somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দীঘির পাড়ের বেঞ্চ

২৬ শে ডিসেম্বর, ২০২২ রাত ৯:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


- এক্সকিউজ মি। একটু সরবেন?

আনমনে অনেক্ক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। বিকেল বেলা স্কুটারে করে এসে দীঘির এ পাড়ের কোন একটা বেঞ্চে বসে থাকি। কোথাও পড়েছিলাম। জলের সাথে থাকলে মন নাকি অনেক স্থির হয়। ভালই লাগে। দীঘিটাও অনেক বড়। অনেকেই বসে আমার মতো। ইনিও বসেন। আমি দেখেছি কয়েকদিন। হঠাত আমার বেঞ্চে এসে,,,,বুঝতে সময় লাগলো। চমকেও উঠলাম। দেখলাম অন্য বেঞ্চগুলোও ফাকা নেই। এখানকার বেঞ্চগুলোও বড়।এদিক ওদিক তাকিয়ে সরে গিয়ে বললাম,

- জ্বী আমি চলে যাচ্ছি। বসতে পারেন।

- না অমন সমস্যা হলে আমিই অন্য কোথাও যাচ্ছি। আপনি বসুন।

- আচ্ছা বসুন। আসলে মাত্র এলাম। রোদটা ভাল লাগছে।

- আপনাকে প্রায়ই দেখি।

- আপনাকেও কয়েকদিন দেখেছি। এই ছোট্টো জেলার তো আসলে এটাই শ্বাস ফেলার জায়গা।

এরপর আর কথা এগুলো না। আসলে কথোপকথন চালিয়ে নেয়ার মতো সামাজিক ক্ষমতা আমার নেই। বাদাম খেতে লাগলাম। হঠাত বলল,

- আমি ভেলা। বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়ছি। আপনি?

- ও আচ্ছা। আমি পাশের গ্রন্থাগারে চাকরি করি।

আবার নিরবতা। বাসায় গিয়ে ছবি দেখার ইচ্ছে হলো হঠাত। উঠে গিয়ে স্কুটারে বসব বলে হাটতে শুরু করলাম।পেছন থেকে শুনতে পেলাম,

- শুনুন,,,,,,এই যে, আপনার বই টা নিয়ে যান।

- ধন্যবাদ আপনাকে। আরেকটু হলেই ফেলে যাচ্ছিলাম।

কয়েকদিন খুব ব্যস্ত গেলো। দীঘির পাড়ে যাওয়া হয়নি। শীতের শেষে যখন বিভিন্ন পোকামাকড় আমার হেলমেটের ভেতর উড়ে এসে ঢুকে তখন বুঝতে পারি বসন্ত এসে গেছে। ফাল্গুন মাস। নামটা উচ্চারণ করলেই মনে হয় যেন কেমন স্নিগ্ধতায় পরিপূর্ণ হয়ে যায় মন। ছেলেদের নাম ফাল্গুন হয় কিনা মনে করতে করতে পরিচিত দীঘির বেঞ্চে গিয়ে বসলাম। কি সুন্দর হয়ে আছে চারপাশ। চোখ ফেরানো যাচ্ছেনা। কদিন বাদে বোধয় আমার এই স্বাধীনতাটা থাকবেনা। হাতে শীর্ষেন্দুর "চক্র" বইটার মলাটের উপর চোখ রাখতেই বুকটা হু হু করে উঠলো। চারদিক আরো মন ভরে দেখতে লাগলাম লোভাতুর চোখে। বিয়েটা বোধয় এড়ানো গেলো না। স্বাধীনতার কি ভয়ংকর অপমৃত্যু। ক্যামেরা,বই,হুটহাট বের হয়ে পড়া বাদ দিয়ে বাজারের ব্যাগ, মশারি টাংগানো, ইউটিলিটি বিলস,,,একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ভেতর থেকে। আর একটা দুটা বছর পেলে মন্দ হতো না। এমন সময় একজন কাছে এসে বলল,

- আপনি ভালো আছেন? আমাকে চিনতে পারছেন?

কতক্ষণ তাকিয়ে থেকে সত্যিই চিনতে পারিনি। তারপর বললাম,

- ইয়ে মানে,,,,, খুব দুঃখিত। আমি মানুষের চেহারা আর রাস্তা ভুলে যাই।

- ঐ যে একদিন জায়গা ছিলোনা বলে এসে বসলাম এই বেঞ্চে।

- ওহ! আপনি ভালো আছেন?

- ভালো। আপনি কেমন আছেন?

- আমিও ভালো আছি।

- অনেকদিন পর এলেন, না!

- আসা হয়নি। আপনি কি আসেন প্রায়ই?

- প্রতিদিন।

কথাটা বলেই মুখ ঘুরিয়ে ফেলল। আমি বইটা দেখতে শুরু করলাম। কিছুক্ষন রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থেকে বলল,

- আচ্ছা যাই। ভালো থাকবেন। দেখা হচ্ছে।

আমি হাসি ফিরিয়ে দিলাম। বই পড়তে পড়তে হঠাত খেয়াল হলো। মানুষের জীবন এক অদ্ভুত চক্রে বাধা। মিসিং পিস জোড়া দেয়া ছাড়া আর কিছুই নেই। স্বাধীনতাই নেই। এর কয়েকদিন পর বহুত আয়োজনের মাধ্যমে এবং ভয়ংকর শব্দদূষণের মাধ্যমে আমার সারাজীবনের শান্তিময় নিরবতা ভেংগে বিয়ে হয়ে গেলো। কোথা থেকে কি হচ্ছিলো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তবে একসময় এসব শেষ হলো। আমি শুধু ঘরে একা হতে চাচ্ছিলাম। বিছানাটা খুব মিস করছিলাম। নিজের মতো করে একা হতে গিয়ে টের পেলাম ঘরে আরো একজন আছেন। গ্রন্থাগারে যারা চাকরি করেন তারা নিরবতায় এত বেশি অভ্যস্থ হয়ে পড়েন যে তাদের জন্য এই হৈ হুল্লোড় অনেক বেশি ক্লান্তিকর হয়ে পড়ে। আমারো ব্যাতিক্রম হয়নি। তাই নতুন বিবাহিত বধুর চেয়ে আমার ঘুমিয়ে পড়াকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো। এই সামাজিক কথোপকথনের রোগটা সারাতেই বোধয় আমাকে বিবাহিত হতে হলো। এসব ভেবে খানিকটা অস্বস্তি লাগছিলো। বললাম,

- আপনি খুব ক্লান্ত হয়ে থাকবেন এতসবের পর। রেস্ট নিয়ে নিলে ভালো লাগবে। ইয়ে মানে,,,আমি খুব ক্লান্ত। কিছু মনে করবেন না। আমি ঘুমাতে চাই। আমার শব্দ সহ্য হয় না। মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

ঘোমটার ভেতর থেকে শব্দ এলো।

- হু।

বই খোঁজ করার দরকার হলো না। চোখ বন্ধ করতেই ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম থেকে উঠেই চোখ বোঝা অবস্থায় চুলের ঘ্রাণ টের পেলাম। চোখ মেলতেই আমার সময় থেমে গেলো। কোন এক অদ্ভুত মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলো আমার সর্বস্ব। একটু পর তিনি চোখ খুললেন। কতক্ষণ এভাবে তাকিয়ে ছিলাম জানিনা। তিনিও কপট রাগ নিয়ে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। প্রশ্ন করলাম,

- আমার না মানুষের মুখ আর রাস্তা মনে থাকেনা। আপনি কি?

- হ্যাঁ। মানুষের চোখে চোখ রেখে কথা বলবেন। তাহলে ভুলবেন না।

- তু,,, তুমি কি প্রতিদিন,,,

- বিয়ের কথা চলছিলো। তাই আপনার সম্পর্কে জানতে প্রথম কয়েকদিন মিতি কে নিয়ে যেতাম। আমার বান্ধবী। পরে একাই যেতাম। আপনি ওখানে বসেন প্রায়ই কোনভাবে জেনেছি।

- আমার নাম,,,,

- তোমার নাম শরৎ । তুমি কি জানো,,,,, আমি কতদিন তোমার জন্য ঐ বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করেছি?

বলেই হাসতে লাগলো। এতো সুন্দর করে কখনো কেউ আমার নাম উচ্চারণ করেনি।






সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে ডিসেম্বর, ২০২২ রাত ৯:৪৮
৮টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইসরায়েলের রাফা দখলের প্রতিবাদে চোখের জলে ভেজা একটি গান

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে জুন, ২০২৪ সকাল ১০:২৭



আমার এই গানটা তাঁদের নিয়ে যাদেরকে দূর্ভিক্ষ ছাড়া কোন শত্রুই পরাস্ত করতে পারবে না। তাঁর হবেন রাসুল (সাঁ)-এর শ্রেষ্ঠ উম্মতদের দলভুক্ত। ফিলিস্তিনের বায়তুল মুকাদ্দাসের আশেপাশে তাঁরা থাকবেন।........তাঁদেরকে নিয়েই... ...বাকিটুকু পড়ুন

হে মানবতাবাদী পোগোতিশীল বাঙ্গু সম্প্রদায়, অতঃপর তোমরা তোমাদের গুরুর কোন কোন ভণ্ডামোকে অস্বীকার করবে!

লিখেছেন প্রকৌশলী মোঃ সাদ্দাম হোসেন, ১৯ শে জুন, ২০২৪ বিকাল ৫:১১



০. হে মানবতাবাদী পোগোতিশীল বাঙ্গু সম্প্রদায়, অতঃপর তোমরা তোমাদের গুরুর কোন কোন ভণ্ডামোকে অস্বীকার করবে!

১. ইদানীং নতুন কিছু হিপোক্রেট দেখতে পাচ্ছি, যাদের কুরবানী নিয়ে অনেক সমস্যা, কিন্তু গোস্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিয়াল জেনারেশন প্রতিবাদ করতে জানে না!

লিখেছেন সোনাগাজী, ১৯ শে জুন, ২০২৪ সন্ধ্যা ৬:৪৩



শেখকে যেদিন হত্যা করলো মিলিটারী, আমি তখন প্রবাসে, পড়ালেখা করছি; প্রবাসে ঘুম থেকে জেগেই সংবাদটা পেয়েছিলাম; সাথে ছিলো অন্য মৃতদের লিষ্ট। আমার মনে এলো, তাজউদ্দিন সাহেব বেঁচে... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্থায়ী যুদ্ধ বিরতির জন্য বাইডেনের শান্তি প্রস্তাব:

লিখেছেন মোহাম্মদ আলী আকন্দ, ১৯ শে জুন, ২০২৪ রাত ৯:৫২

৩১ মে ২০২৪ প্রেসিডেন্ট বাইডেন গাজায় স্থায়ী যুদ্ধ বিরতির জন্য তিন পর্বে বাস্তবায়ন যোগ্য একটি শান্তি প্রস্তাব পেশ করেছেন।

প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনার ধাপগুলি যথাক্রমে --

প্রথম পর্ব:
প্রথম পর্বটি ছয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

পুত্র যখন ছাগল!

লিখেছেন মঞ্জুর চৌধুরী, ১৯ শে জুন, ২০২৪ রাত ১০:৪৪

ঈদ উপলক্ষে ফেসবুক আমাদের জন্য উপহার দিয়েছে নতুন নাটক "পুত্র যখন ছাগল!"

ঘটনার শুরুতে আমরা দেখতে পাই এক ছেলে পনেরো লাখ টাকা দিয়ে ছাগল কিনে বাপকে উপহার দিয়েছে।
এর আগে বাপকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×