somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জীবন যখন জার্মানিতে : ০৩ (ফেরার পথ ভয়ংকর)

১৯ শে ডিসেম্বর, ২০১৬ ভোর ৬:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পশ্চিমের Mittelland canal এবং পূর্বের Elbe-Havel Canal, এই দুইয়ের সংযোগে এলবে নদীর উপর দিয়ে বয়ে চলা সেন্ট্রাল জার্মানি তে ইউরোপের সবচেয়ে বড় ক্যানাল-আন্ডারব্রিজ মাগদেবুর্গ ওয়াটারব্রিজ (Wasserstraßenkreuz Magdeburg) -এর এতো কাছাকাছি থেকেও যদি এটার অভিজ্ঞতা না নেয়া যায় তাহলে কিভাবে হয় ! তো, হঠাত করেই যাত্রা,সাথে কিছু বন্ধুদের নিয়ে।
থিয়েটার, জাদুঘর আর চিড়িয়াখানা সহ আকর্ষণীয় এই মাঝারী সাইজের (২০১ বর্গ কি,মি,) মাগদেবুর্গ শহরের ২,৩২,৩৬৪ (২০১২) জন লোকসংখ্যার মধ্যে প্রায় ২১০০০ জন ছাত্র-ছাত্রী, যার মধ্যে প্রায় 20%আন্তর্জাতিক।

Max-Planck-Institut für Dynamik komplexer technischer Systeme, Fraunhofer Institute for Factory Operation and Automation (IFF), এই রকম নামকরা কিছু গবেষনা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও ১৯৯৩ সালে নতুন করে নামকরন করা, ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি ( TU) ,টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ও মেডিকেল স্কুল মিলে বর্তমান ‘ইউনিভার্সিটি অফ মাগডেবুর্গ’ –এর মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং এ নিজস্ব বেশ কিছু গবেষনা প্রতিষ্ঠান, ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত হোখশুলে মাগদেবুর্গ, রাসায়নিক পণ্য, ইস্পাত, কাগজ ও বস্ত্র উৎপাদনে বিশেষ অবদান, সাথে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং প্লান্ট ইঞ্জিনিয়ারিং এ বেশ কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান , সাক্সেন-আনহাল্ট এর “এলবে” নদীর পাড়ে অবস্থিত এই রাজধানী শহরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেকাংশে বহন করে।

১২০০ বছরের ঐতিহাসিক এই শহর City of garden, City of Otto-Von-Guericke, City of Modern buildings, City of Science এই রকম অনেক নামেই পরিচিত। নামকরন গুলো এই শহরের কিছু আকর্ষনীয় জায়গা আর স্থাপত্য থেকে একদম অনুমেয়।
ট্রামে করে শহরের ব্যস্ততম অংশ থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে বাসে চড়ে চলে যেতে হয় একদম শহরের শেষ প্রান্তে। গাছগাছালি ঘেরা একদম সরু রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে নতুন কিছু অভিজ্ঞতা নেয়ার অনুভুতি ভালো ভাবেই জেগে উঠে।

উল্লেখ্য যে, ২৪০০০ টন স্টিল আর ৬৮০০০ ঘন মিটার কনক্রিট এর স্থাপত্যে, ৯১৮ মিটার জলনালি, আর জাহাজ পারাপার করার জন্য ৩৪ মিটার প্রস্থ এবং ৪,২৫ ( চার দশমিক ২৫) মিটার এই ব্রিজটি তৈরী হয় ২০০৩ সালে।

এই আকর্ষণীয় ব্রিজ টির একদম কাছাকাছি যেতে হাঁটতে হয় প্রায় ৪-৫ কিলোমিটার নিকটস্থ বাস স্টেশন থেকে।
হাঁটতে হাঁটতে এখনো ব্রিজটি অনেক টা দূর।বাইসাইকেলে যাওয়াটা সবচেয়ে সুবিধাজনক উপায়। যেতে যেতে শেষ বিকেল হয়ে যাওয়াতে বাতাসের চাপ টাও বেশ ভালো ছিল, আর সময়টা ছিল একেবারেই শীতকাল। সরু রাস্তার দুপাশে ছিল ছোট ছোট কিছু গ্রাম, একেবারে ছবির মত সুন্দর। একদম জন-মানব হীন এই জায়গা গুলোতে হেটে চলার অনুভুতিও অনেক প্রানবন্ত।

৫০০ মিলিয়ন খরচ করে ৫ বছরে তৈরি করা এই ব্রিজটির গুরুত্বটাও অনেক বেশি। Elbe-Havel and the Mittelland Canal এই দুই নদীর উচ্চতার চেয়ে এলবে নদীর উচ্চতা অনেকটাই কম। এতো কম উচ্চতার জন্য মালামাল বাহী জাহাজ ও যাত্রীবাহী জাহাজ গুলোর একটা ক্যানাল পয়েন্টে একবার স্রোতের প্রতিকুলে উপরে উঠতে হত আবার স্রোতের বরাবরে নিচে নামতে হত, এবং শেষে আবার স্রোতের প্রতিকুলে উপরে উঠতে হত প্রায় ১২ কিমি দুরত্ব অতিক্রম করে। পরে জার্মান ইঞ্জিনিয়ারদের করা এই যুগান্তকারী স্থাপত্য বার্লিনের সাথে এক সুদূরপ্রসারী ব্যবসায়িক যোগাযোগ তৈরি করে।

হাঁটতে হাঁটতে পোঁছে গেলাম একেবারেই কাছে। এতো নিখুঁত স্থাপত্য শিল্প দেখে আমরা অভিভুত। নদীর স্রোতের প্রবাহ অনেকটা সাধারন, দেখে বোঝার কোন উপায় নেই যে এটা একটা একটা নদীর উপর দিয়ে বয়ে চলছে। কিছুক্ষণ থাকতেই একটা জাহাজ পার হয়ে গেল ব্রিজটির উপর দিয়ে। ব্রিজটির আশেপাশের প্রকৃতি যেন মনে হল ব্রিজটির সাথে সাথে জার্মানদের নিজের হাতেই গড়া।

তো এবার ফেরার পালা। যদিও আমাদের দেশের মত এখানে সন্ধায় অতটা দিনের আলোর পার্থক্য হয় না, তবে আকাশের রঙ বদলে যায় তো অবশ্যই। একদম অন্ধকার হবার আগেই ফেরার পথ ধরা শুরু। কোন পথে যাবো এটা নিয়ে চলছে মত-পার্থক্য। কেউ বলে যে রাস্তা দিয়ে এসেছি, সেটা দিয়েই ফিরবো, আবার কেউ বলে না, একই পথে ফিরলে নতুন কিছু আর দেখা হবে না, যাত্রাটাও আনন্দদায়ক হবে না। পিছে আর হাঁটব না, সামনে যে রাস্তা দিয়ে যাওয়া যায় সেটা দিয়েই যাবো আমরা, এটাই চুড়ান্ত। এক জনের অমত থাকলেও জনগণের ভোট বলে কথা। গণতন্ত্র তো মানতেই হবে। যদিও আমি ভোটে জয়ী হয়েছিলাম।

তবে এই পথ টা এতোটা কঠিন হবে কারো ধারনা ছিল না। একে তো পায়ে হাঁটতে হবে পুরোটা,তারপর দিনের আলো একবারেই অবশিষ্ট অল্প একটু। আর, পাড়ি দিতে হবে দুইটা বড় বন, তাও এই অন্ধকারে।

পথ যখন ধরেই ফেললাম, শেষ তো করতেই হবে। ওদিকে আবার ট্রাম এর শেষ সময়ের চিন্তা। বন পাড় করতে বেশী দেরি হয়ে গেলে শেষ ট্রাম টা হাতছাড়া ,তাহলে আরো অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে বাসের জন্য। এখানে এই জঙ্গল এ বাস এর সার্ভিস খুব কম সময়ের ব্যবধানে আছে কি না আমাদের সন্দেহ।
অনেক দূর হাঁটলাম, হবে ৪-৫ কিলোমিটার। আসার সময় হেঁটে এসে, আবারও হাঁটা, এখন সবাই ক্লান্ত স্বাভাবিক ভাবেই। আমরা তখন ও বুঝি নি কত কঠিন হতে পারে পরের পথ টুকু। একটা ছোট সাইনবোর্ড ই সব দেখিয়ে দিল।

এই সাইনবোর্ড এ লেখা আছে, মাগদেবুর্গ এখান থেকে ৯ কিমি। তাও ইতিমধ্যে ৪-৫ কিমি হেঁটে এসেছি। তার মানে আমরা এখন শহরের পুরো বাইরে কোথাও। এই বনের নাম টা আমার জানা নাই,সাথে জায়গাটাও। তবে, হেগেনক্রুখ (herrenkrug) নামের একটা বড় বন আমাদের পাড়ি দিতে হবে সেটা আমরা জানতাম। ভাবলাম এই বন টাই হয়ত সেটা। তো, চলল যাত্রা।

একদম অন্ধকার হবে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই। ওই বন পাড় হয়ে একটা খোলা মাঠ। এতো বড় মাঠ জার্মানি তে মেলা বড়ই কঠিন, ঠিক যেন আমাদের গ্রামের মাঠ। ছেলে রা এই সময়টায় খেলাধুলা করে। হৈ-চৈ আর চিতকারে মাঠ রম-রমা। তবে এখানে নিশ্চয় এমন ছেলে মেয়ে পাওয়া যাবে না।
বুঝতে আর একদম এ দেরী হয় নি যে আমাদের ধারনা পুরোটাই ভুল ছিল, আসল বড় বনটা এখনো আমদের সামনে, যেটা কি না হেগেনক্রুখ (herrenkrug). যত বড় বন,
তার চেয়েও বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলল আমাদের যাত্রা, আর ভাবতে লাগলাম গণতন্ত্র সব সময় ভালো ফলাফল দিবে এটা ভাবা টা একদম বোকামি বৈ কি।

পুরো খোলা মাঠ, রাস্তা বোঝাটাও কঠিন, মাঝে মাঝে ভয় হতে লাগল যে, এমন রাস্তায় যাচ্ছি না তো, উলটো কোন পথে ! এতোটা অন্ধকার যে নিজেদের কেই চেনা যাচ্ছে না। আর, জায়গা টা এমন ছিল, যেখানে কোন মানুষের অস্ত্বিত্ব নেই। হ্যা, একটা সাইনবোর্ড সামনে, এবার আগের মত হতাশ করে নি। দেখে অনেকটাই আশ্বস্ত যে, হ্যা, আমরা ঠিক পথেই এগিয়ে এগুচ্ছি।

বোঝাযাচ্ছে, সামনেই সেই বড় বন টি। হেটে হেটে সবাই ক্লান্ত ইতিমধ্যে, কিন্তু বিশ্রাম নেবার সুযোগ নেই। হেঁটে চলছি ঘুটঘুটে অন্ধকারাচ্ছন্ন নিঃশব্দ বনের ভিতর দিয়ে। পাশ দিয়ে বয়ে চলছে এলবে নদী। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে সেই ব্রিজটি যেটা পার করে যেতে হবে শহরের প্রধান অংশে। দ্রুত হেঁটে চললেও ব্রিজটি কাছে না এসে মনে হচ্ছে আরো দূরে সরে যাচ্ছে। ঠিক পথে এগুচ্ছি তো, নাকি, এতো ঘন বনে একই পথে চক্রাকারে ঘুরছি !!! আমরা শঙ্কিত।

এগিয়ে যেতে যেতে এই অন্ধকারে হঠাত করে মাঝে মাঝে টর্চের মত আলো আসছে। আবার, সেটা বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ভয় টা ভুত,প্রেত এর না, ভয়টা আগন্তুক-এর। একে তো আমরা বিদেশী, তারপর আমরা ওদের ভাষা জানি না, আর, এখানে এই কয়েক মাসে বিদেশীদের উপর কিছু কিছু জার্মানের অপ্রত্যাশিত আচরনে একটা ভয়ঙ্কর আশঙ্কা কাজ করতে থাকে। সবাই নিজেকে বা একজন-আরেকজন কে ভয়ের ব্যাপার টা উড়িয়ে দিলেও, ভয় যে সবাই পাচ্ছে, সেটার হাঁটার গতি দেখলে বুঝতে খুব বেশী অসুবিধা হয় না। মানুষ কখনই ভয় পেলে তার দৈহিক আচরন ও গতিবিধি নিয়ন্ত্রন করতে পারে না।

হঠাত আবিস্কার করলাম, কেউ একজন আসলেই ছিল, আমাদের পিছনে। তবে এখন আর নেই। ব্রিজটাও এখন অনেক কাছে। দূরে গ্রামের কিছু বাড়ি দেখা যাচ্ছে। রাস্তা দেখা যাচ্ছে, সাথে আলোর উৎস। দৌড়ে গিয়ে শেষ ট্রাম টা ধরা, আর ক্লান্ত শরীরে, এক আশ্বস্তটার অনুভুতি।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে ডিসেম্বর, ২০১৬ ভোর ৬:১৩
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×