
নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের নাম অসংখ্যবার শুনেছি ব্লগেও অনেকে ছবিসহ পোষ্ট দিয়েছেন।
দর্শনীয় স্থান গুলোতে ভ্রমন রোগে আমি সর্বদাই আক্রান্ত থাকি শুধু সময় ও সুযোগের যূথী বন্ধনের
অভাবে ভ্রমনগুলো অপরিপূর্ন থেকে যায়।
এবার অপ্রত্যাশিত এবং অপরিকল্পিত ভাবে একটা সুযোগ এসে যাওয়ায় ভ্রমনটা মিস করার মত বোকামি করতে মন চাইলোনা, তাই' 'যে বাহনই পাই তাতেই সওয়ার হবো' এই পণ করে একটা লোকাল ট্রেনে উঠে পড়লাম, [কারন আন্ত:নগর ট্রেনের কোন ষ্টপেজ ঐ গন্তব্যে (জামালগঞ্জ) নেই] জানালার কাছে একটা সিট পেলাম, প্রচন্ড গরমে একটু স্বস্তি যে,ট্রেন চললে বাতাস অন্ততঃ পাওয়া যাবে, কিন্তু ট্রেনে উঠতে গিয়ে যে যুদ্ধটা করলাম সেটা এড়ানোর কোন উপায় ছিলোনা। নারী পুরুষ নির্বিশেষে কে কার আগে উঠবে সেটার প্রচন্ড প্রতিযোগীতা চলছিলো, কারন’ সংক্ষিপ্ত সময়ের বিরতীতে একদল যাত্রী নামবে আরেকদল উঠবে, জনবহুল দেশে সব জায়গায়ই ভীষন ভীড়। ট্রেনের এত চাহিদা থাকা সত্বেও ট্রেন স্বল্পতা, বগী স্বল্পতা লক্ষ্যনীয়। ভীড়ের মধ্যে বারবার মনে হচ্ছিলো এই মানুষগুলি আমাদের দেশের সহজ সরল সাধারন মানুষ, এরাই আমরা । প্রতি বৎসর লক্ষ কোটি টাকার বাজেট যারা করেন তাদের যদি লোকাল ট্রেনে ওঠা বাধ্যতা মূলক করা যেতো বা রেলের মহা মহা কর্তা ব্যক্তিদের যদি রেলে সাধারন বগীতে ভ্রমন করা বাধ্যতামূলক করা যেত তাহলে মনেহয় বেশ হত !!!
একটার পর একটা স্টেশন আসছিলো আর নাটকের একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি চলছিলো । আমার সাথে একজন ভ্রমন সঙ্গী ছিলো, সে বললো যে, সে বসবেনা! বরঞ্চ’ ট্রেন জুড়ে ঘুরে বেড়াবে (এই ভীড়ে এমন প্রস্তাব! নির্ঘাৎ আমার মতই মাথা খারাপ, কারন’ আগে এই অপকর্ম আমিও করতাম) আমি মাথা ঝাকিয়ে সায় দিলাম। অসংখ্য মানুষ দাড়িয়ে যাচ্ছে স্বভাবতই সিটটা খালি থাকলো না। আমি বাহিরের দৃশ্যের দিকে নজর দিলাম, অনেক বড় বড় বিল, জেলেরা মাছ ধরে বাঁশের চিকের উপর শুকোতে দিয়েছে, শুটকী তৈরী করার জন্য । শরৎকালের আবহ, দূর গ্রামের গা ঘেঁষে সবুজ ধান ক্ষেত, উপরে উজ্জ্বল সূর্য্যের নীচে গাঢ় নীলাকাশ আর ভাসমান শ্বেতশুভ্র মেঘের ভেলা, এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্যে বেশ কিছুক্ষন বিভোর হয়ে থাকলাম! হঠাৎ’ অনির্ধারিত একটা জায়গায় ট্রেনটি ধীরে ধীরে থেমে যাওয়ায় (পরে জেনেছিলাম ওখানে একটা ব্রীজ ভেঙ্গে গেছে) কম্পার্টমেন্টের ভিতরে দৃষ্টি দিলাম, দেখলাম’ একজন মহিলা খুব ছোট্ট একটা দুধের শিশুকে কোলে নিয়ে অস্বস্তিকর ভীড় আর গরমের মধ্যে দাড়িয়ে আছেন। ট্রেনের ঝাকুনিতে যেন পড়ে না যায় সেজন্য এক হাতে দুগ্ধপোষ্য শিশু আরেক হাতে একটা সিট ধরে দাড়িয়ে । কখন থেকে কোন স্টেশন থেকে উঠে এই অবস্থায় আছেন বলতে পারবোনা (কারন দৃষ্টি ছিল প্রকৃতির রূপ সূধা পানে ব্যস্ত) আশেপাশে তাকিয়ে অন্যান্য পুরুষ যাত্রীদের দিকে তাকালাম, দেখলাম তারা একেবারেই নির্বিকার, মহিলার অসহায় অবস্থা দেখছে আর মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে, মনে হল এটা আর এমন কি এতো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার! এদিকে আমার মনে হতে লাগলো আমার সিটের নিচে যেন অসংখ্য কাঁটা বিছানো আছে, ভীষন অস্বস্তিতে কিছুতেই আর সিটে বসে থাকতে পারছিলাম না, মনে হচ্ছিলো উঠে দাড়িয়ে মহিলাকে বসতে দেই। আমি আমার পাশের জনকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম তার সিট আমার সঙ্গীর সিটের পরে, তাকে বললাম, আপনার সিটে আপনি বসুন এটা আমার সিট’ তিনি গরিমসি শুরু করলেন, কারন তার সিটে আরেকজন বসে আছেন তিনি তাকে কিছু বলতে নারাজ! কি আর করা অপ্রিয় কাজটা আমাকেই করতে হবে, আমি ঐ যাত্রীকে টিকিট, সিট, ইত্যাদি বিষয়ে প্রশ্ন করে কোন সদুত্তোর পেলামনা, তখন দাড়ানো মহিলার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষন করে বললাম যে, ওনাকে আমার পাশের সিটে বসতে দেবো আপনি দয়া করে সিট ছেড়ে দাড়ান! সিট খালি করে মহিলাকে ডেকে বসালাম । মহিলার চোখের কৃতজ্ঞ দৃষ্টি আমি বোধহয় সহজে ভুলবো না।
অল্পক্ষণ পরেই আমরা জামালগঞ্জ স্টেশনে নেমে ইজিবাইকে করে পাহাড়পুর রওনা হলাম।
ওখানে পৌঁছে টিকিট করে প্রথমেই আর্টিফ্যাক্ট যাদুঘরে প্রবেশ করলাম, ওখানে ছবি তোলা নিষেধ দেখে একটু হতাশ হলাম। খ্রীষ্টজন্মের পাঁচশত/ছয়শত শতকের মূর্তি, মৃৎপাত্র, মাছধরার জালের গুটি এবং ষ্ট্যাম্প, সীল ইত্যাদি দেখছিলাম, বেলে পাথরের মূর্তি, শ্বেত পাথরের মালা গাথার পূতি, শ্বেত পাথরের বুদ্ধ মূর্তি দেখলাম, কয়েকটা মেয়েকে দেখলাম নোটবুক আর কলম নিয়ে নোট করছে, বুঝলাম’ প্রত্নতত্ত্ব বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করছে। দুটো মেয়েকে দেখলাম বোরকার আড়ালের সুযোগ নিয়ে ছবি তুলছে লেখালেখির ঝামেলায় না গিয়ে! আমার নজরে ধরা পড়ে একটু বিব্রত হলো বলে মনে হলো, আমি একটু প্রশ্রয়ের হাসি দিয়ে ওদের আশ্বস্ত করলাম আর ওদের কাজে অনুপ্রানিত হয়ে আমিও চুরি করে শ্বেত পাথরের একটা বুদ্ধ মূর্তির ছবি উঠালাম
আমার সঙ্গী একটা ক্ষুদ্র আর্টিফ্যাক্টের দিকে দৃষ্টি আকর্ষন করে বললো, ‘এটা কিভাবে উদ্ধার করলো’ ? আমি বললাম, এজন্য উদ্ধারকারীরা অবশ্যই প্রসংশার দাবীদার, তবে আমি অবাক হচ্ছি ১১০০/১২০০ সালে যে শিল্পী এটা বানিয়েছেন, তার কর্মকুশলতার, দক্ষতার কথা ভেবে, কারন’ এমন সূক্ষ কারুকার্যের জন্য ততোধিক সূক্ষ যন্ত্রপাতি বানিয়ে নিয়ে তিনি শৈল্পীক চেতনার চরম দক্ষতার পরিচয় দিয়ে এটি গড়েছেন ।
“স্যার! আপনি কোথায় আছেন ?” এমন একটা প্রশ্ন শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ঘুরে দাড়ালাম! দেখি’ গোপনে ছবি তোলা সেই মেয়ে দুটি কখন যে আমার পিছনে এসে দাড়িয়েছে, একদম টের পাইনি! আমার মৌনতায় আবার একই প্রশ্ন করে বললো, এত সুন্দর করে প্রেজেন্টেশন দিলেন তাই জিজ্ঞেস করছি স্যার, বেয়াদবি নিয়েন না! আমি বুঝলাম ওরা কি বুঝেছে ? আমি মজা করে বললাম, আমি পাহাড়পুর প্রত্নতত্ত্ব যাদুঘরে আছি! ওরা হো হো করে হেসে উঠে বললো, ‘আমরাও তো স্যার এখানেই আছি!’ আর কথা বাড়াবার বিশেষ সুযোগ না দিয়ে আমি বললাম, ‘দুঃখীত এই বিষয়ে আমার আসলে কোন পড়াশুনা নেই, যা বলেছি তা সাধারন জ্ঞান থেকেই বলেছি’ ওদের চেহারায় পর্যায়ক্রমে অবাক,অবিশ্বাস আর হতাশার ভাব ফুটে উঠতে উঠতেই আমি কেটে পড়লাম!
(হে হে হে পাঠক বন্ধুরা মুফতে আমার দাম একটু বাড়িয়ে নিলাম
ওখান থেকে বেরিয়ে এসে সামনের লনে বাগান দেখে বাগানের প্রেমে পড়ে গেলাম, তাই’ ফটাফট বাগানের ছবিই বেশী তুললাম।
বিহারের চারিদিকে ব্রহ্মচারীদের কুঠুরী আর মাঝে মন্দিরটি অবস্থিত। বিহারটি রাজা ধর্মপাল তৈরী করেছিলেন ।
বিহারের বাহিরে খুব সুন্দর করে সাজানো কিছু বিশ্রাম শেড রয়েছে, এখানে পিকনিক করার সুবিধাও তৈরী করা হয়েছে ।
























সর্বশেষ এডিট : ১০ ই অক্টোবর, ২০১৭ সন্ধ্যা ৬:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


