
একটা ফোন কলের দূরত্বে ১০ হাজার মানুষের চাকরি!
বিষয়টি আপনি সমাধান করছেন না কেন, পিএম সাহেব? আপনার তো মাত্র একটা ফোন কলই যথেষ্ট—অন্তত ভুক্তভোগীদের এতদিনের অপেক্ষা দেখে সেটাই মনে হয়!
একটা ভুল করেছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী—ভুলটি ছোট ছিল না, অন্যায় হলে তার বিচার হওয়া উচিত, সেটিও ঠিক। কিন্তু সেই ভুলকে রাজনৈতিকভাবে ২০০ শতাংশ কাজে লাগানোর কৃতিত্ব যদি কাউকে দিতে হয়, তাহলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর নামটি বেশ জোরেশোরেই উচ্চারণ করতে হয়।
নির্বাচনের আগে ১০ হাজার চাকরিচ্যুত মানুষকে ঘিরে তৈরি হলো এক মহাশোকের আবহ। শুধু ওই ১০ হাজার মানুষ নয়—তাদের পরিবার, শ্বশুরবাড়ি, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী—সবাই যেন হঠাৎ রাজনৈতিক সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ ভোটার হয়ে গেলেন। সভা-সমাবেশে দরদ উথলে উঠল, বক্তব্যে প্রতিশ্রুতির বন্যা বইল। বলা হলো—“আমরা ক্ষমতায় গেলে চাকরি ফিরিয়ে দেব।”
ব্যস! প্রতিশ্রুতির বাজার জমে গেল।
জামায়াতের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, আওয়ামী লীগের প্রতি ক্ষোভ, নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের হতাশা—সবকিছুর সঙ্গে মিশে গেল ধানের শীষের প্রতি সহানুভূতি। ভোটের বাক্সে তার প্রতিফলনও দেখা গেল।
তারপর?
তারপর নির্বাচন হলো।
ক্ষমতায় এলো বিএনপি।
২১২ আসনের বিশাল ম্যান্ডেট।
সরকারের বয়সও এখন ছয় মাস।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—যে ১০ হাজার মানুষের চাকরি ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এত আবেগ তৈরি করা হয়েছিল, সেই প্রতিশ্রুতিটিই যেন এখন সরকারি ফাইলের কোনো অন্ধকার ড্রয়ারে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে!
নির্বাচনের আগে তাঁরা ছিলেন “ভুক্তভোগী”।
নির্বাচনের পরে তাঁরা হয়ে গেলেন “বিষয়টি বিবেচনাধীন”।
নির্বাচনের আগে তাঁদের চোখের পানি ছিল রাজনৈতিক সম্পদ।
নির্বাচনের পরে সেই চোখের পানি যেন প্রশাসনিক নথিতে শুকিয়ে কাঠ!
এখন আর কেউ বিষয়টি মুখে আনতে চান না। মাঝে মাঝে জনসভায় জামায়াতকে একটু খোঁচা দিতে গিয়ে ভুক্তভোগীদের প্রতি দরদ দেখানো হয়। বক্তৃতায় আবেগ থাকে, শব্দ থাকে, হাততালি থাকে—শুধু থাকে না চাকরি ফেরানোর আদেশ!
কী চমৎকার রাজনৈতিক কৌশল!
যে সমস্যাটি সমাধান করতে একটি ফোন কল যথেষ্ট হতে পারে, সেটিকে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রেখে তাকে নির্বাচনী ইস্যু হিসেবে সংরক্ষণ করা—এ যেন রাজনীতির নতুন “সাসপেন্স মডেল”।
আজ নয়, কাল হবে।
কাল নয়, পরশু হবে।
এই সরকার করবে।
ওই মন্ত্রণালয় দেখবে।
কমিটি হবে।
পর্যালোচনা হবে।
তারপর আবার পরবর্তী নির্বাচন চলে আসবে।
অর্থাৎ চাকরি ফিরবে কি না—তা এখন আর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; মনে হচ্ছে এটি নির্বাচনী ক্যালেন্ডারের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রকাশ করার মতো কোনো বিশেষ রাজনৈতিক ঘোষণা!
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, বর্তমানে প্রশাসন, ব্যাংক, আর্থিক খাত, বিভিন্ন সেক্টর—সবকিছুর ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ক্ষমতার চাবিকাঠি হাতে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। সংসদে শক্তিশালী ম্যান্ডেট আছে।
তাহলে সমস্যা কোথায়?
সমস্যা কি ফাইলে?
নাকি ফাইলের ওপর রাখা হয়েছে আরেকটি ফাইল?
নাকি সেই ফাইলের ওপর রাখা হয়েছে—“পরবর্তী নির্বাচনের আগে খুলবেন না” লেখা একটি বিশেষ নোট?
ভুক্তভোগীরা অবশ্য রাজনীতি বোঝেন না। তাঁরা শুধু বোঝেন—তাঁদের চাকরি নেই। সংসারে অনিশ্চয়তা আছে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা আছে। তাঁরা ভোটের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতিকে এখনো প্রতিশ্রুতিই মনে করেন; নির্বাচনী কৌশল মনে করেন না।
তাই পিএম সাহেবের কাছে বিনীত প্রশ্ন—
১০ হাজার মানুষের জীবন কি শুধু একটি নির্বাচনী ইস্যু ছিল?
যদি না হয়ে থাকে, তাহলে আর কত অপেক্ষা?
আর যদি হয়ে থাকে, তাহলে দয়া করে আগেই জানিয়ে দিন—চাকরি ফেরানোর তারিখটি কোন নির্বাচনকে সামনে রেখে ঘোষণা করা হবে?
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক নির্বাচন?
নাকি পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন?
কারণ জনগণ এখন একটু বিভ্রান্ত। তাঁরা বুঝতে পারছেন না—সরকার কি সমস্যার সমাধান করতে চায়, নাকি সমস্যাটিকে রাজনৈতিকভাবে “জীবিত” রাখতে চায়?
পিএম সাহেব,
একটা ফোন কলই যদি যথেষ্ট হয়, তাহলে ফোনটা করুন।
১০ হাজার মানুষের জীবনকে নির্বাচনী স্লোগান বানাবেন না।
কারণ মানুষ ভোট দিতে পারে একবার,
কিন্তু প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের হিসাব—
মানুষ অনেকদিন মনে রাখে।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


