somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

উপমহাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকান্ড

২০ শে আগস্ট, ২০১৮ সকাল ৮:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১৯৭৫ সালের আগেও দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশে শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সংঘঠিত হয়েছে। ব্রিটিশদের বিদায়ের পরপরই ১৯৪৮ সালে প্রথম রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে নিহত হন ভারতের জাতির জনক মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। এই হত্যাকাণ্ডের তিন বছরের মাথায় ১৯৫১ সালে সিআইএর প্ররোচনায় আফগানিস্তানের বাদশাহ জহির শাহের ভাড়া করা আততায়ীর গুলিতে নিহত হন পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান। ১৯৫৯ সালে কট্টরপন্থী বৌদ্ধ আততায়ীর গুলিতে নিহত হন সিংহলের প্রধানমন্ত্রী সলোমন বন্দরনায়েক।

১৯৬৩ সালে লেবাননের বৈরুতের এক হোটেলে রহস্যজনক পরিস্থিতিতে মারা যান অবিভক্ত বাংলার শেষ, এবং পাকিস্তানের পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। অনেকে বলেন, বৈরুতের এক হোটেল কক্ষে নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা যাওয়া সোহরাওয়ার্দী আসলে গুপ্তহত্যার শিকার হন। একই কথা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতেমা জিন্নাহর মৃত্যুর ক্ষেত্রেও শোনা যায়। ১৯৬৫ সালের আলোচিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা চিরকুমারী এই ডেন্টিস্ট ১৯৬৮ সালে একাকী অবস্থায় করাচীর মোহাত্তা প্রাসাদে মারা যান। অনেক বছর পর করাচীর তৎকালীন পুলিশ প্রধান দাবী করেন, তিনি সেদিন ফাতেমা জিন্নাহর কোয়ার্টারে গিয়ে বসার ঘরে তাঁর গলাকাটা লাশ দেখতে পেয়েছিলেন।

কিন্তু সেসব হত্যাকাণ্ড ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সংঘঠিত মুজিব হত্যাকাণ্ডের মতো উপমহাদেশের শীর্ষ নেতাদের মনে নিজেদের নিরাপত্তা সম্পর্কে চাপা আতংকের জন্ম দেয়নি।

১৯৭৭ সালের গ্রীষ্মে প্রধান সেনাপতি জেনারেল জিয়াউল হকের নেতৃত্বে পরিচালিত এক সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। ভুট্টোর কন্যা, ২০০৭ সালে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো তাঁর রাজনৈতিক আত্মজীবনী ডটার অভ ইস্টে ১৯৭৭ সালের সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লেখেন, সেনাবাহিনীর জওয়ানরা যখন রাওয়ালপিণ্ডিতে প্রধানমন্ত্রীর সরকারী বাসভবনের দেয়াল টপকে ভুট্টোকে গ্রেফতার করতে আসছিলো, তখন ভুট্টো পরিবার স্মরণ করছিলেন দুই বছর আগে ঢাকায় সপরিবারে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের কথা!

সম্প্রতি অবমুক্ত করা মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের গোপন নথি থেকে জানা যায়, মুজিব হত্যাকাণ্ডের খবরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিজের নিরাপত্তা নিয়েই চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি রাতে শোবার সময় নিজের ঘরের দরজা বন্ধ না করে ভিড়িয়ে রাখা শুরু করেন, সোভিয়েতদের সাথে মুজিব হত্যা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন, এতোদিন এড়িয়ে চললেও দিল্লীস্হ মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম স্যাক্সবির দাওয়াত কবুল করেন এবং দিল্লীর সফদর জঙ্গ সড়কে অবস্থিত নিজের সরকারী বাসভবনের নিরাপত্তা বাড়িয়ে দেন।

সত্যিই, মনে হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কোন এক অদৃশ্য ট্রিগারে দম দিয়ে দেয়া হয়, যার ফলে পরবর্তীতে নিয়মিত বিরতিতে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড চলতে থাকে।

যেন এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালে আফগানিস্তানের প্রথম প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ দাউদ খান, ১৯৭৯ সালে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো, একই বছর কয়েকদিনের ফারাকে ততোদিনে সোভিয়েত করদ রাজ্যে পরিণত হওয়া কমিউনিস্ট আফগানিস্তানের দুই রাষ্ট্রপ্রধান নূর মোহাম্মদ তারাকী ও হাফিজুল্লাহ আমীন, ১৯৮১ সালে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, ১৯৮৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, ১৯৮৮ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক, ১৯৯১ সালে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী, ১৯৯৩ সালে শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট রানাসিংহে প্রেমাদাসা, ১৯৯৪ সালে শ্রীলংকার বিরোধীদলীয় নেতা গামিনী দেশনায়েক, ১৯৯৬ সালে আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহ, ২০০১ সালে নেপালের রাজা বীরেন্দ্র বীর বিক্রম শাহ, ২০০৫ সালে শ্রীলংকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী লক্ষ্মণ কাদিরগামার, ২০০৭ সালে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো ও ২০১১ সালে আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট বুরহান উদ্দীন রব্বানী রাজনৈতিক অপঘাত ও গুপ্তহত্যায় প্রাণ হারান।

১৯৭৫ সালের আগেও দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড হয়েছে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর তার ভলিউম যেন এক লাফে তেড়েফুড়ে উঠতে থাকে। সে হিসেবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি ক্রান্তিকাল ছিলো, যে ঘটনার পর দৃশ্যত এই অঞ্চলের দেশগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের প্রাণের উপর অাঘাতের প্রবণতা বেড়ে যায়।

বিগত চল্লিশ বছরের এই এই দীর্ঘ তালিকায় কমপক্ষে আরো তিনটি নাম যুক্ত হতো, যদি ১৯৯৯ সালে তামিল টাইগারদের বোমা হামলায় শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা নিজের এক চোখের বদলে প্রাণটা ফিরে না পেতেন, যদি ২০০৩ সালে অদ্যাবধি অস্পষ্ট কোন গোষ্ঠী কতৃক কয়েক দিনের মাথায় দুইবার চালানো ভয়ংকর বোমা হামলা থেকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশাররফ প্রাণে না বাঁচতেন, অথবা যদি ২০০৪ সালে ঢাকায় মারাত্মক এক গ্রেনেড হামলা থেকে বাংলাদেশের তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী হাসিনা ওয়াজেদ রক্ষা না পেতেন.....!
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে আগস্ট, ২০১৮ সকাল ৮:৪৫
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জামায়াতের দ্বিচারিতায় পরিপূর্ণ রাজনীতি

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ২২ শে জুলাই, ২০২৬ ভোর ৫:২৮


১৯৪১ সালে ব্রিটিশ ভারতের লাহোরে ইসলামী চিন্তাবিদ সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী ‘জামায়াতে ইসলামী’ গঠন করেন। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর এটি ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধার্মিক কে অনুসরণ করুন ভন্ডকে নয় ।

লিখেছেন কিরকুট, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৮

আমরা প্রায়ই নিজেদের ধর্মপ্রাণ জাতি বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসি। কিন্তু প্রশ্ন হলো ধর্ম কি সত্যিই আমাদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও সত্যের পথে পরিচালিত করতে পারছে, নাকি কিছু অসভ্য মানুষ ধর্মকে নিজেদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ক্যাপাসিটি চার্জের পর এবার নজর খাম্বায়

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:০৩


বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগের শেষ নেই । বিশেষ করে যারা নির্দিষ্ট বেতনে সংসার চালান কিংবা যেসব পরিবারে কেবল একজন মাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আছেন, তাদের মাসে প্রিপেইড মিটারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কে হবেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:৫৯



কে হবেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি?

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি পদটি সংবিধানের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন যোগ্যতার চেয়ে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতেই বেশি হয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাকরির জন্য সুপারিশ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৫৮



গত কয়েকদিন যাবত ফেসবুক, ইউটিউব সহ অনলাইন সকল পত্র-পত্রিকা, টিভি নিউজ সহ এমন কোনো স্থান বাদ নেই যেইখানে এক ব্যক্তির রাজনীতি, সাংসদ, সংসদ, চরিত্র, বিবাহ, কাবিন নামা, প্রথম স্ত্রী,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×