somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একজন পতিতা এবং একটি ছেড়া চিঠি

২৯ শে মে, ২০১৪ রাত ১১:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শ্রদ্ধা রইল সকল মায়ের প্রতি । মায়ের কোন শ্রেনীভেদ হয় না । মা একটি শীতল ছায়া যার নিচে আছে সকল রকম ক্লান্তি ও পেরেশানির প্রশান্তির ছটা । ভালবাসা ও শুভ কামনা রইল মা তোমার জন্য ।

স্নেহাশিস ছোটন,

গত রাতে ঘুমের ঘোরে চিৎকার দিয়ে উঠতেই দেখি পুরো শরীর ঘর্মাক্ত অবস্থায় ক্লান্তিতে অবস প্রায় । বাবা তুই ভাল আছিস তো ? যে দুঃস্বপ্নটা দেখলাম তা বলব না । আমি জানি তা বলেও লাভ নেই । কেননা আমার দোয়া তোর সাথে সবসময় । তুই ভাল থাকবি, তোর ভাল থাকার জন্যই তো আমার শ্বাসপ্রশ্বাস আজও চালিয়ে রেখেছি । বাবা তোর কথা আজ-কাল খুব বেশিই মনে পড়ছে । জানিনা তুই কেমন আছিস । ভালই থাকবি । তোকে না খুব দেখতে ইচ্ছে করে জানিস ! আচ্ছা তুই কি অনেক বড় হয়ে গিয়েছিস ? কত বড় হয়েছিস রে ! তোর চুল, তোর মায়াময়ী চোখ গুলো আমার সবচেয়ে বেশি প্রিয় ছিল জানিস !

বাবা, তুই কি আমার উপর রাগ করলি তোকে লিখলাম বলে । কী করব বল, সেই ক'বছর আগে একবার দেখছি । আমি কী তা তুই এখন জানিস, কিন্তু এটাও তো বাবা তুই একটু বোঝ যে আমি এক জন মা'ও সাথে সাথে । আর মায়ের মন তো বাবা তুই বুঝিসই । তুই এখন বড় হয়েছিস । ক'দিন পর কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে ইউনিভার্সিটিতে যাবি । দোয়া করি বাবা তুই অনেক বড় হ ।

জানি আমার উপর তোর রাগ করার কারন যুক্তি যুক্ত । কিন্তু বাবা আমি তো ইচ্ছে করে এই পেশায় নিজের নাম লেখাইনি । সমাজের উচু তলার মানুষ গুলোই আমাকে বাধ্য করেছে এই পেশায় আসতে । তোর বাবা যখন মারা গেলেন, তখন সবার দোয়ারেই কাজের জন্য হন্নে হয়ে ঘুরেছি । চাকরি পেয়েও ছিলাম কয়েক যায়গায় । কিন্তু কিছুদিন যেতেই বুঝতে পারতাম তা আমার দক্ষতা গুণে নয় , আমার অমানিশা রুপের গুণে । ঐ কোর্ট-টাই পরা লোক গুলি বিনা কারনে এই শরীরটাকে ছুবার জন্য নানা পায়তারা করত । আমাকে বাধ্য হতে হতো সেই চাকরিটি ছাড়ার জন্য । তারপর একের পর এক চাকরি আমি ছেড়েছি দু'বছ্র পর্যন্ত । কিন্তু কোথাও আমার এক দন্ডি শান্তিতে নিঃশ্বাস ফেলার মতো অবস্থা ছিল না ।

শেষে নিলাম গার্মেন্টসে চাকরি । ওখানকার মেয়েদের থেকে শিখলাম কি করে নিজেকে বাচাতে হয় এই মানুষ নামের পশু গুলার হাত থেকে । বেশ কয়েক মাস ভালই চলল । অফিসের বড় বাবু একদিন সবাইকে নাইট ডিউটি দিয়ে দিলেন । বললেন কাজের অনেক চাপ । আমাকে বলা হল সব হিসেব রাখতে । আমি তাই রাখলাম । কিছু ক্ষন পর আমার ডাক এলো হিসেবের খাতা নিয়ে তার রুমে যেতে । কিন্তু এই পশুটার আক্রমণে মুহূর্তেই আমি বিলীন হলাম সম্ভ্রমের দুনিয়া থেকে ।

কিছু দিন কাজে গেলাম না । অফিস থেকে ফোন এলো, '' কাজে না আসো ভাল কথা, কিন্তু পুলিশের কাছে গেলে খবর আছে ? '' আমি হতাশ হলাম । তোকে নিয়ে চাইলাম এ শহর ছেড়ে দূরে কোথাও পারি জমাতে । সেই রাতের আঁধারেই বাড়ি ছাড়লাম । কিন্তু আমার নারী চিত্তের ভাবনার আগেই তাদের বসবাস । তারা আমাকে পথি মধ্যেই ধরে ফেলল । তোকে আমার কাছ থেকে কেরে নিল ।

জ্ঞান ফিরতেই দেখি আমি কোন এক বন্ধ ঘরের অন্ধকার কামড়ায় পরে আছি । কয়েক ঘন্টা যেতেই এক জন এসে জানিয়ে দিল, '' পালানোর চেষ্টা কর না, লাভ নেই । এখান থেকে বের হওয়া খুবই শক্ত কাজ । বুঝলাম আমি কোথায় আছি । হতাশা ও কান্নায় ভেঙ্গে পরলাম । তোর কথা খুব বেশি করে মনে পরতে লাগলো । আমি সারা রাত্রি ধরে কান্না জুরে দিলাম । সকালে একজন জানিয়ে দিল তুই ভাল আছিস ।

আমি তোকে দেখতে চাইলাম । আমাকে বলা হল, কথা মত চললে কিছু দিন পর তোকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিবে । আমি নিরবে সব কথা শুনে গেলাম । চলতে থাকল আমার উপর পাশবিক অত্যাচার । দিনের পর দিন আমি তোর অপেক্ষায় কাটাতে লাগলাম । নিরবে ঝড়তে লাগলো আমার আঁখি জল । দীর্ঘ এক মাস পর বাবা, তোকে আমার কাছে এনে দিল । আমি চাইলাম তোকে আমার কাছে রাখতে । বলল পালাবার চেষ্টা করলে জানে শেষ করে দিব, তোলে নয় তোর ছেলেকে । বলেই না, ওরা তোকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে গেল । আমি বাবা অসহায় ছিলাম । অবলা ও দুর্বল নারী বই আর কিছুই না ।

আমি ওদের বাধ্য হয়ে গেলাম তোর প্রান রক্ষার্থে । মাস গড়িয়ে বছর হয়ে গেল । ধীরে ধীরে আমিও হয়ে উঠলাম ওদের একজন হিসেবে । ওরা মনে হয় ব্যাপারটা বুঝতে পারছিল, তাই তোকে আমার কাছে এনে দিল । চলতে থাকল তোর আর আমার সুখের সংসার অন্ধকার জগতের বাঁকা গলিতে । দিনের বেলা আমাদের ছোট্ট সংসার হয়ে উঠতো স্বর্গরাজ্যে ন্যায় । তুই ইস্কুলে যেতে সুরু করলি । আমার অক্লান্ত পরিশ্রান্ত স্বপ্ন গুলো ডানা মেলতে থাকলো তোকে ঘিরে । দিন গড়িয়ে মাস, মাস গড়িয়ে বছর পার হয়ে গেল । ছোট বেলা থেকেই জ্ঞান চক্ষু প্রখর ছিল । সবাই বলত, তুই বড় হয়ে অনেক নাম করবি । গর্বে আমার বুক ভরে যেত, চোখে জল এসে যেত ।

তুই তখন ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে পরিস । একদিন ইস্কুল থেকে ফিরলি মুখ গুমরা করে । আমি তোকে জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে রে বাবুন, তোর মুখ অমন ভারি কেন ? তুই কোন কথার উত্তর দিলি না । তারপর থেকে প্রায়ই তুই মুখ ভার করে বাড়ি ফিরতি । জিজ্ঞেস করলে বলতি, কিছু হয়নি মা । সেদিন কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরলি । সে কি কান্না ! আমি তোকে বললাম, বাবুনি, কি হয়েছে তোর ? কেউ কিছু বলেছে ? তুই আমাকে জরিয়ে ধরে কাঁদলি । খুব কাঁদলি । পরে বললি, '' মামুনি ইস্কুলের ছেলেরা আমায় তোমার নামে কি সব বাজে বাজে কথা বলে । আমি ওদের কিছুই বলি না ,তবুও । আজ স্যারের কাছে ওদের নামে নালিশ করলাম । কিন্তু জানো মা, স্যারও ওদের মতো করে আমায় অনেক গুলো পচাঁ পচাঁ কথা বলল তোমায় নিয়ে । আমার ভীষণ কষ্ট হয়েছে মা । আমি বললাম, নিন্দুকেরা পাছে অনেক কথাই বলে বাবা ওসব শুনতে নেই ।

একদিন গেলাম তোর সেই স্যারের কাছে । বললাম সব কথা । কিন্তু কোন ফল হল না । বুঝলাম এই ইস্কুলে আর তোকে রাখা যাবে না । তাই অন্য ইস্কুলে তোলে ভর্তি করিয়ে দিলাম । তারপর কয়েক মাস ভালই চলতে থাকল ।

তোর মনে পরে সেই বারের কথা , ঐ যে তুই সাঁতার কাটতে গিয়ে জলে ডুবে যাচ্ছিলি । কেউ খবর দিলে আমি তোকে সেই নদি থেকে তুলে এনেছিলাম । তুই ঘাব্রে গিয়ে ছিলি । কান্না জুরে দিয়েছিলি । আমার বুকে মুখ গুজে বললি, '' মা, আমায় কখনো তুমি একা ছেড়ো না, তোমায় ছাড়া আমি থাকতে পারব না । '' আমি বলেছিলাম, '' বাবুনি, তোকে ছাড়া আমার আর আছে কে, তোকে ছেড়ে আমি কি নিয়ে থাকব ! বোকা ছেলে কোথাকার । ''

আমরা রাতের খাবার শেষ করলাম । তোকে বিছানায় রেখে আসছি, এমন সময় তুই বললি, '' মা, তুমি কেন আমার পাশে ঘুমাও না ? কমলা বু রাতে আমার এখানে ঘুমায়, কিন্তু তুমি রাতে কোথায় যাও ? তোমাকে তো রাতে বাসায় দেখিনা ! '' আমি সেদিন নিরুত্তর ছিলাম । তোকে বললাম, '' বাবুনি, বড় হলে সব জানতে পারবে । এখন অনেক রাত হয়েছে ঘুমাও । '' জানিস পাশের রুমে এসে সেদিন আমি অনেক কেঁদে ছিলাম । আমার ছেলের প্রশ্নের সম্মুখিন হয়ে আমার প্রচুর লজ্জা লাগছিল । কিন্তু আমি অসহায় ছিলাম রে, অসহায় ছিলাম সেই নাম নাজা চক্রের বন্ধনে ।

ধীরে ধীরে তুই বড় হতে লাগলি, তোর লজ্জা বোধ তোকে গ্রাস করতে লাগলো । দিন-দিন তুই আমার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে লাগলি । বুঝলাম ভিতরে ভিতরে কোন প্রলয় চলছে । কিন্তু আমি তখন অসহায় ছিলাম অদৃষ্টের কাছে । কিছু দিন যেতে না যেতেই তুই আমাকে এড়িয়ে চলতে সুরু করলি ।

চলবে...

লেখার সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আশা রাখলাম ।
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের পরিকল্পনাটা কোথায় ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১০


ডা. জাহেদ উর রহমান। জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা বিরোধী ছিলেন এবং তাঁকে চেনেন না, এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। মানুষটি অ্যাক্টিভিজম ছেড়ে নতুন সরকারের মুখপাত্র হয়েছেন। এতে আমার মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:২৫

[মানুষ এতো দুষ্ট কেন? পুরনো কথা ভিডিও সহ ফেসবুকে এভাবে না ছাড়লে হয় না। ]

“আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন"

২৫ হাজার টাকার মজুরি আন্দোলন আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

পিনাকী ভট্টাচার্য কেন দেশে আসে না, জানেন?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৯


Pinaki Bhattacharya - পিনাকী ভট্টাচার্য তিনিঞ্চি কেন দেশে আসে না জানেন? তার পাসপোর্টই তাকে সে অনুমতি দেয় না। Meghna Alam থেকে প্রাপ্ত এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে তার পাসপোর্টে স্পষ্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের সেই এন্টিনিয়ার।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৮

কিছু স্বপ্ন, কিছু স্মৃতি এবং নানীর বাড়ি



আমি বেশ কিছুদিন ধরে একটি বিশেষ ধরনের স্বপ্ন দেখছি। স্বপ্নের কথায় যাওয়ার আগে কিছু পেছনের গল্প বলা প্রয়োজন।

ক্লাস নাইনে পড়ার সময় থেকে অনার্স... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে- ভাল্লাগে!

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৭


আমাদের ঝাল খাওয়ার ইতিহাস হাজার বছরের নয়, তবুও কেন আমরা ঝাল পাগল জাতি হলাম এইটা নিঃসন্দেহে গবেষনার বিষয়। পর্তুগীজেরা না আসলে আমরা হয়তো কাঁচা লঙ্কা বা শুকনো লঙ্কা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×