somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কবি আবিদ আনোয়ারের "প্রতিবিম্ব এবং আমি" কবিতা: ভাব ও শৈলী বিশ্লেষণ।

০৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ২:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কবি আবিদ আনোয়ারের "প্রতিবিম্ব এবং আমি" কবিতা: ভাব ও শৈলী বিশ্লেষণ।
- শাহাদাতুর রহমান সোহেল

আবিদ আনোয়ার (জন্ম: ২৪ জুন, ১৯৫০) বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য কবি, প্রাবন্ধিক, গল্পকার ও গীতিকার। তিনি বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কারসহ অনেকগুলো পুরস্কার পেয়েছেন। নীচে কবি আবিদ আনোয়ারের “প্রতিবিম্ব এবং আমি” কবিতা এবং আমার লেখা এই কবিতার ভাব ও শৈলী বিশ্লেষণ দেয়া হলো:

প্রতিবিম্ব এবং আমি
-আবিদ আনোয়ার

অবুঝ শৈশবে
আয়নায় নিজেকে দেখে ধরতে গিয়েছি,
বয়স ও বুদ্ধির কাছে পাঠ নিতে-নিতে
অতঃপর জেনে গেছি:
কাচের ওপারে থাকে কায়াহীন ছায়ার মানুষ;
যে-আমি এপারে আছি
এটাই প্রকৃত আমি শরীরে-সত্তায়।
এখন শৈশব নেই
তবুও যুক্তির কথা মাথায় ঢোকে না,
বুদ্ধিনাম্নী শিক্ষয়িত্রী মারা গেলে পর
বোধি এসে পাকাপোক্ত আসন গেড়েছে;
একান্ত নিবিষ্টমনে আয়নায় নিজেকে দেখে
এখনও তো ভুল করে ফেলি:
কে আমি প্রকৃত আমি মাঝেমাঝে বুঝতে পারি না....
তবে কি ওপারে যিনি তিনিই মালিক?
আমি তার প্রতিবিম্ব অথবা সুদূর
ছায়াপথে আবর্তিত
কর্কট-নামীয় কোনো রাহু কিংবা নক্ষত্রের দাস?

ভাব বিশ্লেষণ: "প্রতিবিম্ব এবং আমি" কবিতায় আবিদ আনোয়ার মানসিক অন্তর্দ্বন্দ্ব ও আত্ম-অন্বেষণের একটি গভীর ভাবধারা প্রকাশ করেছেন। কবিতাটি প্রধানত ব্যক্তি সত্তা এবং তার প্রতিবিম্বের মধ্যে এক আধ্যাত্মিক এবং দার্শনিক সংঘাতকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। কবি নিজের শৈশব থেকে প্রাপ্ত বাস্তব অভিজ্ঞতা, বয়সের সাথে সাথে প্রাপ্ত জ্ঞান এবং বুদ্ধির অগ্রগতির মধ্য দিয়ে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে একধরনের প্রশ্নবোধক অনুভূতির সম্মুখীন হন।
শৈশবের অবুঝ বালক আয়নায় দেখা নিজের প্রতিবিম্ব ধরতে চেয়েছে, কিন্তু বয়স ও শিক্ষার মাধ্যমে তিনি বুঝেছেন যে আয়নার ওপারে থাকা ব্যক্তিটি আসলে কায়াহীন ছায়ামাত্র। এটি মানব জীবনের প্রতীক, যেখানে আমাদের বাইরের প্রতিবিম্ব হয়তো আমাদের সত্যিকারের রূপ নয়, বরং আমাদের অভ্যন্তরীণ সত্তা প্রকৃত আমি। তবে কবি যখন বলেন, "এখন শৈশব নেই, তবুও যুক্তির কথা মাথায় ঢোকে না," তখন বোঝা যায় যে তিনি আত্ম-সত্তার প্রকৃত অর্থ বুঝতে গিয়ে নতুন এক ধরণের ধোঁয়াশার সম্মুখীন হচ্ছেন। বুদ্ধি তাকে শেখালেও, তাঁর বোধি বা অন্তর্দৃষ্টি তাকে আরও গভীর স্তরের চিন্তার দিকে নিয়ে যায়, যেখানে তিনি আয়নার ওপারে থাকা সত্তাকে নিয়ে নতুন প্রশ্ন তোলেন: "কে আমি প্রকৃত আমি?"
কবিতার শেষাংশে কবি এক ধরণের আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানে প্রবেশ করেন। তিনি ভাবতে থাকেন, আয়নার ওপারে থাকা সত্তা কি প্রকৃত আমি, নাকি তা কেবল একজন "ছায়ার মানুষ"? কবি এখান থেকে শুরু করেন এক আধ্যাত্মিক যাত্রা। এটি আত্ম-জিজ্ঞাসার মাধ্যমে মানুষের সীমাবদ্ধতাকে বুঝতে চাওয়ার প্রয়াস। "তবে কি ওপারের সত্তাই প্রকৃত মালিক?" এই প্রশ্নটি মানবজীবনের এক গভীর দার্শনিক সংকটকে ইঙ্গিত করে - আমরা কি নিজের নিয়তির নিয়ন্ত্রণে আছি, নাকি কোনো অদৃশ্য শক্তি আমাদের পরিচালিত করছে? কর্কট-রাহুর মতো জ্যোতিষশাস্ত্রের উল্লেখ নিয়তির প্রতি জিজ্ঞাসাকে আরও গভীর করে তুলেছে।
শিল্পের দিক থেকে, এই কবিতায় গভীর দার্শনিক ভাবনা রয়েছে, যা আত্মপরিচয় এবং অস্তিত্বের দ্বন্দ্ব নিয়ে কাজ করে। প্রতীকী ভাষা এবং বিমূর্ত চিন্তার সাহায্যে কবি আমাদের নিয়ে যান এক আধ্যাত্মিক যাত্রায়, যেখানে আমরা নিজের সত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হই।

শৈলী বিশ্লেষণ: আবিদ আনোয়ারের "প্রতিবিম্ব এবং আমি" একটি দার্শনিক কবিতা। কবিতাটি শৈল্পিকভাবে প্রতীকী এবং গভীর ভাবধারায় পরিপূর্ণ। এটি ভিন্নধর্মী অলংকার ও বিমূর্ততার জন্য একটি চিন্তাশীল ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা প্রদান করে। কবিতার শৈলী গঠন ও উপস্থাপনায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে:
১) প্রতীকের ব্যবহার: "প্রতিবিম্ব এবং আমি" কবিতাটি মূলতঃ প্রতীকী। কবিতায় ব্যবহৃত প্রতীকগুলো গভীরভাবে প্রতিটি স্তরে জীবনের জটিলতা ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বকে প্রকাশ করে। নিচে এই প্রতীকগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
আয়না ও প্রতিবিম্ব:
আয়না এখানে আত্মপরিচয় বা নিজের প্রতি মানুষের উপলব্ধির প্রতীক। আয়নায় দেখা প্রতিবিম্ব মানুষকে তার বাহ্যিক রূপ দেখায়, কিন্তু তা সত্যিকার সত্তা নয়। কবি তার "প্রতিবিম্ব" এবং "আসল সত্তা" নিয়ে দ্বন্দ্বে পড়েছেন, যা আত্ম-সন্ধান এবং নিজের ভেতরের সত্য খোঁজার এক প্রতীক। আয়না প্রতিফলন করে, কিন্তু তা একটি কায়াহীন ছায়া। কবি মনে করেন, আয়নার ওপারে থাকা সত্তাটি কি প্রকৃত সত্তা, নাকি তা কেবল বাহ্যিক চেহারার প্রতিফলন।
শৈশব:
শৈশব এখানে জীবন ও অভিজ্ঞতার প্রাথমিক স্তরের প্রতীক, যখন মানুষ সরল বিশ্বাসে পৃথিবীকে বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু বয়স এবং অভিজ্ঞতার সাথে সাথে মানুষের চিন্তার জগৎ আরও জটিল হয়ে ওঠে। শৈশবের অবুঝ মানসিকতা প্রতীক হিসেবে এখানে সরলতা এবং সরাসরি বাস্তবতার মধ্যে বিভাজন নির্দেশ করে।
কায়াহীন ছায়ার মানুষ:
এটি এক ধরনের ছায়ামূর্তির প্রতীক, যা আসলে মানসিক বা আত্মিক দ্বন্দ্বের প্রতীক হতে পারে। আমরা কি কেবল এই পৃথিবীতে এক বাহ্যিক শরীর নিয়ে আছি, নাকি আমাদের আত্মিক সত্তার আরও গভীর কিছু নিয়ে আছি?
রাহু এবং নক্ষত্রের দাস:
এই শব্দগুলো আধ্যাত্মিক এবং জ্যোতির্বিদ্যার ধারণার প্রতীক, যা মানুষের ভাগ্য, নিয়তি এবং নিয়ন্ত্রণহীনতার দিকটি তুলে ধরে। কবি নিজেকে কখনও রাহুর প্রভাবাধীন কোনো গ্রহের মতো দাস ভাবছেন, যা আমাদের মানবজীবনের সীমাবদ্ধতার প্রতীক।
বুদ্ধি ও বোধি:
বুদ্ধি এবং বোধি এখানে জ্ঞান এবং উপলব্ধির মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করে। বুদ্ধি বা যুক্তি মানুষকে কিছু শেখায়, কিন্তু বোধি বা অন্তর্দৃষ্টি মানুষকে গভীরভাবে সত্য উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। এটি আধ্যাত্মিক জ্ঞানের প্রতীক।
প্রতীকী ভাবনা: কবিতার প্রতীকী ভাবনা মূলত মানুষের আধ্যাত্মিক এবং আত্ম-অন্বেষণকে নির্দেশ করে। "প্রতিবিম্ব" প্রতীকটি শুধু বাহ্যিক রূপের দিকে নয়, আত্মার গভীর অনুসন্ধানের প্রতীকও বটে। কবি আত্মজিজ্ঞাসার মাধ্যমে মানুষের ভেতরের সত্য, আত্মপরিচয় এবং অস্তিত্বের অর্থ খোঁজার প্রতীকী এক যাত্রায় পাঠককে নিয়ে যান।

২) কবিতার ছন্দ ও ভাষা শৈলী:
ক) এই কবিতার ভাষা এবং বিন্যাস গদ্য-কবিতার ধাঁচে গড়ে উঠেছে। কবিতাটি দেখতে গদ্য কবিতার মতো হলেও আসলে মুক্তক অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত।
খ) স্পষ্ট, সরল এবং সংলাপধর্মী ভাষা: কবি কোনো অতিরিক্ত ছন্দ বা অলঙ্কারের চাপে না পড়ে সহজভাবে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন।
গ) বাক্যের ভাঙচুর এবং বিরতি: বাক্যের মধ্যে থাকা সামান্য ছেদ ও বিরতি কবির ভাবনাগুলির ভঙ্গুরতাকে প্রতিফলিত করে। এটি পাঠককে থেমে থেমে ভাবতে বাধ্য করে।

৩) আবহ ও মুড:
কবিতার আবহ বিষন্ন, ভাবগম্ভীর এবং আত্মজিজ্ঞাসামূলক। নিজের সত্তা ও নিয়তি নিয়ে কবি উদ্বিগ্ন। এই আবহ একটি অসন্তুষ্ট আত্মপরীক্ষার মুড তৈরি করে।
বিষাদ ও সংশয়: কবিতার প্রতিটি স্তবকে আত্মপরিচয়ের দোলাচল এবং বিভ্রান্তি ফুটে উঠেছে।
নিয়তির প্রতি জিজ্ঞাসা: কবি প্রশ্ন তুলেছেন, সত্যিকারের নিয়ন্ত্রক কে? তিনি নিজে, নাকি অন্য কোনো শক্তি?

৪) অলংকার বিশ্লেষণ:
আবিদ আনোয়ারের "প্রতিবিম্ব এবং আমি" কবিতায় অলংকারের ব্যবহার গভীর ও চিন্তাশীল। কবি বিভিন্ন রূপক, উপমা এবং চিত্রকল্পের সাহায্যে মানসিক দ্বন্দ্ব ও আত্মজিজ্ঞাসার ভাবনা ফুটিয়ে তুলেছেন। নিচে কবিতায় ব্যবহৃত উল্লেখযোগ্য অলংকারগুলো আলোচনা করা হলো।
ক) রূপক (Metaphor)

রূপক ব্যবহার করে কবি কোনো বিষয়কে সরাসরি না বলে অন্য উপাদানের মাধ্যমে ইঙ্গিত করেছেন।
"কাচের ওপারে থাকে কায়াহীন ছায়ার মানুষ" - এখানে 'কায়াহীন ছায়া' ব্যবহার করে কবি আত্ম-পরিচয় ও মায়ার মধ্যে পার্থক্য বোঝাতে চেয়েছেন। বাস্তব সত্তা (এইপারের মানুষ) আর আয়নায় দেখা ছায়া আমাদের বিভ্রমের প্রতীক।
"বুদ্ধিনাম্নী শিক্ষয়িত্রী মারা গেলে পর / বোধি এসে পাকাপোক্ত আসন গেড়েছে" - এখানে 'বুদ্ধি' এবং 'বোধি' - দুটি ভিন্ন মানসিক অবস্থাকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, যা একটি শক্তিশালী রূপক।
খ) উপমা (Simile)

যদিও কবিতায় সরাসরি উপমার ব্যবহার সীমিত, কিছু জায়গায় তুলনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
"আমি তার প্রতিবিম্ব অথবা সুদূর ছায়াপথে আবর্তিত... দাস?"
এখানে কবি নিজের অস্তিত্বকে প্রতিবিম্ব বা দূর ছায়াপথের কোনো নক্ষত্রের দাস হিসেবে কল্পনা করেছেন। এটি জীবনের অনিশ্চয়তা ও নিয়তির প্রতি মানুষের অসহায়ত্ব বোঝায়।
গ) চিত্রকল্প (Imagery)

কবিতার বিভিন্ন চিত্রকল্প পাঠকের সামনে বাস্তব ও মানসিক দ্বন্দ্বের ভাবনাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
"একান্ত নিবিষ্টমনে আয়নায় নিজেকে দেখে / এখনও তো ভুল করে ফেলি"
এই চিত্রকল্পে কবি নিজের আয়নামুখী মনোযোগ ও আত্মজিজ্ঞাসার ভ্রান্তি তুলে ধরেছেন, যা পাঠকের মনে বিভ্রম এবং দ্বিধার অনুভূতি সৃষ্টি করে।
"সুদূর ছায়াপথে আবর্তিত কর্কট নামীয় কোনো রাহু"
এখানে ছায়াপথ, রাহু, এবং কর্কট চিত্রকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এগুলো আমাদের নিয়তি ও অদৃশ্য শক্তির প্রভাবের প্রতি ইঙ্গিত করে।
কবিতার প্রতিটি স্তবকই এক একটি চিত্রকল্প - আয়না, ছায়া, কাচ, বোধি, রাহু, নক্ষত্র - সবই মিলে এক সুররিয়াল কোলাজ তৈরি করে। এই কোলাজে সময়, স্মৃতি ও আত্মপরিচয় একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। কবির ভাষা স্বচ্ছ অথচ রহস্যময়; যেন আয়নার মতোই প্রতিফলিত কিন্তু অপ্রাপ্য।
ঘ) প্রতিসমতা (Parallelism)

কবিতায় ভাবনার পুনরাবৃত্তি ও প্রশ্নগুলোর ধারাবাহিক ব্যবহার প্রতিসমতা তৈরি করেছে।
"কে আমি প্রকৃত আমি মাঝেমাঝে বুঝতে পারি না..."
এই লাইন কবিতার বিভিন্ন স্তরে ফিরে আসে, যা কবির আত্ম-অন্বেষণ এবং সংশয়ের চক্রাকার প্রকৃতিকে বোঝায়।
ঙ) অন্তবর্ণনা (Internal Monologue)

কবি কবিতার ভেতরে নিজের সঙ্গে কথা বলেছেন, যা কবিতার একটি বিশেষ অলংকারিক বৈশিষ্ট্য। "তবে কি ওপারে যিনি তিনিই মালিক?" এই প্রশ্ন আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের একটি রূপ, যেখানে কবি নিজের মনের ভাবনাকে প্রকাশ করছেন। এটি মানুষের নিজস্ব চিন্তার সঙ্গে কথোপকথনের প্রতিফলন।
চ) আধ্যাত্মিক রূপক (Spiritual Metaphor)

"কর্কট নামীয় কোনো রাহু কিংবা নক্ষত্রের দাস"
এখানে কর্কট এবং রাহু আধ্যাত্মিক রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা জীবনে নিয়তির প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত দেয়।
৫. শৈল্পিক ভাষার ব্যবহার:
কবিতায় যে শৈল্পিক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে তা কবিতার আবেগ ও ভাবনার গভীরতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। কবির প্রতীক এবং অলংকারের ব্যবহারে কবিতার ভাষায় এক ধরনের দৃষ্টিনন্দনতা পেয়েছে, যা পাঠকের মনে চিত্রায়িত হয়। এসব উপরে আলোচিত হয়েছে। বাক্যের ভাঙচুর ও বিরতির ব্যবহার (Fragmentation and Pauses) - এসব উপরে কবিতার ছন্দ ও ভাষা শৈলীতে আলোচিত হয়েছে। এছাড়া কবিতার ভাষায় ধ্যানের (Meditative Language) ছাপ রয়েছে। কবি আয়নায় নিজেকে দেখে গভীরভাবে ভাবতে থাকেন। "একান্ত নিবিষ্টমনে আয়নায় নিজেকে দেখে / এখনও তো ভুল করে ফেলি"- এই লাইনগুলো ধ্যানমগ্ন অবস্থার প্রতিফলন, যেখানে কবি নিজের আত্মপরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তিতে ভোগেন। আধ্যাত্মিক ভাষা (Spiritual Language) ব্যবহৃত হয়েছে: "তবে কি ওপারে যিনি তিনিই মালিক?" এখানে কবি নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন তুলেছেন - মানুষ কি নিজের জীবনের মালিক, নাকি নিয়তি বা কোনো আধ্যাত্মিক শক্তির অধীন? "ছায়াপথে আবর্তিত কর্কট নামীয় কোনো রাহু": এটি আধ্যাত্মিক ভাষা তুলে ধরে। ভাষায় সরলতা ও গভীরতা উভয়ই আছে। এভাবে কবিতাটিতে ভাষা ব্যবহারে নানারূপ শৈল্পিকতা রয়েছে।



৬) শিল্পের সার্বজনীনতা:
কবিতাটি সময় ও স্থান নির্বিশেষে সবার জন্য প্রাসঙ্গিক, কারণ আত্মপরিচয়ের প্রশ্নটি মানব জীবনের সার্বজনীন এক অন্বেষা। যে কেউই নিজের জীবনে কখনো না কখনো "আমি কে?" প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। এভাবে কবিতাটি এক ব্যক্তির ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে সার্বজনীন বোধে রূপান্তরিত হয়। এর ফলে কবিতাটি বিশ্বজনীনও হয়ে উঠে।

তুলনামূলক আলোচনা
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ বয়সের কাব্যগ্রন্থ শেষ লেখা’র ১৩ নম্বর কবিতায় আত্মসত্তার অনুসন্ধান করা হয়েছে। তা সম্পূর্ণ নীচে দেয়া হলো:

প্রথম দিনের সূর্য
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

প্রথম দিনের সূর্য
প্রশ্ন করেছিল
সত্তার নূতন আবির্ভাবে -
কে তুমি?
মেলে নি উত্তর।

বৎসর বৎসর চলে গেল,
দিবসের শেষ সূর্য
শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল
পশ্চিম সাগর তীরে,
নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় -
কে তুমি?
পেল না উত্তর।

কবি আবিদ আনোয়ারের “প্রতিবিম্ব এবং আমি” কবিতাটিও একই বিষয়ে লিখিত। সাধারণ দৃষ্টিতে দেখলেও কবি আবিদ আনোয়ারের কবিতাটি উত্তম বিবেচিত হয়। বিশ্বখ্যাত সুফী কবি আল্লামা রূমী (রহ:) একটি কবিতায় বলেন: "I am not this hair, I am not this skin, /I am the soul that lives within." (Who Am I) । কবি Carl Sandburg তার Who Am I? কবিতায় বলেন: My head knocks against the stars./ My feet are on the hilltops./ My finger-tips are in the valleys and shores of universal life. / Who am I?/ ........ ...... I am the child of Earth. /I belong to this planet." কবি আবিদ আনোয়ারের “প্রতিবিম্ব এবং আমি” কবিতাটিও একই ধারায় লিখিত একটি সেরা কবিতা।

সর্বশেষ বক্তব্য:
সব দেখা এক রকম না। সাধারণ দৃষ্টিতে দেখলে যাকে সাধারণ মনে হয়, গভীর বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে দেখলে তাকেই অসাধারণ মনে হয়। অবশ্য যদি তা সত্যিই অসাধারণ হয়। সমকালীন সেরা কবি আবিদ আনোয়ারের “প্রতিবিম্ব এবং আমি" কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি অসাধারণ দার্শনিক কবিতা।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:১০
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রুশদেশের চিরায়ত শিশুসাহিত্য

লিখেছেন জ্যোতির্ময় ধর, ১৮ ই মে, ২০২৬ রাত ৩:১৭


ঊনবিংশ শতাব্দীর মহান লেখক চেখভ , তুর্গেনেভ , দস্তয়েভ্‌স্কি , তলস্তয়ের নাম বিশ্ববাসীর কাছে সুপরিচিত। এই লেখকেরা - রাশিয়ার জাতীয় গৌরব । ঊনবিংশ শতাব্দীর রুশ লেখকদের মধ্যে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভবিষ্যতের স্পষ্ট বার্তা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৮ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:১৭



কারিনা ইস্যুতে যা ঘটেছে, তা শুধু একটি পরিবারের আত্মপক্ষ সমর্থন না- এটা জনমতের একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। যদি শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেই হেটস্পিচ আসতো, তাহলে কারিনার মা জানাজার পর... ...বাকিটুকু পড়ুন

রক্তের দাগে ধুয়ে যাওয়া আভিজাত্য: কারিনা কায়সারের বিদায় এবং আমাদের কিছু নির্মম শিক্ষা

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১৮ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৯



​বাঙালি সংস্কৃতির চিরায়ত নিয়মে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ সব বৈরিতা ভুলে যায়। জানাজার খাটিয়া সামনে রেখে স্বজনরা কেবল ক্ষমা চান, চিরবিদায়ের প্রার্থনা করেন। কিন্তু গতকাল আমরা এক অভূতপূর্ব ও হাহাকারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ড. ইউনুস শুধুমাত্র বাই বর্ন বাংলাদেশী!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১০


আমেরিকার সাথে চুক্তির কথাটি আসলেই ইউনুসের উপদেষ্টাসহ তার লোকজন বলে বিএনপি ও জামাতের সাথে আলোচনা করেই চুক্তিটি হয়েছে!
বিএনপি ও জামায়েতের সাথে আলোচনা করলেই কি এই চুক্তি সঠিক হয়ে যায়?

আপনাদের বিএনপি-... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিজেকে জানুন, নিজেকে গড়ুন

লিখেছেন মোঃ ফরিদুল ইসলাম, ১৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৭

"নিজেকে জানুন, নিজেকে গড়ুন — নীরবতা হোক আপনার শক্তির সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র।"
সব সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আপনার একার না। আপনি যদি বারবার বোঝান, কিন্তু কেউ বুঝতে না চায় — তাহলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×