আমরা যখন কংক্রিটের মাঝে থেকে বা কর্পোরেট ধাঁচে জীবনকে গড়তে গিয়ে অতিমাত্রায় যান্ত্রিক হয়ে পড়ি, বন্ধ হয়ে আসে মোদের দম, ঠিক তখনই আমরা ছুঁটে যাই আমার আপনার স্বপ্নের বাংলায় । স্নিগ্ধ বাতাসে শ্বাস নিই প্রাণ ভরে, ঘ্রান নিই মাটির সোঁদা গন্ধের , সতেজ হয় মোদের প্রাণ । কিন্তু যারা আমাদের এই বাংলার রূপকার , সেই গ্রাম্য মানুষের জীবনকথা কখনও কী আমরা অন্তর দিয়ে শুনেছি , তাকিয়ে দেখেছি কেমন তাঁদের জীবনধারা, প্রেম - বিরহ । উনবিংশ শতকের ত্রিশ/ চল্লিশের দশকের এমন জীবন কাহিনী জানতে চোখ রাখুন, 'ভোরের আলো ’ তে ।

তৌফিকসাহেব স্ত্রী বিয়োগের পর প্রাথমিক শোক কাটিয়ে উঠে পুত্র মুকুলকে নিয়ে ক্রমশ স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছেন । সকালে ঘুম থেকে উঠে মসজিদে গিয়ে জামাতে ফজরের নামাজ পড়া বা পরে বাড়ি এসে মুকুলকে ঘুম থেকেডেকে দেওয়া , এটা ওনার প্রাত্যহিক কাজ । মুকুলকে নামাজের কথা বললেও উঠি উঠি করে আরও একটু শুয়ে থেকে যখন সে বিছানা ছাড়তো ততক্ষণে ফজরের ওয়াক্ত যেত চলে । অলস চোখ ঘষতে ঘষতে চুলো থেকে ঘুটের ছাই নিয়ে দাঁত মেজে পুকুর থেকে হাতমুখ ধুয়ে বাড়ির লাগোয়া ক্ষেতে একটু দেখভাল করে নিত । ওদিকে তৌফিক সাহেব মুকুলকে তুলে দিয়ে নিরান কোদাল নিয়ে বাড়ি থেকে দূরে সব্জি ক্ষেতে কাজে যেতেন । উল্লেখ্য ভোরের সময় সব্জিক্ষেতে যে উদ্যমে কাজ করা যায়, বেলা বাড়লে ক্লান্তি চলে চলে আসায় ভোর বেলা কাজ করাটা এরকম কৃষি নির্ভর পরিবারগুলির দস্তুর ছিল । মুকুলও তার আব্বার মত বাড়ির পাশের জমিতে দ্রুত কাজ শেষ করে দুমুঠো পান্তাভাত খেয়ে, অন্য একটি পাত্রে কিছু পান্তাভাত কাঁচা লংকা , পেঁয়াজ নিয়ে ভালো করে গামছা দিয়ে বেঁধে আব্বার উদ্দেশ্যে রওনা দিত ।
আলের উপর বসে পান্তা খেতে খেতে তৌফিক সাহেব মুকুলের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা সেরে নেন । সব্জি বেশি উঠলে মুকুলকে বাড়ি এসে গরুর গাড়ি নিয়ে আবার মাঠে যেতে হত । আব্বার খাওয়া শেষ হলে মুকুল পাশের মেঠো পুকুর বা ডোবা থেকে এঁটো বাসনগুলো কোনক্রমে ধুয়ে আব্বার তোলা গাস বা আগাছা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসতো । বাড়ি ফিরে প্রথমে সে বাসনাদি মাজতে বসে । এরপরে রান্নাঘরে গিয়ে মায়ের মত গোবরদিয়ে সুন্দর করে নেমন দেয় । মাটির মেঝেতে এভাবে নেমন দেওয়ার পর না শুকানো পর্যন্ত আর ওখানে যাওয়া যেতনা । এই ফাঁকে বাড়ির চারধারে ভালো করে ঝাড়ু দিত । মাঠ থেকে সদ্য আনা ঘাসগুলি এর পরপরই গরুদের খেতে দিত। একই সঙ্গে গরুর জন্য বিচুলি কাটা শেষ করে খাওয়ার পানি আনতে যেত আলামতচাচাদের বাড়ির পুকুরে। এই পুকুরে গোসল করা নিষেধ ছিল । গ্রামের সবাই এই পুকুরের পানি পানীয়জল হিসাবে ব্যাবহার করে । তখনকার দিনে এরকম গ্রামগুলিতে টিউবওয়েলের নাম কেউ শোনেনি বা ওর প্রচলনও ছিলনা ।
কাঁচা আনাজ মুকুলদের কখনও কিনতে হতনা । বাড়ির চারদিকে সব্জি এরপর ছিল আগের দিন হাটের অবিক্রিত সব্জি । সবমিলিয়ে বাড়িতে সব্জির ছড়াছড়ি । পাড়ার রহিমাচাচিমা বা ফজিলা চাচিমারা প্রায় ওদের বাড়ি থেকে সব্জি নিয়ে যেত । তবে এরা মুকুলের অনেক কাজ করে দিত । এদের মত পাড়ার প্রায় সকলেই মুকুলদের খুব ভালোবাসে । গ্রামে প্রায় ছোটো - খাটো বিষয়কে নিয়ে যখন একে অন্যের সঙ্গে ঝগড়া লেগে থাকতো , সেখানে মুকল তার আব্বাকে কখনও অন্যের সঙ্গে ঝগড়া করতে দেখেনি । তৌফিক সাহেব আর আগেরমত দেরি করে মাঠ থেকে ফেরেন না । বাড়ি এসে প্রায়ই দেখতেন মুকুলের রান্নাকরা প্রায় শেষের দিকে ।
- সব একা একা করতে গেলে কেন? আমার জন্যতো কিছু কাজ রাখতে পারতে ।
-আমার কোনও অসুবিধা হয়নি । আর তাছাড়া রহিমাচাচিমা অনেকটা সাহায্য করেছে ।
- না না না। দুটো তরকারি নিয়ে যায় বলে তুমি ওদের দিয়ে কোনও কাজ করিয়ে নেবে না ।
মুকুল মাথা নাড়িয়ে তার আব্বার কথার সম্মতি জানাতো ।
চাচিমাদের নিয়ে মুকুলের দু ধরনের সমস্যা । সে তার আব্বার কথামত তাদেরকে রান্নাঘরে কাজ করতে বারণ করলে উল্টে তারা মুকুলকে ধমক দিয়ে দু- চারটে কথা শুনিয়ে দিত,
- তুই বড় হয়ে গেছিস , না । তাহলে আব্বাকে বলে বাড়িতে একটা টুকটুকে বউ এনে দে । আমরা আর কাজ করবোনা ।
মুকুল লজ্জিত হয়ে চাচিমাদের মুখের উপর আর কোনও কথা বলতো না । তাঁদের কাজেও আর বাঁধা দিত না । ফলে প্রায়ই তৌফিক সাহেব বাড়ি এসে দেখতেন রান্নাবাড়া শেষ । তিনিও মুকুলের অসহায়ত্ব বুঝে আর আপত্তি করতেন না । কিন্তু এই অযাচিত পাওয়া সাহায্য বাবাছেলেকে একদিন একটি বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্যে ফেলেছিল । সেদিন মুকুলের দুই চাচিমা কেউ এবাড়িতে আসেননি । সকালে মুকুলের শরীরটাও ভালো ছিল না । কোনও কাজ করতে তার ইচ্চা হচ্ছিল না । পাছে আব্বা অহেতুক দুশ্চিন্তা করে তাই আব্বাকে সে কিছুই জানায় নি । কোনক্রমে আব্বাকে মাঠে পান্তা দিয়ে এসে বাড়িতে এসে সে শুয়ে পড়ে । ভেবেছিল চাচিমাদের কেউ এলে তাকে দিয়ে একটু রান্না করিয়ে নেবে । কিন্তু হায়রে ! আজ যে কেউ এদিকে এলনা । ইতিমধ্যে তার পান্তা খাওয়াও হয়ে গেছে। এতে অস্বস্তি আরও বাড়তে লাগলো । পরে বেশ কয়েকবার বমিও হল । পরের দিকে সে আর সোজা ভাবে দাঁড়াতে পারছিল না । অপরদিকে তার আব্বাও সেদিন মাঠে একটু বেশিই দেরি করেছিলেন । অনেকবেলায় বাড়ি এসে তিনি দেখেন ছেলের অবস্থা কাহিল । বাড়িতে রান্নাও হয়নি । এমতাবস্থায় তৌফিক সাহেব বুঝতে পারছিলেন না যে তিনি কোথা থেকে শুরু করবেন ।
অবশেষে আলু কলা, সিদ্ধ ভাত করে কোনক্রমে সে দিনটি চালিয়ে দিলেন ।
চাচিমাদের নিয়ে তার আরেকটি সমস্যা ছিল । হাবিবুরচাচার মেয়ে ঝর্না বেশ বড় হয়েছে । চৌদ্দ বছরের মেয়ে কিন্তু দেখলে মনে হবে যেন সতেরো/ আঠারো বছর বয়স । সাধারনত এই বয়সের পর আর কোনও মেয়েকে বিয়ে না দিয়ে বাড়িতে রাখা হত না । আর চলন - বলনেও পড়ানো হত বেড়ি । সকালে ঝর্না মক্তবে কেতাব পড়তে যেত । ফিরতো একটু বেলা করে । ঝর্নার এই আসা যাওয়ার জন্য মুকুল আকুল হয়ে পথপানে চেয়ে থাকতো । একদিনতো ঝর্নার মক্তবে দেরি হওয়াতে মুকুলেরও আব্বার জন্য মাঠে যেতে দেরি হয়েছিল । আব্বা জিজ্ঞাসা করাতে সে আমতাআমতা করে যেটা বলেছিল , তাতে তৌফিক সাহেব কোনও সন্দেহ করেননি ঠিকই, তবে সে উত্তরে যে খুশিও হননি , তা ছেলেকে হাবভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ।
মুকুল অবশ্য বলেছিল ,
-আমি ঠিক বুঝতে পারিনি যে আজ এত বেলা হয়ে গেছে ।
তৌফিক সাহেব সারাক্ষণ মাঠেঘাটে থাকতেন । ছেলে মিথ্যা বলতে পারে এটা তিনি কল্পনাও করতেন না । যাইহোক মাঠের কাজ মিটিয়ে মুকুল তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে আসে । তাদের বাড়ি থেকে কয়েকটা দূরে গাছের ফাঁক দিয়ে ঝর্নাদের বাড়ি দেখা যায় । সে সমস্ত কাজের মধ্যে সুযোগ পেলে ঝর্নাদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকতো । মাঝে মাঝে দূর থেকে অবশ্য ঝর্নার দেখাও মিলতো । মনে মনে একটা প্রশান্তি লাভ করতো । এর মধ্যে রহিমাচাচিমা বা ফজিলাচাচিমা এলে তার সত্যিই খুব অসুবিধা হত । বাড়িতে আপাত নিঃসঙ্গের এমন মধুর আনন্দ সে হাতছাড়া করে কী করে । চাচিমারা এলে সে গোমরামুখে যন্ত্রের মত ফাইফরমাস খাটতো । চাচিমারা চলে যেতেই দুপুরে আব্বার বাড়ি ফেরা , বিকালে আব্বার সঙ্গে হাটে যাওয়ার মত কাজের মধ্যেই তার দিন কাটতো । সুতরাং সকালবেলা যদি বাড়িটা ফাঁকা না পেত , তাহলে সেদিনটি তারকাছে মাটি হয়ে যেত । আগে সাইকেল নিয়ে ইছামতির তীরে যখন বসতো, তখন তার বেশ কয়েকজন বন্ধু ছিল । কিন্তু এখন বাড়িটাই যেন তার কাছে ইছামতি । সাইকেলটিকে সে আর আগেরমত ভালোবাসেনা । ধুলোয় জর্জরিত এক সময়ের প্রানাধিক প্রিয় সাইকেলটি এখন কতই না অবহেলায় পড়ে আছে ।
পপ
ঝর্নার সকালে কেতাব পড়তে যাওয়ার প্রসঙ্গটা আরও একটু বলা দরকার । আগেই বলা হয়েছে তার আগমনের জন্য মুকুল অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করতো । দূর থেকে তাকে আসতে দেখলে কোনও না কোনও কাজের অজুহাতে মুকুল রাস্তার দিকে চলে আসতো ।
- ঝর্না পড়তে যাচ্ছিস ?
- হ্যাঁ, মুকুলভাই।
- হুজুর এখন কী পড়াচ্ছে?
- আমি এখনও আমপারা পড়ছি । বলে একটু হেসে ঝর্না চলে যেত ।
ঝর্না চলে গেলে মুকুল আবার ভাবতে শুরু করে । ঝর্না তো তাকে পাল্টা কিছু জিজ্ঞেস করেনা । কেবল উত্তর দেয় । অথচ বেশ হেসে হেসে কথা বলে । কিজানি মেয়েটার মনের মধ্যে কি যে আছে । মাঝে মাঝে এও ভাবে ঝর্নাকে সময়মত বলি গিয়ে যে তোর সাথে আমার একটু কথা আছে । আবার পরক্ষণেই পিছিয়ে আসে । না না ও যদি খারাপ ভাবে নেয়, তাহলে বাড়িতে বললে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে । ওর আব্বা যা রাগি লোক ।
মুকুল সারাক্ষণ বাড়িতে থাকায় বা সাংসারিক সব কাজ নিজ হাতে করায় প্রতিবেশীরা তাকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিত । কয়েকজন এমনও বলতো , এ ছেলেকে পেটে ধরা সত্যিই গর্বের । আবার কেউবা বলতো , এমন গোছানো ছেলের বৌ যদি অগোছালো হয় তাহলে মুকুলের কপালে দুঃখ আছে । যাইহোক সামনাসামনি এমন স্ত্ততির কথা শুনে মুকুল লজ্জা পেত । পাড়ার কয়েকজন ভাবি তার সঙ্গে রসিকতা করত । তাদের বাড়ির পাশে বেশ কিছুটা ফাঁকা জমি পড়ে আছে । প্রত্যেকদিন বিকালে বাচ্চারা সেখানে খেলতে আসে । এই সময় ভাবিরাও তাদেরবাড়িতে মাঝে মধ্যে আসতো । অনেকেই তার কাছে জিজ্ঞেস করতো যে তার কোনও পছন্দের কেউ আছে কিনা । মুকুল এত সপ্রতিভ নয় । ঝর্নাকে সে বেশ ভালোবাসে ঠিকই । কিন্তু এখনই ভাবিদের সঙ্গে আলোচনা করাটা ঠিক হবে কিনা সন্দিগ্ধচিত্তে থাকে । যদিও সে জানাই আমার কেউ নেই । অপর একজনভাবি তার বোনের সঙ্গে মুকুলের বিয়ের কথা বলতে, মুকুল আবার লজ্জা পায় । মনের মধ্যে লুকানো সত্যের জন্য যেন খচ খচ করে ওঠে । ঝর্নাকে ছেড়ে অন্য কাউকে বিয়ে করা তার পক্ষে যে সম্ভব নয় । সে তখন স্থির করে ভাবিদের বলে ,
-আমি এখনই বিয়েটিয়ে করবোনা । তোমরা আব্বাকে যেন কিছু বলবেনা ।
বিংশ শতকের ত্রিশ বা চল্লিশের দশকে কোদালিয়ার মত মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামগুলিতে ইংরেজি শিক্ষার কোনও চল ছিলনা । গ্রামের মসজিদকে কেন্দ্র করে মক্তব কোথাওবা মাদ্রাসা গড়ে উঠেছিল । মক্তব বা মাদ্রাসায় আরবি ফার্সি ভাষা শিক্ষা দেওয়া হত । মসজিদের ইমাম সাহেব হতেন মক্তবের একমাত্র শিক্ষক । মেয়েদের শিক্ষা জীবন মক্তবেই শেষ হয়ে যেত । ছেলেরা অবশ্য মাওলানা, হাফেজ, কারি শিক্ষার জন্য বহুদূরে উচ্চ শিক্ষার জন্য উচ্চতর মাদ্রাসায় চলে যেত । এই মাদ্রাসাগুলি ছিল সব আবাসিক । ইংরেজি শিক্ষার জন্য টাকি বা বসিরহাটে র কোনও স্কুলে এ তল্লাটের কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল বলে শোনা যায়নি । বিয়ের জন্য মেয়েদের আরবি জানাটা একপ্রকার বাধ্যতামূলক ছিল । মেয়ের বাবাদের কাছে হাফেজ, মাওলানা পাত্রের খুব কদর ছিল ।
কয়েকবছর মক্তবে পড়াশোনা করে ঝর্না খুব ভালো কোরান তেলোয়াৎ করতে পারতো । সকালবেলা ফজরের নামাজের পর সে খুব সুর করে কোরান পড়তো । পাড়ায় তার সুনাম ছড়িয়ে পড়লো । হাবিবুরচাচা বা মনোয়ারাচাচিমা তাঁদের এমন সুরেলা কন্ঠের মেয়ের জন্য অত্যন্ত গর্ববোধ করতেন । এমন বিবাহযোগ্য পাত্রীর উপযুক্ত পাত্র খুঁজতে বাবামা উকিল ডাকলেন । সেদিন রান্না করতে করতে রহিমাচাচিমার মুখে এসব শুনে মুকুল একেবারে পাথর হয়ে গেল । তার মাথা ঝিম ঝিম করতে লাগলো । একটা চাপা কষ্ট মনের মধ্যে বয়ে চললো । তবে কী সে চাচিমাকে মনের কথা খুলে বলবে । নিজে নিজেকে প্রশ্ন করলো । সে আরও প্রশ্ন করলো, আচ্ছা আমাদের সংসারে এত সমস্যা, অথচ আব্বা আমার বিয়ের কথা কেন ভাবছে না? মা মারা যাওয়ার পর তার দুষ্টু বন্ধু রফিক তাকে বলেছিল যে তার আব্বা তার জন্য সম্বন্ধ খুঁজছে । চাচিমা তাকে আরও বলেছিল যে কয়েকজন নাকি তার আব্বাকে বুঝিয়েছিল এই বয়সে নিজে বিয়েথা না করে বরং কয়েকটা বছর পরে ছেলে বিয়ে দিলে সংসার বেশি সুখের হবে । নিজে বিয়ে করলে সংসার বিষিয়ে উঠতে পারে । এই আশংকায় উনি বিয়ের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন । ঝর্নাকে নিয়ে মুকুল এতটা বেপরোয়া ছিল যে আব্বার একথা জানার পরেও সে অবুঝের মত ভাবে ,
সংসারের সব কাজ করে দিচ্ছি , কোনও সমস্যা হচ্ছেনা - এসব দেখেই হয়তো আব্বা আমার বিয়ের কথা ভাবছেনা । যদি আমি এখন থেকে কোনও কাজ না করে আবার আগের মত ছন্নছাড়া হয়ে সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াই বা ইছামতির চরে গিয়ে সময় কাটাই তাহলে হয়তো আব্বা আমার বিয়ের কথা ভাব্বে ।
সেদিন রাতে শুয়ে মুকুলের আর ঘুম আসছিল না । ছোটো থেকেই মুকুল না ঘুমালে তার আব্বামা ঘুমাতেন না । মায়ের মৃত্যুর পরেও তার আব্বা অভ্যাসটি চালু রেখেছে । সে জানে তার ঘুম আসছেনা দেখে তার আব্বা ব্যস্ত হয়ে পড়বে । কেরোসিনের কুপির আব্ছা আলোয় বেশ অনেকক্ষণ পরে তার আব্বার দিকে পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখে আব্বা তার দিকেই তাকিয়ে আছে । চোখাচোখি হতেই,
- কী, তুমি ঘুমাওনি?
-না, ঘুম আসছেনা ।
- কেন? শরীর খারাপ লাগছে?
- না, তেমন নয়। তবে পানি খাওয়াটা বোধহয় কম হয়ে গেছে ।
তৌফিক সাহেব ধড়ফড় করে উঠে মাটির কলসি থেকে পানি ঢেলে ছেলের দিকে ধরলেন । উল্লেখ্য মুকুলের মায়েরও মৃত্যুর আগের রাতে শরীর খারাপ হয়েছিল । সুতরাং তৌফিক সাহেবের এক্ষেত্রে উদ্বিগ্ন হওয়াটা স্বাভাবিক । ক্রমশ পরিস্থিতির অবনতির আশংকা করে মুকুল আব্বাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো ।
- তুমি খামোকা এত ভয় পেয়োনা । ও সব ঠিক হয়ে যাবে । দেখ আমি কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে যাচ্ছি ।
বাস্তবিক মুকুলও খুব নার্ভাস হয়ে পড়েছিল । আর একটু হলেই যে সে তার আব্বার কাছে ধরা পড়ে যাচ্ছিল ।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সে ঠিক করলো আজ সময় করে রহিমাচাচিমাদের বাড়িতে যাবে । উল্লেখ্য এখন মুকুলের বাড়ির কাজ খুব দ্রুত শেষ হয়। ঝর্না এখন আর মক্তবে কোরান পড়তে যায়না । যে কারনে মুকুলের সকালে আর সময় নষ্ট হয়না । ওদিকে ঝর্নার আব্বা মেয়ে ক্রমশ বড় হওয়ায় বাড়ির চারপাশে উঁচু করে পাঁচিল তুলে দিয়েছেন । কাজেই এখন আর ঝর্নাকে মুকুল গাছের ফাঁক দিয়ে দেখতে পায়না । তখনকার দিনে এধরনের কৃষি নির্ভর গ্রামগুলিতে চোর দস্যুর উপদ্রব একেবারে ছিলনা বললেই চলে । ফলে বাড়ির সব কাজ শেষ করে মুকুল বাকে করে খাওয়ার পানির কলসি নিয়ে একই রাস্তায় রহিমা চাচিমার বাড়িতে গেল । এত সকালে মুকুলকে দেখে চাচিমা বেশ অবাক হল । তাকে খুব খাতির করে বাড়ির ভিতরে নিয়ে তার আসার কারন জানতে চাইলো । মুকুল এবার ঢোক গিলে হ্যাঁ না মানে বলতে বলতে আসল ঘটনাটা বললো । চাচিমা সব শুনে জানালো ,
- ও মেয়েরতো বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে । ছেলের বাড়ি দেবহাটে । তোর যদি ওকে ভালো লাগেতো আগে জানালিনা কেন । তবুও দেখি ওর আব্বার সঙ্গে কথা বলে । কিছু একটা করতে পারি কিনা দেখি । উল্লেখ্য দেবহাট বর্তমানে বাংলাদেশের সাতক্ষিরা জেলার অন্তর্গত ।
( পাঠকবন্ধুদের অনুরোধ, এই পরিবারের পরবর্তী কাহিনী জানতে প্রকাশনার অপেক্ষায় থাকা ' উজান হাওয়া ' র দিকে লক্ষ্য রাখুন।)
বিঃ দ্র- পোস্টটি উপহার দিলাম আমার ছোটোবোন কথার ফুলঝুরিকে । অজ্ঞাত কোনও অভিমানে অনেকদিন বোন ভায়ের বাড়িতে আসেনা। আজ ওর জন্য আমার ঈদ স্পেশাল । সঙ্গে আগত সকলকে সুস্বাগতম ।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০১৮ বিকাল ৫:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




