
সােনা বউদিদি গাে বাত্তি জালাও বাঘ আইতাছে
ম্যাচে করে ঝন্নার ঝন্নার বাত্তি জ্বলে না ।
গানটির গীতিকার সুরকার এমনকি নির্দিষ্ট কােন গায়কের নাম জানা নেই। ইন্টারনেট ঘাটাঘাটি করেও কারো নাম জানা হলো না। মাঝে মাঝে আমার মনের কােনে গানটির এদুটি লাইন টুুংটাং করে বেজে উঠে। আমি তখন হারিয়ে যাই নিরিবিলি মেঠো পথের সবুজ বিছানো নির্মল আনন্দের সেই গ্রামে। যেখানে স্তরেস্তরে সাজানো আছে মুক্তামানিক্যের মতো আমাদের লােকজ সংস্কৃতির হাজারো শাখা উপশাখা। থাক সে কথা। এবার গানটির প্রেক্ষাপটে একটু নজর দেই।
কনকনে শীতের গভীর রাত। মায়ের কােলে ঘুমাচ্ছি। হঠাৎ হারমোনিয়ম, ঢােল, করতাল সাথে হৈ-হুল্লোড়, চিৎকার চেঁচামেচির কারণে জেগে উঠি আমরা সবাই। অজানা ভয়ে মাকে জড়িয়ে ধরি। মা বলতেন, ভয় পাইসনা বাবা। তাড়াতাড়ি উঠ, ‘বাঘের সিন্নি’ আইছে। দরজা খুলে ঘুমকাতর চােখে ওদের উদ্ভট পােশাক দেখে আমরা ভয়ে নুইয়ে পরতাম। এই গানটি গ্রামের এক সময়কার জনপ্রিয় কিন্তু বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায় সংস্কৃতির অঙ্গ ‘বাঘের সিন্নি’র বহুল প্রচলিত গান। বাঘের সিন্নিতে বিভিন্ন ধাচের গান গীত হলেও সােনা বউদিকে নিয়ে এই গানটির আবেদন ছিল আকাশচুম্বী।
গ্রামের উঠতি বয়সি ছেলেদের কয়েকজন মিলে গঠন করত এই গানের দল। প্রতি রাতে আগেই নির্দিষ্ট করা কােন গ্রামে প্রবেশ করে প্রতিটা বাড়ির উঠানে গিয়ে ঘুমন্ত বাড়িওয়ালাকে ডেকে গান-বাজনা আর নাচানাচি শুরু করে দিত সবাই। দলের কয়েকজন বিভিন্ন রকমের মুখোশ ব্যবহার করতো। তবে বাঘের মুখোশটা ছিল বাধ্যতামূলক। ওদের নাচের ধরনও ছিল খুব চমৎকার। দরজা খুলে বাড়ির সবাই ওদের নাচ-গানের পরিবেশনা উপভোগ করতেন। বকশিস হিসাবে দেওয়া হতো চাল-ডাল, নারকেল এবং টাকা। অর্থাৎ যার যেটা সামর্থ্য তা দিয়েই ওদেরকে খুশি করা হতো। আবার বকশিস মনের মতো না হলে বাঘমামা হুংকার দিয়ে বাড়ির কর্তা অথবা ছােটদের ভয় দেখাতো। এভাবে অর্ধমাস অথবা পুরো মাসব্যাপী এ গ্রাম থেকে ঐ গ্রামে বিচরণ করে এই বাঘ মামার দল। গানের পালা শেষে একটা নির্দিষ্ট দিনে এতদিনের জমানো বকশিস দিয়ে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করা হয়। খাওয়ার আয়োজন নিয়ে আছে কিছু নিয়মনীতি। বাড়ীতে রান্নাবান্নার আয়োজন করা যাবে না। তাই গ্রাম থেকে দূরে নির্জন কােন বনের ভিতর অথবা খােলা মাঠে চলতো এই আয়োজন।
পাহাড়ের পাদদেশে এই বাঘের সিন্নি’র উদ্ভব হলেও কালের প্রবাহে একটা সময় সমতল অঞ্চলে চলে আসে। সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ এলাকায় বাঘের সিন্নির প্রচলন ছিল বেশ লক্ষ্যনীয়। শীতকালে যখন মানুষের হাতে কাজকর্ম কম থাকতো তখনই বাঘের সিন্নি’র দল বের হত বিচিত্র সব মুখোশ পড়ে। চাঁদনী রাতে নদীর পাড় ঘেঁষে বাঘের সিন্নি’র দল ছুটে চলে ঘুমন্ত মানুষকে বিনোদন দেয়ার আশায়। কতশত যুবক দলের প্রধান হবার জন্য অর্থাৎ বাঘের মুখোশ পড়ার জন্য স্বপ্ন বেঁধেছিল গোপনে। আবার কতজন শুধু দলে ঠাঁই না পাওয়ার জন্য কেঁদেছে নিরবে। কারণ সবার কাছে বাঘের সিন্নি’র দল ছিল এক কাঙ্ক্ষীত স্থান।
বাঘের সিন্নি’র আধ্যাত্মিক তথা পৌরাণিক কোন ব্যাখা পাওয়া যায়নি। তবে হিন্দু-মুসলিম সমাজে এর ব্যাপক প্রচলন ছিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে গবেষক সজল সরকার চমকপ্রদ এক তথ্য দেন। তিনি বলেন, আগেকার দিনে পাহাড়ের পাদদেশের গ্রামগুলোতে রাতের বেলা বাঘ আক্রমন করতো। তাই হিংস্র বাঘের আক্রমন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য গ্রামের রাখালরা রাত জেগে পাহারা দিত। আর এই রাত জাগার সুবিধার্থে করা হতো গানের আয়োজন। তাই বাঘ তাড়ানোর জন্য কার্যকরী এই গানের আয়োজনকে ‘বাঘের সিন্নি’ নামে নামকরণ করা হয়। এভাবে ধীরে ধীরে এই বাঘের সিন্নি আমাদের লােকজ সংস্কৃতিতে পাকাপোক্ত আসন দখল করে নেয়। এ নিয়ে নানান রং-ঢংয়ের গানও প্রচলিত রয়েছে।
বাঙ্গালীর লােকজ সংস্কৃতির ভান্ডার শুধুমাত্র রত্ন দিয়েই পরিপূর্ণ। গ্রামের সহজ-সরল মানুষ হাজার বছর কাটিয়ে দিয়েছে এই রত্নগুলো নাড়াচড়া করেই। এই সংস্কৃতির গন্ডির ভেতর থেকে মানুষ ভালভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছে। সহজসরল মানুষ বাইরের জগতকে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করেনি অথবা ইচ্ছা জাগলেও সাধ্যের কারণে পিছ পা হয়েছে। তবে জীবন থেমে থাকেনি। গান-বাজনা, খেলাধুলা আর রাত জেগে যাত্রাপালার মতো নির্মল আনন্দের মধ্যেই মানুষের জীবনের গীত বারেবারে ঝংকার তুলেছে। আবার অধিক শোকে মানুষ মন-মানসে বৈরাগ্য ধারণ করে ঘর ছেড়ে পা ফেলেছে অজানায়। এভাবে উদ্ভব হয়েছে বাউলগান, সুফিবাদ, গাজীরগান, কবিগান, যাত্রাপালা, ধামাইলগান আরও কত কী ! এসবই তাে আমাদের প্রাণে গর্বের আর ভালবাসার স্পন্দন জাগায়।

সংস্কৃতির এই ধারাগুলো সম্পর্কে আমরা মােটামুটি জেনেছি অথবা দেখেছি। তবে যেটি সচরাচর দেখা যায় না এমনকি প্রায় দূর্লভ সেটি হচ্ছে ‘ব্যাঙের বিয়ে’। লােকপ্রচলিত নাম ‘ব্যাঙাব্যাঙির বিয়ে’। দুইটা ব্যাঙকে সুঁতা দিয়ে বেঁধে একটার সাথে অন্যটার বিয়ে দেওয়া হয়। গ্রামের কিশোরীরা আনন্দঘন পরিবেশে এই বিয়ের আয়োজন করে থাকে। ছােটছোট কলাগাছ আর আমপাতা দিয়ে কুঞ্জ সাঁজানো হয়। মেয়েরা গীত গেয়ে এ বাড়ি ঐবাড়ি থেকে চাল-ডাল সংগ্রহ করে। বাচ্চারা এদিক সেদিক ছোটাছুটি করে ঘুরে বেড়ায়। বিয়ের আয়োজন নিয়ে তারা মহাব্যস্ত। তখন বয়স্ক মহিলারাও নিজেদের দমিয়ে রাখতে পারেন না। তারাও এসে এই আনন্দযজ্ঞে ভীড় জমান। সুরেলা কন্ঠে আঞ্চলিক টানে সবাই গান ধরেন-
ব্যাঙাব্যাঙির বিয়া, ষােল মুকুট দিয়া
ব্যাঙাই মেঘ আনো গিয়া।
গানের মধ্যেই এই বিয়ের কারণ নিহীত রয়েছে। গ্রীষ্মের খাঁ খাঁ রােদে জমি ফেঁটে চৌচির। আকাশে মেঘের দেখা নাই। তীব্র গরমে জনজীবন অতিষ্ট। তাই এক ফোঁটা বৃষ্টির জন্য সৃষ্টিকর্তার নিকট কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করা হয়। আর এভাবেই বৃষ্টি কামনা করে এই বিয়ের আয়োজন হয়ে থাকে। তবে এই সন্ধাকালীন আয়োজনে অর্থের যোগান কম হলেও আনন্দের কমতি থাকে না।
এ ধরণের লােকজ আচার-অনুষ্ঠান, রীতি-নীতি, কৃষ্টি-কালচার আমাদের সংস্কৃতিকে তিলে তিলে ঋদ্ধ করেছে। এগুলো আমরা আমাদের বাঙ্গালীদের স্বাতন্ত্রিক অনুষ্ঠান বলেই দাবী করতে পারি। হাজার বছরের পুরানো এই ধারা আজ বিলীন হয়ে যাচ্ছে আমাদের ভালবাসা আর দায়িত্বের অভাবে। আর তা টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন নিরলস সাধনা, সাথে ব্যক্তি তথা সরকারী উদ্যোগ। তবে ক’জন এগিয়ে আসে সেটাই ভাবার বিষয়।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জানুয়ারি, ২০১৬ দুপুর ১২:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




