
লরা লুমার নামে আমেরিকায় একজন ঘৃণ্য বর্ণবাদী, কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক কর্মী ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আছেন। তিনি ট্রাম্পের অনুগত হিসেবে পরিচিত। তার মুখের ভাষা এত জঘন্য যে ট্রাম্পের অনেক ঘোর সমর্থকও লুমারের কাজে বিরক্তি অনুভব করেন। লুমার মার্কিন সমাজে অভিবাসনবিরোধী, ভারতবিরোধী ও মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্যের কারণে যেমন পরিচিতি পেয়েছেন, তেমনি কুখ্যাতিও অর্জন করেছেন।
আমেরিকার গত নির্বাচনী প্রচারের সময়, লুমার লিখেছিলেন যে, কমলা হ্যারিস যদি প্রেসিডেন্ট হন তাহলে "হোয়াইট হাউস তরকারির গন্ধে ভরে যাবে" এবং "হ্যারিসের বক্তৃতাগুলো ভারতীয় কল সেন্টার থেকে প্রচারিত হবে"। সেসময় রিপাবলিকান প্রার্থী এবং তখন ট্রাম্পের অন্যতম সমর্থক মার্জরি টেইলর গ্রিন এটিকে ঘৃণ্য ও বর্ণবাদী বলে উল্লেখ করেছিলেন।
ভারতীয় পেশাজীবীদের লক্ষ্য করে লুমার দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য প্রচার করেছেন। বছরের পর বছর তিনি আমেরিকায় ভারতীয় কর্মীদের "তৃতীয় বিশ্বের অনুপ্রবেশকারী" হিসেবে চিত্রিত করেছেন এবং তাদের ওপর আমেরিকানদের চাকরি দখল করে নেওয়ার দায় চাপিয়েছেন।
ভারতীয় অভীবাসীদের সম্পর্কে তার পোস্টের কিছু নমুনা দেখা যাক। তিনি পোস্ট করেছেন "হাই স্কিলড ইমিগ্রান্ট! যাদের প্রবাহমান পানির লাইন ও টয়লেট পেপার নেই"। আবার লিখেছেন, "ঠিক আছে, আমি ভুল স্বীকার করছি। ভারতে আসলে প্রবাহমান পানির লাইন আছে। তবে সেটা মানুষের পিছন দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার প্রবাহ।"
ভারতীয়দের সম্পর্কে তার মন্তব্যগুলো এতটাই আপত্তিকর যে, তা প্রকাশযোগ্য নয়। তিনি লেখেন, "ভারতীয়রা সেই একই পানি পান করে যাতে তারা স্নান করে ও মলত্যাগ করে।"
শ্বেতাঙ্গদের ভারতপ্রীতিতে লুমার বিক্ষুব্ধ হয়ে লিখেছেন "বোকা শ্বেতাঙ্গরা! 'বয় মিটস ওয়ার্ল্ড' দেখা বন্ধ করে বলিউডের সিনেমা দেখা শুরু কর, যাতে কীভাবে ধর্ষণ সংস্কৃতি তোমার চাকরি সংস্কৃতিকে গ্রাস করে নিচ্ছে সেটা দেখতে পার।" আমেরিকা কিভাবে নির্মিত হয়েছিল সেটা নিয়ে লুমার বলেন, "আসলে আমাদের দেশটা শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয়দের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। ভারত থেকে আসা তৃতীয় বিশ্বের অনুপ্রবেশকারীদের দ্বারা নয়।" ঘৃণার আগুন একটু নিভে এলে, আবার ফুঁ দিয়ে সেটিকে উসকে দিতে তার দেরি হয় না। তার প্রশ্ন "ভারতে মানুষ এখনও স্নান ও পানীয় জলে মলত্যাগ করে কেন?"
লুমার যখন প্রকাশ্যেই এমন ভারতবিরোধী বর্ণবাদী, তখন তাকে ভারতে আমন্ত্রণ জানানোর ঘটনা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে সেটাই ঘটেছে। গত মাসে ভারতীয় গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া গ্রুপ, তাকে ভারতে আমন্ত্রণ জানায়। ভারতীয় উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের সাথে জায়নবাদী, ইসরায়েলপন্থী ও কট্টর ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর যে আতাত গড়ে উঠেছে, এই আমন্ত্রণ তারই প্রমাণ। এর সাথে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক ইসরায়েল সফরের সম্পর্ক আছে। এই সফরে মোদি ঘোষনা করেন, "ভারতের ১.৪ বিলিয়ন মানুষ ইসরায়েলের পাশে আছে।...ইসরায়েল হলো পিতৃভূমি এবং ভারত হলো মাতৃভূমি।"
এটি একটি নতুন সংঘবদ্ধ চক্র, যা ইসরায়েলের পৃষ্ঠপোষকতায় মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ ও প্রোপাগান্ডা বিস্তারের মাধ্যমে শুধু ভারতে নয়, বরং বৈশ্বিক মেরুকরণ এবং চরম ডানপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতে সক্রিয় নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করছে।
দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া সেই গণমাধ্যম, যারা '২৪ সালের আগস্টে হাসিনার পতনের পরে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তথ্যসন্ত্রাস ও প্রপাগাণ্ডা চালিয়েছে।
আমেরিকায় যখন লুমারের মতো বর্ণবাদীরা ক্রমে অগ্রহণযোগ্য হয়ে পড়ছেন, তখন তাকে প্রাসঙ্গিক রাখার জন্য ভারতীয় গণমাধ্যমের একটি অংশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলের "হাসবারা" নেটওয়ার্ক পশ্চিমা গণমাধ্যম ছাড়িয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের গভীরে প্রোথিত হচ্ছে।
দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়ার মতো পত্রিকাগুলি জায়নবাদীদের আর্থিক ও মতাদর্শগত প্রভাবের আওতায় চলে গেছে। এরা এমন এক বয়ানকে শক্তিশালী করছে, যা পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতিকে উসকে দেয়। এই প্রক্রিয়ায়, কিছু ভারতীয় সুবিধাবাদী, বর্ণপ্রথাবাদী ও হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী বৃহত্তর আধিপত্যবাদী এজেন্ডার সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছে, যার লক্ষ্য বিশ্বব্যাপী উপনিবেশবাদ, দখলদারিত্ব, যুদ্ধ ও গণহত্যাকে টিকিয়ে রাখা।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৪:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



