
বরাম হাওরের স্বচ্ছ জলে ভাসমান সবুজ জলজ উদ্ভিদগুলো সামান্য বাতাসে দুলছিল। আরও দূরে হিজল-করচগাছগুলো যেন আমাদের প্রতীক্ষায় ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমরা জনা ত্রিশেক বেদনাবিধূর মানুষ ‘ময়ূরপঙ্খি’ নৌকার ছইয়ের ওপর বসে ছিলাম। আমাদের সামনে-পিছনে নৌকাভর্তি শতশত মানুষ। সবার দৃষ্টি আমাদের নৌকার দিকে। ততক্ষণে বাউল রনেশ ঠাকুর করুণ গলায় কেঁদে কেঁদে গান ধরেন, ‘কেন পিড়িতি বাড়াইলায় রে বন্ধু/ ছেড়ে যাইবায় যদি’।
শাহ আবদুল করিম: জীবন ও গান বইটির প্রাককথনে এভাবেই শুরু করেন লেখক সুমনকুমার দাশ। নৌকাটা কোথায় যাচ্ছে, বাউল রনেশ দাশের গলায় কেন বিচ্ছেদী গান- এসবকিছু জানতে যেন তর সহ্য হচ্ছে না। শরীরের লোমকূপ থেকে নুইয়ে পড়া লোমগুলো যেন মাথা নাড়া দিয়ে উঠে। মনে প্রশ্ন জাগে সুমনকুমার দাশ কী লিখেছেন বইটিতে ?
তারপর আবার শুরু করেন, এত এত নৌকা, এত এত মানুষ, বরানের হাওরে এত এত জল। কিন্তু কোন মানুষের মুখে শব্দ নেই, বরাম হাওরের পানিতে নেই কোন আফালের গর্জন। এক সময় উজানধল গ্রামে আমাদের নৌকা থামে। এ নৌকার ছইয়েই যে আতর-গোলাপ, চুয়া-চন্দন গায়ে মেখে চুপচাপ শুয়ে আছেন প্রিয় বাউল শাহ আবদুল করিম।
হাওরের টলমল জল যেন চোখের কোনায় বাসা বাঁধে। লেখক সুমনকুমার শাহ আবদুল করিমের মৃতদেহ তাঁর প্রিয় ভাটি এলাকার প্রিয় গ্রামে নিয়ে যাওয়ার এমন বেদনাবিধুর বর্ণনা দিয়েই শুরু করেছেন। বইটির শেষ প্রান্তে এসেও এর রেশ কাটেনি। ঘোরে আচ্ছন্ন হই আমি। চোখের সামনে ভেঁসে উঠে সেই বরাম হাওরের টলটল স্বচ্ছ জল, কালনীর ঢেউ আর করিমের সহজ-সরল চাহনি।
লেখক সুমনকুমার দাশ করিমের জীবনের শেষ দশটি বছর তাঁর ঘনিষ্ট সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। একে তো পাশের গ্রামের মানুষ তাছাড়া চিন্তা-চেতনায় অভিন্ন থাকায় করিমকে হারিয়ে তিনি যারপরনায়ই ভেঙ্গে পড়েন। আর তা তাঁর লেখাতেই সুস্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। যেকোন সাধারণ পাঠক সহজেই তা আঁচ করতে পারবেন। সে তো হৃদয়ের গভীর থেকে ভালবাসা আর সম্মানবোধ জাগ্রত না হলে শুধু নিথর কলমের কালি দিয়ে তা ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়।
লেখক তাঁর জ্ঞানের গভীরতা দিয়ে বইটিকে তিনটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করেছেন। পুরো বই জুড়ে করিমের জীবনের গভীরতা, ব্যাপকতা, গানের মর্মকথা পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। প্রথম অধ্যায়ে আছে শাহ আবদুল করিমের জীবনচিত্র। হতদরিদ্র এক কৃষক পরিবারে ১৯১৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারী আবদুল করিম জন্মগ্রহন করেন। তাঁর শৈশব কেটেছে দাদা নসিবউল্লাহর কাছে। সংসারবিবাগি এই মানুষটিই করিমের মনে ছাপ কাটেন। দাদার সেই গান- ‘ভাবিয়া দেখ মনে/ মাটির সারিন্দা রে বাজায় কোন জনে’ তাঁর মনে তখনই বাউল ধারার বীজ বপন করে দেয়। করিমের বয়স যখন এগারো তখন মাত্র দুই টাকা বেতনে গ্রামে রাখালের দায়িত্ব পালন করেন। বর্ষা মৌসুমে তো রাখালদের কোন কাজ নেই, তাই তখন তিনি ধলবাজারে মুদি দোকানে চাকরি নেন। লেখকের কথায়- দিনে চাকরি,রাতে গান, যেন করিমের দৈনন্দিন রুটিন।
করিমের বয়স যখন ২৮ বছর তখন ঈদের জামাতে নামাজ পড়তে দেখে ধর্মান্ধরা বাঁধা দেয়। তাকে বলা হয়- গান গাওয়া বেশরা-বেদাতি কাম। তাকে সবার সামনে তওবা করতে হবে। তবে করিম দ্বীধাহীনভাবে বলে উঠেন-
পরে করিব যাহা এখন বলি করব না
সভাতে এই মিথ্যা কথা বলতে পারব না।
তখনই তাকে কাফের আখ্যা করে গ্রাম ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর মাঝে ত্রাতা হয়ে আসেন গ্রামের কয়েকজন। তবে কূল রক্ষা হয়নি ‘কুলহারা কলঙ্কিনী’ গানের মহান এই গীতিকারের। এক সময় তাঁর জন্মভিটা ছাড়তে হয়। ‘আর কিছু চায়না মনে গান ছাড়া’ আবদুল করিম সে কথা বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁর ব্যক্তি জীবনে। প্রথম স্ত্রী কাচামালার সাথে বিচ্ছেদ ঘটে এই গানের জন্যই। শ্বশুরবাড়ী থেকে তাকে শর্ত দিয়ে বলা হয়- বউ অথবা গান, এই দুইয়ের মধ্যে বেছে নিতে হবে একটি। আর এই ‘একটি’ গ্রহণ করার মধ্যেই তো সৃষ্টি হয় অনন্য এক ইতিহাস।
বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায় সৃষ্টি’তে আছে আবদুল করিমের লেখা আফতাব সঙ্গীত,গণসঙ্গীত, কালনীর ঢেউ, ভাটির চিঠি, ধলমেলা, কালনীর কূলে এবং শাহ আবদুল করিম রচনাসমগ্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা। প্রথম বই আফতাব সঙ্গীত এর নামকরণ নিয়ে ধুম্রজাল রয়েছে গবেষকদের মধ্যে; তারও ব্যাখা দিয়েছেন সুমনকুমার। দ্বিতীয় বই গণসঙ্গীত নিয়ে লেখক বলেছেন- গণসঙ্গীতের এগারটি গান আবদুল করিমের বিপ্লবী ও প্রতিবাদী সত্তাকে চিনে নিতে সাহায্য করে। এর প্রথম গানটিই দুর্ভিক্ষ নিয়ে লিখা। তৃতীয় বই কালনির ঢেউ প্রকাশ নিয়ে নির্মম সত্যটি প্রকাশ করেছেন সুমনকুমার দাশ। আবদুল করিমের শেষ সম্বল নয় বিঘা জমি বিক্রি করে তিনি তা প্রকাশ করেন। করিম যেমন সরল ভাষায় তার গানের পদ সৃষ্টি করেছেন তেমনি সুমনকুমার অতি সরল-প্রাঞ্জল ভাষায় তার তত্ত্ব কথার অর্থ প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন। করিম ছন্দে ছন্দে গেয়েছেন জীবনের গান আর সুমনকুমার আরো সহজ ভাষায় করিমের মর্মবাণী আমাদের কাছে তুলে ধরেছেন এই বইয়ের মাধ্যমে। রসিক পাঠক সহজেই এই বই পাঠে সাধক করিমের জীবনরস আহরণ করতে পারবেন।
তৃতীয় অধ্যায়ে তাঁর পঞ্চাশটি গান সংকলিত হয়েছে। বইটির পরিশিষ্ট অংশে আছে আবদুল করিমের জীবনপঞ্জি, সাক্ষাৎকার, জীবনবৃত্তান্তমূলক টিকা, গ্রন্থপঞ্জি, আর গানের সূচী। জীবনবৃত্তান্তে সুমনকুমার শাহ আবদুল করিমের শিষ্যদের সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরে মহান দায়িত্ব পালন করেছেন। তাছাড়া আলোকচিত্র অংশে তাঁর দুর্লভ কিছু ছবিও স্থান পেয়েছে।সাক্ষাৎকার অংশে করিমের দৃঢ়, অসাম্প্রদায়িক, দেশপ্রেমিক ব্যক্তিসত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। অর্থসংকট, পারিবারিক দৈন্য দুর্দশার মধ্যে গানে নিজেকে জড়িয়ে ভূল করেছেন কিনা প্রশ্নের উত্তরে করিম সাফ জানিয়েছেন- না। আমিতো কোন কিছু পাওয়ার আশায় গান গাইনা। করিম বলেন- আমি শিষ্যদের বলি, আমরা হিন্দু-মুসলমান এটা বড় নয়; আমরা বাঙ্গালী, আমরা মানুষ। আসলে সুমনকুমার সাধক করিমের মনোজগতে প্রবেশ করে তাঁর না বলা কথাগুলো এমনভাবে বের করে এনেছেন তা সত্যিই মুগ্ধকর। আর এখানেই একজন লেখকের পূর্ণ স্বার্থকথা।
বিভিন্ন পদক পাওয়া নিয়ে করিম বলেন- ‘পদক আনতে শহরে গেছি, আইবার সময় পকেটে টাকা নাই। এই পদক-টদকের কোন দাম নাই। সংবর্ধনা বিক্রি করে দিরাই বাজারে এক সের চালও কেনা যায় না’। তাঁর স্বপ্ন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন- ‘ বাংলাদেশ একসময় সত্যিকারের অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হিসাবে সারা বিশ্বে পরিচিতি পাবে এটাই আমার স্বপ্ন।’
বইটির পরতে পরতে করিমের জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পটভূমিও স্থান করে নিয়েছে। আছে ৪৭ এর দেশভাগের কথা, ৫২ এর ভাষা আন্দোলনের কথা, আছে মহান মুক্তিযোদ্ধের কথা। বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর আলাপচারিতা, শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে পরিচয়, টাঙ্গাইলের কাগমারিতে সম্মেলনে যোগদানের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে এই বইটিতে। করিমকে নিয়ে বিজ্ঞজনের বিভিন্ন মন্তব্য বইটিকে আরো সম্বৃদ্ধি করেছে।
প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত এই বইটি করিম গবেষকদের জন্য আকরগ্রন্থ বলে বিবেচিত হবে। বইটির প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন অশোক কর্মকার এবং প্রচ্ছদের আলোকচিত্র তুলেছেন নাসির আলী মামুন। সাধক করিমকে নিয়ে বাজারে যে বইগুলো পাওয়া যাচ্ছে সেগুলোর তুলনায় শাহ আবদুল করিম: জীবন ও গান বইটি ব্যতিক্রম এক দলিল হিসাবে বাংলা সাহিত্যে স্থান করে নিবে বলে আমার বিশ্বাস।
লেখক পরিচিতিঃ
সুমনকুমার দাশ ১৯৮২ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা উপজেলার সুখলাই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কাজ করছেন প্রথম আলোর সিলেট প্রতিনিধি হিসাবে। হারিয়ে যাওয়া লোকগান ও গ্রামীণ সংস্কৃতি সংগ্রহ করা তাঁর নেশা। এ পর্যন্ত তাঁর রচিত ও সম্পাদিত বইয়ের সংখ্যা চল্লিশেরও বেশী।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ দুপুর ১২:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




