার শেষ প্রান্তে একটি নিরব বাড়ী। গেইটে শেওলা জমে এক ফালি সবুজ আস্তর বাসা বেঁধেছে। অপরিচিত মানুষ দেখলেই বাড়ীর কুকুর ঘেউ ঘেউ করে এগিয়ে আসে। দু’তলা বাড়ীর প্রায় সব রুমগুলোই ফাঁকা। সিঁড়ির পাশে লাগানো রুমটায় আমার এক বন্ধু বাস করতো। নাম সিজার। পেশীবহুল শরীরে বয়সের তিল পরিমান ছাপ নেই। তাকে দেখেই মনেহয়, তাঁর স্বাস্থ্য আর উচ্চতার অনুপাত সমানুপাতিক হারে বৃদ্ধি পেয়ে স্থির হয়ে বসে আছে।
সে বছর ইঁদুরের জ্বালায় শহরের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। শহর জুড়ে ইঁদুরের আতংক। মানুষের কাপড়-চােপড় ছাড়াও সুযোগ পেলে শিশুদের আক্রমন করে বসতো এই পাজি ইঁদুরের দল। আমার বন্ধু সিজার শহরে ইদুর মারার কাজ নেয়। ওদের একটা ইঁদুর মারার দল ছিল। সিজার ছিল ঐ দলের দলনেতা। শহরের আনাচে-কানাচে বর্শা হাতে নিয়ে হাঁটতো সবাই। ইদুর পেলেই বর্শা দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেলত সব। ইদুর মারার পেশাটা ওদের নেশা হয়ে যায়। এক বিভৎস নেশা।
ক’দিন ধরে শহরে কানাঘুষা শুরু হয়েছে। সংবাদটা ছড়িয়ে পড়ছে মানুষের মুখে মুখে। সবার মনে জিজ্ঞাসা, কারা করছে এ জঘন্যতম কাজ। ঝিঝিপোঁকার শব্দে যখন রাত নেমে আসে তখন মানুষের মনের মধ্যে খাঁ খাঁ করে। চুপিচুপি ঐ বুঝি আসলো ঘাতকের দল। ওদের কালো হাতের মুঠোয় ঐ বুঝি প্রাণ যাবে নিস্পাপ ফুলের মতো কোন শিশুর। প্রতি মঙ্গলবার একটি করে বিকৃত ভাবে হত্যা করা হয় কােন এক শিশুকে। পুলিশ হন্য হয়ে খুঁজছে অপরাধীদের। না, কােন হদীস পাওয়া যাচ্ছে না।
দুঃসংবাদটা ছড়িয়ে পড়ে বুধবার সকালে। সেদিন আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামছিল। রাস্তায় পানি জমে থৈ থৈ করছে। বয়সের ভারে পা কাঁপে আমার, তাই বৃষ্টিভেজা ভােরে সেদিন কাজে যতে পারিনি। জেনির ক্ষতবিক্ষত দেহ নাকি বৃদ্ধ জারুল গাছটার শিকড়ে পড়ে ছিল। গাছটার চারদিকে মানুষ গিজগিজ করছে। প্রশাসন নড়েচড়ে বসছে এবার। সবার মনে একই প্রশ্ন, মানুষ মানুষের বাচ্চাকে এভাবে খুন করে!
আমার গলাটা চেপে ধরার পর তাঁর কনুইয়ের দাগটিতে আমার চােখ পড়ে। একটা দাগ উজ্জলভাবে ভেসে আছে। ক্ষতটা ভালভাবে এখনও শুকায়নি। মনে হচ্ছে একটু আঘাত পেলেই রক্ত ঝরবে। আমার মাথায় ঝিমঝিম করছিল। এটা তাে ইঁদুরের কামড়ের দাগ। ওহ, মানুষ মানুষকে এভাবে হত্যা করতে পারে। তবে জীবনটা এমনই। ওর হিসাব কখন মিলবে আর কখন মিলবে না, তার হিসেব নেই। কখন, কে, কার জীবনের জন্য বিপদসংকুল হয়ে দাঁড়ায় তার হিসেব কে রাখে। তা না হলে গত ক’দিন আগে যার রক্ত ঝরা হাতে মানব প্রেমের বাঁধন বেঁধেছিলাম সেই হাত আমার গলা চেপে ধরার দুঃসাহস পায় কীভাবে। সিজারের প্রতি আমার বন্ধুত্বের বাঁধন কি এতটাই ঢিলেঢালা ছিল !
ওপারে আমরা অনেকেই আছি, যাদের সাধারণ মৃত্যু হয়নি। মনের মধ্যে সারাক্ষণ ফেলে আসা পৃথিবীর জন্য চিনচিন ব্যাথা অনুভব হয়। পৃথিবীতে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তুু আমি জানি, এ সম্ভব নয়। যারা মরে, তারা ফিরে না। এত আদরের পৃথিবী তখন ধুর ধুর করে তাড়িয়ে দেয়। নতুনকে গ্রহণ করে হৃদয় উজার করে।
জীবনের প্রতি মুহুর্তে আমার ব্যর্থতা, বিষন্নতা, আমার মনে মানুষের প্রতি একধরনের ঘৃনার জন্ম দেয়। মানুষের সুখ আমার হৃদয়ে বিষের কাটার মতো হুল ফুঁটায়। তবে এই কাজটা করা আমার একদম ঠিক হয়নি। কতরাত শহরের অলিতেগলিতে বিরামহীন হেঁটে চলেছি। ঘুমহীন রাত কাটিয়েছি একের পর এক। আমার প্রতি মানুষের অবহেলা আমাকে মানুষের প্রতি নির্দয় করে তুলেছে। আমার স্ত্রী-সন্তান হারিয়েছি সেই কুড়ি বছর আগে। তাই জীবনের শেষ কুড়িটি বছর পার করেছি জীবনবোধের সঙ্গাহীন অমসৃণ পথে। তাইতো স্বপ্নগুলো ফিকে হয়েছে নিয়মিত গতিতে।
আমি তাে আলোর চাকচিক্যময় জীবন চাইনি। আমি তাে কয়লার খনিতে স্বর্ণ প্রত্যাশা করিনি। আমিতো শুধু বাঁচতে চেয়েছিলাম। একজন সাধারণ মানুষ যেভাবে বাঁচতে চায় সেভাবেই। ফুলের মতো শিশু জেনিকে এভাবে হত্যা করা উচিত হয়নি আমার। আমি জানি, জেনি হত্যার বিচার হবে না। কারণ সাক্ষী বিহীন বিচার পুরোটাই ভিত্তিহীন।
কেউ জানুক না জানুক, কেউ বুঝুক না বুঝুক আমার বন্ধু সিজার ঠিক বুঝেছিল আমাকে। আমার মনের গতি-প্রকৃতি সে ঠিকই টাহর করতে পেরেছিল। সে বুঝতে পেরেছিল শহরে যে কটা শিশু মারা গিয়েছে তাঁর সব কটাতেই আমার এই নোংরা হাত জড়িত ছিল। হয়তো জেনি হত্যার পরেই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আমাকে আর বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। তাইতো, সে রাতে .. ..
তবে আমি এখন মাটির গন্ধ নিতে চাই। নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে বুক ছিড়ে পাকা ধানের তীব্র ঘ্রান শুকতে চাই। কিন্তু আমার কষ্ট, আমার বুকের ব্যাথা কাকে দেখাবো, কাকে বুঝাবো। আমি অনুতপ্ত। আমি ক্ষমাপ্রার্থী।
দিনের পর দিন আমি মানুষকে জাগিয়ে দিয়েছি, কিন্তু আমাকে আজ †ক জাগিয়ে দিবে ?
(২)
পুলিশের বড় কর্মকর্তা গল্পটি শেষ করে চােখ থেকে চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলেন। টেবিলের নিচে পা দু’টা টানটান করে ছেড়ে দিয়ে চেয়ারে আলতো করে হেলান দেন। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখেন রাত দু’টা। পাশের বিছানায় তাঁর স্ত্রী ঘুমাচ্ছেন। স্ত্রীর কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে পাশে শুয়ে আছেন তিনি। কিছুতেই ঘুম আসছে না তাঁর। বারে বারে বইটি নেড়েচেড়ে দেখছেন। গত মাসে প্রকাশিত হয়েছে বইটি।
গল্পটা সারা দেশে হৈচৈ ফেলে দিয়েছে। বই প্রকাশের কিছুদিন পূর্বে শহরে একটি শিশুকে হত্যা করা হয়। লাশটা পাওয়া যায় বাড়ীর পাশের বৃদ্ধ জারুল গাছের নিচে। তদন্তের ভার পড়েছে এই কর্মকর্তার উপর। গল্পের সাথে বাস্তবতার কােথায় জানি একটু মিল পাচ্ছেন এই চৌকস পুলিশ অফিসার।
পরের দিন তাঁর অধীনস্ত কর্মকর্তাকে বইটি দেখিয়ে বললেন- গল্পের লেখককে আমার অফিসে তলব করা হউক।
(সমাপ্ত)
উৎসর্গঃ নবরত্ন সভার সম্মানিত সদস্যবৃন্দ (প্রবাসী পাঠক, মাহমুদ ভাই, ডি মুন, তুষার কাব্য)। কেমন জানি এক সঙ্গাহীন ভালবাসার টানে জড়িয়ে পড়েছি আমরা। এজন্য ব্লগই দায়ী।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ সকাল ১০:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




