somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

সাফায়েতুল ইসলাম
জ্ঞান হবার পর থেকে নিজের পরিচয় খুঁজে বেড়াচ্ছি। প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করি—আমি কে? আমি কী? কোথা থেকে এসেছি? কিছুই জানি না। কখনো নিজেকে শূন্য মনে হয়। মাঝে মাঝে ভাবি, এই জগৎ সংসার কেমন করে শূন্য থেকে শূন্যে মিলিয়ে যায়।

কি কারণে ধর্ষণ?

১২ ই অক্টোবর, ২০২০ দুপুর ১:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যৌন সহিংসতা, বিশেষ করে ধর্ষণ, আধুনিক সমাজের সবচেয়ে ভয়াবহ ও মানবিক বিপর্যয়ের একটি রূপ, যার শিকড় কেবল যৌন বাসনায় নয়, বরং সমাজে প্রতিষ্ঠিত পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার কাঠামোতে গভীরভাবে প্রোথিত। বহু সমাজবিজ্ঞানী এবং মনস্তত্ত্ববিদ একমত যে, ধর্ষণের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য যৌন পরিতৃপ্তি নয়, বরং এটি এক ধরনের আধিপত্য, নিয়ন্ত্রণ এবং দমন-পীড়নের কৌশল। ইতিহাসজুড়ে আমরা দেখতে পাই, যুদ্ধক্ষেত্রে ‘ওয়ার স্ট্র্যাটেজি’ হিসেবে নারীদের ধর্ষণ করা হয়েছে—বিজয়কে প্রতিষ্ঠা করার এক নিপীড়নমূলক উপায় হিসেবে, যা প্রমাণ করে ধর্ষণ আসলে একটি ‘ক্ষমতা প্রদর্শনের নৃশংস হাতিয়ার’।

বর্তমান বিশ্বে ধর্ষণ একটি নীরব মহামারীতে পরিণত হয়েছে। ইউনিসেফ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী প্রতি আটজন নারীর একজন এবং প্রতি দশজন শিশুর একজন ১৮ বছরের আগেই যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। এই চিত্র শুধু একটি সংখ্যার নয়, বরং হাজার হাজার নির্যাতিত আত্মার আর্তনাদের প্রতিবিম্ব, যারা বিচারহীনতার সংস্কৃতির মাঝে নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আরও গভীর সংকটে নিমজ্জিত। ২০১৯ সালে সরকারি তথ্যমতে দেশে প্রায় ৬০০০ ধর্ষণ মামলা নথিভুক্ত হয়েছে, যদিও বাস্তব সংখ্যা এর চেয়েও বহুগুণ বেশি হতে পারে, কারণ সমাজ ও পরিবারভেদে ‘লজ্জা’ ও ‘সমাজিক অপমানের’ ভয়ে বহু ভুক্তভোগী অভিযোগই করতে পারে না। তারচেয়েও দুঃখজনক বিষয় হল, এসব মামলার প্রায় ৯৭ শতাংশই চার্জশিট পর্যন্ত পৌঁছায় না। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে নথিভুক্ত ১৭,২৮৯টি মামলার মধ্যে মাত্র ৬৭৩টি মামলায় দোষীদের শাস্তি হয়েছে, যা আমাদের বিচার ব্যবস্থার অকার্যকারিতা ও দুর্বলতা প্রকাশ করে।

বাংলাদেশের ধর্ষণের ঘটনাগুলোর পেছনে একাধিক সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ বিদ্যমান। এর মধ্যে রয়েছে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, যেখানে নারীদেরকে ‘অধীনস্থ’ বা ‘ভোগ্যপণ্য’ হিসেবে দেখার চর্চা প্রথাগতভাবে চলে আসছে। নারীকে তার পোষাক, আচার বা প্রকাশভঙ্গির জন্য দায়ী করা—অর্থাৎ ভিকটিম ব্লেমিং-এর যে সংস্কৃতি সমাজে ছড়িয়ে আছে, তা ধর্ষণকারীদের মনোবলে পুষ্টি জোগায়। অপরদিকে, যৌন শিক্ষার ঘাটতি, পর্নোগ্রাফির অবাধ বিস্তার, এবং সামাজিক সচেতনতার অভাব যৌন সহিংসতার হারকে বাড়িয়ে তুলছে প্রতিনিয়ত। এই বিপদ আরও গভীর হয় যখন দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই ধর্ষকের পরিচয় থাকে অত্যন্ত পরিচিত—পিতা, ভাই, শিক্ষক বা এমনকি মোল্লার মতো ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। এটি প্রমাণ করে, ধর্ষণ শুধুমাত্র অপরিচিতের হাতে ঘটে না—অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি ঘটে সবচেয়ে নিরাপদ মনে হওয়া পরিবেশেই।

শিশু ধর্ষণ, যার মূল কারণ পেডোফিলিয়া বা বিকৃত মানসিকতা, এটি একটি আলাদা মনোসমস্যা হলেও সমাজে সচেতনতা এবং কঠোর আইন না থাকায় এর বিস্তার থামানো যাচ্ছে না। এর পাশাপাশি, এক ধরনের আইনি ও সামাজিক অনীহা কাজ করছে—যেখানে অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথভাবে মামলা গ্রহণ করে না, প্রমাণ সংগ্রহে অবহেলা করে অথবা বাদীকে হয়রানি করে, যার ফলে অপরাধীরা বারবার ছাড় পেয়ে যায়।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কেবল আইন প্রণয়ন ও কঠোর শাস্তি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন শিক্ষা ব্যবস্থায় সচেতনতা তৈরি, শিশুদের মধ্যে সম্মতি, শরীর সচেতনতা ও নিরাপত্তা বিষয়ক শিক্ষা প্রদান, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং সবচেয়ে বড় কথা, বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একসাথে কাজ করে এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে একজন নারী বা শিশু নিঃসংকোচে বলতে পারে—"আমার শরীর আমার অধিকার"।

যৌন সহিংসতা একটি জাতীয় সংকট, যা মানবিক মূল্যবোধের ওপর আঘাত হানে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে। এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের দরকার বিশ্বাসের পরিবর্তন, মনোভাবের বিপ্লব এবং রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। ধর্ষণ রোধ করা কেবল আইন প্রয়োগকারীর দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের প্রতিটি মানুষের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব—একটি নিরাপদ, সম্মানজনক এবং মর্যাদাপূর্ণ সমাজ গঠনের লক্ষ্যে।

বিশেষত শিশু ধর্ষণের ক্ষেত্রে, প্রতিবেদন বলছে:
২৭৫–৩১০ মিলিয়ন ছেলে-মেয়ে, অর্থাৎ প্রতি ১১ জনে একজন শিশু শারীরিক বা যৌন নিপীড়নের শিকার—জেনারাল ইউনিসেফ রিপোর্ট।

দেশে ধর্ষণের পিছনে কারণগুলো হলো:
-সামাজিক ভিকটিম-ব্লেমিং ও প্রতিপক্ষতার সংস্কৃতি, যা নির্যাতিতকে দোষীর দিকেই ঠেলে দেয়।
-আইনি প্রথাগুলোর দুর্বলতা—দীর্ঘ বিচারকার্য, সবল প্রমাণের অভাব, মারাত্মক সাজার দৃঢ়তা না থাকা ইত্যাদি।
-পিতৃতান্ত্রিক মনোভাব, নারীর উপযোগী হওয়া যুক্তিবাদ এবং মার্গ-নির্দেশিত মিথ্যাচার।

প্রতিরোধ ও সমাধান
১-আইনি সংস্কার এবং দ্রুত বিচার
-ধর্ষণে মৃত্যুদণ্ড-সহ কঠোর শাস্তি আইনজীবনে চুক্তি
-ফাস্ট‑ট্র্যাক কোর্ট বানিয়ে বিচার দ্রুততর করার ‍প্রয়োজন
২-বিষয়‑সমন্বিত শিক্ষা
-স্কুলে সহমর্মিতা, সম্মতি ও যৌন নিরাপত্তা ভিত্তিক শিক্ষা চালু
৩-আইন প্রয়োগ ও তদন্তে স্বচ্ছতা
-পুলিশ-বিচার বিভাগে প্রশিক্ষণ ও “ভিকটিম-সেন্ট্রিক” মনোভাব তৈরি করা প্রয়োজন
-চার্জশিট ও দোষী করণের হার বাড়িয়ে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি
৪-মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা ও পুনর্বাসন
-ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার, কাউন্সেলিং সেবা এবং নিরাপদ আশ্রয় উপশম প্রয়োজন
৫-সচেতনতা ও পারিবারিক ভূমিকা
-পরিবারদের মধ্যে ‘কনসেন্ট’ ও সমান মর্যাদা শিক্ষার গুরুত্ব, বৃক্ষের মতো ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজন
-পুরুষদের অন্তর্ভুক্ত করণ, বিশেষ করে কিশোরদের প্রশিক্ষণ programme রাখা জরুরি
৬-প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা
-সহিংসতা প্রতিরোধে সিসিটিভি, হেল্প‑লাইট ও ই‑রক্ষণ সংযোজন করতে হবে
৭-মিডিয়া ও সংস্কৃতি
-মিডিয়াম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মেয়েদের বিরুদ্ধে বর্ণনা চিত্রের পরিবর্তন, উদ্ধ্যোগমূলক প্রতিবেদন ও সহানুভূতিশীল প্রচার প্রয়োজন

উপসংহার
ধর্ষণ হল যৌনতা নয়—এটা পর্নোগ্রাফি, পুরুষতন্ত্র ও ক্ষমতার অপব্যবহার। এটি একটি বৈশ্বিক মহামারী, যা বাচ্চা ও নারী–পুরুষ উভয়কেই আঘাত করে। বাংলাদেশের মতো দেশে ভিকটিম-ব্লেমিং, আইনি দুর্বলতা ও সামাজিক কলঙ্ক পরিস্থিতিকে তীব্র করে তোলে।

তবে আমরা যদি আইন-প্রয়োগকারীদের দায়িত্বশীল আচরণ, প্রযুক্তির নিরাপত্তা ব্যবস্থা, গভীর শিক্ষণ ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন একত্রে করি, তবে এই সংকট নিরসন সম্ভব। একদল মানুষ থেকে অনেক মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারলেই বহু মানুষ রক্ষা পাবে। ধর্ষণকে বাধা দিয়ে ক্ষত হয়ে যাওয়া মানুষের সুরক্ষা ও মর্যাদা রক্ষা-ই আমাদের আসল সংগ্রাম।

সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জুন, ২০২৫ দুপুর ১:০১
৮টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আগামী নির্বাচন কি জাতিকে সাহায্য করবে, নাকি আরো বিপদের দিকে ঠেলে দিবে?

লিখেছেন জেন একাত্তর, ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০২৫ রাত ৮:১২



আগামী নির্বচন জাতিকে আরো কমপ্লেক্স সমস্যার মাঝে ঠেলে দিবে; জাতির সমস্যাগুলো কঠিন থেকে কঠিনতর হবে। এই নির্বাচনটা মুলত করা হচ্ছে আমেরিকান দুতাবাসের প্রয়োজনে, আমাদের দেশের কি হবে, সেটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফেসবুক বিপ্লবে সেভেন সিস্টার্স দখল—গুগল ম্যাপ আপডেট বাকি

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০২৫ রাত ৯:৩০




কিছু তথাকথিত “বাংলাদেশি বিপ্লবী” নাকি ঘোষণা দিয়েছে—ভারতের সেভেন সিস্টার্স বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে! সহযোগী হিসেবে থাকবে বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী আর পাকিস্তানি স্বপ্ন।শুনে মনে হয়—ট্যাংক আসবে ইনবক্সে। ড্রোন নামবে লাইভ কমেন্টে। আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গু এনালিস্ট কাম ইন্টারন্যাশনাল সাংবাদিক জুলকার নায়েরের মাস্টারক্লাস অবজারবেশন !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই ডিসেম্বর, ২০২৫ রাত ১২:২৬

বাংলাদেশের দক্ষিণপন্থীদের দম আছে বলতে হয়! নির্বাচন ঠেকানোর প্রকল্পের গতি কিছুটা পিছিয়ে পড়তেই নতুন টার্গেট শনাক্ত করতে দেরি করেনি তারা। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ ঘিরে নতুন কর্মসূচি সাজাতে শুরু করেছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিবাদ: দিল্লির ছায়া থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র

লিখেছেন কৃষ্ণচূড়া লাল রঙ, ১৮ ই ডিসেম্বর, ২০২৫ ভোর ৫:৫৭

একটা সত্য আজ স্পষ্ট করে বলা দরকার—
শেখ হাসিনার আর কোনো ক্ষমতা নেই।
বাংলাদেশের মাটিতে সে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত।

কিন্তু বিপদ এখানেই শেষ হয়নি।

ক্ষমতা হারিয়ে শেখ হাসিনা এখন ভারতে আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

Grameen Phone স্পষ্ট ভাবেই ভারত প্রেমী হয়ে উঠেছে

লিখেছেন অপলক , ১৮ ই ডিসেম্বর, ২০২৫ দুপুর ২:৪৯



গত কয়েক মাসে GP বহু বাংলাদেশী অভিজ্ঞ কর্মীদের ছাটায় করেছে। GP র মেইন ব্রাঞ্চে প্রায় ১১৮০জন কর্মচারী আছেন যার ভেতরে ৭১৯ জন ভারতীয়। বলা যায়, GP এখন পুরোদস্তুর ভারতীয়।

কারনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×