somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

গৃহকর্মী!

১৩ ই জুলাই, ২০০৯ রাত ২:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গৃহকর্মী নির্যাতনের খবর প্রায়শই সংবাদপত্রে কিংবা টিভিতে দেখা যায় ইদানিং। শুধু নির্মমতা নয়, নির্যাতনের ধরণ দেখে আতকিংত হতে হয়। ইলেকট্রিক শক দেয়া ও গরম ইস্ত্রি দিয়ে গায়ে ছ্যাঁকা দেয়ার মতো নারকীয় ঘটনা ঘটে গৃহকর্মীর ওপর। যারা এই কাজগুলি করে, তারা যে সুস্থ মস্তিস্কের নয়, তা সহজেই বোঝা যায়। এই অসুস্থতা ঘরে ঘরে বিরাজমান। কেউ আমরা দেখি, কেউবা না দেখার ভান করে স্বাভাবিক (!) জীবনযাপন করি।
আজকের যায় যায় দিনে লিজা নামের এক গৃহকর্মীর খবর এসেছে, যাকে ইস্ত্রি দিয়ে গায়ে ছ্যাঁকা দিয়েছেন গৃহকত্রী (?)। ঘটনাটি ঘটেছে তাল্লু স্পিনিং মিলের শিল্পপতি শহিদুল ইসলাম খোকনের উত্তরার বাসায়। ঘটনাটি ঘটিয়েছেন ওনার স্ত্রী। তথ্য না জানলেও আমরা ধরে নিতে পারি, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়েছেন কিংবা ব্যাচেলর কিংবা ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত ওনার শিক্ষার সার্টিফিকেট আছে। কিন্তু এই সার্টিফিকেট ওনাকে মানুষকে মানুষ হিসাবে বিবেচনা করার শিক্ষা দেয়নি (অবশ্য আমাদের শিক্ষা এটা কখনোই দেয় না কিংবা আমাদের শিক্ষা হতে আমরা এটা অর্জন করতে পারি না)।
গতকাল এক ডাক্তার দম্পত্তির গৃহকর্মীর ওপর নারকীয় নির্যাতনের চিত্র টিভিতে দেখেছি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বেডে সেই গৃহকর্মী ভালভাবে কথাই বলতে পারছিল না। এই ডাক্তারী সার্টিফিকেটও তাদের মানুষ করতে পারেনি (অবশ্য এমবিবিএস পড়ানো হয় ডাক্তার হওয়ার জন্য, মানুষ হওয়ার জন্য নয়)।
লিজাকে নির্যাতনের বিষয়ে যায় যায় দিনের সাংবাদিক মোবাইলে তাল্লু স্পিনিং মিলের এমডিকে ফোন করলে তিনি নির্যাতনের কথা অস্বীকার করে বলেন, ‌তার গায়ে চর্মরোগ ছিল, সেকারণে তার হাতে পায়ে ঘা হয়েছে (?????)।
আমরা যারা শিক্ষার সার্টিফিকেট নিয়ে একটু সমাজসচেতন হওয়ার প্রমাণ রাখার চেষ্টা করি, তারা কাজের মেয়ে কিংবা বুয়া কিংবা মেইড সারভেন্ট কিংবা কাজের বেটি ইত্যাদিগুলোর অপসারণ করে সুন্দর নাম দেয়ার চেষ্টা করেছি, গৃহকর্মী। সুন্দর প্রচেষ্টা, অন্ততঃ এটার মাধ্যমে নিপীডিত কাজের মেয়েদের কিংবা ছেলেদের একটা সামাজিক মর্যাদা দেয়া হয়েছে। কিন্তু সেই স্বীকৃতি মিলেনি এখনো। যার জন্য আইন করার জন্য আমরা চেষ্টা করছি; শুনছি আইনও নাকি হয়ে যাবে খুব শিঘ্রই। কিন্তু সেই আইনে কি বলা থাকবে, কিভাবে মানুষ নামের অমানুষগুলোর মানসিকতার পরিবর্তন ঘটবে?
আমার পরিচিত একজনের বাড়ীতে কাজের মেয়ে, সরি! গৃহকর্মী এনে দিয়েছিলাম গ্রাম হতে। নিয়ে আসার আগে বলেছিলাম, তার বিয়ের খরচ দেয়া হবে। তারপর......।
বেড়াতে যেতাম সেই বাড়ীতে। জানতে পারি, কাজের মেয়েটি (গৃহকর্মী!) খুবই ফাঁকিবাজ। সুযোগ পেলেই কাজ ফাঁকি দেয়, চুরি করে এটা ওটা খায়। ভাগ্য ভাল অন্য কিছূ চুরি করা অভিযোগ পাইনি। এটা ছিল গৃহকত্রীর অভিযোগ। গৃহকর্মীর কোন অভিযোগ ছিল না। শুধু চোখ-মুখ বন্ধ রেখে নিরবে এসব কথা শুনে যেত, আর চোখভরা নৈরাশ্যমূলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো।
সেই দৃষ্টিতে যে অনেক অভিযোগ জমা আছে, তা বুঝতে পারতাম। কারণ নিজের চোখের সামনেই দেখেছি, চোখ-মুখ-দাঁত খেচিয়ে চুলের মুঠি ধরে ঝাকানি দিয়ে উচ্চস্বরে বকাবকি করতো গৃহকত্রী। তারচেয়ে একধাপ এগিয়ে সেই গৃহকত্রীর ৪ বছরের মেয়ে। নির্যাতন করার মতো বয়স তার হয়নি, কিন্তু তার অর্ডার করার ধরনেই একজন আগামী নির্যাতকের যে জন্ম হচ্ছে, তা বুঝতে পারতাম। সেই মেয়ে নির্যাতন করতে না পারুক, নির্যাতন করতো গৃহকত্রী। কারণ মেয়ের অর্ডার সময়মতো পালন করা হয়নি। নিজের চোখেই দেখেছি, সেই ঘটনা। কেন অর্ডার সময়মতো পালন করা হয়নি, তার কারণটা কেউ জানতে চায়নি। কিন্তু আমি এমনিতেই জানতে পেরেছি। কিভাবে? বাসায় আমার আগমন হওয়াতে গৃহকত্রী চা বসাতে বলেছেন। সেই চা করছেন গৃহকর্মী। ঘর হতে গৃহকত্রীর মেয়ের চিৎকার, এ্যাই আমাকে পানি দিয়ে যা। মিনিট পাঁচেক স্বাভাবিক অবস্থা! তারপর হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, গৃহকত্রীর মেয়ে রাগে টকটকে লাল হয়ে গেছে, আর চিৎকার করে রান্নাঘরে গিয়ে গৃহকর্মীকে ধাক্কা দিয়ে বলছে, এ্যাই তোর কাছে না আমি পানি চেয়েছি। দিসনি কেন বল! দিসনি কেন বল! মেয়ের চিৎকার শুনে মা প্রায় দৌডে গেলেন রান্নাঘরে। মায়েরও অভিযোগ শুনতে পেলাম, এ্যাই মেয়ে আমার মেয়েকে না খাইয়ে মেরে ফেলবে। এ্যাই তোর কাছে না ও পানি চেয়েছে। দিসনি কেন বল? দিস নি কেন বল? বার বার একই কথা শুনতে পেয়ে আমিও এগিয়ে গেলাম রান্নাঘরে। গিয়ে দেখলাম, গৃহকত্রী একবার চুলের মুঠি ধরে টানছে, তো আরেকবার গাল ধরে টানছে, আর বলছে, এই দিসনি কেন বল, এই দিসনি কেন বল! গৃহকর্মী নির্বাক। শুধু চুল, নাক, মুখ, গাল টানাটানিতে এদিক ওদিক দুলছে।
রান্নাঘরে হঠাৎ আমার আগমন হওয়াতে নিজের সাথে নিজেই খিস্তি করতে করতে লাগলেন গৃহকত্রী। আমরা আবার চলে এলাম ড্রয়িংরুমে। কত অভিযোগ গৃহকর্মীর নামে। এ্যাই মেয়েকে ভাল কাপড়-চোপড় দিচ্ছি, আমরা যা খাই তা খাওয়াচ্ছি, যা চৌদ্দজনমে চোখে দেখতো না; তাও কাজে ফাঁকি দেয়া, সময় পেলেই ঘুমিয়ে পড়ে, চুরি করে মেয়ের খাবার খেয়ে নেয়, ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপর এলো আমার চা পানের সময়। চা আর নাস্তা নিয়ে এলেন গৃহকর্মী। এগুলি আমাকে খেতে হবে! আমি গৃহকর্মীর দিকে চেয়ে রইলাম কিছুক্ষন যদি কিছু বলে। নাহ! কোন অভিযোগ নেই তার। ভদ্রলোক বলে কথা, আমিও চা-নাস্তা গলদধরন করলাম।
তারপর একদিন সুযোগ বুঝে গৃহকর্মীকে বললাম, চল তোকে বাড়ীতে দিয়ে আসি। এতো নির্যাতন সহ্য করে এখানে আর থাকিস না। কিন্তু গৃহকর্মী সেটাতে রাজী নয়। তারকথা, মারধর করে করুক, এখানে তো তিনবেলা খেতে পাই, বাড়ীতে গেলে তো একবেলা খেয়ে, কখনো কখনো না খেয়ে থাকতে হয়। শুধু রাতে যদি ঘুমাতে দিত, তাহলে ভাল হতো।
জিজ্ঞাসা করে জানলাম, রাত দুটোতে ঘুমিয়ে আবার ভোর পাঁচটায় উঠতে হয় সেই গৃহকর্মীকে। তাই ঘুম আসে। আর ঘুম আসলেই মারধোর।

এই অবস্থা আমার নিজের দেখা। যদিও বিয়ে পর্যন্ত সেই মেয়েকে ঐ বাসায় রাখা হয়নি। তার মা এসে নিয়ে গেছে। আর তার বিয়ের খরচ দেয়া হয়নি। গৃহকর্মীদের এই অবস্থা। আমার আপনার চারপাশে চলছে এই ঘটনা।
সেই দিনের আমার নিরবতা আজও আমাকে পীড়া দেয়। তাই কোন গৃহকর্মীর ওপর নির্যাতন হলে অন্ততঃ এখন আমি আর চুপ করে থাকি না, মৌখিক প্রতিবাদ করি। পরবর্তীতে সেই বন্ধু, আত্মীয় কিংবা বসদের যে ঘৃণা করি, সেটা বুঝিয়ে দেয়ার চেষ্টা করি। প্রতিবাদ এ পর্যন্তই। আসুন না, সবাই আমরা এদের ঘৃণা করি, বুঝিয়ে দেয়ার চেষ্টা করি। সামাজিকভাবে বয়কট করি এবং অন্যান্যদের বয়কট করার জন্য উৎসাহিত করি।
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে ট্রাম্প চাচা ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৫


সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ভোট দিয়ে এসে অনেকক্ষণ ধরেই অপক্ষো করছিলাম কখন সন্ধ্যা হবে সে প্রত্যাশায়। সন্ধ্যার পর মোটামুটি বসে গিয়েছিলাম ফলাফলের উপর টেলিভিশনে বিশেষ আলোচনা দেখার জন্য।... ...বাকিটুকু পড়ুন

"বন্ধ দুয়ার"

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৪


"বন্ধ দুয়ার"

ক্লান্ত এ সপ্তাহে শুনি, আজ কারো কাজ নাই,
বন্ধ কারখানায় তালা, কোথা যাব তবে ভাই?
ছুটা বুয়া হয়ে খাটা, সে সুযোগও মেলা ভার,
তরুণী দেখিয়া মোরে, কেহ খোলে না যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্যালটের চিঠি: মাননীয় ট্রাম্প, আপনার বাকি বন্ধ

লিখেছেন নতুন নকিব, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩

ব্যালটের চিঠি: মাননীয় ট্রাম্প, আপনার বাকি বন্ধ

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

"আমেরিকাকে আবার মহান করব" বলে এসে যিনি দুনিয়ার সবাইকে বিরক্ত করলেন, ভোটাররা তাঁকে জানিয়ে দিলেন: হুমকি ধমকি আর উম্মাতাল আঁতলামির... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)
.................................................................................................................



কক্ষপথে ঘোরে আমার একলা মনের ইলেকট্রন,
নেগেটিভ চার্জে মেঘ জমেছে, খুঁজছে আজি কার্বন মাখা অন্যমন।
তুমি যখন পজিটিভ এনার্জিতে, এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫৮



পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

একটি একটি সামরিক কৌশল। কোনো সামরিক বাহিনী যখন পিছু হটে বা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে চায়, তখন তারা নিজেদেরই ফেলে যাওয়া এলাকার সমস্ত ফসল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×