
শহীদুল ইসলাম প্রামানিক
সংসারে মাত্র তিনজন লোক। আমি আমার স্ত্রী আর ছোট একটি বাচ্চা। আমার স্ত্রী কিছুটা সহজ সরল। সোজা কথা সহজভাবে বোঝে কিন্তু একটু প্যাঁচ দিয়ে কথা বললে আর বুঝতে পারে না।
ঢাকা শহরে বাসা নিয়েছি। চাকরী করে যা বেতন পাই তাতে টানাটানি করে কোনরকমে দিন চলে যায়। তবে অভাব পিছু ছাড়ে না। সংসারে অভাব থাকলে অশান্তি কিছুটা লেগেই থাকে। অর্থিক অভাবের কারণেই হোক আর মানসিক অভাবের কারণেই হোক, আমার স্ত্রীর সাথে মাঝে মধ্যে ছোট খাটো ঝগড়া ঝাটি লাগে, আবার তা সহজে মিটে যায়।
সেদিন কোন এক বিষয় নিয়ে আমার স্ত্রীর সাথে আমার তুমুল ঝগড়া লেগে গেল। আমার যুক্তি সে কোন ভাবেই মেনে নিচ্ছে না। আমার চড়া গলা আগেই সপ্তমে উঠে গিয়েছিল, আমার স্ত্রীর গলাও পঞ্চম থেকে ষষ্ঠতে যায় যায় আরকি। তাকে কথা বলতে নিষেধ করলেও মানছে না। চোখ দু’টা বড় করে ডান হাতের একটা আঙুল উঁচিয়ে বললাম, তুমি আর একটা কথাও বলবে না, একদম চুপ।
স্ত্রী আমার কথায় ঝগড়া কড়া মুরগীর মত ঘাড় লম্বা করে বলল, কথা বললে কি করবে, মারবে?
আমি বললাম মারবো না, তবে এমন একটা দিব্যি দিবো, সারা জীবনের জন্য কথা বলা বন্ধ হয়ে যাবে। আমার স্ত্রী তুচ্ছ তাচ্ছিল্যভাবে বলল, রাখেন আপনার দিব্যি, দিব্যি দিলেই আমি কথা বলা বন্ধ করে দিব, আমি অতো পাগোল না।
স্ত্রীর তুচ্ছ তাচ্ছিল্যভাবটা আমার সহ্য হলো না। আমি সাথে সাথেই বলে ফেললাম, এই তুমি যদি আর একটি কথা বলো, তা হলে আল্লার কসম লাগে, কথা বলার সাথে সাথে তোমার বাপ আমার শ্বশুর আমার বাপ তোমার শ্বশুর।
দিব্যি দেয়ার সাথে সাথেই আমার স্ত্রীর কড়কড়ানি বন্ধ হয়ে গেল। বড় বড় চোখ করে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চোখের পানি ছেড়ে মুখে আঁচল গুঁজে রান্না ঘরে চলে গেল। আমার দেয়া দিব্যি কোরামিন ইনজেকশনের মত কাজ হওয়ায় মনে মনে খুব খুশি হলাম।
কিছুক্ষণ পরেই জামা কাপড় পরে অফিসে চলে গেলাম। যাওয়ার সময় লক্ষ্য করলাম। আমার স্ত্রী রান্না ঘরে পিঁড়ির উপর বসে তখনও গুনগুন করে কাঁদছে।
অনেক রাতে অফিস থেকে বাসায় ফিরে দেখি বাসার দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। অনেক ডাকাডাকির পর আমার স্ত্রী দরজা খুলল বটে কিন্তু কোন কথা বলল না। দরজা খুলে আমার মুখ দেখার আগেই সে ঝড়ের বেগে বেড রুমে চলে গেল। আমি হাত মুখ ধুয়ে খাওয়ার টেবিলে গিয়ে বসলাম। খাবার টেবিলে বসে আহাম্মক হলাম। খাবার টেবিলে খাওয়ার মত কিছুই নেই। থালা বাটিসহ সব হাঁড়িকুড়ি উপর করে রেখে দিয়েছে। বুঝতে পারলাম স্ত্রী পরাজিত হয়ে আমাকে না খাইয়ে রেখে প্রতিশোধ নিচ্ছে। মনে মনে বললাম, যত প্রতিশোধই নাও না কেন, কোনভাবেই আগে কথা বলবো না, তহলে নিজের দিব্যি নিজে ভাঙার কারণে আমাকে দুর্বল ভাববে। স্ত্রীর কাছে দুর্বল হওয়া যাবে না। দেখি কয় দিন সে কথা না বলে থাকতে পারে। অগত্যা এক গ্লাস পানি খেয়েই রাতের ডিনার সেরে নিলাম। বেড রুমে গিয়ে দেখি খাটের উপর বিছনা এলোমেলো হয়ে আছে। খাটের মশারী খুলে নিয়ে সে নিচে মেঝেতে বিছনা পেতে বাচ্চা নিয়ে শুয়ে আছে। আমি আমার জেদ বহাল রাখার জন্য কোন কথা না বলে মশারী ছাড়াই খালি বিছনায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম। মনে মনে বললাম, কথা বলার জন্য যত বুদ্ধিই কর না কেন কোনভাবেই আমি আগে কথা বলবো না। নিজের জেদ বহাল রাখার নিমিত্তে চিৎ হয়ে শুয়ে রইলাম। ক্ষুধার্ত পেটে ঘুম আসতে চায় না তরপরেও নিজেকে কিছুটা বিজয়ী ভেবে নিলাম।
একটু পরেই আমার বিজয়ী ভাবটা পরাজিত হবার উপক্রম হলো। আমার বউ আমার সাথে কথা না বললে কি হবে, বেয়াদব মশাগুলো ঠিকই আমার কানের কাছে কথা বলা শুরু করে দিল। কিছু মশা আমার কানের কাছে রবীন্দ্র সংগীত গাইতে লাগল, আবার কিছু মশা কানের উপর চরে বসে লম্বা শুরে ভাওয়াইয়া গান শুরু করে দিল। শুধু গান গাইলে ততটা কষ্ট পেতাম না, কিন্তু গানের মাঝে মাঝে তারা আমার গালে, পিঠে, পেটে, বুকে, ঠ্যাংগে সুইয়ের মত হুল ফুটিয়ে চুমাও খেতে লাগল। মশার এরকম গান আর সুই ফুটানো আদর যতেœ ঘুম আর হলো না। দাপাদাপি করতে করতে রাত কেটে গেল। তরপরেও বউয়ের কাছে নত হলাম না।
সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে বাইরে চলে গেলাম। আমার স্ত্রী আমার সামনে এলো না। বাচ্চা কোলে নিয়ে রান্না ঘরে বসে রইল। বিকাল বেলা বাসায় ফিরলে খাওয়ার টেবিলে কোন খাবার পেলাম না। নিজের জেদ বহাল রাখার জন্য ভাতের কথা জিজ্ঞাসও করলাম না। ছেলেটির বয়স দুই বছর। সে মায়ের কোল থেকে দৌড়ে এসে আমাকে জাপটিয়ে ধরে বলল, আব্বু আব্বু, আম্মু তোমার সাথে কথা বলে না কেন? আমি বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে বললাম, তোমার আম্মুর মুখে ঘা হয়েছে। সেই জন্যে কথা বলতে পারছে না।
একথা শুনে বাচ্চা আমার কোল থেকে নেমে দৌড়ে ওর মায়ের কাছে গিয়ে বলল, আম্মু তোমার নাকি মুখে ঘা হয়েছে। দেখি কোথায় ঘা হয়েছে? একথা বলে সে তার মায়ের মুখের দুই ঠোঁট দুই হাতে ধরে উপর নিচে টানাটানি করে মুখের ভিতরে ঘা দেখার চেষ্টা করতে লাগল। আমার স্ত্রী ছেলের এরকম উৎপাতে বিরুক্ত হয়ে জোরে ধমক দিতেই ছেলেটি ভ্যাঁ করে কেঁদে দিল। অবস্থা বেগতিক দেখে আমি তাড়াতাড়ি বাইরে চলে গেলাম।
পরদিন অফিসে গিয়েছি। আমার সহকর্মী হাবিব ভাই আমাকে বলল, ভাই মনে আছে তো, আগামী কাল যে আপনার বাসায় আমাদের যাওয়ার কথা? আমি সাথে সাথে হাসি মুখে সায় দিয়ে বললাম, অবশ্যই মনে আছে। ভাবি বাচ্চাসহ আসছেন তো?
হাবিব ভাই বলল, আপনার ভাবীর জন্যই তো আগামী কাল আপনার বাসায় যাওয়া। সে অনেক দিন হলো যেতে চাচ্ছে। কিন্তু আমার সময় হলে আপনার হয় না আপনার সময় হলে আমার হয় না। যে কারণে এতোদিন আপনার বাসায় বেড়াতে যাওয়া হয় নাই। বিয়ের দাওয়াত দিয়েছিলেন, আমার স্ত্রী তখন অসুস্থ্য থাকায় যেতে পারি নাই। আপনার বউ বাচ্চা দেখার জন্য আমার স্ত্রী উদগ্রীব হয়ে আছে। আপনি বাসা নেয়ার পর থেকে প্রায়ই আপনার কথা জিজ্ঞেস করে, আপনার বউ বাচ্চার কথা জিজ্ঞেস করে। তাদেরকে একনজর দেখতে চায়।
হাবিব ভাইয়ের কথায় ঝোকের মাথায় হ্যাঁ বললেও পরক্ষণেই আমার মুখ শুকিয়ে আমচুর হয়ে গেল। হাবিব ভাইয়ের স্ত্রীসহ বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে আসার জন্য আগামী কালকের তারিখ আমিই দিয়েছিলাম। এখন তাকে না করি কিভাবে? এদিকে তো কথা না বলার দিব্যি নিয়ে বাসায় আমার এবং স্ত্রীর মধ্যে মহা দ্বন্দ চলছে, এই অবস্থায় তাদেরকে নিয়ে গেলে না জানি কোন কেলেংকারী ঘটে যায়। না করাও সম্ভব নয়। চাকরী নেয়ার পর থেকে তার বাসায় অনেক গিয়েছি, অনেক খেয়েছি। সে সব চিন্তা করে বাকী সময় আর কাজে মন বসাতে পারলাম না। সকাল সকাল অফিস থেকে বাসায় চলে এলাম।
বাসায় ঢুকতেই আমায় দেখে বউ এক হাত লম্বা ঘোমটা দিয়ে আমার সামনে থেকে সরে গেল। হাতমুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে তাকিয়ে দেখি এক প্লেট ভাত আর আলু ভর্তা রাখা আছে। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করে চটপট খেয়ে নিলাম। তিনদিন পর বউয়ের হাতের রান্না করা ভাত খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুললাম। তৃপ্তির ঢেকুর তুললে কি হবে, আগামীকাল হাবিব ভাই তার বউ বাচ্চা নিয়ে আসবে, সে কথা মনে হতেই পেটের ভিতর অতৃপ্তি মোচড়ামুচড়ি করতে লাগল। বউয়ের সাথে কি ভাবে কথা বলা যায় সেই উপায় খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু কোন উপায় খুঁেজ পেলাম না। মনে মনে চিন্তা করলাম, বউয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ালে যদি বউ কিছু একটা বলে তাতেই কাজ হয়ে যাবে। আমি ঐ কথার উপরেই কথা বলা শুরু কারবো। কিন্তু কাজ হলো না, বউয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই বউ ঘোমটা আরো লম্বা করে দিয়ে রান্না ঘরের কোনায় চলে গেল। তার কোনায় সরে যাওয়ার ভাব দেখে লজ্জা পেয়ে আমি নিজেই সরে এলাম। কিন্তু সরে এলে তো হবে না, কথা বলতেই হবে। তা না হলে আগামী কাল উপায় থাকবে না।
অনেকক্ষণ শুয়ে শুয়ে চিন্তা করলাম, বাচ্চাটাকে দিয়ে ওর মাকে আমার কাছে ডেকে আনার সিদ্ধান্ত নিলাম, বাচ্চার ডাকে যদি কাছে আসে তখন দিব্যি তুলে নিয়ে কথা বলা শুরু করে দিব। কিন্তু আমার বাচ্চা এতো ডাকার পরেও কাছে এলো না। তখন বেকায়দা মনে করে নিজেই বিছানা ছেড়ে উঠে রান্না ঘরে বউয়ের কাছে গিয়ে বললাম, এই ডাকতেছি শুনতে পাওনা।
আমার উপস্থিতি টের পেয়ে বউ দেড় হাত লম্বা ঘোমটা টেনে মিন মিন করে বলল, ডাকলে কি হবে, কথা বলা যাবে না। যে দিব্যি দিয়েছো, তাতে কথা বললে তোমার আমার সম্পর্ক থাকবে না। তার চেয়ে আমি আগামী কাল বাপের বাড়ি চলে যাচ্ছি। বাড়িওয়ালীর কাছ থেকে যাওয়ার টাকা ধার নিয়েছি।
তার কথা শুনে আকাশ থেকে পরলাম। সোজা মানুষ যে সোজা কথা সহজ ভাবে বোঝে, বাঁকা কথা মোটেই বোঝে না এবং বুঝতেও চায় না, তা বউয়ের কথায় হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। এবার বুঝতে বাকি রইল না যে, আর দু’একদিন দেরি করলে হয়তো সংসারটাই ভেঙে যেতে পারে। তাই সহজ সরল বউটাকে বাঁকা কথা সোজাভাবে বুঝানোর চেষ্টা করে বললাম, আমি কি এমন দিব্যি দিয়েছি যে তোমার বাপের বাড়ি যেতে হবে?
বউ মিন মিন করে বলল, এমন একটা খারাপ দিব্যি দিয়েছো, যেটা মুখে বলতেও ঘেন্না হয়।
আমি হাসি হাসি মুখে বললাম, দিব্যিটা কি?
বউ বলল, নিজেই দিব্যি দিয়েছো, অথচ এখন নিজেরই মনে নাই?
আমি বললাম, আরে-- রাগের মাথায় কি বলেছি সেটা কি আমার মনে আছে? না বললে আমি কি করে বুঝবো যে খারাপ দিব্যি দিয়েছি?
বউ বলল, এমন খারাপ কথা মুখে আনতেও তো লজ্জা করছে।
আমি বললাম, যত খারাপই হোক, না বললে কি করে বুঝবো?
তখন সে ঘোমটার ভিতর মুখ আধা ঢাকা অবস্থায় বলল, দিব্যিটা হলো, আমি যদি আর একটা কথা বলি, তাহলে আমার বাপ তোমার শ্বশুর, তোমার বাপ আমার শ্বশুর।
এ কথা শুনে অট্টহাসি দিয়ে বললাম, ঠিকই তো বলেছি, এখানে খারাপ কি দেখলে?
বউ কিছুটা রাগ রাগ ভাব প্রকাশ করে বলল, এমন একটা খারাপ কথা বলার পরেও বলছো খারাপ না? তুমি কেমন মানুষ? তোমার ভিতরে কি ঘিন পিত বলতে কিছু নাই?
আমি তার সরল মনে বিশ্বাস আনার জন্য হাসি হাসি ভাব নিয়ে বললাম, আমি কি সতিই বলেছি, ্আমার বাপ তোমার শ্বশুর, তোমার বাপ আমার শ্বশুর?
আমার বউ ঘোমটা সহ মাথা ঝাকিয়ে বলল, হ্যাঁ বলেছো।
আমি বললাম, তহলে তো আমি ঠিকই বলেছি। বলেই বউকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্নের সুরে বললাম, ্আমার বাপ তোমার শ্বশুর না?
বউ বলল, হ্যাঁ।
তোমার বাপ আমার শ্বশুর না?
বউ বলল, হ্যাঁ।
আমার প্রশ্নের উত্তরে বউয়ের ‘হ্যাঁ’ সূচক বাক্য পেয়ে কিছুটা আনন্দের সাথেই উচ্চ স্বরে বললাম, আমি তো সেটাই বলেছি, এই সহজ কথাটা তিন দিনেও বুঝলে না। কেমন অবং মহিলা তুমি!
একথা শোনার এক মিনিট পরেই আমার বউয়ের দেড় হাত লম্বা ঘোমটা সড়াৎ করে মথা থেকে সরে ঘাড়ে চলে এলো। আমার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে বলল, বল কি? এই সহজ কথাটা বুঝতে না পেরে এদিকে সর্বনাশ করে ফেলেছি।
আমি চোখ কপালে তুলে বললাম, কি সর্বনাশ করেছো?
বউ বলল, বাপের দেয়া কানের দুল বাড়িওয়ালীর কাছে বন্ধক রেখে টাকা নিয়ে এই তিনদিন চানাচুর মুড়ি খেয়ে দিন কাটিয়েছি। তাড়াতাড়ি টাকা দাও কানের দুল নিয়ে আসি।
বউয়ের কথা শুনে আহম্মকের মত হা করে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
০০০ সমাপ্ত ০০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


