মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর জীবনেও অদ্ভুত তীব্র এক প্রেম এসেছিলো। স্ত্রী রতনবাঈ ছিলেন সে প্রেম। এই প্রেমের সূত্রপাতও ছিল নাটকীয়। রতনবাঈ বা রুতী পেটিট ছিলেন জিন্নাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ভারতীয় পার্সি সম্প্রদায়ের একজন মুখ্য নেতা দিনশো পেটিটের একমাত্র সন্তান। কোন এক ট্রেন যাত্রায় বাবার সাথে যাবার সময় রুতী প্রথম জিন্নাহকে দেখেন। জিন্নাহর বয়স তখন চল্লিশ, রুতীর ষোল। সেখানে জিন্নাহ বলতে গেলে রুতীর দিকে নজরই দেননি। এটা তখন বোম্বাইয়ের অভিজাত সমাজে 'ফুল' নামে গণ্য রুতীর অহমিকায় আঘাত হানে। সে বছরই জিন্নাহ দিনশো পেটিটের আমন্ত্রণে দার্জিলিং বেড়াতে যান।
সেখানে তিনি রুতীকে একজন বুদ্ধিমতী, ও সংবেদনশীল চরিত্র হিসেবে দেখতে পান। এভাবেই একটি অসম প্রেম গড়ে উঠে। দিনশো পেটিটের নারাজির মুখে জিন্নাহর হাত ধরে ঘর ছাড়েন রুতী। বিয়ের পর রুতীর নাম হয় মরিয়ম জিন্নাহ। বিয়েটি হয় ১৯১৮ সালের এপ্রিলে, জিন্নাহর বন্ধু মাহমুদাবাদের মহারাজা মোহাম্মদ আলী মোহাম্মদ খানের মধ্যস্থতায়। বিয়ের সময় জিন্নাহর বয়স ছিলো তাঁর শ্বশুর দিনশো পেটিটের চেয়ে মাত্র তিন বছর কম।
কিন্তু অচিরেই তাঁদের দাম্পত্য জীবনে অশান্তি নেমে আসে। একটি অষ্টাদশী মেয়ে একজন পুরুষের কাছে কেমন প্রেম অথবা সংবেদনশীলতা আশা করে, তা মাঝবয়সী জিন্নাহর কাছ থেকে রুতী পাচ্ছিলেন না। তাছাড়া তিনি যুগের তুলনায় অনেক অগ্রসরমান খেয়ালের ছিলেন, এবং গৃহবধূ হয়ে দিন কাটিয়ে দেবার মতো মেজাজ তার ছিলোনা। অত্যন্ত সুনামধারী উকিল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ তখন ক্রমেই ভারতীয় রাজনীতির সাথেও জড়িয়ে পড়েন। তখন তিনি কংগ্রেসের একজন শীর্ষ পর্যায়ের নেতা ছিলেন, এবং নানাবিধ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছিলেন। তিনি পরিবারের দিকে খুব একটা সময় দিতে পারতেন না। এরই মধ্যে ১৯১৯ সালের আগস্টে তাঁদের একমাত্র সন্তান দীনার জন্ম হয়।
১৯২৭ সালে জিন্নাহ ও রুতীর মধ্যে বিচ্ছেদ হয়। তবে সেটা আনুষ্ঠানিক তালাক ছিলোনা। বিচ্ছেদের পর রুতী অসুস্থ হয়ে পড়েন। দুই বছর পর ১৯২৯ সালের শীতে রুতী মারা যান। জিন্নাহ ও রতনবাঈ দম্পতির সন্তান দীনা গত বছর মারা গেছেন। স্ত্রীর মতো একমাত্র কন্যার সাথেও মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর বিচ্ছেদ ঘটেছিলো৷ আর এর কারণ ছিলো দীনা কতৃক বোম্বাইয়ের পার্সি ধনকুবের নেভিল ওয়াদিয়াকে বিয়ে করা। জিন্নাহ এটা মেনে নেননি, এবং একমাত্র কন্যাকে তিনি ত্যাজ্য করে দেন।
ভারতের তৎকালীন তাবদ রাজনীতিবিদদের মধ্যে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ব্যক্তিত্ব ছিল সবচেয়ে ক্ষুরধার ও চাঁছাছোলা দৃঢ়তার অধিকারী। ব্যক্তিগত জীবনকে ব্যক্তিগত স্তরে সীমাবদ্ধ রাখতে তিনি ছিলেন খুবই কঠোর। তিনি কখনোই তাঁর আবেগ প্রকাশ করতেন না। সেই জিন্নাহকে দুইবার প্রকাশ্যে কাঁদতে দেখা গেছে। একবার ১৯৩০ সালের গোল টেবিল বৈঠকের মাধ্যমে হিন্দু ও মুসলিম রাজনীতি আলাদা হয়ে যাবার পর, এবং দ্বিতীয়বার ১৯৪৭ সালের ৬ আগস্ট চিরতরে ভারত ত্যাগের আগে বোম্বাইয়ের মাঝগাঁওয়ের রহমতাবাদ কবরস্থানে সাবেক স্ত্রী রতনবাঈয়ের কবর জিয়ারত করতে গিয়ে...!

সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ সকাল ৯:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


