somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মানুষগুলো না বলে চলে যাচ্ছে কেন?

০৪ ঠা আগস্ট, ২০১০ বিকাল ৫:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি গ্রামের মেয়ে। গ্রামেই বড় হয়েছি। এমন পরিবারে জন্ম যে বড় কোন স্বপ্ন দেখাও মানায় না। ছোট বেলায় পড়াশুনায় মোটামুটি ভাল ছিলাম বলে বাবু (বাবা) আমাকে নিয়ে নিজে তো স্বপ্ন দেখা শুরু করলেনই আমার মনেও বুনে দিলেন সেই স্বপ্নের বীজ। বাবু তার মেয়েকে ডাক্তার বানাবেন। তারপর সেই বড় কিছু হবার স্বপ্নকে লালন করতে করতে এস.এস.সি. পাশ করলাম। তার পর বাবা চাইলেন আমি ঢাকায় পড়াশুনা করি। কিন্তু আমি একটু বোকা-সোকা । বাবুর আহ্লাদী মেয়ে। একা একা আমি কিকরে ঢাকায় থাকব? রাস্তায় বের হলে আমি তো দু-পা এগিয়ে আর দু-পা পেছনের ঠিক জায়গাটায় পৌঁছাতে পারবনা। কি করা?

ঢাকায় পিসির বাসা আছে। পিসেমশাই উকিল মানুষ। যদিও ওকালতি ছেড়ে দিয়ে ব্যাবসা করছেন এখন। ভরসা দিলেন তারা। তারপর প্রথম প্রথম বাবু নিজে এ-কলেজ সে-কলেজ দৌড়ালেন। তা, উনি নিজেও তো ঢাকায় থাকেন না। চেনেন না সব। চাকুরীজীবী মানুষ, সময় কম। পিসেমশাই ই ভরসা। সাথে করে নিয়ে যেতেন বাবুকে আর আমাকে। কলেজে ভর্তি হবার পরও একাজ সেকাজ। পিসিদের বাসাতেই ছিলাম ২-৩ মাস। পরে হলে সীট পেয়েছি।

কলেজ জীবনের পর ভর্তি পরীক্ষা। নাহ, ডাক্তার হতে পারলাম না। আমি যেন ভেঙ্গে না পড়ি সেদিকেও পিসেমশাইয়ের খেয়াল। বোঝাতেন সব চাওয়া পূরণ হয় না। বলতেন, তুই খারাপ করলে আমার দুর্নাম হবে, আর তুই ভাল কিছু করতে পারলে তা আমারই গৌরব। এখন যে ভার্সিটিতে পড়ছি তার ফরম নেয়া থেকে শুরু করে ভর্তি করা সবই নিজে আমাকে সাথে নিয়ে করেছেন।

আমি এমনিতে অসুস্থ হই কম। কিন্তু একটু অসুস্থ হলে সহ্য করতে পারি না। কখনো অসুস্থ হলে ডাক্তার দেখানো, ঔষধ আনা, এমনকি সময়মত ঔষধ খাওয়ানো সব পিসেমশাই করতেন। বাবু তো গ্রামে থাকেন। তাঁর দায়িত্বটুকু পিসেমশাই পালন করতেন। বলতেন, আমি তো তোর বাবার মতই রে! আমি যেন পিসিমার চাইতে তাঁর কাছেই বেশী আদর পেয়েছি।

কিছুদিন আগে (১৫-২০দিন হবে হয়তো) একটা শার্ট গিফট করেছিলাম পিসেমশাইকে। মজা করে বললেন, ''আরে তুই কি আমারে গিফট করস, এখনো পড়াশুনাই শেষ হয় নাই, আমি তোরে বিয়া দিমু, তোর বরের কাছ থেইকা গিফট নিমু।'' না, তিনি আমার পড়াশুনা শেষ না হতেই চলে গেলেন। আর কি আশ্চর্য ! আমার দেয়া শার্টটা পরেই শেষ নিঃশ্বাসটা ত্যাগ করলেন!

খবরটা আমি পেয়েছি দেরীতে। বাসায় পৌঁছে শেষ দেখাটাও দেখতে পারলাম না।বেঁচে থাকতে তিনি আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব অনেকের জন্যই যথাসাধ্য করেছেন। তাঁর ছোট ছোট ছেলে দুইটার দিকে তাকানো যাচ্ছে না। আমার সে সাধ্য নেই যে ওদের সান্ত্বনা দেব, সে যোগ্যতা এখনো নেই যে ওদের জন্য কিছু করব। পিসিমা সৌখিন মানুষ। সাজগোজ খুব পছন্দ। তাঁরও তো বয়স তেমন বেশী নয়। সেই পিসিমার পরনে এখন সাদা থান। লাল রঙ এখন থেকে তাঁর জন্য নিষিদ্ধ। আমার সহ্য হচ্ছে না।

পিসেমশাইকে হারিয়ে মনে হচ্ছে আমার জীবনের অনেক বড় একটা অবলম্বন হারিয়ে ফেলেছি। আর আমাকে 'নায়িকা' বলে কেউ ক্ষ্যাপাবে না, কেউ বলবে না ''তোর নায়ক খুঁইজা পাওয়া যাইতেছে না''। আমি সত্যি সত্যি ক্ষেপে যেতাম, আর এখন মনে হচ্ছে কী ছেলেমানুষীই না করতাম! এখন আর কেউ হঠাৎ ডেকে বলবে না ''ওই মাইয়া, তুই দিন দিন ছোট হইয়া যাইতেছিস ক্যান? কালা মাইয়া, তোরে বিয়া দিমু ক্যামনে?''

যাকে ভরসা করে আমার ঢাকায় আসা, আমার শিক্ষাজীবনে বাবা-মায়ের পর যার অবদান সবচেয়ে বেশী, চলার পথে যার দিকনির্দেশনা আমার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তিনি চলে গেলেন এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে। কয়েক মাস আগে হারিয়েছি আরেকজন প্রিয় মানুষকে। শেষ দেখাটুকুও দেখা হয়নি দুজনের কাউকেই। একটু একটু করে যেন পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। ভাল লাগে না আর। সবাই এমন না বলে চলে যাচ্ছে কেন?
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা আগস্ট, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:২০
২৫টি মন্তব্য ২২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০৫ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫৭


আজ দেশজুড়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালিত হচ্ছে। ২৪ -এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিভ্ন্নি সময়ে বহু নিরীহ প্রাণ অকালে ঝরেছে। আবু সাঈদ, মুগ্ধ ছাড়াও নাম জানা-অজানা হাজারো ব্যাক্তি তাদের প্রাণ হারিয়েছেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

তেহরানের ছায়া কি এখন ঢাকা সেনানিবাসে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৩:০১


সোমবার সকালে জলসিঁড়িতে একটা অনুষ্ঠান হলো। ফিতা কাটা, ফুলের তোড়া, বক্তৃতা, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, স্বাভাবিক একটা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যা যা থাকে সবই ছিল। সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামান নিজে হাজির, পাশে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাতিঘর (Lighthouse)

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:৪৬



বাতিঘর (Lighthouse)

বাতিঘর নিয়ে সেই ছোট্টবেলা থেকেই আমার অনেক কৌতুহল ছিল। কেন ঐ বয়সেই বাতিঘর নিয়ে আমার এতটা আগ্রহ ছিল, তার কারণ আজও খুঁজে পাই না। অথচ আমি নিজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

"‘৫ই আগস্ট সবার জন্য ভালো হয়েছে’- একটি বক্তব্যের রাজনৈতিক পাঠ"

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:৪৯



"‘৫ই আগস্ট সবার জন্য ভালো হয়েছে’- একটি বক্তব্যের রাজনৈতিক পাঠ"

"৫ই আগস্ট সবার জন্য ভালো হয়েছে। শেখ হাসিনার প্রয়োজন ছিল বিশ্রাম। আওয়ামী লীগের দরকার ছিল শুদ্ধিকরণ। অন্যান্য দলগুলোরও... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে বিষয়ে মজিবর ও হাসিনা এক বিন্দুও ভুল করেনি!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:২৫


বাংলাদেশের ইতিহাসে মজিবরের শেষ শাসন কাল ও হাসিনার শেষ শাসন কাল দুটি ভিন্ন সময়ে হলেও গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত মিল বহন করে। নির্বাচনী বৈধতার নিরিখে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের সংগে ২০১৪, ২০১৮... ...বাকিটুকু পড়ুন

×