somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্বাধীনতার ইতিহাস সৃষ্টির সেই দিনটি

০৬ ই মার্চ, ২০০৭ সন্ধ্যা ৬:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

একজন রাজনৈতিক নেতার দেওয়া ভাষণ কালোত্তীর্ণ হতে পারে তখন যখন সেই ভাষণ জাতীয় জীবনের মোড়কে ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো আবেগ সৃষ্টি করতে পারে, মানুষের রাজনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে পারে; গোটা জাতি যে ভাষণের মধ্যে জাতির ইতিহাস নির্মাণের দিকনির্দেশনা পেয়ে থাকে। এমন ভাষণ দেওয়ার সৌভাগ্য পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম রাজনৈতিক নেতার জীবনেই ঘটেছে বা ঘটে থাকে। অবশ্য মুক্তিসংগ্রামের কালে যিনি নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন তার কথা, দিকনির্দেশনা, কর্মসূচি সেই জাতির জীবনে অবশ্যই প্রভাব বিসত্দার করতে পারে, করেও থাকে। লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা মহাদেশ ও এশিয়ার দেশে দেশে মুক্তি সংগ্রামের প্রধান নেতাদের বক্তৃতা মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতা সংগ্রামে অত্যনত্দ গুর"ত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, জনগণের কাছে দেশের স্বাধীনতার মন্ত্রবাণী হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।


বঙ্গবন্ধু যথার্থই বুঝতে পেরেছিলেন সমবেত লাখ লাখ জনতা, দেশবাসী সেই সময়ে তার কাছ থেকে কোন ঘোষণাটি শোনার জন্য উন্মুখ হয়েছিল। কিন' সেই স্বাধীনতার সরাসরি ঘোষণা দেওয়ার বিপদটি সম্পর্কে তিনি জানতেন, নেতাকে অতোটা আবেগ দ্বারা তাড়িত হলে চলে না, তাই তিনি তার নিজের ও জনগণের আবেগকে যথাস্থানে সংযত করার কৌশল নিয়েও 'এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রামের' কথা বলে গেলেন। নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী বঙ্গবন্ধুর পক্ষে এর চাইতে সেই মুহূর্তে বেশি কিছু বলার সুযোগ ছিল না। দেশী-বিদেশী নানা সমস্যা, শক্তির অবস্থান বিবেচনায় রেখেই তাকে ঐভাবে প্রস'তি নেওয়ার কথা বলতে হয়েছিল।

পাকিসত্দানের শাসক চক্রের সার্বিক চরিত্র সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন থেকে বঙ্গবন্ধু জনগণের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য বৃহত্তর প্রস'তি গ্রহণ, এর জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকারের প্রস'তি গ্রহণের আহ্বান সেদিন জানালেন, একই সঙ্গে স্বাধীনতার চূড়ানত্দ ঘোষণা প্রদানের হয়তো তিনি সুযোগ নাও পেতে পারেন_ এমন পরিস্থিতির কথাই তিনি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিলেন। বঙ্গবন্ধু যেন সম্মুখের দিনগুলোতে দেশে কী হতে যাচ্ছে তেমন দিব্যদৃষ্টি নিয়েই দেখতে পাচ্ছিলেন। পূর্ববাংলার জনগণকে স্বাধীনতার মন্ত্রে সুসজ্জিত করার জন্য তিনি যেভাবে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন তার নজিরও ইতিহাসে মেলানো ভার।

বঙ্গবন্ধুর ঐ ভাষণে 25 মার্চ-পরবতর্ী অবস্থায় কী করণীয় ছিল সবই যেন তিনি বলে দিয়েছিলো এবং সর্বত্র জনগণ সেভাবেই প্রতিরোধ, অবশেষে মুক্তিযুদ্ধ শুর" করেছিল। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর 7 মার্চের ভাষণটিই ছিল প্রেরণার উৎস, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন তাই বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা অংশবিশেষ 'বজ্রকণ্ঠ' নামে উচ্চারিত হতো। প্রতিদিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে যখন বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠটি উচ্চারিত হতো তখন মনে হতো এই তো বুঝি বঙ্গবন্ধু আমাদের সঙ্গে, দেশবাসীর সঙ্গে থেকেই মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অবশেষে 7 মার্চ বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে উচ্চারিত 'এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ' কথাটি 16 ডিসেম্বর বাসত্দবে প্রতিফলিত হলো। রাজনীতির প্রফেট এদেরই বলে যাদের উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ বাসত্দবে রূপ নেয়। বঙ্গবন্ধু ছিলেন আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল নেতা, মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নদ্রষ্টা, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি। 7 মার্চ বঙ্গবন্ধু জাতিকে সেই জাগানিয়ার গান শুনিয়ে দিলেন যা নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে সাড়ে সাত কোটি মানুষকে গভীরভাবে উদ্বেলিত করেছিল, সেই ভাষণের অনত্দর্নিহিত সুর আর বাণী দেশবাসীকে স্বাধীনতার মন্ত্রে মুগ্ধ করে রেখেছিল। সেভাবে মুগ্ধ করতে পেরেছিল বলেই সাড়ে সাত কোটি মানুষ নয় মাস এতো রক্ত, এতো আত্মত্যাগ ও এতো কিছুকে বিসর্জন দিতে পেরেছিল। সে কারণেই কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুর 7 মার্চের ভাষণকে রাজনীতির মহাকাব্য, মহার্ঘ্য বলে অভিহিত করে থাকেন।


-কিন' অতীব দুঃখের কথা হচ্ছে বাংলাদেশে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা পাঠ্যপুসত্দকে মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস রচনার কারণে বঙ্গবন্ধুর 7 মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটিকেও বাঁকা চোখে উপস্থাপন করা হয়েছে, তাঁর ভাষণে স্বাধীনতার ঘোষণার গুর"ত্বপূর্ণ অংশকে বাদ দিয়ে বিগত জোট সরকারের আমলে বলার চেষ্টা করা হয়েছে যে, 7 মার্চ শেখ মুজিব পাকিসত্দান রক্ষার জন্য 4 দফা আলোচনার শর্ত পাকিসত্দান সরকারের কাছে দিয়েছিলেন। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর ঐ ভাষণটি দেশের বেতার-টিভি চ্যানেলসমূহে যথাযথ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহ উপস্থাপন করা হচ্ছে না, তাই নতুন প্রজন্মের শিশু, কিশোর তর"ণ-তর"ণীরা জানতে ও বুঝতে পারছে না কোন পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু ঐ ভাষণটি দিয়েছিলেন, কেন তিনি সেদিন তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি, দিলে কী কী বিপদ ঘটার সমূহ সম্ভাবনা ছিল, নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কাছে অন্য কোনো পথ খোলা ছিল কিনা, ইত্যাদি বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরসহ একটি স্বচ্ছ ধারণা দেওয়ার জন্য প্রচার মাধ্যমে যে ধরনের আলোচনা অনুষ্ঠান, বঙ্গবন্ধুর 7 মার্চের ভাষণ সমপ্রচার করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল_ সেটি হচ্ছে না বলেই আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা নিয়ে নানা বিভ্রানত্দি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

আমরা আশা করবো_ এ বছর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বিশেষত বঙ্গবন্ধুর 7 মার্চের ভাষণের গুর"ত্ব প্রচার মাধ্যমে যথাযথভাবে তুলে ধরা হবে, 22 জন বুদ্ধিজীবীর বিবৃতি বিবেচনায় নিয়ে তা প্রচারের ব্যবস্থা করা হবে। এটি করা হলে বর্তমান প্রজন্ম 1971 কে নতুনভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ পাবে এটিই আমার বিশ্বাস।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শরীফ থেকে শরীফা ইস্যু কেন চাঙা হচ্ছে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৩:১৭


দেশে ট্রান্সজেন্ডার ও সমকামী ইস্যু নিয়ে জল ঘোলা হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমকামী ইস্যুতে একের পর এক বহিষ্কারের ঘটনার মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে দুই... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্প - অভাগীর সুর ব্যঞ্জনা – পর্ব ১ -

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:০৮


শহরটা রাতে কখনও পুরো ঘুমোয় না। কেউ প্রেমে জাগে, কেউ স্বপ্নে, কেউ অপরাধবোধে।আর কেউ কেউ জেগে থাকে অভাবে। তিনতলার ছোট্ট ভাড়া-বাড়িটির জানালার পাশে বসে শিরীন হারমোনিয়ামের রিডে আঙুল রাখল।

বাইরে তখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

জন্মদিনে তাহাদের জন্য শুভকামনা। আমার জন্মদিনের স্মৃতি...

লিখেছেন করুণাধারা, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৫৬



একেকটা জন্মদিন পার করা মানে জীবন বইয়ের একেকটা পৃষ্ঠা পড়ে ফেলা, কয়েক বছর পরপর সেই বইয়ের একেক অধ্যায় শেষ হয়! বইটা ট্রাজেডি না কমেডি, একেবারে শেষ পর্যন্ত না পৌঁছালে তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

চুপ - একদম চুপ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



আমরা শুধু চুপ থাকবো -
আমাদের কথা বলার মুখ নেই
আমাদের দেখার মতো চোখ নেই
আমাদের শোনার মতো কান নেই
মনে হয়, মনে হয় -
আমাদের হাত-পাও নেই।

আমাদের বিবেক নেই
আমাদের চিন্তা-চেতনাও নেই
আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিজিবিজি নদী চলে মন উদাসের দেশে !

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০২





হিজিবিজি নদী চলে মন উদাসের দেশে !

...................................................................
মানচিত্রের আঁকাবাঁকা রেখায় তারে পাবেনা,
সে নদী তো চেনা কোনো ঠিকানায় যাবে না।
তার কোনো কূল নেই, নেই কোনো ঘাট,
সে বয়ে চলে একা, বুক জুড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×