somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

পদাতিক চৌধুরি
আমি আমার নিরক্ষর কিন্তু বুদ্ধিমতী মায়ের কাছ থেকে এই শিক্ষাই পেয়েছিলাম,যথাযথ কর্তব্য পালন করেই উপযুক্ত অধিকার আদায় করা সম্ভব। - মহাত্মা গান্ধী

অপরাহ্ণের আলো

১১ ই জুলাই, ২০১৮ রাত ১:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



নিধুবাবু ঘনঘন ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন । ট্যাক্সি সবে মা উরালপুলে উঠেছে । জ্যাম না থাকলে এমনিতেই একঘন্টার মধ্যে শিয়ালদা পৌছানোর কথা । তবে যেভাবে জ্যামে আটকে যাচ্ছে তাতে সওয়ারি বাবা মেয়ে দুজনেই খুব দুশ্চিন্তায় আছেন। এক একটা জ্যাম যেন তাদের প্রেশারকে ক্রমাগত বাড়িয়ে দিচ্ছে । মালবিকা খুব অস্থির হয়ে উঠেছে । সে বার বার বাবাকে প্রশ্ন করছে যে নির্দিষ্ট সময়ের আগে পৌছানো যাবে কিনা । নিধুবাবু মেয়েকে সান্ত্বনা দিলেও নিজের দুশ্চিন্তাকে কোনক্রমে চেপে রেখেছেন । ঘড়িতে এখন বেলা সাড়ে এগারোটা হয়েছে । ট্রেনের টাইম দুপুর একটা পনেরো মিনিট । শিয়ালদা থেকে আপ পদাতিক এক্সপ্রেস ধরে মেয়ে মালবিকা শিলিগুড়ি যাবে । আগামীকাল জেলা হসপিটলে ল্যাবটেকনিসিয়ান পদে জয়েন করবে । এজন্য মেয়েকে ছাড়তে বাবার শিয়ালদা আসা । অবশেষে সমস্ত চিন্তার অবসান ঘটিয়ে দুপুর একটা বাজার একটু আগেই ওরা শিয়ালদাতে স্টেশন পৌছে গেল । মালবিকা চট করে মাকে একটা ফোনে খবরটা জানিয়েও দিল । কোনক্রমে ছুটতে ছুটতে নয় নম্বর প্লাটফর্ম ধরে একেবারে মাথায় চলে এল । প্লাটফর্মে আগেই ট্রেনটি দাঁড়িয়েছিল । বাবামেয়ে নির্দিষ্ট কমপার্টমেন্ট দেখে উঠে পড়লো । নিধুবাবু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন এখনও ট্রেন ছাড়তে মিনিট দশেক বাকি আছে । ট্রেনটি প্রায় হাত ছাড়া হচ্ছিল । নিধুবাবু বারবার কপালে আঙুল ঠেকিয়ে উপরওয়ালার কাছে যেন কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন । কম্পার্টমেন্টে উঠে নিজের আসনটি চিহ্নিত করে গলার ঘাম মুছতে মুছতে মালবিকা বাবাকে প্রণাম করে ,
- বাবা প্লীজ, এবার একটু মায়ের দিকে খেয়াল রেখো ।
- হ্যাঁরে মা, ঠিক রাখবো । তুই একদম চিম্তা করিসনা । আর হ্যাঁ, তুইও ওখানে পৌছেই একটা ফোন করবি । আমরা খুব চিন্তায় থাকবো ।
- হ্যাঁ বাবা, ঠিক করবো । আমাকে নিয়ে তুমিও একদম চিন্তা করোনা ।
কথা বলতে বলতে সময় শেষ হয়ে এল ।
- বাবা, তুমি শীঘ্রই নামো । ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে এল ।
বলতে বলতে ট্রেনের বাঁশি বেজে উঠলো । নিধুবাবু দ্রুত ট্রেন থেকে নেমে এলেন । কাঁচের জানালায় চোখ রাখতে আবার বাবা মেয়ের চোখাচোখি হল । ট্রেনটি দুলকি চালে সবে চলা শুরু করেছে । নিধুবাবুও একপা দুপা করে প্লাটফর্ম ধরে ট্রেনের গা ঘেষে এগোতে লাগলেন ।ক্রমশ ট্রেনটির গতি বৃদ্ধি পেলো । ফলে একটা সময় তিনি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়লেন । অপলক দৃষ্টিতে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনটির দিকে তাকিয়ে থাকলেন । একসময় ট্রেনটি শাপের মত আঁকাবাঁকা পথে এগিয়ে দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেল । নিধুবাবুও স্টেশন থেকে বার হয়ে একটি প্রিপেড ট্যাক্সি ধরে সোজা মুকুন্দগড়ের বাড়িতে চলে এলেন ।

নিধুবাবুর আসল নাম নিবারণ ধুবে । অত্যন্ত সৎ ,পরিশ্রমী, কর্তব্যনিষ্ঠ মানুষটি একবাক্যে সকলের কাছে নিধুবাবু নামেই পরিচিত । জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসাবে কর্মজীবন শুরু করলেও শেষবয়সে প্রমোশন পেয়ে সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যন্ট বা বড়বাবুর পদমর্যদা পেয়ে ময়ুখভবন থেকে অবসর নিয়েছেন । কাজ পাগল মানুষটি সারাজীবন অফিস থেকে ফেরার সময় ব্যাগে একটি করে ফাইল বাড়ি নিয়ে আসতেন । তবে সবসময় যে নিজের টেবিলের ফাইল নিয়ে আনতেন তা নয়, কলিগদের অনুরোধও ফেলতে পারতেন না । ফলে অফিসের অন্যান্য কলিগরাও নিজের কাজের চাপ কমাতে নিধুবাবুর উপর মাঝে মাঝে অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপাতেন ।

তবে নিধুবাবুর অফিসের ফাইল বাড়ি এনে কাজ করাটা একেবারে মসৃণ ছিলো না । স্ত্রী মনিমালাদেবী সংসারের ব্যাপারে উদাসীন মানুষটার উপর ছিলেন প্রচন্ড ক্ষুব্ধ । দুই ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, বাজারঘাট, গৃহস্থালি সবই একহাতে ওনাকে সামলাতে হত । মাঝে মাঝে অবশ্য তিনি অগ্নিবর্ষণও করতেন । অগ্নিশর্মা হয়ে তিনি স্বামীকে ফাইলম্যান বলে কটাক্ষ করতেন । নিধুবাবু মুখে কোনও শব্দ করতেন না । তবে মাঝে মাঝে অবশ্য অসহায় মানুষটা মেয়েকে বলতেন,
- দেখতো মা, তোর মাকে একটু শান্ত করতে পারিস কিনা ।
বাধ্যমেয়ে বাবার অসহায় মুখের ভাষা বুঝে যেত । করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে মুশকিলআসান করতো,
- তুমি ভেবোনা বাবা । আমি দেখছি, মাকে শান্ত করছি ।
উল্লেখ্য ছোটো থেকেই মালবিকা মাকে যাবতীয় সাহায্য করে আসছে । তবে ছেলে নিখিলেশ আবার ভিন্ন স্বভাবের । কখনও সখনও একটুআধটু বাজারঘাট করলেও বাড়ির অন্যান্য ব্যাপারে বাবার মত সম্পূর্ণ উদাসীন । যেকারনে গতবছর বাঁকুড়ার মল্লভূমি ইনিস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে বিটেক করে টি সি এসের চাকুরী নিয়ে গুরগাঁওতে চলে গেলেও বাড়ির পরিবেশে তেমন কিছু পরিবর্তন হয়নি । কিন্তু এবার মেয়ে চলে যেতে গোটা বাড়ির পরিবেশটি একেবারে থমথমে । নিধুবাবুতো প্রথমে রাজিই হচ্ছিলেন না মেয়েকে অতদূরে চাকুরী করতে পাঠাতে । যদিও মালবিকার জেদের কাছে নত স্বীকার করে শেষে রাজি হয়েছেন । আর মনিমালাদেবী মেয়ের চলে যাওয়ার দুশ্চিন্তাতো আছেই, সঙ্গে আরও চিন্তিত এবার একা হাতে কী করে সংসার টানবেন - এটা ভেবেই ।

নিধুবাবু সবে দুমাস হল অবসর নিয়েছেন ।যদিও সংসারের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গীর কোনও পরিবর্তন হয়নি । আগে যেখানে বাড়িতে একটি মাত্র বাংলা দৈনিক আসতো , এখন সেখানে আরও দুটি পেপার অতিরিক্ত আসে । সকালে বেডটি খেয়ে হেড লাইন দেখতে দেখতে নটা বেজে যায় । ওদিকে মনিমালাদেবীর ততক্ষণে বাজার করে বাড়ি ফেরেন । স্বামীকে এখনও বেডে পড়ে থাকতে দেখে বাজখেয়ী গলা ছাড়লে নিধুবাবু কোনক্রমে উঠে পড়নের কাপরটা ঠিক করতে করতে ওয়াশরুমে ঢুকে নিজেকে বিপদমুক্ত করেন । পরে দুপুরে খেয়ে বেডে শুয়ে শুয়ে পেপারগুলি খুটিয়ে খুটিয়ে পড়বেন , এটাই ওনার প্রাত্যহিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে ।

সেদিন মেয়েকে ট্রেনে তুলে দিয়ে বাড়ি ফিরে নিধুবাবু চুপিচুপি বেডরুমে শুয়ে থাকতে দেখে মনিমালাদেবী খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন । পাশে এসে জিজ্ঞাসা করলেন,
-তোমার কী শরীর খারাপ লাগছে?
- না না, ঠিক আছি ।
-যেতে তেমন কোনও সমস্যা হয়নিতো?
-একেবারে যে হয়নি তা নয়, তবে অসুবিধা হয়নি। তোমার মেয়ে ভালো ভাবে ট্রেন পেয়েছে ।

কথা বলতে বলতে মনিমালাদেবী খাটের পাশে এসে স্বামীর মাথায় হাত দিতেই চমকে উঠলেন।
- অ্যা!! তোমার তো গা পুড়ে যাচ্ছে । গায়ে তো জ্বর মারাত্মক বেশি ।
- না না তেমন জ্বর নয়। আসলে মালবিকা চলে যেতেই মনের মধ্যে একটি অস্থিরতা তৈরী হয়েছে । তুমি ওসব নিয়ে ভেবোনা । খানিকবাদে সব ঠিক হয়ে যাবে । ছোটো থেকে দুই ভাইবোন কাছে থাকায় ওদের অভাব টের পায়নি । আজ ওকে তুলে দিতে মনে হল যেন বুকের একটা পাঁজর যেন কমে গেল ।
- আমারও সকাল থেকে একদম ভালো লাগছে না । যাওয়ার সময় তোমাদের ধরা না দেওয়াই যন্ত্রের মত কাজ করে গেছি । তোমরা চলে যাওয়ার পরে অন্যান্য ঘরের সঙ্গে ওর ঘরটিও পরিষ্কার করতে গেছিলাম ।হঠাৎ মনে হলো না, ওর ঘরের ধুলো পরিষ্কার করবো না। টেডিবিয়ারগুলি উল্টেপাল্টে দেখছিলাম, সেই ছোটো থেকে পাওয়া জিনিসগুলি কী সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে । চলে যাওয়ার সময় ও তোমাকে কিছু বলেনি?
- হ্যাঁ বলেছিলো। পাগলি মেয়ে আমার, মাকে দেখতে বলে গেলো ।

মনিমালা দেবী জলপটি দিতে দিতে যখন আবেগময় হয়ে মালবিকার কথা বলছিলেন তখন নিধুবাবু স্ত্রীর অপর হাতটি দুহাতে দৃঢ় ভাবে ধরে বুকে ধরতেই মনিমালাদেবী ডুকরে কেঁদে উঠলেন ।আজ সাতাশ বছর এক ছাদে বসবাস, অথচ সংসারের জাঁতাকলে একে অপরকে একটু ফিরেও তাকাননি বহুদিন । দুজনের মধ্যে জানার চেয়ে অজানাটাই যেন পাহাড় সমান হয়ে দাঁড়িয়েছিল । কিন্তু আজ এক বিশেষ মুহূর্তে একে অপরকে আবার ফিরে পেলেন ।আনন্দাশ্রু মনিমালাদেবীর চিবুক গড়িয়ে নিচে পড়তে লাগলো । নিধুবাবু পরম মমতায় স্ত্রীর চোখের জল মুছতে লাগলেন ।

বিঃদ্র - পোষ্টটি অন্যতম জনপ্রিয় ব্লগার আমাদের সবার অত্যন্ত আপনজন, ব্লগে আমাদের অভিভাবক শ্রদ্ধেয় সনেট কবি ভাইকে উৎসর্গ করলাম।

সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জুলাই, ২০১৮ দুপুর ১২:৩৯
৩১টি মন্তব্য ৩৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

তুমি আমার আধো আধো সকাল হবে?

লিখেছেন এম ডি মুসা, ২৪ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:০৬

তুমি আমার আধো আধো সকাল হবে?
-মোঃ মুসা (গাঙচিল)

তুমি আমার আধো আধো সকাল হবে?
ঘর কাপলের জোড়া শালিক!
শেষ শিশিরের নরম আলো
তোমার মনে মুখটা একটু ধুইতে দেবে?

তুমি আমার নৌকা বিহীন নদী হবে?
বৈঠা... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাষ্ট্রপতির বিদায়ঘণ্টা: রাজনীতি ও নৈতিকতা

লিখেছেন ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন, ২৪ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:১৩



বাংলাদেশের রাজনীতি অঙ্গনে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের গুঞ্জন। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের
পদত্যাগ কেবল একজন ব্যক্তি বা কোন একটি বিশেষ পদের পরিবর্তন নয় বরং এটি দেশের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সেনাবাহিনী যখন দেশপ্রেম দেখাতে ব্যর্থ ‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৫ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১:৫০



গণঅধিকার পরিষদ ছেড়ে আসা বিএনপি নেতা রাশেদ খান বলেছেন, ‘ক্যান্টনমেন্টের স্পষ্ট ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পর নাহিদ ইসলাম এক দফার ঘোষণা করেছিলেন।’ জুলাই বিক্ষোভ নিয়ে শুক্রবার নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিঃশব্দ প্রহর

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৫ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:১৯



খাস খাতার পাতায় কলম চালাচ্ছিলেন ফরিদা বেগম (৪৫)। রাত তখন সাড়ে সাতটা। চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে পাশে বসা ছোট ছেলে সিয়ামকে (৯) বললেন, "হাতের লেখা এত দ্রুত শেষ করলে হবে?... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশিরা কেন বিজেপির পতন চায়?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:১৯


আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকলে মনে হয় ভারতের ভাগ্য নির্ধারণের গুরুদায়িত্ব বুঝি এদেশের মানুষের ওপর এসে পড়েছে। ভারতে কোথাও একটু আন্দোলন বা উত্তাপ ছড়ালেই এপারে যেন উৎসবের ধুম পড়ে যায়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×