দুইদিন ধরে গান শুনতে পারছিলেন না, সিডিটা নষ্ট হয়েছে মনে হয় ।ঠিক করতে দিতে হবে। তার আগে হঠাৎ করেই পুরনো ট্র্যানজিস্টারটার কথা মনে পড়লো। মেয়েদের বলতেই..."আব্বু, ওইটার তো দি এন্ড হয়ে গেছে, খাটের নিচে ময়লার মধ্যে পড়ে আছে। আমরা কত ট্রাই করেছি ঠিক করার,কিছু হয় না।আমাদের চে বেশী বয়স ওইটার তুমিই না বলেছ? দাঁড়াও তোমাকে সিডিটা তাড়াতাড়ি ঠিক করে দিব। ওকে বাবা? "
আলম সাহেব সম্মত হয়েছিলেন, সিডিটাই ঠিক করতে হবে, এখন কি আর কেউ ক্যাসেটে গান শুনে? তবু আজ মেয়েরা না থাকায় হঠাৎ কি ভেবে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে মেয়েদের ঘরে এলেন। খাটের দিকে তাকিয়ে ছেলেবেলার কোন কিছু চুরি করতে যাবার আগে যেমন একটু দ্্বিধাজনিত লজ্জা লজ্জা হাসি হাসতেন, আজ অনেক দিন পরে তেমনি করে হাসলেন। তারপর এগুলেন কয়েক পা। পায়ে ব্যাথা, নিচু হতে কষ্ট হয়, তবু অনেকখানি ঝুঁকে খাটের নিচে খুঁজে খুঁজে অবশেষে বের করে আনলেন যা খুঁজছিলেন এতক্ষন ধরে।সেই অতি পুরনো ট্র্যানজিস্টার-- তাঁর, তাঁদের।
নিজেই ঝেড়েমুছে পরিষ্কার করেন ট্র্যানজিস্টারটা। নিজের ঘরে এসে সিডিটা সরিয়ে সেখানে রাখেন। কাঁপা কাঁপা হাতে একটা ক্যাসেট ঢুকিয়ে "প্ল্লে" তে চাপ দেন। বাজে না।রেডিও অন করেন, ঘরঘর শব্দ ছাড়া কার্যকরী কিছু শোনা যায় না সেখানেও। একটা মুহুর্ত কাটে, নীরবে। তারপর...নীরবতা অক্ষুন্ন থাকে, তার সাথে ঝরে পড়ে অশ্রু, আলম সাহেবের দুই চোখ বেয়ে। এক ঝটকায় ঝাপসা চোখের সামনে ভেসে ওঠে স্মৃতি।
নতুন সংসার। বিয়ের বছরেই সেই সংসার আলো করে এলো ফুটফুটে দেবদূত। মাত্র বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বেরুনো বেসরকারী কলেজের শিক্ষক আলম সাহেব নিজের সাধ্য অনুযায়ী স্বর্গ সাজান, পরী-বৌ আর দেবশিশুকে নিয়ে । সংসারে কেবল খুটিনাটি প্রয়োজনীয় কিছু আসবাব আর হাঁড়ি-পাতিল ছাড়া আর কোন বাহুল্য জিনিস নেই। একদিন পরী-বৌ আবদার করে একটা টিভি কেনার। আরো কিছুদিন অপেক্ষার পরে আলম সাহেব অবশেষে টিভি কেনার টাকাটা জমাতে পারেন। ঠিক হয় একটা ছোট্ট সাদাকালো টিভি কেনা হবে। পরী-বৌটার চোখে আনন্দের ঝিলিক দেখে আলম সাহেবের মনটা ভরে যায়। একসাথে বের হন টিভি কেনার উদ্দেশ্যে। দোকানে গিয়ে দুজনে মিলে দেখতে দেখতে হঠাৎ বৌ বলে আমার টিভি চাই না ! আলম সাহেব অবাক, বলে কি?! লজ্জা লজ্জামুখে বৌ বলে " মিতা, আমাকে ওই ট্র্যানজিস্টারটা কিনে দিবে? আমি টিভি দেখে কি করব? তার চে সারাদিন গান শুনব আর কাজ করব। দুইটা তো একসাথে কেনা যাবে না, তুমি আমাকে ট্র্যানজিস্টারটাই কিনে দাও না !" আলম সাহেব আরো অনেকক্ষন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন বৌয়ের ব্যাগ্র মুখের দিকে। নিজের মনের না বলা ইচ্ছাটা এমন করে মিলে গেলো!
আলম সাহেবর ঘরে হাঁড়ি-পাতিল,খাট-টেবিলের সাথে আরো একটি জিনিস যোগ হলো সেই থেকে--ট্র্যানজিস্টার ! আর গান-পাগল দুজন মানুষের ঘরে রাত-দিন বাজতে লাগলো গান। এরপর কেটে যেতে লাগলো দিন, সেই সংসারে যোগ হলো আরো কত কি! সেই সাথে আরো দুজন নতুন অতিথি।আরো দিন যায়.....একের পর এক...বছর পার হয়ে হয়ে 32 টি বছর ! একসাথে দুইজন....গানে গানে....।
আলম সাহেব পাশে রাখা গামছা দিয়ে চোখের জল মুছেন, আবার ভিজে ওঠে, আবার মোছেন। পুরো ঘরটায় চোখ ঘুরেফিরে তাঁর... এক বছর হলো প্রায়। এখনও আলনায় শাড়িগুলো তেমনি করে রেখেছেন ঠিক যেমনটা সে রেখেছিলো...জুতার স্ট্যান্ডে এখনও সারি সারি সখের জুতা তেমনি করে সাজানো। খানিক আগেই রোজকার মত সব ঝেড়েমুছে রেখেছেন নিজ হাতে। সব রয়ে গেলো...আরো কত কিছু এলো উপলক্ষ্য ধরে ধরে...এমনকি এই না বাজতে চাওয়া ট্র্যানজিস্টারটাও, কেবল সেই ফাঁকি দিলো আমাকে?
আরো দুদিন পরের বিকাল। ছোট মেয়ে ঘরে ফিরে দেখে বাবা গান শুনছে, সেই পুরনো ট্র্যানজিস্টারে ।
"বাবা! এটা কি করে করলে? এটা বাজলো?? ইম্পসিবল ব্যাপার !"
বাবা মিটিমিটি হাসেন, "হয়ে গেলো রে মা কেমনে যেন! দুই দিন ধরে হেডটা মুছামুছি করতে করতে মনে হয়... অনেক দিন ধরে ময়লা জমে ছিলো তো...আবার দ্যাখ রেডিওর সব স্টেশনও ধরছে। বিবিসি শুনতে পারব আবার রেগুলার।"
"কিন্তু বাবা আমরাও তো ওই হেড কত মুছে টুছে ট্রাই...."
মেয়ের কথা আটকে যায় বাবার হাসিমাখা মুখ দেখে।
আলম সাহেবের ঘরে এখন ট্র্যানজিস্টারে গান বাজে, পাশে ঠিক করে রাখা সিডি আর মেয়েদের পিসির গানের তুমুল শব্দকে পরিহাস করেই যেন।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জুলাই, ২০০৬ সকাল ১০:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




