ট্রাম্প সরে গেলেই যে বিশ্বের বিপদ কেটে যাবে বলে যারা ভাবছেন তারা খুব সম্ভবত আমেরিকার রাজনীতি নিয়ে স্পষ্ট ধারনা রাখেন না। তার প্রশাসনের কিছু নীতি আমি ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ না করলেও তার অনেকগুলো নীতি আমেরিকার জন্য ভালো ছিলো বলে আমি মনে করি।
প্রথমতঃ আমেরিকায় অবৈধ অভিবাসীর সঠিক সংখ্যা জানা না থাকলেও তা ২০১৪ সালের হিসেব অনুযায়ী তা ১ কোটিরও অনেক বেশী এবং এদের বেশীর ভাগই মেক্সিকো আসা (৬৬ লাখ ২০১৭ সালের হিসেবে অনুযায়ী)। প্রথাগত ইমিগ্রেশন আইন থাকার পরও তারা সেটার তোয়াক্কা না করে অবৈধভাবে আসলে, কেন তারা প্রচলিত আইনের সহায়তা পাওয়ার আশা করেন সেটা আমার বোধগম্য নয়। আইন ভেঙ্গে দেশে এসে সেই আইনের আশ্রয় চাওয়া নিতান্তই হিপোক্রেসি। ডেমোক্রেটিক পার্টি বরাবরই এদের প্রতি উদার এবং এটা কোন ভাবেই একটি দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়। এই দলটি বরাবরই ভোটের রাজনীতি করে এসেছে এখনো করছে। কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে রাজনৈতিক রূপ দেয়াই এদের মূল কাজ। আজকে রোহিঙ্গারা যখন অবৈধভাবে বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে যাচ্ছে তখনতো বাংলাদেশীদের হতাশা আর ক্ষোভ ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না, তাহলে আমেরিকানরা কেন তাদের দেশে অবৈধদের স্বাগত জানাবে সেটাও ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে।
দ্বিতীয়তঃ রেসিসম নেই এমন দেশ দুনিয়াতে আছে বলে আমি জানিনা। আমেরিকাও এর ব্যতিক্রম নয়। ভারতীয় উপ-মহাদেশের দেশগুলো আমেরিকার চেয়েও অনেক বেশী রেসিস্ট বলে আমি মনে করি। ওখানে ধর্ম, গায়ের রং, জেন্ডার, জাত-পাত, রাজনৈতিক মতবাদ সবকিছুতেই বৈষম্য কাজ করে। সংখ্যালঘু হওয়ার পরেও আমেরিকায় কালো প্রেসিডেন্ট মানুষ দেখেছে, এটা যারা মনে করেন আমেরিকা মূলত রেসিস্ট দেশ তাদেল গালে বিশাল চপেটাঘাত এর মতো। কনডোলিৎজা রাইস, কলিন পাওয়েলের মতো ব্যক্তির সেক্রেটারী অফ স্টেট হওয়ার পরে যদি কোন প্রশ্ন থেকে থাকে তাহলে আমার বলার কিছু নেই। এখানে যোগ্যতার প্রশ্ন বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। যোগত্যা থাকলে একজন কালো ব্যক্তিও যে দেশের সর্বোচ্চ স্থানে পৌছুঁতে পারেন ওবামাই তার প্রমাণ। বর্তমানে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে যে বিচারক আসীন আছেন, তিনিও কালো। যোগ্যতার কারণে একজন হিসপ্যানিক বিচারকও আছেন। যোগত্যার বলেই ভারতীয়রা, চায়নীজরা এখানে ভালো চাকুরী করছেন, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। প্রথাগতভাবে কালোদের ঢালাও অভিযোগ যে তাদের প্রতি বৈষম্য করা হয়ছেে এবং হচ্ছে এ কথার কোন ভিত্তি আছে বলে আমি মনে করিনা। এদশের আর দশজন মানুষের মতো সবার সমান সুযোগ-সুবিধা থাকার পরেও সুর্নিদিষ্ট একটি বা দু'টি জাতির লোকজনদের পারফরম্যান্স অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর তুলনায় কেন খারাপ সেটা তাদের নিজেদেরই ভেবে দেখতে হবে।
একটা উদাহরণ দিচ্ছি। ভালো রেজাল্ট থাকার কারণে আমি নিউ ইয়র্কের অন্যতম সেরা পাবলিক কলেজে ভর্তি হতে পেরেছি। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, ঐ কলেজটাতে সবচেয়ে বেশী ভারতীয় আর চায়নীজরা পড়াশোনা করে। এরপর পাবেন, সাদা, হিসপ্যানিক এবং সবশেষে কালো ছাত্র। এই দৃশ্য মোটামুটিভাবে পুরো আমেরিকার। প্রশ্ন হলো, নিউ ইয়র্কে ভারতীয় এবং চায়নীজরা সংখ্যায় এখানে হিসপ্যানিক এবং কালোদের চেয়ে অনেক কম হওয়া সত্ত্বেও ভালো স্কুল গুলোতে হিসপ্যানিক, আফ্রিকান আমেরিকান বা কালোদের উপস্থিতি এত কম কেন? উত্তর রেজাল্ট এবং সেটা ভালো করার দায়িত্ব ব্যক্তি বিশেষের উপর বর্তায়। এটাকে রেসিজম বলে আখ্যা দেয়ার কোন অবকাশ আছে বলে আমার মনে হয় না। আপনি যদি মনে করেন, বুয়েটে যদু-মধু সবাই সুযোগ পাবে তাহলে প্রকৃত মেধার আর কোন মূল্য থাকছে কোথায়! কোটা করে যদি যদু-মধুদের ঢোকানো হয় তাহলে ধীরে ধীরে বুয়েট-ই তার মান হারাবে।
আমেরিকায় কোন রকম বৈষম্য নেই সে কথা ভূতেও বলবে না। বরং ক্ষেত্র বিশেষে ট্রাম্পের সময়েই এই সমস্যাগুলো আরো বেশী খোলাখুলিভাবে প্রকট হয়েছে। অন্যদিকে বাইডেন আসলেই যে, এই সমস্যার ম্যাজিক কোন সমাধান সম্ভব সেটা ভাবাও নিতান্তই বোকামী।
তৃতীয়তঃ বিগত দেড় যুগের বেশীদিন ধরে চলে আসা বিভিন্ন যুদ্ধ থেকে এই প্রথম কোন প্রেসিডেন্ট নতুন করে কোন যুদ্ধ বাধানো থেকে দূরে ছিলো। এটাকে আমি পজিটিভ হিসেবেই দেখবো। ২০০৮ সালে ওবামা নির্বাচনে বার বার যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার কথা বললেও তিনি আসলে সেটা পুরোপুরি করতে পারেন নি। ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করা এই যুদ্ধ থেকে কতিপয় ব্যক্তি এবং কিছু কোম্পানী মুনাফা গুনেছে। সাধারণ জনগনের করের টাকা নষ্ট হলেও তাদের তেমন কোন প্রত্যক্ষ মুনাফা হয় নি।
চর্তুথতঃ বিগত কয়েক দশক ধরে চায়না-আমেরিকার বৈদেশিক বাণিজ্য ধীরে ধীরে আমেরিকার বিপক্ষে চলে গেছে। এতে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে আমেরিকার নিজস্ব ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানীগুলো। চাকুরীহারা হয়েছে বহু আমেরিকান আর মুনাফা গুনেছে চায়নীজরা। এই ধরনের ডেফিসিট বাণিজ্য মূলত আমেরিকার অর্থনীতিকে দূর্বল করে দিয়ে চায়নাকে চাঙা করেছে। ট্রাম্প এসে বেশী কর আরোপ করায় তা কিছুটা হলেও কমে এসেছে। নাফটা চুক্তির কারণে মেক্সিকো একাধারে তাদের পণ্য আমেরিকা, কানাডায় রপ্তানী করেছে, লাভ হয়েছে তাদের। ট্রাম্প এসে সেটাকে পরিবর্তন করে এইএসএমসিএ করাতে পণ্যের দাম কিছুটা বাড়লেও আমেরিকায় চাকুরির সংস্থান বাড়বে, বিশেষ করে গাড়ি তৈরী এবং এগরিকালচার ইন্ডাস্ট্রিতে। অন্তত মেক্সিকোর এক চেটিয়া মুনাফা আর আমেরিকার ক্ষতি আর আগের মতো থাকছে না।
পঞ্চমঃ করোনার ইস্যুতে তাকে নিয়ে জল যথেষ্ট ঘোলা করা হয়েছে। চায়না থেকে এই ভাইরাস আমদানি হওয়ার পর যখন তিনি চায়না থেকে লোক আসা বন্ধ করে দিতে চাইলেন, তখন ডেমোক্রেটিক পার্টি তাকে রেসিস্ট বলে আখ্যা দিতে শুরু করলো। ফলাফল চায়নিজ লোক আসা যাওয়া অব্যাহত রাখা হলো আর লাখো লাখো লোকের মাঝে সংক্রমন ছড়ানো হলো। মানুষতো আর মাসের পর মাস ঘরে বসে থাকবে না। ঘরের বাইরেও যেতে হবে, কাজও করতে হবে, দিন শেষে বিলও পে করতে হবে। ব্যাপারটাতো এমন নয় যে, তিনি ঘরের ভেতর ঘাপটি মেরে বসে ছিলেন। তিনি নিজেও সংক্রমিত হয়েছেন। কিন্তু আমিতো দেখিনি, ন্যান্সী পেলোসি বা চাক শুমার সংক্রমিত হয়েছেন। জনগনের আর্থিক সহায়তার জন্য বিল এসেছে তার দল এবং তিনি সেটা পাশও করিয়েছেন। নিজের ক্ষমতা বলে তিনি সবাইকে টাকাও পাঠিয়েছেন। অথচ এক ডেমোক্রেটিক পার্টির ন্যান্সী পেলোসির কারণে পুরোদেশের মানুষ এখন অর্থশূণ্য। হাতে টাকা নেই, কোন স্টিমূলাসও পাশ করানো যায় নি নির্বাচনের আগে। সেই জুলাই মাস থেকে দেশের মানুষ শূণ্য হাতে বসে আছে। কিন্তু এভাবেতো আর বসে থাকা যায় না, বাড়ি ভাড়া, বিলতো আর বন্ধ নেই। বাউডেন সরকার গঠন করলেও যেন আমাদের ভাগ্যের কোন আহামরি পরিবর্তন ঘটবেনা সেটও চোখ বন্ধ করেই বলা যায়।
লিখতে চাইলে আরো অনেক বেশী তথ্য লিখা সম্ভব তবে সেটা নিয়ে আজ আর নয়। তবে যে কথা না বললেই নয়, সেটা হলো ব্যক্তি ট্রাম্প আর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প-এ ব্যবধান অনেক। প্রথমে সে একজন ব্যবসায়ী এবং প্রেসিডেন্ট হয়ে সে তার ফায়দা যে তুলেন নি, সেটাও জোর দিয়ে বলা সম্ভব নয়। সে প্রথাগত তৈল মর্দন করা রাজনীতিক নন, তার মুখে লাগামও কম। বেফাস কথা বলে বেশ সমস্যার সৃষ্টি করেছেন আর সেটার ফায়দা তুলেছে ডেমোক্রেটিক দল। এবার তারা সরকার গঠন করলেও আমাদের মতো আম জনতার কপালে যে ভালো কিছু নেই সেটা হয়তো আপাতত আলোচনার উর্দ্ধে তবে খুব তাড়াতাড়িই সেটাও দেখা যাবে বলেই আমার বিশ্বাস। দিন শেষে দলের উর্ধ্বে দেশ আর সেখান থেকেই প্রতিটা রাজনীতিকের ভূমিকাকে আলোচনা করা উচিত। তবে যারা ভোটের রাজনীতি করেন, তাদের নীতি-আদর্শের কথা মুখে থাকলেও কাজে যে সেটার বাস্তবায়ন দেখা যায় না সেটা নতুন করে শেখার দরকারও নেই। মূলত এই কারণেই ব্যক্তিগতভাবে আমি র্নিদলীয় ভোটার বা ইন্ডিপেন্ডেন্ট ভোটার।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই নভেম্বর, ২০২০ সকাল ৯:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



