somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এপস্টেইনের এলিট: পশ্চিমা গণতন্ত্র আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

০৭ ই মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


"ইসরায়েল এবং শয়তান যদি একে অপরের সাথে যুদ্ধ করে, আমরা শয়তানের পাশে থাকবো।"

বাংলাদেশে কেউ যখন কাউকে হুমকি দেয়, তখন বলে, "এই, আমি কে, চিনিস!" তবে দেখা যায়, হুমকিদাতা ঘুসি বাগালেও আর খুব বেশি ক্ষতি করেনা বা তার ক্ষতি করার ক্ষমতা থাকে না। সে যে আসলে কে - সেটা বড় করে প্রকাশ হয় না। কিন্তু পাশ্চাত্যের কোন দেশে যদি আপনি এমন হুমকি পান, তাহলে প্রায় নিশ্চিতভাবে ধরে নিতে হবে, আপনার জীবন বিপদের মুখে।

প্রথমেই যা ঘটবে তা হলো, কর্মস্থানে গিয়ে শুনবেন, আপনার চাকরিটা চলে গেছে। আপনি হয়তো ভাববেন, এত বছর ধরে তো সেই প্রতিষ্ঠানে সুনামের সাথে কাজ করলেন, একের পর এক প্রমোশন পেলেন, উচ্চপদস্থদের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখলেন - তবু কোনোটাই কাজে লাগলো না? বাস্তবে এর কোনোটাই কাজে লাগেনি। কারণ এই সিদ্ধান্ত এসেছে এমন এক জায়গা থেকে, যা আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রধানের ক্ষমতারও বাইরে। সেই অদৃশ্য কিন্তু প্রভাবশালী লোকগুলোকে আমরা বলতে পারি "এপস্টেইনের এলিট শ্রেণি"। সমাজের কোনো অদৃশ্য এলিট, নেপথ্যে বসে, এক মুহূর্তেই আপনার চাকরিটা খেয়ে ফেলেছে।

২০২৩ সালের শেষে ইসরাইল যখন গাজায় গণহত্যা শুরু করলো, পরবর্তী দুই বছরে নিম্নলিখিত ঘটনাগুলো আমার চোখে পড়েছিল।

ড. ক্রিস্টিয়ান জারউর নামে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্বনামধন্য শিক্ষক, যিনি একই সাথে টরন্টোর সিক-কিড হাসপাতালের চিকিৎসক, ইনস্টাগ্রামে একটি পোস্ট শেয়ার করেছিলেন। সেখানে লেখা ছিল, "ইসরায়েল এবং শয়তান যদি একে অপরের সাথে যুদ্ধ করে, আমরা শয়তানের পাশে থাকবো।" কানাডার ইসরাইলপন্থী একটি মিডিয়া অ্যাডভোকেসি গ্রুপ পোস্টটি ফ্ল্যাগ করলে সাথে সাথেই ড. জারউরকে তার কর্মস্থান থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়। জারউরের মত কানাডার আরও অনেক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী সোশ্যাল মিডিয়ায় ফিলিস্তিন সমর্থনকারী মন্তব্য করার কারণে শাস্তি বা তদন্তের মুখোমুখি হন।

টরন্টোর অদূরে হ্যামিলটন শহরের প্রাদেশিক এমপি সারাহ জামা। রীতিমতো জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন জনপ্রতিনিধি। টুইটারে এক পোস্টে তিনি লিখলেন: ফিলিস্তিনে হত্যাকাণ্ড বন্ধ করো। গাজায় যুদ্ধবিরতির দাবি জানিয়ে তিনি ইসরায়েলকে একটি বর্ণবাদী রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। অফিসে গিয়ে দেখলেন, তার ইমেইল আর কাজ করছে না। কিছুক্ষণ পর জানতে পারলেন, তাকে তার দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তার অপরাধ, তিনি নাকি সহকর্মীদের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন।

রড লয়োলা, আলবার্টা প্রদেশের একজন এমপি; গত বছর লিবারেল পার্টির মনোনয়নে কেন্দ্রীয় নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন। ইসরাইলপন্থী একটি গ্রুপ হঠাৎ খুঁজে বের করল যে, ১৬ বছর আগে লয়োলা তার এক বক্তৃতায় হিজবুল্লাহ ও হামাসকে জাতীয় মুক্তির আন্দোলনকারী হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। সাথে সাথেই তাকে লিবারেল পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হলো। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার কার্যত এখানেই শেষ হয়ে গেল। সেই এপস্টেইনের এলিটদের কেউ কেউ নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছে।

গাজার গণহত্যার প্রতিবাদে আমেরিকার বহু নামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলনে নামলে, এপস্টেইনের বিখ্যাত এলিট জায়নবাদী হেজফান্ড কোম্পানির মালিক বিল ওকম্যান, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের নাম-ঠিকানা চাইলেন। যাতে এই ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা শেষ করে চাকরি না পায় এবং তাদের পেশাগত জীবন ধ্বংস হয়ে যায় সেটা তিনি দেখে নেবেন। মাইক্রোসফট, গুগলসহ বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের অনেক চাকুরিজীবী তখন গাজার গণহত্যার প্রতিবাদ করায় চাকরি হারিয়েছিলেন।

জাতিসংঘের বিশেষ রিপোর্টার ফ্রান্সেসকা আলবেনেসের ঘটনাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে সমালোচনার কারণে তার পক্ষে চাকরি টিকিয়ে রাখা এবং কাজ চালিয়ে যাওয়াটাই কঠিন হয়ে পড়ে। তার আর্থিক ও ভ্রমণসংক্রান্ত সেবাগুলো সব বন্ধ করে দেওয়া হয়; ক্রেডিট কার্ড বাতিল করা হয়, হোটেল বুকিংয়ের সুযোগ বন্ধ করা হয়, এমনকি ভিসাও বাতিল করা হয়। আমেরিকা ভ্রমণেও তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় - যেখানে তার মেয়ে পড়াশোনা করেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রধান করিম খান নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী গ্যালান্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এটি করার পরই তার জীবন বিষময় হয়ে ওঠে। তার বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক ও প্রচারমূলক চাপ শুরু হয়। ট্রাম্পের এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে তাকে আমেরিকায় প্রবেশের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। খানের ব্যক্তিগত জীবনকে লক্ষ্য করে অপবাদ ছড়ানো হয় এবং তার স্ত্রী ও সন্তানরাও সেই প্রচারণার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। এখানেই শেষ নয়, মাইক্রোসফট খানের ইমেইল অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে আইসিসিকে মাইক্রোসফটের সাবস্ক্রিপশন বাতিল করতে হয়। পরে খানের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ আনা হয় এবং তদন্তের অজুহাতে তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

পশ্চিমা সমাজে জনমতকে এভাবেই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। মুখে গণতন্ত্র, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের কথা বলা হয়, কিন্তু বাস্তবে এসব স্বাধীনতা সাধারণ মানুষের জন্য নেই। সমাজটি এপস্টেইনের এলিটের দাসত্ব মেনে নিয়েছে। স্বাধীনতা শুধুমাত্র এপস্টেইনের এলিটদের জন্য। তারা যা খুশি করতে পারে, আর সাধারণ মানুষ এক নিষ্ঠুর শৃঙ্খলের মধ্যে বন্দি থাকে।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১:৩৫
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সামুর ব্লগারদের পোস্ট নিয়ে একটা সংকলন বের করতে চাই

লিখেছেন ডার্ক ম্যান, ০৯ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:৫১

আমি একটা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান চালু করতে চাচ্ছি। তাই আমার প্রত্যাশা প্রথম বইটা হবে সামুর ব্লগারদের পোস্ট সংকলন।
আপনারা যদি চান, তাহলে আপনাদের লেখা যেকোনো প্রিয় পোস্ট সেখানে দিতে পারেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছায়ার মোনাজাত

লিখেছেন কাবিল, ০৯ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:৫১



ফজরের আগের সেই নীরব সময়টা—যখন আকাশ আর জমিনের মাঝে এক অদৃশ্য দরজা খুলে যায়।
আমি ওযু করে নামাজের জন্য দাঁড়ালাম। চারপাশে এমন নীরবতা, যেন পৃথিবীটা কারো গভীর চিন্তার মধ্যে ডুবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনু কবিতা

লিখেছেন সামিয়া, ০৯ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:৫১



(১)
গল্প স্বল্প আড্ডার ভেতর
ডাকে পুরোনো দিন,
বিষন্ন স্মৃতির পাতা
ক্লান্ত বিলীন।

(২)
শোকের ধুলো জানালাতে,
বসে থাকে রোদ না মেখে,
হারিয়ে গেলো কারো মুখ
ভুল ঠিকানায় নাম লিখে।

(৩)
চায়ের ধোঁয়ায় মুখ লুকিয়ে
একাকী নিরালায়,
গল্প শেষেও... ...বাকিটুকু পড়ুন

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন 2026 : BJP কি জিততে চলেছে ?

লিখেছেন গেছো দাদা, ০৯ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:৪৫

আসন্ন বিধান সভা নির্বাচনে(2026) কি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে BJP জিততে চলেছে?
আসুন জেনে নিই প্রকৃত সম্ভাব্য রেজাল্ট।
রাজ্য সরকারের IB এবং মোদী সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র অনুসারে,কোন দল কত আসন পেতে পারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা যে আসলে কী চাই, নিজেরাও জানি না

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২:৫৬



কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই একটাই দৃশ্য—হতাশার গল্প আর সমালোচনার স্রোত। বিশেষ করে শিক্ষামন্ত্রী ড. এহছানুল হক মিলন সাহেবকে নিয়ে নানামুখী আলোচনা বেশ জমে উঠেছে। ক্ষমতায় আসার দুই মাসও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×