
শহীদুল ইসলাম প্রামানিক
দেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েক বছর পরের ঘটনা। লালমনির হাটে আমার ফুফাতো ভাইয়ের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম। বিকালের ট্রেন ধরার জন্য বের হয়েছি। স্টেশনের কাছাকাছি আসতেই ট্রেন ছেড়ে দিল। দৌড়ে গিয়ে ট্রেন ধরা সম্ভব নয় দেখে দৌড় না দিয়ে আহম্মকের মত দাঁড়িয়ে রইলাম। ট্রেন চলে গেলে স্টেশনে গিয়ে পরবর্তী ট্রেন আসার সময় সূচী দেখে নিলাম। রাত নয়টায় ট্রেন। এত সময় বসে থাকা অস্বস্তি লাগবে। ফুফাতো ভাইয়ের বাড়ি ফিরে যেতেও লজ্জা করছে। বিদায় নিয়ে এসে আবার ফিরে যাওয়াটা কেমন দেখায়? তাছাড়া ফুফাতো ভাই নতুন বিয়ে করেছে। আমি ফিরে গেলে ফুফাতো ভাই বোনেরা সাদরে গ্রহণ করলেও নতুন ভাবীর কাছে নিজেকে নাককাটা নাককাটা মনে হবে। তাই বিদায় নিয়ে এসে সে বাড়িতে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে হলো না। পরবর্তী ট্রেন ধরার জন্য স্টেশনের প্লাটফরমের বেঞ্চে বসে কালক্ষেপণ করতে লাগলাম। কিন্তু সঙ্গী-সাথীবিহীন একা একা সময় কাটতে চায় না। কোথায় কিভাবে এত সময় কাটাবো সেটাও ভেবে পাচ্ছি না। অবশেষে সিনেমার কথা মনে পড়ল। সময় কাটানোর জন্য আস্তে আস্তে সিনেমা হলের দিকে রওনা হলাম।
টিকিট কেটে হলে ঢুকে সিনেমা দেখে যখন বের হলাম তখন নয়টা প্রায় বাজে বাজে। সিনেমা হল থেকে বের হয়েই দৌড়াতে লাগলাম। স্টেশনের প্লাট ফরমের কাছাকাছি এসেছি। আর দু’শ গজ গেলেই ট্রেন ধরতে পারি। দৌড়াতে লাগলাম। ট্রেনের কাছাকাছি আসতেই ট্রেন ছেড়ে দিল। দৌড়ে গিয়েও কাজ হলো না। মাত্র আট দশ হাত দুরে থাকতেই ট্রেনের স্পীড বেড়ে গেল। আমার দৌড়ের চেয়ে ট্রেনের গতি অনেক বেশি। ট্রেনে ওঠা সম্ভব হলো না। প্লাট ফরমের মাঝামাঝি গিয়ে থেমে গেলাম। অনেক দুর থেকে দৌড়ে এসেছি। একা একা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগলাম।
ট্রেন ফেল করে নিজেকে নিজে ধিক্কার দিতে লাগলাম। কেন সিনেমা দেখতে গেলাম? কষ্ট করে স্টেশনে বসে থাকলেই তো এই বিড়ম্বনার শিকার হতাম না? কিন্তু ধিক্কার দিয়ে কি লাভ? এই রাতে তো আর বাড়ি যাওয়ার ট্রেন পাবো না? সারা রাত স্টেশনেই কাটাতে হবে। স্টেশনের প্লাট ফরমের বেঞ্চের উপর অসহায়ের মত বসে রইলাম। কিন্তু কতক্ষণ বসে থাকা যায়? উঠে গিয়ে পরবর্তী ট্রেনের সময়সূচী দেখে নিলাম। পরবর্তী ট্রেন ভোর পাঁচটায়। এত সময় কিভাবে কাটাবো ভেবে পাচ্ছি না। প্লাট ফরমের এমাথা ওমাথা এমনি এমনি ঘুরে ঘুরে সময় কাটাতে লাগলাম। কিন্তু সময় কি যেতে চায়? ঘড়িও যেন আস্তে আস্তে চলে। ঘড়ির ঘন্টার কাঁটা সরতেই চায় না। রাত এগারোটা পর্যন্ত সময় কাটাতেই অস্বস্থিতে হাঁপিয়ে উঠলাম। পরবর্তী সময় কাটানোর জন্য আড্ডা খুঁজতে লাগলাম। পেয়েও গেলাম। প্লাট ফরমের মাঝখানে কয়েকটি কুলি বস্তার উপর বসে টাস খেলছে। সময় কাটানোর জন্য আমিও ওদের সাথে বস্তার উপর বসে টাস খেলা দেখতে লাগলাম। টাকা দিয়ে খেলছে। প্রতি খেলায় যারা হারে তারা দুই টাকা করে দেয় আর যে জিতে যায় সে সব টাকা জড়িয়ে নেয়। এরজন্য আবার খাতায় পয়েন্ট লিখতে হয়, কে কত পয়েন্ট পেয়েছে। প্রত্যেক খেলার শেষে প্রত্যেকের নামের পাশে একজন লিখছে। তিনিও খেলোয়ার। কিছুক্ষণ পরেই যে লোকটি লিখতেছিল সে খেলা ছেড়ে চলে গেল। আরেকজন এসে তার জায়গায় খেলতে বসল। পুনরায় খেলা শুরু হলো বটে কিন্তু পয়েন্ট লেখার লোক নেই। তারা সবাই মুর্খ। পয়েন্ট লেখার অভাবেই খেলা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। একজন চারদিকে তাকিয়ে লেখার মত কাউকে খুঁজে পেল না। আমাকে দেখে অনুরোধের সুরে বলল, ভাই আপনি কি চলে যাবেন?
বললাম, না দেরি আছে?
-- যাদি কিছু মনে না করেন তাহলে আমাদের খেলার পয়েন্টগুলো কি লিখতে পারবেন?
তার প্রস্তাবে সাথে সাথেই রাজী হয়ে গেলাম। মনে মনে ভাবলাম আমাকে তো সারা রাত বসেই কাটাতে হবে। এমনি এমনি বসে থাকার চেয়ে খেলার হৈ-হুল্লোড়ের উপর থাকলে সময় কাটাতে সুবিধা হবে। খাতা হাতে নিয়ে কার নাম কি জেনে নিলাম। তাদের প্রত্যেকবার খেলা শেষে কে কত পয়েন্ট পেয়েছে আমাকে বললে আমি সেই অনুযায়ী প্রত্যেকের নামের পাশে খাতায় লিখি। বিনিময়ে আমারো কিছুটা সুবিধা হলো। তারা লাভের টাকা থেকে একটু পরপর চা বিস্কুট খাওয়াতে লাগল। তাদের খেলা দেখতে দেখতে কখন রাত বারোটা বেজে গেছে বলতেই পারি না। এমন সময় একজন কুলি এসে বলল, এই তোরা খেলা বন্ধ কর ট্রেন আসতেছে।
দক্ষিণে তাকিয়ে দেখি ট্রেনের হেড লাইটের আলো দেখা যায়। কুলিরা খেলা বন্ধ করে লাফিয়ে উঠল। খেলা বন্ধ করার কয়েক মিনিট পরেই ট্রেন এলো। ট্রেন প্লাট ফরমে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আবার পরবর্তী গন্তব্যের দিকে চলে গেলো। ওরা আর খেলায় বসল না। আমি অসহায়ের মত এদিক ওদিক আবার ঘোরাঘুরি করতে লাগলাম। আমার মত আরো অনেকেই স্টেশনের প্লাট ফরমে বসে আছে। কেউ প্যাসেঞ্জার, কেউ রেলের কর্মচারী, কেউ ফেরিওয়ালা এর মাঝে কিছু ভাসমান পতিতাও আছে। তারাও প্লাটফরমের এমাথা ওমাথা পায়চারী করছে। মাঝে মাঝে অন্ধকারে হারিয়ে যায়, আবার কিছুক্ষণ পর ফিরে আসে।
এভাবে আরো আধ ঘন্টা কেটে গেল। সময় কাটতে চায় না। মুল প্লাট ফরমের বাইরে যেতেও সাহস পাচ্ছি না। ভয় হলো গুন্ডাপান্ডা মাস্তানের। যদি একা পেয়ে ছিনতাই করে? তারপরেও ভয়ের ভিতরেই হাঁটতে হাঁটতে প্লাটফরমের উত্তরে চলে গেলাম। স্টেশনের পূর্ব পাশে অনেক মালগাড়ি রাখা আছে। তারও পূর্ব পাশ থেকে মাইকে গানের সাথে সাথে জিকিরের শব্দ কানে ভেসে এলো। হারমোনিয়মের সাথে ঢোলের শব্দ এবং সাথে গান এবং জিকির শুনতে ভালই লাগছে। একা একা দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ শুনলাম। মনে হলো স্টেশনের পূর্ব পার্শ্বে অল্প দূরেই হলকা জিকিরের অনুষ্ঠান হচ্ছে। ভাবলাম এরকম কোনো অনুষ্ঠান পেলে সহজেই সেখানে বসে রাত কাটানো যাবে। আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে ওভার ব্রীজের উপর উঠে গেলাম। ব্রীজের পূর্ব পাশে নেমে মাইকের শব্দ অনুযায়ী কিছুদুর গিয়েই লাল, নীল, সবুজ লাইটিং করা বাড়ি পেলাম। ভিতরে অনুষ্ঠান তবে বাড়ির গেট খোলা আছে। সাহস করে ভিতরে ঢুকে গেলাম। উত্তর পার্শ্বে আর পূর্ব পার্শ্বে ইটের দেয়াল দেয়া টিনের ঘর। পশ্চিম ও দক্ষিণ পার্শ্বে ইটের দেয়াল দিয়ে ঘেরা। সেই সময়ে লালমনির হাট শহরটি থানা শহর ছিল। লালমনিরহাট বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিম অঞ্চল ডিভিশন। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত প্রচুর রেলওয়ের দালান কোঠা আছে। রেলের সমস্ত কর্মচারীরা রেল কলোনীতে থাকে। শহরের অধিকাংশ ঘরবাড়ি এবং জায়গা জমি রেলের। সাধারণ লোকজনের বাসাবাড়ি খুব কম। সেই সময়ের হিসাবে, এই বাসাটি লালমনির হাট শহরের উন্নতমানের বাসাই বলা চলে। বাসার ভিতরে অনেকটা জায়গা জুড়ে উঠান। উঠানের মাঝখানে হারমোনিয়াম আর ঢোল বাজিয়ে গান হচ্ছে। ষাট সত্তর জন লোক মাথা দুলিয়ে ঢোলের তালে তালে ‘আল্লাহু’ ‘আল্লাহু’ জিকির করছে। হলকা জিকিরের ধরন দেখে মনে হলো এরা চিশতিয়া তরিকার ভক্ত আশেকান।
এক পাশে অজু করার জন্য বালটিতে পানি এবং বদনা রাখা আছে। আমি বালটি থেকে বদনায় পানি ঢেলে অজু করে তাদের সাথে বসে গেলাম। আমাকে অজু করে জিকিরের আসরে বসতে দেখে অনুষ্ঠানের লোকজন খুশিই হলো। তাদের সাথে সাথে মাথা দুলিয়ে ‘আল্লাহু’ ‘আল্লাহু’ জিকির করতে লাগলাম। রাত দু’টার দিকে অনেকেই চলে গেল, আমিসহ বিশ পঁচিশ জন তখনও জিকির করছি। এই শহরে আমার পরিচিত কেউ থাকার কথা নয়। তারপরেও চারদিকে তাকিয়ে পরিচিত লোকজন খুঁজতে লাগলাম। পরিচিত কাউকেই পেলাম না। সবাই অপরিচিত। অপরিচিত লোকজনের মাঝে যে কোন ভাব ধরা যায়, তাতে লাজ্জা লাগে না। কিন্তু পরিচিতদের মাঝে এটা করা যায় না। আমি খাজাবাবার অতি আশেক ভক্তের মত মাথা দুলিয়ে মাঝে মাঝে ‘হু-হ আল্লাহ’ ‘হু-হ খাজা’ করে বেহায়ার মত জোরে জোরে চিল্লাতে লাগলাম। আমার চিল্লানো দেখে অনেকেই ধরে নিল আমি খাজাবাবার চরম ভক্ত। আমার এ অবস্থা দেখে তারা আমাকে সামনে যাওয়ার জায়গা করে দিল। আমাকে সামনের সারিতে ঢোলওয়ালার কাছে বসতে দিল। আমি আমার সাধ্য মত অতিরিক্ত মাথা দুলিয়ে জিকিরের সাথে সাথে চিল্লাতে লাগলাম। এতে আমার কিছু উপকার হলো। একদিকে আল্লাহর জিকির করা হলো, অন্যদিকে ঘুমে ঢুলতে ছিলাম অতিরিক্ত মাথা দুলুনি আর চিল্লানোর কারণে ঘুমের ভাবটা কেটে গেল। আমি ঘুম তাড়াতে গিয়ে চিল্লাচিল্লি আর মাথা দুলালেও, উপস্থিত লোকজন ধরে নিল আমি কোন পীর ফকিরের ভক্ত আশেকান, তা না হলে এরকম জিকিরে মত্ত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু আমি যে সময় কাটানোর জন্য সেখানে গিয়েছি সেটা আমি এবং বিধাতা জানলেও উপস্থিত লোকজন তো আর জানেনা। তারা আমার মনের ভাব না জেনেই আমার ভাব ভঙ্গি দেখে যথেষ্ট সম্মান করতে লাগল। অবশ্য আমার চিল্লাচিল্লিতে তাদেরও উপকার হলো। উপস্থিত জেকেরকারীদের মধ্যে যারা ঘুমে ঢুলতে ছিল, আমার জোরে চিল্লানোর কারনে তাদের ঘুম ছুটে গেল এবং আমার সাথে সাথে তারাও জিকির করতে লাগল। এতে আর কেউ খুশি না হলেও জিকিরের মাহফিল আয়োজনকারী বাড়িওয়ালা খুব খুশি হলেন।
বাড়িওয়ালার বয়স প্রায় ষাটের কাছাকাছি। সুঠাম দেহ। মুখে চাপ দাড়ি। গায়ে পাঞ্জাবী, মাথায় টুপি। উনি জিকিরের ফাঁকে ফাঁকে উপস্থিত ভক্ত আশেকানদের খেদমত করছেন। ভদ্রলোক দুইবার এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমি চা খাবো কিনা। আমি জিকিরের মাঝেই মাথা নাড়ালাম, খাব না। মুখে কথা না বলে মাথা নাড়িয়ে চা খেতে নিষেধ করায় উনি ধরে নিলেন জিকিরের মাঝে আমাকে কিছু বলা মানে জিকিরের ধ্যান নষ্ট হচ্ছে। দুইবার না করার পড়ে জিকির চলাকালীন সময়ে উনি আর চা খেতে বলেন নাই।
রাত চারটার দিকে জিকিরের আসর ভেঙ্গে গেল। আমি উঠতে চাইলেও আমাকে উঠতে দিল না। তবারক খাওয়ার জন্য স্বয়ং বাড়িওয়ালা অনুরোধ করতে লাগল। জোরে চিল্লানো আর মাথা দুলানোর কারণে তাদের কাছে ভাল সম্মান পেতে লাগলাম। জিকিরের আসরের গুরুত্বপুর্ণ লোকদের সাথে আমাকে খেতে দিল। আমার পাতে বেশি বেশি মাংস খিচুরি দিল। এরকম সম্মান পেয়ে মনে মনে খুব খুশিই হলাম। খাওয়া শেষে খাজা বাবার চরম ভক্ত মনে করে অনেক লোকই আমার হাতে হাত মিলালো। অনেকেই সামনের জিকিরের মাহফিলে আসার জন্য অগ্রীম দাওয়াতও দিল। খুব সম্মানের সাথে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে স্টেশনে চলে এলাম।
স্টেশনে এসে দেখি গাড়ি প্লাট ফরমে দাঁড়িয়ে আছে, তবে ইঞ্জিন লাগে নাই। কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে ট্রেনের একটি কামড়ায় উঠে বসলাম। মাঝের দেয়ালের কাছের সিটে বসে ঝিমুতে লাগলাম। ঠিক পাঁচটার সময় ট্রেন হুইসেল দিয়ে ছেড়ে দিল। রাত জাগা শরীরে গাড়ির ঝাঁকুনিতে কখন ঘুমিয়েছি বলতে পারি না। ঘুম থেকে জেগে দেখি আমার স্টেশন পার হয়ে পরের স্টেশনে এসেছি। এর মধ্যে আমিও টের পাইনি এবং যাত্রীরাও কেউ ডাক দেয়নি।
তাড়াতাড়ি সেই স্টেশনে নেমে ফিরতি ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। এক ঘন্টা পর ট্রেন এলো। সেই ফিরতি ট্রেন থেকে নেমে ঘুম জাগা বিধ্বস্ত শরীর নিয়ে যখন বাড়ি পৌঁছি তখন প্রায় দুপুর হয়েছে। মা জিজ্ঞেস করলেন রাতে কোথায় ছিলাম? বিস্তারিত বিবরণ না দিয়ে শুধু বললাম লালমনির হাট ছিলাম। মা লালমনির হাটের কথা শুনে ধরে নিল আমার ফুফাতো ভাইয়ের বাড়ি ছিলাম। আর কিছু বলল না।
০০০ সমাপ্ত ০০০
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জুন, ২০১৫ সন্ধ্যা ৬:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



