somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমাদের প্রথম টিভি এবং পেশাবের গন্ধ

১৭ ই জুন, ২০১৫ রাত ১১:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



শহীদুল ইসলাম প্রামানিক

১৯৮৩ সালের ঘটনা। গ্রামে তো দুরের কথা শহরের নব্বইভাগ বাসাতেও টিভি নেই। কারণ সেই সময়ে চার, পাঁচ বা সাত হাজার টাকা দিয়ে টিভি কেনা অনেকের পক্ষেই সম্ভব ছিল না। কেরানীরা বেতন পেতেন সর্বসাকুল্যে নয় শত টাকা থেকে বারো তেরো শত টাকা, প্রথম শ্রেনীর অফিসার সাতেরো আঠারো শত টাকা বেতন পেতেন। বেতনের টাকা জমিয়ে টিভি কেনা খুব কষ্ট সাধ্য ব্যাপার ছিল। তাছাড়া সেই সময় এত ঘুষের প্রচলনও ছিল না। ঘুষখোর কেরানী যারা ছিলেন তারা প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়ার ভয়ে টিভি কিনতেন না। কন্ট্রাক্টর, বড় ব্যাবসায়ী, ইঞ্জিনীয়ারসহ ভাল আয়রোজগারওয়ালা ছাড়া সাধারণ রোজগারওয়ালাদের টিভি কেনা সাধ্যের বাইরে ছিল। এখানে উল্লেখ না করে পারছি না, স্বনামধন্য লেখক হুমায়ুন আহমেদকেও শুধু টিভি কেনার টাকা যোগাড় করতে গিয়ে টিভি সিরিয়াল লিখতে হয়েছিল।

আমার বড় ভাই রংপুর শহরে থাকেন। দু’টি বাচ্চা আর ভাবীসহ চারজনের সংসার। ভাই সরকারী চাকরী করেন। বড় বাচ্চাটি ক্লাস থ্রিতে পড়ে। পাশের বাসায় টিভি থাকলেও মেয়েটির মনমতো টিভি দেখা হয় না। বাসায় এসে টিভি কেনার জন্য প্রায়ই বায়না ধরে। তার কান্নাকাটির কারণেই ভাই টিভি কেনার চেষ্টা করেও কিনতে পারছেন না। কারণ টিভির টাকা যোগাড় হয়েও পুরাপুরি হচ্ছে না। এতিমধ্যে দুঃখজনক ঘটনা ঘটে যায়। মেয়েটি হঠাৎ জন্ডিস রোগে আক্রান্ত হয়। চিকিৎসা চলা অবস্থায় লিভার ড্যামেজ হয়ে রংপুর মেডিকেলে মারা যায়। মেয়েটি মারা যাওয়ায় আমাদের পুরো পরিবার শোকাভিভুত হয়ে পড়ে। বড় ভাই টিভি কেনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। যার বায়নার কারণে টিভি কেনার কথা সেই যখন নাই তখন আর টিভি কিনে কি হবে? কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই ছোট মেয়েটিও টিভি কেনার জন্য বায়না ধরে। আমার বড় ভাই মৃত মেয়ের কথা স্মরণ করেই ছোট মেয়ের কথায় টিভি কিনতে উদ্যোগী হন।

আমি ভাইয়ের বাসায় বেড়ানোর জন্য গিয়েছি। বিকাল বেলা টিভি কেনার জন্য ভাই আমাকে নিয়ে রংপুর জাহাজ কোম্পানীর মোড়ে গেলেন। পছন্দনীয় টিভিটি তিনশত টাকার অভাবে কেনা হলো না। মাত্র তিন শত টাকার জন্য টিভি কেনা হলো না এটা আমি মেনে নিতে পারছিলাম না। মনের ভিতর অস্থিরতা কাজ করছিল। আমার মনেও টিভি কেনার অতি আগ্রহ আর জেদ চেপে বসল। পরদিনই গ্রামের বাড়ি এসে বাবার অজান্তে ধান বিক্রি করে পাঁচ শত টাকা নিয়ে রংপুর চলে গেলাম। বাবাকে না জানানোর কারণ হলো এই, সেই সময়ে চার হাজার টাকায় ধানি জমি দশকাঠা কিনতে পাওয়া যেত (যার বর্তমান মূল্য পাঁচ ছয় লাখ টাকা)। বাবাকে টিভি কেনার কথা বললে এত দাম দিয়ে টিভি কেনার অনুমতি নাও দিতে পারে অথবা টিভির বদলে জমি কিনতে বলবে। তাহলে আর টিভি কেনা হবে না।

বিকেলেই ভাইকে সাথে নিয়ে সেই দোকানে চলে গেলাম। সর্বসাকুল্যে তিন হাজার আট শত নব্বই টাকা দিয়ে ১৪ ইঞ্চি সাদা কালো করোনা ব্্রান্ডের টিভি কেনা হলো। টিভির দাম তিনহাজার আট শত টাকা আর এন্টেনা এবং এন্টেনার তার কিনতে লেগেছিল নব্বই টাকা। টিভি কেনার পর তর সইছিলো না, রাতেই এন্টেনা সেট করে ইলেক্ট্রিশিয়ান ডেকে এনে দশ টাকা মজুরী দিয়ে ইলিক্ট্রিক প্লাগ লাগিয়ে টিভি দেখার সাধ পুরণ করি। নতুন টিভি দেখতে আশে পাশের বাসা থেকেও অনেকে এলো। টিভি দেখানোর পাশাপাশি তাদেরকে চা নাস্তাও খাওয়াতে হলো।

তিন দিন পরে বাড়ি এসে টিভি কেনার সুখবরটি ছোট ভাই বোনসহ বাবা মাকে জানালাম। ছোট ভাই বোন শুনে তো মহাখুশি। বাবা টিভি কেনায় মনে মনে খুশি হলেও মুখে কিছুই বললেন না।

টিভি গ্রামের বাড়িতে আনার জন্য পরিকল্পনা করতে লাগলাম। কিভাবে কখন আনবো সেই সময় সুযোগ খুঁজতে লাগলাম। মাসের শেষের দিকে ছোট ভাইকে টিভি আনার কথা বলে রংপুর চলে গেলাম। পরদিনই টিভি নিয়ে ট্রেনে চেপে বসলাম। টিভি আনার সময় বড় ভাই না করতে পারলেন না। গ্রামের বাড়িতে বাবা মাসহ আমরা তিন ভাইবোন থাকি। আমাদের টিভি দেখার আগ্রহের কথা চিন্তা করেই বড় ভাই টিভি নিয়ে নিজে এসে ট্রেনে তুলে দিয়ে গেলেন।

বিকেলের দিকে ট্রেন গাইবান্ধা জেলা শহর পার হয়ে বাদীয়াখালী স্টেশনে এসে থামল। স্টেশনে নেমে দেখি আমার ছোট ভাই সমবয়সী চার পাঁচ জনের একটি বাহিনী নিয়ে হাজির। টিভি ট্রেন থেকে নামাতেই দুই তিন জনে এগিয়ে এসে কে আগে মাথায় নিবে হুড়োহুড়ি করতে লাগল। অবশেষে আমার চাচাতো ভাইয়ের ছেলে ছালাম টিভি মাথায় নিয়ে রওনা হলো।

সেই সময়ে শহর অঞ্চল ছাড়া অনেক গ্রাম গঞ্জের ধারে কাছেও কোন প্রকার বিদ্যুৎ ব্যাবস্থা ছিল না। টিভি চালাবো কি দিয়ে? টিভি কেনার সময় বুদ্ধি করে ব্যাটারীতে চলবে এমন পদ্ধতী দেখেই কিনেছিলাম। নিজের ব্যাটারী না থাকায় পুরাতন বাদিয়াখালি থেকে বরো ভোল্টের একটি ব্যাটারী প্রতিদিন বিশ টাকা ভাড়া হিসেবে নিয়ে নিলাম। টিভি এবং ব্যাটারী নিয়ে বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল। গিয়ে দেখি আরো পাঁচ সাতজন ভাই ভাতিজা আমাদের অপেক্ষায় বাড়ির সামনে বসে আছে। তারা আমরা পৌঁছার আগেই বাঁশ ঝাড় থেকে লম্বা একটি বাঁশ কেটে চেঁছেছিলে পরিস্কার করে এন্টেনার জন্য তৈরী করে রেখেছে। পৌঁছানো মাত্রই দশ বারোজন কাজে লেগে গেল। কেউ বাঁশ পোঁতার জন্য গর্ত খুঁড়ে, কেউ টেবিল চেয়ার বের করে উঠানে বসার ব্যাবস্থা করে, কেউ এন্টেনার তার লাগায় সে এক মহা হুলস্থুল কান্ড। ওদের সহযোগীতায় মুহর্তেই সব কিছু রেডি করে ব্যাটারীর কানেকশন দিয়ে টিভি চালু করা দিলাম। এদিকে টিভি আনার খবর মুহুর্তেই পুরো এলাকায় ছড়িয়ে গেছে। বাড়ির ভিতরে পুরুষ মহিলায় পুরো উঠান ভরে গেল। বুধবার থাকায় ভাল কোন অনুষ্ঠান ছিল না, তারপরেও রাত দশটা পর্যন্ত সবাই বসে থেকে টিভি দেখে গেল।

পরদিন শুধু পুরো এলাকা নয় কয়েকটি গ্রামে টিভির খবর ছড়িয়ে পড়ল। এর কারণ হলো সেই সময়ে আমাদের এলাকায় কোনো টিভি ছিল না। আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দুরে উড়িয়া ইউনিয়নের চেয়াম্যান বাড়িতে ব্যাটারী চালিত একটি টিভি ছিল। আর কোথাও টিভি নেই। যে কারণে কিছু অতি উৎসাহী পুরুষের ভাগ্যে টিভি দেখার সৌভাগ্য হলেও নারীদের ভাগ্যে টিভির চেহারা দেখার সৌভাগ্যও হয় নাই। টিভির চেহারা না দেখার কারণেই অনেকের মধ্যে টিভি দেখের আগ্রহ বেড়ে যায়।

পরদিন বিকাল তিনটায় টিভি সেন্টার শুরু হলেই টিভি চালু করে দেই। পৌনে চারটার দিকে সিনেমা শুরু হয়। (পাঠকদের জ্ঞাতার্থে জানাই, সেই সময়ে বিটিভিতে প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার একটি নাটক এবং প্রতি মাসের শেষ বৃহস্পতিবার একটি সিনেমা প্রচার করা হতো। এছাড়া বিশেষ পর্ব ব্যতীত আর কোন নাটক সিনেমা বিটিভিতে প্রচার করা হতো না) তাই দিনটি ছিল মাসের শেষ বৃস্পতিবার। বিটিভিতে সিনেমা ছিল। তবে কি সিনেমা ছিল আজ আর মনে করতে পারছি না।

অনেক মানুষ হতে পারে এমন অনুমান করে বাড়ির ভিতরের উঠানে টিভি চালু করেছিলাম। কিন্তু সিনেমা শুরু হলে সন্ধ্যা হতে না হতেই বাড়ির ভিতর লোকে লোকারন্য হয়ে গেল। বাধ্য হয়ে টিভি বাড়ির ভিতর থেকে বাহির বাড়ির (বাড়ির সামনের উঠান) বিশাল উঠনের এক কোনায় সেট করে দিলাম।

একটু পরে তাকিয়ে দেখি বাহির বাড়ির এত বড় উঠানের কোথাও এতটুকু জায়গা খালি নেই। উঠান ভরে রাস্তা পর্যন্ত মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। আমি টিভির কাছে বসে টিভি দেখছি। একটু পরেই আর টিভি দেখা সম্ভব হলো না। আমাদের পাশের গজারিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ভাই তার বউ বাচ্চা নিয়ে এসে হাজির। তাকে সমাদর করতে গিয়ে দেখি আরো অনেক গণ্যমান্য ব্যাক্তি ধানের নাড়া বিছিয়ে বসে আছেন। বাধ্য হয়ে তাদের জন্য চেয়ার বেঞ্চের ব্যবস্থা করতে হলো। বাড়ির ভিতর গিয়ে দেখি আমার মায়ের অবস্থাও কাহিল। অনেক বাড়ির বউঝিরা এসেছে। যাদের দাওয়াত করে আনা যায় না তারা নিজের থেকেই টিভি দেখতে এসেছেন। মা তাদের অনবরত পান সুপারি দিয়ে যাচ্ছেন। ছোট বোনটাও তার স্কুলের বান্ধবী এবং গ্রামের মাহিলাদের সেবায় ফুরসুত পাচ্ছে না, বাবারও একই অবস্থা। সেই সময় হুক্কার প্রচলন ছিল। একটানা গ্রামের মুরুব্বীদের পান তামাক দিয়ে সমাদর করে যাচ্ছেন। রংপুর থেকে টিভি নিয়ে এলাম প্রাণ ভরে দেখবো, কিন্তু টিভি দেখা তো দুরের কথা টিভির দিকে তাকানোরও সুযোগ পাচ্ছি না। মানুষের সমাদর করতে গিয়ে আর আমাদের বাড়ির কারোরই টিভি দেখা হলো না। ও দিকে রাস্তার পাশে ধানার নাড়ার গাদা থেকে অনবরত খড় খুলে এনে এনে সবাই বিছিয়ে বসার কারণে ছোট খড়ের গাদা প্রায় শেষের দিকে, কেউ সেদিকে খেয়াল করার সুযোগই পাইনি। পেলেই বা কি করবো, কয়জনকে নিষেধ করবো। তাছাড়া ওদেরকে বসার জায়গাও তো দিতে হবে?

নারী-পুরুষ, ছেলে-ছোকরা, বাচ্চা-কাচ্চা মিলে দুই আড়াই হাজারের কম নয়। তবে কারো মুখে কোন টু-শব্দ নেই। পিনপতন শব্দও হচ্ছে না। নিরবে সবাই টিভির সিনেমা দেখছে। রাত দশটার আগে আগে সিনেমা শেষ হলো। এপর্যন্ত মানুষ বসেই ছিল। রাত দশটায় ইংরেজী খবর শুরু হলেও মানুষ উঠতে চায় না। তবুও বসে থাকে। রাত এগারোটার দিকে বাধ্য হয়ে টিভি বন্ধ করে দিলাম। তখন মানুষ উঠে যেতে বাধ্য হলো।

রাতে সব কিছু গুছিয়ে শুয়ে পড়েছি। শেষ রাতের দিকে বাবার চিল্লাচিল্লিতে ঘুম ভেঙে গেল। প্রথমে বুঝতে পারিনি কি নিয়ে চিল্লায়। তার চিল্লাচিল্লিতে ভয় পেয়ে গেলাম। ভাবলাম টিভি দেখার সুযোগে হয়তো বাড়ি চুরি হয়েছে। ভাল করে বাবার কথা বোঝার চেষ্টা করতেই মুখ শুকিয়ে গেল। বাড়ির চারিদিকে নাকি পেশাবের গন্ধে টেকা যাচ্ছে না! বাবা আমাকেই বকাবকি করছে। কেন আমি টিভি নিয়ে এলাম, সেটাই আমার অপরাধ। আস্তে আস্তে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির সামনে যেতেই নাকে প্রস্রাবের গন্ধ এলো। প্রস্রাবের গন্ধে দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। বাড়ির যেদিকে যাই সেদিকেই একই অবস্থা। ভয়ে বাবার সামনে যাওয়ার সাহস পেলাম না। পাশের বাড়ি থেকে জ্যাঠাতো ভাইয়ের ছেলেদের ঘুম থেকে তুলে নিয়ে এলাম। বললাম, এই সময় বাবা নামায পড়ছে, তোরা তাড়াতাড়ি বাড়ির চারদিকে বালতি দিয়ে পানি ঢেলে দে। নইলে কেউ বাড়িতে থাকতে পারবি না। বাবার ঠ্যাঙ্গানীর চোটে এলাকা ছাড়া হতে হবে। আমার কথা শুনে ওরা তাড়াতাড়ি বালতি ভরে পানি এনে ঢালতে ছিল, এমন সময় বাবা নামায শেষ করে বাড়ির সামনে এসে দেখে ওরা বালতি দিয়ে পানি ঢালছে, ওদের দেখেই রাগে গজগজ করতে করতে একটা লাঠি নিয়ে করল ধাওয়া। ধাওয়া করতেই ওরা বালতি ফেলে দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল।
মা এসে বাবাকে বলল, মাইনষে টিভি দেখতে আইসা পেসাব কইরা বাড়ি তল কইরা থুইয়া গেছে এখন চিল্লাইলে লাভ হইবো। ছ্যাড়ারা বালতি ভাইরা পানি দিতেছে হেগো যে দৌড়ানি দিলেন, এহন এই মুতে পানি দিব কেডা?
ওদের তাড়ানো যে ভুল হয়েছে এটা বুঝতে পেরে বাবা চুপ হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর বকাবকি করতে করতে কোন দিকে যেন চলে গেলেন। আমি এতক্ষণ বাবার ভয়ে লুকিয়ে ছিলাম, বের হওয়ার সাহস পাচ্ছিলাম না। বাবা বাড়িতে না থাকায় চুপ করে বেরিয়ে এসে আবার ওদের খুঁজে খুঁজে ধরে নিয়ে এসে নিজেও সাথে সাথে পানি ঢালতে লাগলাম। তারপরেও কি গন্ধ যেতে চায়। তিনদিন ভরা পেশাবের গন্ধে বাড়িতে থাকাই মুশকিল হলো।

আমার নিকটতম জ্যাঠাতো ভাই মসজিদের ইমাম। পরদিন সকাল বেলা তিনি আমাকে রাস্তায় পেয়ে ধমকের সুরে বললেন, মানুষ ট্যাকা খরচ করে মাদ্রাসা মসজিদে পরকালে বেহেস্তে যাওয়ার জন্য। আর তুই ট্যাকা পয়সা খরচ কইরা জাহান্নামের বাক্স কিনা আনছোস।
আমি বললাম, আপনে কি করে বুঝলেন এটা জাহান্নামের বাক্স?
-- আরে আমি গেছিলাম পূবের পাড়া। ফিরতে ফিরতে রাইত হইছে। বাড়িতে ঢুইকা দেখি বউ পোলাপান একটাও ঘরে নাই। চিন্তায় পইরা গেলাম, এরা গেল কই? খুঁজতে খুঁজতে যায়া দেখি তগো বাড়ি গেছে। হাজার হাজার মাইনষের ভিতর খুঁজতে গিয়া জাহান্নামের বাক্সের দিকে চোখ পড়তেই ‘নাওউজু বিল্লা’ করতে করতে বাড়ি আইলাম।
আমি বললাম, ভাই ‘নাউজু বিল্লাহ’ কইলেন ক্যা?
আরে হারামজাদা এই সব দেখা যায়, নজরডা দেয়ার সাথেই দেখি জড়াজড়ি হুড়াহুড়ি কইরা মাহিলা পুরুষ মিলা নাচতেছে আর গান গাইতেছে। এইসব দেহা যায়। ‘নাউজু বিরøাহ, নাউজু বিল্লাহ’ করতে করতে সে তার কাজে চলে গেল।

দুপুর বেলা ঘরে বসে আছি, এমন সময় পূবের পাড়ার একজন এসে বাবাকে বলল, চাচা, আপনি হাজী মাইনষের বেটা হয়া বাড়িতে নাকি সিনেমা হল চালু করছেন? আপনে গ্রামের মাতব্বর মানুষ, আর আপনি যদি মাইনষেরে সিনেমা দেহান, পোলাপাইনে তাইলে কি করবো? ওরা তো সিনেমার এ্যাকটিং করা শুরু করবো?

তার কথায় বাবা যেন লজ্জাবোধ করতে লাগলেন। কথার কোন সদুত্তর দিতে পারলেন না। আমিও তাদের কথার মাঝখানে যাওয়ার সাহস পেলাম না। মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি লজ্জায় বাবার ফর্সা মুখটা কেমন যেন কালো হয়ে গেছে। তার কারণও আছে, অত্র এলাকায় দাদা একমাত্র হাজী ছিলেন। ব্রিটিশের পরপরই দাদা হজ্বে গিয়েছিলেন। সেই সময়ে হজ্ব করতে খরচ হয়েছিল এক হাজার সাত শত টাকা। তখন ঐ টাকায় আমাদের এলাকায় অনায়াশে চল্লিশ পঞ্চাশ বিঘা জমি কেনা যেত। পানির জাহাজে হজ্ব করতে গিয়ে পাক্কা ছয় মাস লেগেছিল। মক্কা থেকে মদীনায় গিয়েছেন উটে চড়ে, সময় লেগেছিল তের দিন, আবার মদীনা থেকে মক্কায় ফিরেছিলেন তেরদিনে। তখন মক্কা মদীনায় যাতায়াতে হাজীদের জন্য উটই ছিল উত্তম বাহন। দাদা যখন হজ্ব করেছেন তখন হাজীদের ছবি তোলার নিয়ম ছিল না। প্রত্যেকের হাতে টিকা দেওয়া হতো। এই টিকার ক্ষত চিহ্ণ দ্বারাই প্রমাণ হতো ভিসা পাসপোর্টের। দাদার ডান হাতে বড় একটি টিকার দাগ ছিল। এই দাগটি আমরাও দেখেছি। দাদা দীর্ঘদিন মসজিদের ইমামতি করেছেন। এসব কারণেই আমাদের বাড়িতে টিভি চালানোটা গ্রামের ধর্মভীরু বয়োবৃদ্ধ লোকজনেরা মেনে নিতে পারলেন না। হাজীর ছেলে হিসাবে তাই বাবাকে খোঁচা মারা কথা বলে গেলেন।

সন্ধ্যার সময় আবার লোকজন এসে বাড়ি ভরে গেল। বাবার ভয়ে টিভি চালানোর সাহস পেলাম না। কারণ যাও টিভি চালাতাম মানুষের খোঁচামারা কথায় বাবা খুব মনঃক্ষুন্ন ছিলেন। টিভি না দেখতে পেরে অনেকেই মনঃকষ্ট নিয়ে চলে গেল। আবার অনেক দুষ্টু ছেলেপেলে যাওয়ার সময় মনের কষ্ট প্রকাশ করে টিনের চালে ঢিল ছুঁড়ে মারল। ছেলে ছোকরাদের ঢিল টিনের চালে পড়ায় বাবা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন। গ্রামে বসে টিভি দেখার সৌভাগ্য আর হলো না, পরদিনই টিভি রংপুর নিয়ে যেতে বাধ্য করলেন।
০০০ সমাপ্ত ০০০
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে জুন, ২০১৫ দুপুর ১২:৪৫
২১টি মন্তব্য ২১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমার মহাজাগতিক ভাবনাকে এআই আমার সেরা পোষ্ট হিসাবে সাব্যস্ত করেছে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০২ রা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:১২



মহাজাগতিক ভাবনা

মহাজগতের প্রথমের পূর্ব অবস্থান শূন্য। কারণ প্রথমের পূর্ব অবস্থান শূন্যই হয়ে থাকে।শূন্য অবস্থানে সীমাদাতা না থাকায় তাতে যা হবে তা’ অসীম হবে।সকল অসীম একত্রে মিলে এক হবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

সালমান মুক্তাদিরের বিরুদ্ধে এ্যাকশান নিয়ে সরকার কি বার্তা দিচ্ছে?

লিখেছেন আফনান আব্দুল্লাহ্, ০২ রা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০৫

সালমান মুক্তাদির দেখি জঘন্য মানুষ। ওয়াইন, ওম্যান আর ওয়েল্থ – পুরুষ নষ্টের এই তিন ডব্লিউ-ই তার অস্থিমজ্জা ও লিভারে ঢুকেছে



এদিক-ওদিক ব্যাপক আম-লিচু করে বেড়িয়েছে। নিজের স্টুডিওতে আজেবাজে শুটিং করেছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিনয়: মুমিনের এক অনন্য মহৎ গুণ; কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে একটি বিশ্লেষণ

লিখেছেন নতুন নকিব, ০২ রা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৫

বিনয়: মুমিনের এক অনন্য মহৎ গুণ; কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে একটি বিশ্লেষণ

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

ভূমিকা

মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য তার বাহ্যিক চেহারা, ধন-সম্পদ বা সামাজিক মর্যাদায় নিহিত নয়। বরং তাঁর চরিত্র,... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন ব্লগার

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০৩ রা অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:০৯

যখন একজন ব্লগার
টরন্টো সময়ঃ সন্ধ্যা ৭ঃ০৩ ২রা অক্টোবর ২০২৬
বাংলাদেশ সময়ঃ ভোর ৫ঃ০৩ ৩রা অক্টোবর, ২০২৬

...বাকিটুকু পড়ুন

ইমাম মাহদী আসার আগে নেতৃত্ব দাবী করা সকল দলই গোমরাহের পথে আছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৩ রা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:১৭

সেক্যুলার দলকে সমর্থন ততো দিন পর্যন্ত দিয়ে যেতে হবে, যতো দিন ইসলামী দলগুলো 'যোগ্য' না হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের কোন ইসলামী দলই দেশ চালাতে সক্ষম নন।

ইসলামে বলা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×