
"ইসরায়েল এবং শয়তান যদি একে অপরের সাথে যুদ্ধ করে, আমরা শয়তানের পাশে থাকবো।"
বাংলাদেশে কেউ যখন কাউকে হুমকি দেয়, তখন বলে, "এই, আমি কে, চিনিস!" তবে দেখা যায়, হুমকিদাতা ঘুসি বাগালেও আর খুব বেশি ক্ষতি করেনা বা তার ক্ষতি করার ক্ষমতা থাকে না। সে যে আসলে কে - সেটা বড় করে প্রকাশ হয় না। কিন্তু পাশ্চাত্যের কোন দেশে যদি আপনি এমন হুমকি পান, তাহলে প্রায় নিশ্চিতভাবে ধরে নিতে হবে, আপনার জীবন বিপদের মুখে।
প্রথমেই যা ঘটবে তা হলো, কর্মস্থানে গিয়ে শুনবেন, আপনার চাকরিটা চলে গেছে। আপনি হয়তো ভাববেন, এত বছর ধরে তো সেই প্রতিষ্ঠানে সুনামের সাথে কাজ করলেন, একের পর এক প্রমোশন পেলেন, উচ্চপদস্থদের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখলেন - তবু কোনোটাই কাজে লাগলো না? বাস্তবে এর কোনোটাই কাজে লাগেনি। কারণ এই সিদ্ধান্ত এসেছে এমন এক জায়গা থেকে, যা আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রধানের ক্ষমতারও বাইরে। সেই অদৃশ্য কিন্তু প্রভাবশালী লোকগুলোকে আমরা বলতে পারি "এপস্টেইনের এলিট শ্রেণি"। সমাজের কোনো অদৃশ্য এলিট, নেপথ্যে বসে, এক মুহূর্তেই আপনার চাকরিটা খেয়ে ফেলেছে।
২০২৩ সালের শেষে ইসরাইল যখন গাজায় গণহত্যা শুরু করলো, পরবর্তী দুই বছরে নিম্নলিখিত ঘটনাগুলো আমার চোখে পড়েছিল।
ড. ক্রিস্টিয়ান জারউর নামে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্বনামধন্য শিক্ষক, যিনি একই সাথে টরন্টোর সিক-কিড হাসপাতালের চিকিৎসক, ইনস্টাগ্রামে একটি পোস্ট শেয়ার করেছিলেন। সেখানে লেখা ছিল, "ইসরায়েল এবং শয়তান যদি একে অপরের সাথে যুদ্ধ করে, আমরা শয়তানের পাশে থাকবো।" কানাডার ইসরাইলপন্থী একটি মিডিয়া অ্যাডভোকেসি গ্রুপ পোস্টটি ফ্ল্যাগ করলে সাথে সাথেই ড. জারউরকে তার কর্মস্থান থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়। জারউরের মত কানাডার আরও অনেক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী সোশ্যাল মিডিয়ায় ফিলিস্তিন সমর্থনকারী মন্তব্য করার কারণে শাস্তি বা তদন্তের মুখোমুখি হন।
টরন্টোর অদূরে হ্যামিলটন শহরের প্রাদেশিক এমপি সারাহ জামা। রীতিমতো জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন জনপ্রতিনিধি। টুইটারে এক পোস্টে তিনি লিখলেন: ফিলিস্তিনে হত্যাকাণ্ড বন্ধ করো। গাজায় যুদ্ধবিরতির দাবি জানিয়ে তিনি ইসরায়েলকে একটি বর্ণবাদী রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। অফিসে গিয়ে দেখলেন, তার ইমেইল আর কাজ করছে না। কিছুক্ষণ পর জানতে পারলেন, তাকে তার দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তার অপরাধ, তিনি নাকি সহকর্মীদের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন।
রড লয়োলা, আলবার্টা প্রদেশের একজন এমপি; গত বছর লিবারেল পার্টির মনোনয়নে কেন্দ্রীয় নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন। ইসরাইলপন্থী একটি গ্রুপ হঠাৎ খুঁজে বের করল যে, ১৬ বছর আগে লয়োলা তার এক বক্তৃতায় হিজবুল্লাহ ও হামাসকে জাতীয় মুক্তির আন্দোলনকারী হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। সাথে সাথেই তাকে লিবারেল পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হলো। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার কার্যত এখানেই শেষ হয়ে গেল। সেই এপস্টেইনের এলিটদের কেউ কেউ নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছে।
গাজার গণহত্যার প্রতিবাদে আমেরিকার বহু নামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলনে নামলে, এপস্টেইনের বিখ্যাত এলিট জায়নবাদী হেজফান্ড কোম্পানির মালিক বিল ওকম্যান, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের নাম-ঠিকানা চাইলেন। যাতে এই ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা শেষ করে চাকরি না পায় এবং তাদের পেশাগত জীবন ধ্বংস হয়ে যায় সেটা তিনি দেখে নেবেন। মাইক্রোসফট, গুগলসহ বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের অনেক চাকুরিজীবী তখন গাজার গণহত্যার প্রতিবাদ করায় চাকরি হারিয়েছিলেন।
জাতিসংঘের বিশেষ রিপোর্টার ফ্রান্সেসকা আলবেনেসের ঘটনাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে সমালোচনার কারণে তার পক্ষে চাকরি টিকিয়ে রাখা এবং কাজ চালিয়ে যাওয়াটাই কঠিন হয়ে পড়ে। তার আর্থিক ও ভ্রমণসংক্রান্ত সেবাগুলো সব বন্ধ করে দেওয়া হয়; ক্রেডিট কার্ড বাতিল করা হয়, হোটেল বুকিংয়ের সুযোগ বন্ধ করা হয়, এমনকি ভিসাও বাতিল করা হয়। আমেরিকা ভ্রমণেও তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় - যেখানে তার মেয়ে পড়াশোনা করেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রধান করিম খান নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী গ্যালান্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এটি করার পরই তার জীবন বিষময় হয়ে ওঠে। তার বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক ও প্রচারমূলক চাপ শুরু হয়। ট্রাম্পের এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে তাকে আমেরিকায় প্রবেশের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। খানের ব্যক্তিগত জীবনকে লক্ষ্য করে অপবাদ ছড়ানো হয় এবং তার স্ত্রী ও সন্তানরাও সেই প্রচারণার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। এখানেই শেষ নয়, মাইক্রোসফট খানের ইমেইল অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে আইসিসিকে মাইক্রোসফটের সাবস্ক্রিপশন বাতিল করতে হয়। পরে খানের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ আনা হয় এবং তদন্তের অজুহাতে তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
পশ্চিমা সমাজে জনমতকে এভাবেই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। মুখে গণতন্ত্র, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের কথা বলা হয়, কিন্তু বাস্তবে এসব স্বাধীনতা সাধারণ মানুষের জন্য নেই। সমাজটি এপস্টেইনের এলিটের দাসত্ব মেনে নিয়েছে। স্বাধীনতা শুধুমাত্র এপস্টেইনের এলিটদের জন্য। তারা যা খুশি করতে পারে, আর সাধারণ মানুষ এক নিষ্ঠুর শৃঙ্খলের মধ্যে বন্দি থাকে।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


