
শহীদুল ইসলাম প্রামানিক
ছোটকালে যারা গ্রামে বাস করেছেন তাদের প্রত্যেকেরই প্রায় একটা নেশা ছিল সেটা হলো পাখির বাসা থেকে ডিম চুরি করা অথবা পাখির বাচ্চা চুরি করে বাড়িতে এনে খাঁচায় রেখে পালন করা। এটা থেকে আমিও বাদ ছিলাম না। পাখির বাসা থেকে ডিম চুরি করতে গিয়ে মাঝে মাঝে কিছু ছোট খাটো বিপদে পড়তে হতো। তারই দু’টি কাহিনী এখাবে উল্যেখ করছি।
আমি আমার চাচাতো ভাইসহ ফালগুন মাসের শেষের দিকে আমাদের গ্রামের পশ্চিম পাশে বেড়াতে গিয়েছি। সেখানে এক পড়ো ভিটায় অনেক পুরানো শিমুল গাছ আছে। গাছের উপর দিকে তাকিয়ে দেখি বড় একটি পাখির বাসা দেখা যায়। আমি চাচাতো ভাইকে জিজ্ঞেস করতেই বলল, তুই গাছের উপরে উঠে দেখ বাসায় পাখির ডিম আছে কি না, থাকলে পেরে নিয়ে আয়। বাচ্চা ফুটানো মুরগীর ডিমের সাথে পাখির ডিম দিয়ে ফুটাবো। ডিম ফুটলে দুইজনে মিলে পাখির বাচ্চা পালবো।
কথাটি শোনার সাথে সাথে আমার পাখি পালন নেশা চাপল। তাড়াতাড়ি গাছে উঠে দেখি বিশাল বড় ডিম। এত বড় ডিম এর আগে কখনও চোখে দেখিনি। ডিম হাতে নিয়ে গাছ বেয়ে নামা সম্ভব নয়। কাজেই গায়ের গেঞ্জি খুলে গেঞ্জির একপাশে গেরো দিয়ে থলির মত করে নিলাম। গেঞ্জির থলির ভিতর ডিম নিয়ে গেঞ্জির অন্য প্রান্ত দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে নামতে লাগলাম। অর্ধেক নামতেই আমার চাচাতো ভাই কি যেন একটা কথা জিজ্ঞেস করল। আমি সে কথার উত্তর দেয়ার জন্য যেই হা করেছি অমনি মুখ থেকে গেঞ্জি মাটিতে পরে ঠাস করে ডিম ভেঙে গেল।
এটা যে শকুনের ডিম ছিল তখনও বুঝতে পারিনি। যখন বুঝতে পেলাম তখন কযেক শ’ শুকুন এসে পুরো গ্রাম ভরে গেছে। মানুষের বাড়ির দরজায় গিয়ে হামলা করছে। অনেকে শকুনের ভয়ে বাড়ি ঘর ফেলে অন্যত্র গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। গ্রামের মানুষ এ অবস্থা দেখে আমাদের দু’জনকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেছে। আমাদের কারণে গ্রামে শকুনের অত্যাচার শুরু হয়েছে এ কথা বাবার কানে গেলে উত্তম মধ্যম খেতে হবে। অবস্থা বেগতিক দেখে আমরা দু’ভাই বাড়ি থেকে বের হয়ে সোজা পূবের দিকে দৌড় দিলাম। তিন মাইল ফাঁকে ফুফুর বাড়ি ছিল সেখানে গিয়ে উঠলাম। তিন দিন আর বাড়ি ফিরে এলাম না। গ্রামে শকুনের অত্যাচার বন্ধ হলে তখন বাড়ি ফিরে এলাম। তিন দিন পর শকুনের অত্যাচার কমলেও গ্রামের লোকের তিরস্কার কমল না। যেখানে যাই সেখানেই জোয়ান বুড়োদের ধমক খেতে লাগলাম। বুড়োদের ধমকের ভয়ে কিছু দিন বাড়ির বাইরে খুব একটা বের হলাম না।
এর কিছুদিন পরের ঘটনা। রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি এমন সময় আমাদের গ্রামের এক বড় ভাই আমাকে গাছের উপরে একটি পাখির বাসা দেখিয়ে বলল, ওটা মনে হয় কোকিলের বাসা, গাছে উঠে দেখ তো রে, কোকিলের বাচ্চা ফুটেছে কি না? শুকুনের অত্যাচারের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য যে তিনি আমাকে গাছে উঠতে বলেছেন, সেটা আমি বুঝতে পারিনি। না বুঝেই তার কথা মত গাছের উপরে উঠে গেলাম। সোজা গাছ, ডালপালা কম। গাছ বেয়ে কেবল অর্ধেক উঠেছি। অমনি কোত্থেকে একটা ফিঙে পাখি এসে আমার মাথায় ঠোকর দিয়ে বসল। আমি এক হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরলাম। আবার এসে ঠোকর দিল। হিস হিস করে এক হাত দিয়ে পাখি তাড়াতে লাগলাম। কিন্তু আমার কোনো চেষ্টাই কাজে লাগল না। মাথার উপর ঘন ঘন উড়তে লাগল আর ঠোকরাতে লাগল। ফিঙের অত্যাচার কুলোতে না পেরে তাড়াতাড়ি নামতে লাগলাম। কিন্তু তারপরও রক্ষা পেলাম না। মিনিটে অন্তত দশটা ঠোকর দিতে লাগল। অবশেষে গাছের অর্ধেক উপরে থেকেই লাফ দিতে বাধ্য হলাম। লাফ দিয়ে নিচে পড়ে পায়ে ব্যাথা পেলাম। কিন্তু ফিঙের অত্যাচার কমল না। মাটিতে নামার পরও ঠোকরাতে লাগল। অবশেষে ন্যাংড়াতে ন্যাংড়াতে বাড়ির দিকে দৌড়াতে লাগলাম। ফিঙেও আমার মাথার উপর দিয়ে উড়তে উড়তে ঠোকরাতে লাগল। প্রাণপনে দৌড়ে বাড়ির ভিতর গিয়ে ঘরে ঢোকার পর রক্ষা পেলাম। ততক্ষণে আমার মাথা ঠুকরিয়ে রক্ত বের করে দিয়েছে। ওই ঘটনার পর থেকে পাখির বাসা থেকে ডিম হাতিয়ে নেয়ার নেশা ছুটে গেছে। হাতের নাগলে পাখির বাসা থাকলেও আর কখনই পাখির বাসায় হাত দেই নি।
আগে পাখির বাসা দেখলে খুশি হতাম কিন্তু পাখির ডিম চুরি করলে যে পাখির মনে কষ্ট হতো এটা বোঝার চেষ্টা করতাম না। তার কারণও আছে সেই সময়ে পাখি শিকার করা একটা রেওয়াজ ছিল। গ্রামের লোকেরা ফাঁদ দিয়ে পাখি শিকার করতো, শীত কালে অনেক ধনী লোককে বন্দুক নিয়ে পাখি শিকার করতে দেখতাম। রাতে দাদী নানীদের কাছে শুয়ে শুয়ে রুপকথার গল্প শুনতাম সেখানেও রাজা বাদশাদের পাখি শিকারের কাহিনী ছিল। বাস্তবে পাখি শিকারী দেখে আর রুপ কথার গল্প শুনে পাখি শিকার করার নেশা জাগতো। বর্তমানে দেশে পাখির পরিমাণ কমে যাওয়ায় পাখি শিকার করার পরিবর্তে পাখি সংরক্ষণের চেষ্টা করি।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা নভেম্বর, ২০১৫ রাত ১১:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




