
"সীমার সজোরে হোসেনের গলায় খঞ্জর দাবাইয়া ধরিল। এবারেও কাটিল না। বারবার খঞ্জর-ঘর্ষণে হোসেন বড়ই কাতর হইলেন। পুনরায় সীমারকে বলিতে লাগিলেন, "…সীমার! মাতামহ জীবিতাবস্থায় অনেক সময় স্নেহ করিয়া আমার এই গলদেশে চুম্বন করিয়াছেন। সেই পবিত্র ওষ্ঠের চুম্বন-মাহাত্ম্যেই তীক্ষধার অস্ত্র ব্যর্থ হইয়া যাইতেছে। আমার মস্তক কাটিতে আমি তোমাকে বারণ করিতেছি না। আমার কণ্ঠের পশ্চাৎভাগে, যেখানে তীরের আঘাতে শোণিত প্রবাহিত হইতেছে, সেখানেই খঞ্জর বসাও, অবশ্যই দেহ হইতে মস্তক বিচ্ছিন্ন হইবে।"
-বিষাদ-সিন্ধু, মীর মোশাররফ হোসেন।
ইসরাইল-আমেরিকার আক্রমণের সময় খামেনি তাঁর নিজ অফিসকক্ষে বসে কাজ করছিলেন। হয়তো অবিচলিত মনে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। শত্রুর আক্রমণের মুখে তিনি কোথাও আত্মগোপন করেননি, কোনো গোপন কুঠুরি অথবা বাংকারে আশ্রয় নেননি, কোনো মিত্র দেশে পালিয়ে যাননি। ৮৬ বছর বয়সী এই ধর্মীয় নেতা তাঁর বিশ্বাস অনুসারে শহিদি-মৃত্যুকে বেছে নিয়েছেন।
শহিদি আত্মত্যাগের এই ধারণা শিয়া মতবাদের একটি মৌলিক নীতি, যা ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসেনের শাহাদাত বরণ শিয়া ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার একটি। ইয়াজিদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধ শিয়া মতাদর্শে অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে একটি চিরন্তন প্রতীক। শিয়াদের কাছে এই আদর্শ জীবনের থেকেও বেশি মূল্যবান।
শিয়াদের বারো ইমামের অধিকাংশই বিষপ্রয়োগে বা যুদ্ধের মাধ্যমে মৃত্যুবরণ করেছেন। ধারাবাহিক এই আত্মোৎসর্গ তাদের সমাজে শক্তিশালী শহিদি সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। ফলে ধর্মীয় আচরণ ও রাজনৈতিক ভাষ্যে শহিদ হওয়া এক ধরনের মূল্যবোধে পরিণত হয়েছে। তাদের কাছে এমন মৃত্যুর অর্থ হেরে যাওয়া নয়, বরং এটি আধ্যাত্মিকভাবে জেগে ওঠা। মৃত্যুর বিনিময়ে সত্য প্রতিষ্ঠার এই নীতি যুগের পর যুগ ধরে শিয়াদের অত্যাচার ও নিপীড়নের মুখে দৃঢ় অবস্থান নিতে প্রেরণা জুগিয়েছে।
ইসরাইল-আমেরিকার অন্যায়ের বিরুদ্ধে খামেনির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সেই প্রতিরোধী প্রতীক আবার জাগিয়ে তোলা হলো। শিয়াদের আত্মত্যাগের এই ধারণাকে জায়নবাদীরা মৃত্যুপূজা বা ডেথ-কাল্ট নামে প্রচার করে, এবং সকল মুসলিমের ওপর চাপিয়ে দেয়।
অন্যদিকে, শহিদি মৃত্যুর এই তাৎপর্যের একটি ভয়ংকর দিকও আছে। সেটি হলো এই মতাদর্শ আনুসারে মানুষের জীবনকে তুচ্ছ ও মূল্যহীন করে দেখার গভীর মনস্তত্ত্ব। সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই - এই মানবিক নীতিবোধ তাদের রাজনৈতিক দর্শনে নেই। সেখানে মানুষের জীবন একটি উপকরণ মাত্র, যা রাষ্ট্র, ধর্ম বা রাজনীতির জন্য উৎসর্গযোগ্য হতে বাধা নেই।
যখন কোনো শাসক নিজের স্বেচ্ছামৃত্যুকেও রাজনৈতিক অস্ত্র বানায়, তখন অন্য মানুষের জীবনের মূল্য তার কাছে শূন্য হয়ে যায়। নিজেকে শহিদ হিসেবে কল্পনা করা এই শাসককে এমন এক উচ্চাসনে বসায়, যেখান থেকে সাধারণ মানুষের রক্ত, কান্না ও মৃত্যুর কোনো তাৎপর্য থাকে না। এ অবস্থায় শাসকের কাছে মানুষ হত্যা আর অপরাধ বলে গণ্য হয় না।
এই জায়গায় এসে, আমার কাছে ইরানের ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলা উপন্যাসের কাপালিক চরিত্রের মিল চোখে পড়ে। কাপালিক যখন ঘোষণা করে যে নবকুমারকে নরবলি দেওয়া হবে, তখন নবকুমার পালাতে চাইলে কাপালিক তাকে সান্ত্বনা দেয় এই বলে যে, "মূর্খ! কি জন্য বল প্রকাশ কর? তোমার জন্ম আজি সার্থক হইল। ভৈরবীর পূজায় তোমার এই মাংসপিণ্ড অর্পিত হইবেক; ইহার অধিক তোমার তুল্য লোকের আর কি সৌভাগ্য হইতে পারে?"
এখানে নবকুমার মানুষ নয়। সে একটি উৎসর্গ এবং পবিত্র প্রয়োজন। ঠিক এই মনস্তত্ত্বেই রাষ্ট্র যখন ধর্ম ও রাজনীতিকে এক করে, তখন নাগরিক আর নাগরিক থাকে না, সে হয়ে ওঠে বলি দেওয়ার উপাদান। মাহসা আমিনির মতো ২৩ বছরের নারীকে মাথার কাপড় না পড়ার অজুহাতে হত্যা করতে তখন শাসকের প্রাণ কাঁপে না। এই রাষ্ট্রে মানুষের জীবন রক্ষা নৈতিক কর্তব্য নয়, বরং ক্ষমতার প্রয়োজনে জীবন নেওয়াই কর্তব্য। ধর্মের নামে রাজনৈতিক মতবাদ রক্ষা করতে তারা অনায়াসেই নিজ দেশের হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করতে পারে।
কিন্তু আমেরিকা বা ইসরাইলের সামরিক আক্রমণ ইরানিদের মুক্তি দেবে না, বরং তা কট্টরপন্থীদের আরও শক্তিশালী করবে। একজন খামেনির মৃত্যু একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শাসকের মৃত্যু, কিন্তু সেটি ইরানের মোল্লাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অবসান নয়। এই সংঘাতে উদারপন্থীদের বিজয়ের কোনো সম্ভাবনাই নেই।
এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ এবং ইরানের ভেতরে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ ডেকে আনতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে মধ্যপ্রাচ্য লাখো মানুষের জীবিকার অনিশ্চয়তা। আমাদের মতো দেশগুলোর রেমিট্যান্স প্রবাহে ধস এবং তেলের উচ্চমূল্যের বোঝা বহন করতে না পারার বাস্তবতা, যা সম্মিলিতভাবে একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা মার্চ, ২০২৬ সকাল ১০:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



