somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শরীীয়তের দৃষ্টিতে ঈদে মিলাদুন্নবী (স.)

১৩ ই ডিসেম্বর, ২০১৬ সন্ধ্যা ৬:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين ، والصلاة والسلام على خير المرسلين ، أما بعد ؛
ইসলামের অন্যতম মূলনীতি হলো: রাসূল (স.) কে সম্মান ও মহব্বত করা। সকলের চেয়ে রাসূল (স.) কে সর্বাধিক মহব্বত করতে হবে। অন্যথায়, কারো ঈমানই পূর্ণ হবে না। এ মর্মে রাসূল (স.) ইরশাদ করেন:
لا يؤمن أحدكم حتى أكون أحبَّ إليه من ولده ووالده والناس أجمعين
“তোমাদের কেউই ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ আমি তার কাছে তার ছেলে-সন্তান, মাতা-পিতা তথা সব মানুষের চেয়ে সর্বাধিক প্রিয় না হবো” (বুখারী-মুসলিম)।
কিন্তু প্রশ্ন হলো: এর অর্থ কি এই যে, আমাদেরকে অবশ্যই মীলাদুন্নবী বা রাসূল (স.) এর জন্মদিবস পালন করতে হবে?
এ প্রশ্নের উত্তর দেবার আগে কয়েকটি কথা জানা অত্যাবশ্যকীয়:
ক. আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
{ الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِينً}
“আজকে আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম (জীবনব্যবস্থা) পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের উপর আমার নি‘আমাতকে সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের জন্য ইসলামকেই একমাত্র দ্বীন/জীবনব্যবস্থা হিসেবে নির্বাচন করলাম” (আল-মাইদাহ: ৩)। অতএব, ইসলামকে পরিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা দেয়ার ঐ দিন যা ইসলামের মধ্যে ছিলো না, আজকেও তা ইসলামের মধ্যে গণ্য করা হবে না।
খ. রাসূল (স.) বলেন,من عمل عملاً ليس عليه أمرنا فهو رد “আমাদের ধর্মে নেই এমন কাজ যদি কেউ করে, তবে তা অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করতে হবে” (মুসলিম)। অন্য হাদীসে বলা হয়েছে, “সমস্ত বিদআত/ইসলামের মধ্যে নবতর সংযোজন ই হচ্ছে পথভ্রষ্টতা” (মুসলিমু)। এই হাদীসদ্বয় থেকে প্রমাণিত হয় যে, রাসূল (স.) যা শরীয়ত হিসেবে গণ্য করেন নি, তাই শরীয়তপরিপন্থী। তা কখনোই সুন্দর কাজ হতে পারে না। কারণ, হাদীসে (كل) (সমস্ত) শব্দটি ব্যাপাকার্থবোধক শব্দাবলীর অন্তর্গত।
গ. রাসূল (স.) এর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁকে সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামগণই সর্বশ্রেষ্ঠ। এ ব্যাপারে কোন বিবেকবান সন্দেহ পোষণ করতে পারে না। এতদসত্বেও কোন একজন সাহাবী থেকে এ রকম কোন বর্ণনা পাওয়া যায়নি যে, তিনি মীলাদুন্নবী উদযাপন করেছেন। তাহলে কি আমরা সাহাবীদের চেয়েও রাসূল (স.) এর প্রতি অধিক ভালোবাসা পোষণ করছি?
ঘ. মীলাদুন্নবী পালনকারীকে আমরা যদি প্রশ্ন করি, রাসূল (স.) কি তাঁর মীলাদ উদযাপন করেছেন? জবাবে যদি সে বলে: না, তিনি উদযাপন করেন নি। তবে আমরা বলবো: রাসূল (স.) স্বয়ং যে কাজ করেন নি, সে কাজটি আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উপায় তথা ইবাদাত হিসেবে মনে করার দুঃসাহস আপনি কিভাবে/কোথায় পেলেন? অথচ রাসূল (স.) উম্মতকে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের সমস্ত বিষয় বলে দিয়েছেন। একটিও বাদ দেন নি।
আর যদি সে বলে, রাসূল (স.) পালন করেছেন। তাহলে আমরা বলবো,
{ هَاتُواْ بُرْهَانَكُمْ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ}
“যদি আপনারা সত্যবাদি হয়ে থাকেন, তাহলে আপনাদেও প্রমাণাদি পেশ করুন” (আল-বাকারাহ:১১১)।
এ পর্যায়ে তাদের কাছে কোন দলীল পাওয়া যাবে না। সুইয়ের ছিদ্র দিয়ে যতদিন উট প্রবেশ করতে পারবে না, ততদিন পর্যন্ত...।
অতএব, মীলাদুন্নবী উদযাপন করা কারো জন্য শরীয়তসিদ্ধ নয়।।
মীলাদুন্নবী উৎসব সম্পর্কে যতটুকু জানা যায় তা হলো, ফাতেমীয়রা প্রথম এর প্রবর্তন ঘটায়। উল্লেখ্য যে, তারা নিজেদেরকে হযরত ফাতিমার (রা) প্রতি আরোপণ করলেও মূলত ফাতিমার সাথে তাদের কোন প্রকার সম্পর্ক নেই। তারা ছিলো সব দাসশ্রেণীর। অনেক নির্ভরযোগ্য ইসলামী পন্ডিত, যেমন ইমাম ইবনু কাসীর তার বিদায়াহ অননিহায়াহ গ্রন্থে এ তথ্যটি উল্লেখ করেছেন।
ইমাম ইবনু কাসীর উক্ত কিতাবে আরো বলেন, রাসূল (স.) এর জন্মের দিন-তারিখ অকাট্যভাবে জানা যায় না। ইমাম কুরতুবী তার তাফসীরের মধ্যে এব্যাপারে আলেমদের কিছু মতানৈক্য তুলে ধরেছেন। এমনকি যদি ধরেও নেয়া হয় যে, রাসূল (স.) ১২ রবিউল আউয়াল মাসে জন্ম নিয়েছিলেন, তাহলে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, তিনি একই দিনে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। অতএব, ঐ দিন শোকার্ত না হয়ে শুধু আন্দন্দিত হওয়া কি যৌক্তিক?
আল্লাহর বাণী:
{ قُلْ بِفَضْلِ اللّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُواْ هُوَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُونَ}
“বল, আল্লাহর দয়া ও মেহেরবাণীতে। সুতরাং এরই প্রতি তাদেও সন্তুষ্ট থাকা উচিত। এটিই উত্তম সে সমুদয় থেকে যা সঞ্চয় করছ” (ইউনূস: ৫৮)। এই আয়াত দিয়েও মীলাদুন্নবী উৎসবের পক্ষে প্রমাণ পেশ করা ঠিক নয়। কারণ, শ্রেষ্ঠ যুগের (সাহাবা, তাবেয়ী, তাবে তাবেয়ী) কেহই এই আয়াতরে অনুরূপ ব্যখ্যা করেন নি। তাহলে কি আমরা সাহাবা ও তাবেয়ীদের চেয়েও কুরআন বেশি বুঝি? তাদের যুগে যেহেতু, এ জাতীয় ব্যখা করা হয়নি, তাই এটি ছিলো তাদের ঐকমত্য যে, এই আয়াত দ্বারা ঐ অর্থ উদ্দেশ্য নয়। বরং ইমাম কুরতুবী (স.) সালাফ থেকে বর্ণনা করে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলছেন,
(فضل الله الإسلام ، ورحمته القرآن)
“আল্লাহর অনুগ্রহ হচ্ছে: ইসলাম। তাঁর রহমত হচ্ছে কুরআন”।
ঐ স্বপ্ন দিয়েও এ ক্ষেত্রে প্রমাণ পেশ করা যাবে না। যাতে বলা হয়েছে যে, আবু লাহাব রাসূল (স.) এর জন্ম গ্রহণে খুশী হয়েছিলেন বলে আল্লাহ তার শাস্তি লাঘব করে দিয়েছেন। কারন, এ স্বপ্নটি সনদ দ্বারা প্রমাণিত হয়নি। তাছাড়া, কাফিরকে কোন ভালো কাজের প্রতিদান দেয়া হয় না। কারণ আমল কবুল হওয়ার একটি মূল শর্ত হলো, ঈমান। যা তার নেই। তদুপরি তা যদি এমন আমল যা সাওয়াবের ক্ষেত্র নয়। কারণ, সন্তানাদি হওয়ার আনন্দ একটি স্বভাবগত বিষয়। শুধু এজন্যই মানুষকে কোন সাওয়াব দেয়া হয় না।
وأما صيام النبي صلى الله عليه وسلم يوم الاثنين لأنه يوم وُلد وبُعث فيه فلا يدل على جواز الاحتفال . فالحديث دليل على أننا نصوم هذا اليوم من كل أسبوع شكراً لهذه النعمة ، وليس فيه أننا نحتفل بيوم واحدكل عام ، والعبادات لا قياس فيها .
রাসূল (স.) সোমবার রোজা পালন করতেন। কারণ ঐ দিন তিনি জন্ম গ্রহণ করেছেন। এই হাদীস দিয়েও মীলাদুন্নবীর পক্ষে দলীল দেয়া যায় না। কারন এ হাদীসের দাবী হচ্ছে, আমরা এই নি‘আমাতের শুকরিয়া করার জন্য এই দিন রোজা রাখবো প্রত্যেক সপ্তাহে। কিন্তু এর মধ্যে এমন কোন অর্থ নাই যে, আমরা বছরে একদিন উৎসব পালন করবো। ইবাদাতের মধ্যে কোন কিয়াস চলে না।
মূলকথা, আল্লাহর নবীর (স.) সুন্নাতকে শক্ত করে ধারণ করাই হচ্ছে রাসূল প্রেমের শ্রেষ্ঠ নমুনা। এর মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত কল্যান ও হিদায়াত। অন্যথায়, নতুন কিছু তৈরি করে তাকে বিদআতে হাসানাহ নাম দিয়ে বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যাবেনা। অতএব, প্রমাণিত হলো, রাসূল প্রেমের নামে মীলাদুন্নবী তথা জলনে জুলুসের এ সব আয়োজন সাওয়াব নয়; বরং গুনাহের আয়োজন ও অনুশীলন ছাড়া আর কিছুই নয়।

হে আল্লাহ আমাদেরকে বিদ‘আত মুক্ত ঈমান ও আমল দাও। আমীন

লেখকঃ

ড. বি. এম. মফিজুর রহমান আল-আযহারী
অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ
সমন্বয়ক, মোরালিটি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (এমডিপি)
সাবেক পরিচালক, ইউনিভার্সিটি রিকোয়ারমেন্ট কোর্সেস
আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম।

copy post
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই ডিসেম্বর, ২০১৬ সন্ধ্যা ৭:২৫
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×