চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের হামলায় ২৫ কক্ষ তছনছ, উপাচার্যের গাড়ি ভাঙচুর
ছয়টি হলেই শিবিরের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, ১৫ ছাত্রলীগ কর্মীসহ আহত ২০, ক্যাম্পাস বন্ধ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গত বৃহস্পতিবার রাতে শিবির কর্মীদের আকস্িনক হামলায় তিনটি আবাসিক হলের ছাত্রলীগের ১৫ জনসহ অন্তত ২০ জন গুরুতর আহত হয়েছে। শহীদ আবদুর রব হলের মসজিদে শিবিরের বৈঠক করা নিয়ে তর্কের জের ধরে বিভিন্ন আবাসিক হলের সশস্ত্র শিবির-কর্মীরা সংঘবদ্ধ হয়ে ওই হলের ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ওপর হামলা চালিয়ে ঘটনার সুত্রপাত করে। পরে তারা সোহরাওয়ার্দী এবং শাহ আমানত হলেও ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ওপর হামলা করে। রাত সাড়ে ১০টা থেকে ভোর চারটা পর্যন্ত এ হামলা চলে বলে জানা যায়।
এই ঘটনায় আজ শনিবার থেকে আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। তবে এই সময় প্রশাসনিক কাজ চলবে। খোলা থাকবে আবাসিক হলগুলোও। গতকাল শুক্রবার বিকেলে উপাচার্য দপ্তরে উপাচার্য অধ্যাপক আবু ইউসুফের সভাপতিত্বে এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয় সুত্র জানায়, হামলার সময় শিবির তিনটি আবাসিক হলের ছাত্রলীগ সমর্থকদের অন্তত ২৫টি কক্ষ ভাঙচুর ও লুটপাট করে। কয়েকটি কক্ষ থেকে কম্পিউটার, টেবিলফ্যানসহ মূল্যবান যন্ত্রপাতি লুট করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাতে উপাচার্য পরিস্িথতি শান্ত করতে শাহ আমানত হলে গেলে সেখানে শিবিরের কর্মীরা উপাচার্যের গাড়িও ভাঙচুর করে এবং তাকে লাঞ্ছিত করার চেষ্টা চালায়। গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনরত আমার দেশ পত্রিকার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি রাশেদ খান লাঞ্ছিত হন।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক শামসুদ্দিন আহমেদ বলেন, ?ছাত্রলীগ কর্মীদের ওপর আমরা হামলা চালাইনি। বরং তারা আমাদের কর্মীদের ওপর হামলা চালাতে এলে আমরা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছি।?
ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল মনসুর জামশেদ বলেন, ?ছাত্রশিবির পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালিয়েছে। মুহুর্তে এত শিবির-কর্মীর একসঙ্গে আসা বুঝিয়ে দেয়, তারা পরিকল্পিতভাবে এ হামলা করেছে। আমরা দোষীদের বিচার দাবি করছি।?
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, দফায় দফায় হামলা চালিয়ে শিবির-কর্মীরা গতকাল ভোররাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি আবাসিক হলের মূল ফটকে তালা মেরে সবগুলোতেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এখন তারা প্রতিটি হলের গেটে পাহারা বসিয়ে নিজেরাই সাধারণ শিক্ষার্থীদের পরিচয়পত্র দেখে হলে যাওয়া-আসা নিয়ন্ত্রণ করছে। হামলা চালানোর সময় শিবিরের ক্যাডারদের হাতে অস্ত্রশস্ত্র দেখা যায়। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত সুপার আমেনা বেগম বলেন, ?আমরা সেখানে অস্ত্রধারী কাউকে পাইনি। চারটি আবাসিক হলে তল্লাশি চালিয়েও কোনো অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি।? তিনি বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে শহীদ নামে শিবিরের এক কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আহতদের মধ্যে ১০ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং অন্যদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি করা হয়েছে। ছাত্রলীগের কর্মী কাজী মারুফ-উর রহমান, জাহিদ হাসান, শান্তনু মহাজন, শিহাব, সাইফুল ইসলাম ও রিয়াজ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এঁদের মধ্যে মারুফের অবস্থা আশঙ্কাজনক। গতকাল দুপুরে চমেক হাসপাতাল থেকে তাঁকে নগরের একটি ক্লিনিকে নিয়ে গিয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
অপরদিকে ছাত্রলীগের কর্মীদের আঘাতে গুরুতর আহত হয়েছেন শিবির নেতা মনসুরুল আলম মজুমদার। তিনি বর্তমানে নগরের একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন। ঘটনা প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাটহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ঈসমাইল বলেন, ?ঘটনার সময় আমরা কিছু ছেলের হাতে ছোরা আর হকিস্টিক দেখেছি। বর্তমানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আশা করছি পরিস্িথতি স্বাভাবিক হবে।?
যেভাবে ঘটনার শুরু: প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে আটটায় শহীদ আব্দুর রব হলের মসজিদে দলীয় সভা শেষ করে ফিরছিলেন শিবিরের কর্মীরা। এ সময় ছাত্রলীগের কর্মীরা মসজিদে দলীয় বৈঠক করা ঠিক না বলে জানালে শিবিরের কর্মীরা ক্ষেপে যান। পরে এ নিয়ে বাগ্বিতন্ডা শুরু হলে মীমাংসায় এগিয়ে আসেন হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক আব্দুল করিম, সহকারী প্রক্টর চন্দন কুমার পোদ্দার ও ড. আবুল কালাম আজাদ। শিক্ষকেরা দুই দলের কর্মীদের নিজ নিজ কক্ষে ফিরে যাওয়ার কথা বললে শিবিরের ক্যাডাররা রেগে যান। মুহুর্তেই তাঁরা হলের গেট বন্ধ করে দিয়ে অন্যান্য হলে ফোন করে দেন। পরে সবাই সংঘবদ্ধ হয়ে অস্ত্র নিয়ে প্রথমে শহীদ আব্দুর রব হলের ছাত্রলীগ কর্মীদের কক্ষে হামলা চালাতে শুরু করে। আত্মরক্ষার্থে দরজা বন্ধ করে দিয়ে হলের ১১৭ নম্বর কক্ষে দুই বন্ধুকে নিয়ে অবস্থান করছিলেন ছাত্রলীগের নেতা কাজী মারুফ।
শিবিরের ক্যাডাররা হকিস্টিক ও লোহার রড দিয়ে হাত, পা ও মাথায় এলোপাতাড়ি আঘাত করে। বাধা দিতে এগিয়ে এলে জাহিদ হাসান নামের অপর এক কর্মীকেও বেধড়ক পেটায় তারা। শিবিরের কর্মীরা রকিব হোসেন ও ইকরাম হোসেন মোল্লা নামে দুই ছাত্রলীগ কর্মীকে মাথায় রড দিয়ে আঘাত করে। ছাত্রলীগের অনেক কর্মীকে কক্ষে না পেয়ে তাদের আসবাবপত্র ও টাকা-পয়সা লুট করা হয়। পরিসংখ্যান বিভাগের ছাত্র আসাদ অভিযোগ করেন, ?আমার কক্ষ থেকে তিন হাজার টাকা নিয়ে গেছেন শিবিরের কর্মীরা।?
রাত ১২টায় আমানত হলে দ্বিতীয় দফা হামলা চালাতে শুরু করেন শিবিরের কর্মীরা। অনেকে টয়লেটে ও বাথরুমের কক্ষের দরজা বন্ধ করে দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেন। হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র নুরুজ্জামান বলেন, ?শিবিরের কর্মীদের ভয়ে আমি হল ছেড়ে শাহজালাল হলের একটি কক্ষে বস্তার ভেতর লুকিয়ে থাকি। পরে ভোররাতে দেয়াল টপকে পালিয়ে যাই।?
তদন্ত কমিটি: বৃহস্পতিবার রাতের হামলার ঘটনায় প্রশাসন দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করতে গঠিত চার সদস্যের কমিটির প্রধান করা হয়েছে শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক কামাল হোসাইনকে। অপরদিকে ক্যাম্পাসে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার জন্য ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে কথা বলতে সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলাউদ্দিনকে দ্বিতীয় কমিটির প্রধান করা হয়েছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



