
শামচুল হক
সেদিন গিয়েছিলাম সাভারের বিশ মাইল এলাকায় একটি কাজে। সাভারে আমার এক ছোট ভাই মৎস গবেষণা কেন্দ্রের সাইন্টিফিক অফিসার। তাকে টেলিফোন দিতেই বলল, আপনি এখন কোথায়?
প্রথম রিংগেই ফোন রিসিভ করায় খুশি হয়ে বললাম, বিশ মাইল।
বিশ মাইলের কথা শুনে কথার ঘোর প্যাচ না করে সোজাসুজি বলল, তাহলে এখন পৌনে দুইটা বাজে, আপনি তাড়াতাড়ি জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় চলে যান।
আমি মনে মনে কিছুটা রেগে গিয়েই বললাম, বটতলায় কেন?
আমার রাগত কন্ঠ বুঝতে পেরে বলল, ভাই মনে কিছু করবেন না, আমার বাসায় কেউ নাই, রান্নাও নাই, সেই জন্য আপনাকে বটতলা যেতে বললাম।
আমি আরো রেগে গিয়ে বললাম, বাসায় রান্না নাই দেখে কি আমাকে বটতলায় পাঠিয়ে দিয়ে মাঘ মাসের উত্তরা বাতাস খাওয়াবে নাকি?
আমার ছোট ভাইটি বয়সে আমার চেয়ে ছোট হলেও তার সাথে সম্মান বজায় রেখে অনেক সময় হাসি ঠাট্টা রসিকতাও করে থাকি। আমার রেগে যাওয়া দেখে সে হাসতে হাসতে রসিকতা করে বলল, আরে ভাই রাগ করেন কেন? আমি জানি আপনি একজন খাদোক মানুষ। সাভারের হোটেলে খেয়ে আপনার তৃপ্তি হবে না, সেই জন্য বটতলায় যেতে বললাম।
তার কথা শুনে কেন যেন মনে হলো নিশ্চয়ই বটতলায় কিছু একটা আছে, তা না হলে ও আমাকে বটতলায় পাঠানোর কথা নয়। আমি রাগটা একটু কমিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বললাম, বটতলায় খাওয়ার মত কিছু আছে নাকি?
আমার ছোট ভাইটি হাসতে হাসতে বলল, এই তো লাইনে আইছেন। ওখানে বাইশ প্রকারের ভর্তা আছে। আপনি বড় হোটেলে দেড় হাজার টাকার খাবার খেয়ে যে তৃপ্তি পাবেন না বটতলার হোটেলে মাত্র দেড়শ' টাকা খরচ করে তার চেয়ে বেশি তৃপ্তিসহকারে খেতে পারবেন।
বাইশ প্রকারের ভর্তার কথা শুনে জিহ্বা লক লক করতে লাগল। দৌড়ালাম জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায়। গিয়ে দেখি আমার ছোট ভাইটি সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। অর্থাৎ আমাকে আসতে বলে সেও এখানে খেতে এসেছে। টেলিফোনে আমাকে বটতলায় আসতে বলায় কিছু না বুঝেই ওর উপরে রেগে গিয়েছিলাম, এখন বুঝতে পেরে মেজাজ পানির মত ঠান্ডা হয়ে গেল।
আমাকে সাথে করে টিনের ছাপড়াওয়ালা একটি হোটেলে গিয়ে ঢুকল। হোটেলের সামনে প্রচুর শাক-সব্জি, মাছ-মাংসের তরকারীসহ অনেক পদের ভর্তা থরে থরে সাজানো আছে। খিদেও লেগেছিল, কোন কথা না বলে হাতমুখ ধুয়েই দশ প্রকারের ভর্তা আর হাঁসের মাংস অর্ডার দিয়ে ছোট ভাইটিকে সাথে নিয়ে খেতে বসলাম।
খেতে মন্দ নয়, অনেক বাড়ির বউঝির হাতের রান্নার চেয়েও অনেক মজাদার রান্না।
ভাত খেতে খেতে মনে পড়ে গেল আমার এক বন্ধুর বউয়ের কথা। বন্ধুটির সাথে ঢাকার রাস্তায় অনেক দিন পরে দেখা। রাস্তা থেকে অনেকটা জোর করেই টেনে নিয়ে গেল তার বাসায় দুপুরে ভাত খাওয়াবে বলে। বাসা বেশি দূরে নয়, মতিঝিলের কাছেই ফ্লাট বাড়ির তিন তলায় বাসা। বন্ধুর বউকে এর আগে কখনও দেখিনি। প্রথম দেখাতেই ধান্দা লেগে গেলাম। দেখতে পরীর মত সুন্দরী। ক্লাসের মধ্যে সবচেয়ে পাজি ছিল আমার এই বন্ধু, আর এই পাজিদের কপালেই নাকি ভালো ভালো বউ জোটে, এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মনে মনে ওর কপালের খুব তারিফ করলাম। এরকম সুন্দরী বউ সাধনা করেও হাজারে একটা মেলে না সেখানে ওর কপালে জুটেছে, এটা ওর সৌভাগ্যই বলা চলে।
ভাত তরকারী রান্না করাই ছিল। বন্ধুর বউয়ের সাথে পরিচয় পর্ব শেষ করে হালকা পাতলা একটু কথা বলেই খাওয়ার টেবিলে গিয়ে বসলাম। ডাল, ভর্তাসহ চার পাঁচ প্রকারের আইটেম বাহারী ডিজাইনের সিরামিকের গামলায় সুন্দর করে সাজানো। মনে মনে খুব খুশিই হলাম। দুপুরের খাওয়াটা খুব ভালই হবে।
কিন্তু যখন খাওয়া শুরু করলাম তখন খুশি ভাবটা আর থাকল না। মনে হলো হলুদ, মরিচ, লবন আর পানি দিয়ে শুধু সেদ্ধ করে এনেছে। মনে মনে ভেবেছিলাম বউটি দেখতে যেরকম সুন্দরী তার রান্না করা খাবারও হয়তো তেমনই মজাদার হবে, কিন্তু বিষয়টি তার উল্টো হলো। বিস্বাদের চোটে মুখ উল্টে আসার অবস্থা। অনেক কষ্টে আধা প্লেট খাবার খেয়ে বেসিনে হাত ধুতে গেলে বন্ধুটি কিছুটা আশ্চার্য হয়েই বলল, কিরে-- তুই তো এক গামলা করে ভাত খাস, সেখানে মাত্র আধা প্লেট খেয়েই হাত ধুলি কেন?
মনে মনে গাল দিয়ে বললাম, হারাম জাদা, তোর বউটা সুন্দরী হলে কি হবে, রান্না তো সুন্দর নয়, খাই কি করে? যা খেয়েছি তাও তো পেটের ভিতর থেকে উল্টে আসার অবস্থা।
কিন্তু যত খারপ রান্নাই হোক না কেন? এত আদর করে আমাকে খেতে দিয়েছে সেই জায়গায় সামনি সামনি তো আর বদনাম করা যায় না। তাই হাসি হাসি মুখ করে বললাম, আরে তোকে তো আগেই বললাম এখন আমি খাবো না, তারপরেও তুই জোর করে খেতে নিয়ে আসলি। আমি একটু আগেই মনার হোটেল থেকে দেড় প্লেট বিরানী খেয়েছি। আসলে তখনও আমি কিছুই খাইনি, তারপরেও বন্ধুকে এবং বন্ধুর সুন্দরী বউকে উপস্থিত ক্ষেত্রে খুশি করার জন্য মিথ্যা বলতে হলো।
তবে যাই হোক, বটতলার কথা শুনে অনেকেই হয়তো মনে করবেন ফুটপাতের খোলামেলা মাছি ভিনভিন করা হোটেল হবে হয়তো। না ভাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে হওয়ায় খোলামেলা নিরিবিলী পরিবেশে টিনের চালের নিচে চমতকার পরিবেশ। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাসহ রান্না মন্দ নয়। খেতে খুব মজাই লেগেছিল। খেয়েছিও অনেক। ঢাকার এত কাছে এত ভালো খাবার হোটেল আছে এত দিনেও জানা ছিল না। মনে মনে আমার ছোট ভাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ দিলাম। আপনারা যারা ভর্তা ভাত খাওয়ার জন্য কাপাসিয়ার টোকে যান অথবা কাপাসিয়ার টোকে যাওয়ার ইচ্ছা থাকা সত্বেও যাওয়ার সময় পান না তারা আপাতত জাহাঙ্গীর নগর ইউনিভার্সিটির বটতলায় গিয়ে খেয়ে দেখতে পারেন। আপনাদের জ্ঞাতার্তে কিছু ভর্তার ছবি শেয়ার করলাম- - --
ছবি-০১

চ্যাপা ভর্তা। এই চ্যাপা ভর্তার অনেক নাম ডাক আছে, অনেক লোক এখনও এক চিমটি চ্যাপা ভর্তা দিয়ে তিন থাল ভাত খেয়ে ফেলেন। তাদের কাছে এটি খুবই মজাদার ভর্তা। আমিও কয়েক বছর আগে সাভারের এক গেরস্থবাড়ি খেয়েছিলাম। লাল টকটকা মরিচের ঝালে চ্যাপা ভর্তা খেতে খুব মজাই লেগেছিল। তিন থাল না খেলেও আড়াই প্লেটের মত ভাত খেয়েছিলাম। লাল টকটকা মরিচের ঝাল খাওয়ার মজাটা পেয়েছিলাম বাসায় গিয়ে, যখন ঘনঘন টয়লেটে যাতায়াত করতে লাগলাম। তবে বটতলার চ্যাপা ভর্তায় আপনাদের অসুবিধা হবে না, কারণ এখানে এত ঝাল দেয়া হয় না।
ছবি-০২

রুই মাছের ভর্তা।
ছবি-০৩

কালিজিরা ভর্তা বাসায় যারা তৈরী করতে পারেন না তারা নিঃসন্দেহে এখানে গিয়ে খেতে পারেন।
ছবি-০৪

শুধু ইলিশ মাছ আর মুরগী ভর্তা ১০ টাকা বাকী সব ভর্তাই দাম মাত্র ৫ টাকা।
ছবি-০৫

ছবি-০৬

ছবি-০৭

ছবি-০৮

ছবি-০৯

ইলিশ মাছের ভর্তা। এক কথায় চমৎকার খেতে। দাম দশ টাকা।
ছবি-১০

দেশী মুরগীর ভর্তা। দেশী মুরগীর ভর্তা আগে কখনও খাইনি। মুরগীর মাংসের ঝুরি ভাজা অনেক খেয়েছি কিন্তু মুরগীর মাংসেরও যে ভর্তা হয় সেটা এই প্রথম দেখলাম এবং খেলাম। চমৎকার খেতে। দাম দশ টাকা।
ছবি-১১

গরম গরম বেগুন ভাজা। দাম ৭ টাকা । মুরগী চপ এটার দামও নাগালের মধ্যে। দাম ১০ টাকা।
ছবি-১২

ছবি-১৩

এটা যদিও আস্ত ডিমের সাথে মরিচ পিয়াজ ভর্তা দেয়া আছে মূলত এটা ডিম ভর্তা। আপনি নিজহাতে ডিম পেয়াজ ভর্তার সাথে মেখে ভর্তা বানিয়ে খাবেন।
ছবি-১৪

মুরগীর ঝাল ফ্রাই। দাম ৮০ টাকা।
ছবি-১৫

হাঁসের মাংস। হাঁসের মাংসও দাম নাগালের মধ্যে। মাত্র ৮০ টাকা।
ছবি-১৬

চিংড়ি ভুনা।
ছবি-১৭

ডালের ভুনা। দাম ১০টাকা।
ছবি-১৮

দেশী মুরগীর কোরমা। আহা! অনেক দিন হলো কোরমা খাওয়া হয় না, কোরমার চেহারা দেখে লোভ লেগেছিল কিন্তু পেটে জায়গা না থাকায় আফসোস থাকা সত্বেও খাওয়া সম্ভব হলো না। আরেক দিন কোরমা এবং বিভিন্ন ধরনের তরকারী খেতেই আবার এখানে যাওয়ার ইচ্ছা আছে।
ছবি-১৯

মুগ ডাইল দিয়ে মুরগীর মাংস রান্না। দাম ৮০ টাকা।
ছবি-২০

ডিম ভুনা। দাম বেশি নয় মাত্র ১৫ টাকা।
ছবি-২১

লাউ শাকের সাথে চিংড়ি দিয়ে রান্না। ভর্তা দিয়ে খেয়েই পেট ভরে গিয়েছিল দেখে খেতে পারিনি, দেখেই মনে হচ্ছে খুব সুস্বাদু হবে।
ছবি-২২

ডাটা দিয়ে চিংড়ি রান্না। আহা! আগে এরকম রান্না মায়ের হাতে কত খেয়েছি। এখন ডাটা পেলে চিংড়ি পাই না, চিংড়ি পেলে ডাটা পাই না, আবার চিংড়ি ডাটা পেলেও পেটের ধান্ধায় কামলা বিক্রি করতে গিয়ে সময় পাই না, যেকারণে এসব এখন মুখে কমই পড়ে।

হোটেলের ভিতরের পরিবেশ

হোটেলের বাহিরে কাস্টমারের ভির।

এই সেই বটতলা পাশের দোকানগুলো হোটেল এবং রাস্তা থেকে অনেকটা দূরে।
আপনারা হয়তো ভাবতে পারেন ভর্তার উপরে আবার সাইবোর্ড কেন, এত এত ভর্তার ভিতর কিছু ভর্তার নাম হোটেলওয়ালারও মনে থাকে না সেই কারণে কাস্টমার এবং দোকানদারের সুবিধার জন্য এই সাইনবোর্ড।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ দুপুর ১২:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




