
আমার আট বছরের ছেলে ফোনে ফেসবুক পাতার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "বাবা, এটা কিসের ছবি"? আমি তার মনোযোগ অন্যদিকে সরানোর বৃথা চেষ্টা করে অবশেষে বললাম, এটা আমেরিকা- ইসরায়েলের ইরানের একটি শহরের ওপর বোমা হামলার ছবি। যেখানে তারা বোমা ফেলেছে, সেই শহরটার নাম শিরাজ। ইরানের খুব বিখ্যাত দুজন কবি, সাদি এবং হাফিজের জন্মস্থান এই শহর।
আমার ছেলে ভেবেছিল, এটা হয়তো রাতের আকাশে আতশবাজির ছবি হবে। সে যে জগতে বাস করে, সেখানে পৃথিবীটা বড় একটা প্লে-গ্রাউন্ড ছাড়া কিছু নয়। এখানে যে কেউ বোমা মেরে শিশুহত্যার মত অপরাধ করতে পারে, এটা তার পক্ষে বোঝা কঠিন। আর, আমার জন্য এটা তাকে বোঝানো আরো বেশি কঠিন। বাস্তবতা হলো, মানবাধিকার, স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের বুলি আওড়ানো আমেরিকা এখন ঘোষণা দিয়েই শিশুহত্যার মত অপরাধ করছে।
আমার মনে পড়ল, রবীন্দ্রনাথের "পারস্যে" গ্রন্থে বর্ণিত তাঁর তিন সপ্তাহের ভ্রমণ শুরু হয়েছিল শিরাজ শহর থেকে। শিরাজ থেকে তিনি গিয়েছিলেন ইস্ফাহান, তারপর তেহেরান। কবির বর্ণনায় আমার স্মৃতিতে শিরাজের নাম জড়িয়ে ছিল পাহাড়ের পর পাহাড়, কমলালেবুর বাগান, নিবিড় সবুজ ডালিমের বন আর দিগ্বিজয়ী দারিয়ুসের প্রাসাদের প্রত্নস্থাপনার সৌন্দর্যের সাথে। হাফিজের সমাধির পাশে বসে কবির মনে হয়েছিল, "...আমরা দুজনে একই পানশালার বন্ধু, অনেকবার নানা রসের অনেক পেয়ালা ভরতি করেছি। ...কত-শত বৎসর পরে জীবনমৃত্যুর ব্যবধান পেরিয়ে এই কবরের পাশে এমন একজন মুসাফির এসেছে যে মানুষ হাফেজের চিরকালের জানা লোক।"
সেই শহরের নামগুলোই এখন ফিরে ফিরে আসছে বোমা হামলা, নির্বিচার হত্যা আর সামরিক-বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংসের ছবির সাথে। ইরানকে বোমা মেরে গাজার মতো মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে ইরানকে প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেবার ঘোষণা ট্রাম্পের কাছ থেকে এসেছে। ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করে জনগণকে মুক্ত করার যে ভণিতা প্রথমে ছিল, এখন সেটা নেই।
ট্রাম্প ধারণা করেছিলেন, খামেনি ও ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যা করলে ইরানের মানুষ রাস্তায় নেমে এসে সরকার উৎখাত করবে। যেভাবে ১৯৫৩ সালে সিআইএ-কে দিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে আমেরিকা উৎখাত করেছিল, সেটাই আবার ঘটবে। মোসাদ্দেকের পতনের কারণ ছিল, তিনি ইরানের তেল কোম্পানিগুলো জাতীয়করণ করে ব্রিটিশ কোম্পানি বিতাড়িত করেছিলেন।
ভেনেজুয়েলার মতো ইরানেও একই ধরনের সাফল্য অর্জন করে দেশটির তেলসম্পদ লুট করতে পারবেন, এই ইচ্ছা ট্রাম্পের ছিল। কিন্তু সেটা না হওয়ায় এখন তার পরিকল্পনা ইরানকে ধ্বংস করে দেয়া, দেশটিকে প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। এই ঘোষনা স্পষ্টই ইসরায়েলের শিখিয়ে দেওয়া। ইসরায়েলের নির্দেশে ট্রাম্প যা করছেন সেখানে কোনো লুকোছাপা নেই। বোমা হামলার লক্ষ্য এখন সামরিক স্থাপনায় সীমিত নেই। সামরিক-বেসামরিক সবকিছুই এখন টার্গেট। হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, সবখানেই নির্বিচারে বোমা হামলা চলছে।
ফিলিস্তিনে সবাই হামাস, এই অজুহাত ব্যবহার করে যেভাবে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে বেসামরিক নারী-পুরুষ ও শিশুদের উপর গণহত্যা চালিয়েছে, এই কৌশল এখন তারা দক্ষিণ লেবাননে প্রয়োগ করছে। একই মডেল ইরানের ক্ষেত্রেও প্রয়োগের চেষ্টা চলছে। এ নিয়ে আমেরিকার জবাবদিহিতা নেই, কোনো লজ্জাও নেই। শ্বেতাঙ্গ প্রভুরা ছাড়া অন্যদের তারা মানুষ হিসেবেই গন্য করে না।
এই যুদ্ধে ইসরায়েলের উদ্দেশ্য ইরানকে ভেঙে টুকরো টুকরো করা। যেমনটা ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া আর লেবাননে হয়েছে, দেশটাকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে ভেতরের জাতিগত ও ধর্মীয় সংঘাতে সে নিজেই ধ্বংস হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
গত চার দশক ধরে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামানোর চেষ্টা করেছে। আগের রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট প্রশাসন সেটা প্রত্যাখ্যান করলেও, জায়নবাদীদের চাপের মুখে ট্রাম্প ইসরায়েলের ফাঁদে পা দিয়েছে। এখন আবার সেই আগ্রাসনকে ঢাকতে ইরানের তেল দখলের গল্প সামনে এনেছেন, যেন এটা একটা প্রয়োজন। আসলে এটা সরাসরি ইরানের তেল সম্পদ লুটপাটের পরিকল্পনা।
গতকাল ইস্টারের অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় ট্রাম্প সেটা পরিষ্কার করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "আমরা সহজেই ইরানের তেল দখল করে নিতে পারতাম, এবং আমি শুধু তেলটাই নিতে চেয়েছিলাম।" আমেরিকানদের ধৈর্য কম, আর সেকারণেই নাকি সেটা তিনি এখনো দখল করে উঠতে পরেননি। একই বক্তৃতায় ভেনেজুয়েলা নিয়ে গর্ব করে তিনি বলেছেন, "৪৫ মিনিটে অভিযান শেষ হয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের ৫৯% তেলের নিয়ন্ত্রণ রাখে"।
পশ্চিমা শক্তির নৈতিক দাবি ভেঙে পড়েছে। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে কথা বলার অধিকার তারা হারিয়েছে। এটা স্পষ্ট যে, এই শক্তিপূজা, ধ্বংস ও গণহত্যাগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এগুলো একটি অরেকটির সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। পশ্চিমা সভ্যতার অন্তর্গত কাঠামোতেই এই বর্বরতা, অবিচার, লুটতন্ত্র ও গণহত্যার বীজ নিহিত আছে।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর পারস্য ভ্রমণে একজন জার্মান প্রত্নতত্ত্ববিদের দেখা পেয়েছিলেন। শিরাজের অদূরে প্রাচীন পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানী পার্সিপোলিস; প্রত্নতত্ত্ববিদ সেখানেই একটি বহুপুরাতন প্রাসাদের ভগ্নাবশেষের একটি অংশ সংস্কার করে লাইব্রেরি ও সংগ্রহশালা গড়ে তুলে বসবাস করতেন। তিনি কবিকে বলেছিলেন, "আলেকজান্ডার এই প্রাসাদ পুড়িয়ে ফেলেছিলেন।…অসহিষ্ণু ঈর্ষাই তার কারণ। তিনি চেয়েছিলেন মহাসাম্রাজ্য স্থাপন করতে। আলেকজাণ্ডার আকেমেনীয় সম্রাটদের পারস্যকে লণ্ডভণ্ড করে গিয়েছেন।"
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, "এই পর্সিপোলিসে ছিল দরিয়ুসের গ্রন্থাগার। বহু সহস্র চর্মপত্রে রুপালি সোনালি অক্ষরে তাঁদের ধর্মগ্রন্থ আবেস্তা লিপীকৃত হয়ে এইখানে রক্ষিত ছিল। আলেকজাণ্ডার আজ জগতে এমন কিছুই রেখে যান নি যা এই পর্সিপোলিসের ক্ষতিপূরণ-স্বরূপে তুলনীয় হতে পারে।"
আলেকজান্ডার শেষ পর্যন্ত পারস্যেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। যে প্রাচীন পারস্য তিনি ধ্বংস করেছিলেন, ইতিহাসের পরিহাসে সেখানেই তার মৃত্যু ঘটে।
রবীন্দ্রনাথ আরও লিখেছেন, "নিষ্ঠুর ইতিহাসের হাত থেকে পারস্য যেমন বরাবর আঘাত পেয়েছে পৃথিবীতে আর-কোনো দেশ এমন পায় নি, তবু তার জীবনীশক্তি বারবার নিজের পুনঃসংস্কার করেছে।...পারস্য এক...আঘাত পেলে সে পীড়িত হয়, কিন্তু বিভক্ত হয় না। রুসে ইংরেজে মিলে তার রাষ্ট্রিক সত্তাকে একদা দুখানা করতে বসেছিল। যদি তার ভিতরে ভিতরে বিভেদ থাকত তা হলে য়ুরোপের আঘাতে টুকরো টুকরো হতে দেরি হত না। কিন্তু যে মুহূর্তে শক্তিমান রাষ্ট্রনেতা সামান্যসংখ্যক সৈন্য নিয়ে এসে ডাক দিলেন, অমনি সমস্ত দেশ তাঁকে স্বীকার করতে দেরি করলে না; অবিলম্বে প্রকাশ পেলে যে, পারস্য এক।"
বর্ণবাদী, লুটেরা ও সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রশক্তির আড়ালে থাকা দুর্বৃত্তের মরণ আঘাত সত্ত্বেও ইরান নিজের শক্তিতে অটল থাকবে - আমিও এই প্রত্যাশা করি।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



