তৃণমূলের ত্যাগ আর শীর্ষ নেতাদের নীরবতা: এক নির্মম বাস্তবতা।
------------------------------------------------------------------
বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ইতিহাস ত্যাগ, সংগ্রাম ও নির্যাতনের ইতিহাস। এই দলের শিকড় শক্ত হয়েছে তৃণমূলের সেইসব নেতাকর্মীদের রক্ত, ঘাম এবং অমানবিক নির্যাতন সহ্য করার মাধ্যমে, যারা আদর্শের জন্য সবকিছু বিসর্জন দিতে দ্বিধা করেননি। কিন্তু আজ প্রশ্ন উঠেছে সেই তৃণমূল কি তাদের ন্যায্য মূল্যায়ন পাচ্ছে?
দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার সময় দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার আশেপাশে এমন কিছু সুবিধাভোগী ও আত্মীয়স্বজনের উত্থান ঘটেছিল, যারা আদর্শ নয় বরং ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছে এমন অভিযোগ তৃণমূলের অনেকের মধ্যেই রয়েছে। সেই সময় অনেক প্রকৃত ত্যাগী কর্মী অবহেলিত ছিলেন, আর কিছু সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি ক্ষমতার আশ্রয়ে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন।
বর্তমান বাস্তবতা আরও নির্মম। বহু তৃণমূল নেতাকর্মী আজ মামলা, গ্রেপ্তার, হামলা ও সামাজিক নিপীড়নের শিকার। কেউ নিজের ব্যবসা হারিয়েছেন, কেউ পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তবুও তাদের দুর্ভোগের শেষ নেই। আরো বেশী কস্টে আছে সংখ্যলঘু আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা। একের পর এক মামলা যেন তাদের জীবনের স্থায়ী বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরও বেদনাদায়ক হলো অনেক নেতাকর্মী জামিনে মুক্তি পাওয়ার পরও নিজেদের ঘরে ফিরতে পারছেন না। পরিচিত রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তারা কোথাও বাসা ভাড়া পাচ্ছেন না। মব সহিংসতার ভয়ে আত্মীয়স্বজনও আশ্রয় দিতে সাহস করছেন না। নারী নেত্রীদের অবস্থা আরও করুণ; সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ও আর্থিক সংকটে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, যেসব বড় নেতা তৃণমূলের আন্দোলন ও ত্যাগের কারণে এমপি, মন্ত্রী বা প্রভাবশালী পদে পৌঁছেছিলেন, তাদের অনেকেই আজ নীরব। কেউ কেউ দেশের বাইরে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন কাটাচ্ছেন, অথচ যাদের কাঁধে ভর করে তাদের এই অবস্থান, সেই কর্মীদের খোঁজ নেওয়ার মতো দৃশ্যমান উদ্যোগ খুব কমই দেখা যায়।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যেমন বিএনপি, জামাতেএনসিপি বা অন্যান্য বিরোধী শক্তির চাপ ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগের মাঝখানে পড়ে অনেক ছোট নেতাকর্মী চরম মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এমন কথাও বিভিন্ন মহলে শোনা যাচ্ছে। কেউ দেশ ছাড়তে পারছেন না, আবার নিজ এলাকাতেও নিরাপদ নন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো কারাগারের ভেতরে থাকা কিছু নেতাকর্মীর অসুস্থতা বা মৃত্যুর খবরও মাঝে মাঝে সামনে আসে, যা মানবিক ও আইনি প্রশ্ন উত্থাপন করে। এই পরিস্থিতি শুধু একটি দলের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, বরং একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি, যেখানে তৃণমূলের ত্যাগ প্রায়ই ক্ষমতার রাজনীতির আড়ালে চাপা পড়ে যায়।
রাজনীতির নৈতিকতা যদি সত্যিই প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, তবে দলীয় বড় নেতাদের উচিত হবে এই নিপীড়িত কর্মীদের পাশে দাঁড়ানো। শুধু বিবৃতি বা আনুষ্ঠানিক সহানুভূতি নয়, বরং আইনি সহায়তা, আর্থিক সহযোগিতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
তৃণমূলই একটি রাজনৈতিক দলের প্রাণশক্তি। তাদের অবহেলা করে কোনো দল দীর্ঘমেয়াদে শক্ত অবস্থানে থাকতে পারে না এটাই ইতিহাসের শিক্ষা। এখন সময় এসেছে আত্মসমালোচনার, সময় এসেছে দায়িত্ব নেওয়ার। কারণ ত্যাগের মূল্য যদি না দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কেউ আর ত্যাগ স্বীকার করতে আগ্রহী হবে না।
শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, এখন প্রয়োজন বাস্তব উদ্যোগ:
১.নির্যাতিত কর্মীদের জন্য আইনি সহায়তা সেল গঠন
২.আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন
৩.নিরাপত্তাহীন কর্মীদের জন্য সহায়তা তহবিল
৪.নারী নেত্রীদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা
যদি এসব উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে তৃণমূলের মধ্যে হতাশা আরও বাড়বে এটা বলাই যায়।
--- সালাউদ্দিন রাব্বী
সংখ্যালঘু বাচাও আন্দোলন
বাংলাদেশ।

সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে মার্চ, ২০২৬ ভোর ৬:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



