ছোট্টবেলা থেকে যে আমার হাত দেখেছে সেই বলেছে, "তোর জীবনে বিদেশ যাত্রা নেই"। ভীষণ খারাপ লাগতো। তখন থেকেই একটা জেদ ধরে গেছিল। ঠিক করে নিয়েছিলাম একবার অন্তত বিদেশ যাব - যে ভাবেই হোক। এরপর জীবনের নানা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে এক সময় মনে হ'ত এ জেদ, স্বপ্ন হয়েই থেকে যাবে। কিন্তু হাল ছাড়িনি। আমার এই বর্তমান চাকরি টা পাবার পরই বুঝতে পারি যে আজ না হোক কাল বিদেশ যাবই। কারণ এদের বিশ্বের অনেক দেশেই কাজ চলে। এটুকু পড়ে যদি কেউ ভাবেন যে ছেলেটা নিজের দেশকে ভালবাসেনা -এ নিছকই এক অর্থলিপ্সু, ভোগবিলাসী ব্যক্তির আত্মম্ভরী জীবন আলেখ্য। তাহলে বাকিটা পড়ে সময় নষ্ট করবেন না।
এ চাকরিতে ঢোকার সাথে সাথেই আমায় জামশেদপুরে চলে যেতে হয়। সে কাহিনি আমার অন্য পোষ্টে আছে। সেখান থেকে ফেরার তিন মাসের মধ্যেই ভিসা তৈরি হয়ে যায়। আর আমাকেও বলা হয় এক সপ্তাহের মধ্যে যেতে হবে -15ই জুলাই। এইবার হল আমার সমস্যা। অন্তত এক বছরের জন্য যেতে হবে, অথচ আমার একটা স্যুটকেস পর্য্যন্ত নেই! গোদের উপর বিষফোঁড়, এই সময়ই আমি আমাদের জন্য একটা বড় ফ্ল্যাট কেনার ব্যবস্থা করছি। উপরওয়ালার পায়ে ধরতে বাকি ছিল। কিছুতেই কিছু হল না। পাগলের মত ছুটতে শুরু করলাম - বাড়ি থেকে কর্মস্থল, সেখান থেকে বাজার, সেখান থেকে ব্যাঙ্ক। পাগল হয়ে যেতাম। 13ই জুলাই সকালে ডাক্তারি পরীক্ষা দিতে গেছি; এমন সময় আমার এক সহকর্মীর ফোন এল, "কি খাওয়াচ্ছিস বল?" আমি বললাম, "বেশি বাজে না বকে খবর কি তাই বল।" জানলাম আমার যাওয়া এক হপ্তা পেছিয়ে গেছে। আনন্দে , স্বস্তিতে এত জোরে চেঁচিয়ে উঠেছিলাম যে আসে-পাসের সব লোক চমকে উঠেছিল। ভিসা বানানোর সময় একটা ঘটনার উল্লেখ না করে পারছি না। US ভিসার জন্য petition-এ একটুঅন্য রকম ছবি লাগতো। 5সেমিX 5সেমি আকারের ছবি। স্টুডিওতে গিয়ে ছবির আকার বলতেই প্রশ্ন,US যাচ্ছেন? স্বীকার করতেই হল। সাথে সাথে ছবির দাম হল 100টাকায় 2টি। যেখানে পোস্টকার্ডআকারের ছবির দাম 2.50টাকা থেকে 3টাকা, সেখানে 50টাকা এই ছবি গুলোর দাম! রেগে গিয়ে দোকানদারটিকে বললাম, "এত দাম কি আমেরিকা যাবার মাশুল?" উত্তরের অপেক্ষা না করে বেরিয়ে এসেছিলাম।
নতুন যাওয়ার দিন স্থির হল 22শে জুলাই 2006 শণিবার রাত 11:55টায়। বিমান কলকাতা থেকে প্রথমে সিঙ্গাপুর যাবে। তারপর সেখান থেকে টোকিয়ো যাবে। টোকিয়ো থেকে বিমান সোজা প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে পৌঁছবে লস অ্যাঞ্জেলিস। মোটামুটি 24ঘন্টার যাত্রা।
শুক্রবার রাতে লালি ছিল আমাদের বাড়িতে। কারণ, ও আর বিমানবন্দর অত রাতে যাবে না। শণিবার দুপুর অবধি গোছগাছ চলল। একটা ঢাউস স্যুটকেস আর একটা কিট ব্যাগ। শেষ দুপুরে একটু ঘুমিয়ে নিলাম। সন্ধ্যেবেলা আমার বন্ধু অরিত্র আর গজু এল বিদায় জানাতে। ভীষণ খারাপ লাগছিল। আরও বাজে লাগছিল মায়ের মুখের দিকে তাকালে। কান্না ঢাকার জন্য অকারণে হাসছিল। দাদু আগে বলেছিল airport-এ যাবে। কিন্তু 8টা নাগাদ যখন বেরোচ্ছি তখন বলল আর যাবে না। 2ঘন্টা আগে reporting। আমরা পৌঁছুলাম সাড়ে 9টা নাগাদ। তাই মা, দাদা, বৌদি আর "পুচকী"-র কাছথেকে দ্রুত বিদায় নিয়ে ঠেলা গাড়ি ঠেলে নেতাজি সুভাষ আর্ন্তজাতীক বিমানবন্দরে ঢুকে পড়লাম। এখন থেকে আমি একা। সম্পূর্ণ একা।....
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই অক্টোবর, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




