somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি মুক্তিযুদ্ধের দলের নিঃশব্দ নিধন: বাংলাদেশে রাজনৈতিক নিপীড়ন ও জবাবদিহির পতন

২৬ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

একটি মুক্তিযুদ্ধের দলের নিঃশব্দ নিধন: বাংলাদেশে রাজনৈতিক নিপীড়ন ও জবাবদিহির পতন
বাংলাদেশ আজ এক ভয়ংকর রাজনৈতিক পশ্চাদপসরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যা কোনো প্রকাশ্য গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে নয়, বরং নীরবতা, ভয় এবং পরিকল্পিত নিপীড়নের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের লক্ষ লক্ষ নেতা–কর্মী আজ হয় কারাগারে বন্দী, নয়তো নির্যাতন ও আতঙ্কের কারণে আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার অধীনে।কারাগারের ভেতরে থাকা মানুষগুলো পরিবার ও আইনজীবীদের ভাষ্যমতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। আর যারা বাইরে আছেন, তারা প্রকৃত অর্থে মুক্ত নন। তারা নিজ দেশেই উদ্বাস্তু পুলিশি হয়রানি এবং জামায়াত–বিএনপি সংশ্লিষ্ট সহিংস মব সন্ত্রাসীদের ভয়ে বাড়িতে ফিরতে পারছেন না। এটি কোনো আইন প্রয়োগ নয়; এটি ভয় দেখিয়ে রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযান (political cleansing)।
এই সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক সাহসের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি। কোনো প্রধান গণমাধ্যম সত্য বলার সাহস পাচ্ছে না। সাংবাদিকরা আত্মনিয়ন্ত্রণে বাধ্য, সম্পাদকরা নীরব, আর সত্য নিজেই এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আদালতগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় ভরে গেছে যার লক্ষ্য ন্যায়বিচার নয়, বরং অর্থনৈতিক নিঃশেষকরণ। মামলা এখন ন্যায়বিচারের পথ নয়; এটি পরিণত হয়েছে এক ভয়ংকর মামলা-বাণিজ্যে।
মানবাধিকার ভাষায় এর একটি নাম আছে ল’ফেয়ার (Lawfare): আইনি ব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করা। হাজার হাজার আওয়ামী লীগ কর্মী জমি, বাড়ি, ব্যবসা বিক্রি করে শুধু আদালতের তারিখ সামলাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে জামায়াত, বিএনপি ও নতুন ক্ষমতাকেন্দ্রিক নেটওয়ার্কের প্রভাবশালী অংশগুলো মামলা বাণিজ্য ও ভয়ভীতি দেখিয়ে বিপুল অর্থ লুটে নিচ্ছে রাষ্ট্রের চোখের সামনেই।
তবে সবচেয়ে নির্মম আঘাতটি আসছে ভেতর থেকেই।
এই গণনির্যাতনের সময়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব কার্যত অনুপস্থিত। যে নেতারা তৃণমূল কর্মীদের ত্যাগ, কারাবরণ ও রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আজ বড় হয়েছেন, তারা এখন দেশের বাইরে নিরাপদে অবস্থান করছেন। কোনো ফোন নেই, কোনো খোঁজ নেই, নেই আইনি সহায়তার সংগঠিত উদ্যোগ। মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কাছে এই নীরবতা নিপীড়নের চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। ক্ষোভ জমছে শুধু সরকারের বিরুদ্ধে নয়, নিজ দলের নেতৃত্বের বিরুদ্ধেও।

ইতিহাস আমাদের কঠিন শিক্ষা দেয়: রাজনৈতিক দল কেবল শত্রুর আঘাতে ভেঙে পড়ে না; ভেঙে পড়ে তখনই, যখন নেতৃত্ব ত্যাগের সঙ্গে সংযোগ হারায়। আওয়ামী লীগ কোনো সাধারণ রাজনৈতিক দল নয় এটি বাংলাদেশের জন্ম, সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত। ভয়, গ্রেপ্তার ও নিঃশেষকরণের মাধ্যমে এই দলকে ভাঙা মানে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকেই দুর্বল করা।
অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষের কাছে কঠিন প্রশ্ন উঠতেই হবে। গণগ্রেপ্তার কি স্থিতিশীলতা আনে? ভয়ভীতিতে চুপ করানো মিডিয়া ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত আদালত কি বৈধতা সৃষ্টি করে? আর একজন নোবেলজয়ী নেতৃত্ব কীভাবে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কার্যত সমষ্টিগত শাস্তি (collective punishment) চলতে দিতে পারেন?
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও তাদের বেছে নেওয়া নীরবতার মুখোমুখি হতে হবে। মানবাধিকার শর্তসাপেক্ষ হতে পারে না। ভুক্তভোগীরা একসময় ক্ষমতায় ছিল বলেই নিপীড়ন বৈধ হয়ে যায় না। বিদেশি সরকার, দাতা সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নীরবতা এই দমননীতিকে আরও সাহসী করে তুলছে।
এটি আর কেবল একটি দলের সংকট নয়। এটি একটি রাষ্ট্রের সংকট। যখন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও কণ্ঠ হারায় তখন গণতন্ত্র একটি ফাঁপা স্লোগানে পরিণত হয়।
বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। হয় সে এই নিঃশব্দ নিধনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জবাবদিহি ফিরিয়ে আনবে, নয়তো ভয়কে দিয়ে নিজের রাজনৈতিক ইতিহাস নতুন করে লিখতে দেবে। ইতিহাস ক্ষমতাকে নয়, সত্যকে মনে রাখে এবং সে ভুলে না, কে এই নিপীড়নের সময় নীরব ছিল।

সালাউদ্দিন রাব্বী

জয়েন সেক্রটারী মুন্সীগন্জ জেলা।

বাংলাদেশ কৃষকলীগ।

সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:২০
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ক্ষমতা পেলে শরিয়া আইন চালু না করে দলের নামে ইসলাম রাখা যায় কি?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৬:৫২



সূরাঃ ৪ নিসার ৭৬ নং আয়াতের অনুবাদ-
৭৫। তোমাদের কি হলো, তোমারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করছো না? অথচ নারী-পুরুষের এবং শিশুদের মধ্যে যারা দূর্বল তারা বলে, হে আমাদের রব... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৌশল

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:২৮

জামায়াতের আমীরের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে কর্মজীবী নারীর সঙ্গে বেশ্যাবৃত্তির সম্পর্ক টেনে আনা পোস্টটি হ্যাকড হোক বা অ-হ্যাকড—এর রাজনৈতিক প্রভাব মোটেও একমুখী নয়। অনেকেই ধরে নিচ্ছেন, এতে জামায়াতের ক্ষতিই... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম, রাজনীতি ও “বেহেস্তের টিকিট”: ভণ্ডামির চূড়ান্ত রূপ।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:৩২

ধর্ম, রাজনীতি ও “বেহেস্তের টিকিট”: ভণ্ডামির চূড়ান্ত রূপ।
-----------------------------------------------------------
ধর্ম ও রাজনীতি এক জিনিস নয়, এক পথে চলে না, এবং এক লক্ষ্যেও পৌঁছায় না। ধর্মের ভিত্তি সত্য, ন্যায়, নৈতিকতা ও আত্মসংযম। রাজনীতির... ...বাকিটুকু পড়ুন

লিমেরিক

লিখেছেন বাকপ্রবাস, ০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:০১

ধান লাগাতে গিয়ে খোকার একী হল হাল
কাদা জলে হোঁচট খেয়ে চিড়ে গেলো গাল
না পারে আর কইতে
না পারে আর সইতে
টক মিষ্টি যাহাই খাচ্ছে সবই লাগে ঝাল। ...বাকিটুকু পড়ুন

=আজ হবে দেখা নিশ্চয়ই =

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৫০


জম্পেশ খানা শেষে তোরা করিস চায়ের আয়োজন
আজ একত্রে কাটাবো সময় আমরা প্রিয়জন,
ধোঁয়া ওঠা চায়ের সাথে আমরা ক'জন
গল্প আড্ডা আহা সেকি মধুর গুঞ্জরন।

জেনে যাবো কেমন ছিলে, আছো কেমন তোমরা,
কেউ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×