somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হীরক রাজার দেশের যন্তর-মন্তর ঘর এবং ইংল্যান্ডের আদালতে দণ্ডিত ইমাম

১৮ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


"হীরক রাজার দেশে" সিনেমায় অত্যাচারী রাজা প্রজাদের ওপর অনেক অত্যাচারের পরেও যখন দেখেন প্রজারা পুরোপুরি বশ মানছে না, তখন সভা-বিজ্ঞানীকে দিয়ে একটা "যন্তর-মন্তর" ঘর তৈরি করেন। সেখানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রজাদের এমন মগজ ধোলাই দেওয়া হয় যে, অত্যাচারিত প্রজারা পর্যন্ত অতীতের সব কিছু ভুলে রাজার গুণগান করতে থাকে। হীরক রাজা বুঝেছিলেন, "মানুষ যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে"।

হীরক রাজার "যন্তর-মন্তর" ছিল রাজ্যশাসন টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা - বিদ্রোহ দমন ও প্রজাদের আনুগত্য নিশ্চিত করা। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও গভীর। এখানে মগজ ধোলাই বিদ্যমান শাসন রক্ষার জন্য নয়; মানুষকে চিন্তাহীন ও অন্ধ করে, প্রশ্নহীন আনুগত্য তৈরি করে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে দিয়ে একটি মোল্লাতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাই এই মগজ ধোলাইয়ের লক্ষ্য। এমন এক সামাজিক পরিবেশ তৈরির চেষ্টা হচ্ছে যেখানে প্রশ্নহীন আনুগত্যকে মানুষ ধর্মীয় কর্তব্য মনে করে।

বিভিন্ন সময়ে শাসকগোষ্ঠী আমাদের চিন্তার স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ের মতো একসাথে চলমান এতগুলো মগজ ধোলাইয়ের মেশিন আগে কার্যকর হতে দেখা যায়নি। ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অনেকগুলো মগজ ধোলাইয়ের যন্ত্র এখন কাজ করছে। এর মধ্যে শক্তিশালী একটি মাধ্যম হলো ধর্মের নামে পরিচালিত ওয়াজ-মাহফিল বা ওয়াজী মোল্লাদের বক্তৃতা।

এই ধরনের বক্তৃতাগুলো কখনো সমালোচনা বা বিশ্লেষণের বিষয় হয় না। মানুষ সেখানে বক্তার বক্তব্য, যুক্তি বা তার বাস্তব প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। বক্তৃতাদানকারীর কথার অর্থ, সময়োপযোগিতা বা বাস্তবতা নিয়ে জবাবদিহিতা থাকে না। পুরো বিষয়টিই এমন যে এসব বক্তব্য যুক্তি-তর্ক বা বিশ্লেষণের বিষয় নয়। এগুলো কেবল বিশ্বাস বা মান্য করার বিষয়। বক্তব্যগুলো পবিত্র ও প্রশ্নাতীত। ফলে সমালোচনার জায়গা নেই।

এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয়েছে যে, ধর্মের সাথে সম্পর্কিত সবকিছুই ভালো ও শ্রেষ্ঠ। ধর্মের সাথে যুক্ত ধর্মজীবী মোল্লারা জ্ঞানী। এভাবে ধর্মীয় পরিচয় ও ধর্মীয় কর্তৃত্বকে প্রশ্নাতীত একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যে বিষয় নিয়ে কোনো প্রশ্নই করা যায় না, সেটি কীভাবে জ্ঞানের বিষয় হয়, সেটিও একটা প্রশ্ন বটে।

প্রশ্নহীন ধর্মীয় কর্তৃত্ব যখন সমালোচনা, যুক্তি ও জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে উঠে যায়, তখন তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, লন্ডনের এই ইমামের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের ঘটনাটি তারই এক সাম্প্রতিক উদাহরণ। ইমামের নাম আব্দুল হালিম খান। তার বিরুদ্ধে ২১টি ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। যাদের তিনি ধর্ষণ করেছেন, সেই সাতজন ভুক্তভোগীর মধ্যে তিনজন নারীশিশু আছেন, যাদের বয়স ১৩ বা তার কম।

আদালত ইমামের অপরাধ সম্পর্কে বলেন, "অপরাধী ভুক্তভোগীদের এই বলে প্রতারিত করত যে তার সাথে জিন আছে, যেটা তাদের ও তাদের পরিবারকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। এরপর অপরাধী জিনের ছদ্মবেশে নারী এবং নারীশিশুদের ধর্ষণ করতেন। ভুক্তভোগীরা যাতে ঘটনাগুলো গোপন রাখে, সেজন্য আবার ধর্ষক এই বলে তাদের ভয় দেখাতেন যে কাউকে বলে দিলে জিন তাদের অনেক বড় ক্ষতি করবে।"

ইংল্যান্ডের আদালত রায়ে ভুক্তভোগীদের সাহসিকতার প্রশংসা করে যৌন নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার সকলকে পুলিশে অভিযোগ জানানোর আহ্বান জানিয়েছে। আদালত বলেছে, "এই দণ্ডাদেশ প্রমাণ করে যে শিশু সুরক্ষা সংস্থাগুলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অটল এবং নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধের বিচার নিশ্চিত করবে। আপনারা একা নন এবং সবরকম সাহায্য পাওয়ার অধিকার আপনাদের আছে।"

ঘটনাটি ইংল্যান্ডে ঘটেছে বলেই হয়তো ভুক্তভোগী নারী ও শিশু ইমামের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে সাহস করেছেন। তাদের বিশ্বাস ছিল যে তাদের অভিযোগগুলো আমলে নেওয়া হবে এবং তারা ন্যায়বিচার পাবে।

ঘটনাটি যদি বাংলাদেশে ঘটত, তাহলে ভুক্তভোগীরা হয়তো পুলিশের কাছেই যেত না। অপরাধী ক্ষমতাশালী, আবার পুলিশও ক্ষমতাশালী। ভুক্তভোগীই কেবল ক্ষমতাহীন। তাই অভিযোগ করার জায়গা তাদের নেই। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিযোগ করলে বিপদ আরও বাড়ে। পুলিশ টাকা চায়, অপরাধী হুমকি দেয়, আবার পাড়া-প্রতিবেশী সুযোগ পেয়ে কুৎসা রটায় - "ইমামের দোষ নয়, ওই মেয়েরই দোষ, মেয়েটাই খারাপ" - এমন উদাহরণ আমাদের সমাজে ভুরিভুরি আছে।

কোনোভাবে গণমাধ্যমে খবরটি প্রকাশিত হলে বা মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হলে যদি সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশ পেয়ে পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারও করে, তবে দেখা যেত তথাকথিত "তৌহিদি জনতা" মব তৈরি করে থানা ঘেরাও করত - ইমাম বলে কথা।

মোল্লাতন্ত্র যখন রাষ্ট্রের অংশ না হয়েও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে এবং মানুষের অনুভূতির অংশ হয়ে ওঠে, তখন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতি আমরা ড. ইউনূসের সময়ে দেখেছি, যখন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা, এমনকি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাও, মবের পক্ষ নিয়ে বক্তব্য দিতেন।

সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত মোল্লাতন্ত্রের প্রভাব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন এবং বিচার ব্যবস্থার কার্যক্রমে প্রতিফলিত হয়। পুলিশ, প্রশাসন ও বিচার বিভাগ - সবাই একটি নির্দিষ্ট সামাজিক পরিবেশের ভেতর কাজ করে, যেখানে জনগণের প্রত্যাশা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোন বিষয়ে জনগণের প্রত্যাশা প্রবল হলে, প্রতিষ্ঠানগুলোও সেই চাপের বাইরে থাকতে পারে না। ফলে নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ অনেক সময় বিচারবুদ্ধি ও ন্যায়বিচারের বদলে জনমতের প্রতিক্রিয়ায় প্রভাবিত হয়।

উদাহরণ হিসেবে কুষ্টিয়ায় পীরকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাটি উল্লেখ করা যায়। সেখানে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও মব দমনকে তারা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছিল। যদিও আইনগতভাবে এটি গুরুতর অপরাধ এবং তা প্রতিরোধ করা তাদের দায়িত্ব ছিল, তবুও জনতার চাপ ও পরিস্থিতির কারণে তারা দায়িত্ব পালন করেনি।

ইংল্যান্ডে দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশীয় মুসলিম অভিবাসীদের একটি অংশের মধ্যে পাকিস্তানি-ধাঁচের রক্ষণশীল ও উগ্রবাদী সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। পশ্চিমা বিশ্বের উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক নীতি ও মূল্যবোধ - যেমন ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা- এসবের অপব্যবহার করে একটি উগ্রবাদী সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছে। এই পরিবেশই আব্দুল হালিম খানের মতো লোকদের জন্য কর্তৃত্ব ও প্রভাব অর্জনের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

এই ধরনের ঘটনা পশ্চিমা রাজনীতিতেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। উগ্র ডানপন্থী শক্তি, যেমন ইংল্যান্ডের টমি রবিনসনের মতো ব্যক্তিরা, এসব ঘটনাকে ব্যবহার করে মুসলিম-বিদ্বেষী বা ইসলাম-বিদ্বেষী প্রচারণা জোরদার করে। একদিকে মুসলিম অভিবাসীদের উগ্রবাদী সংস্কৃতি, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াশীলতা - উভয়েই একে অপরকে শক্তিশালী করে।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে মে, ২০২৬ রাত ৩:৩২
৫টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রুশদেশের চিরায়ত শিশুসাহিত্য

লিখেছেন জ্যোতির্ময় ধর, ১৮ ই মে, ২০২৬ রাত ৩:১৭


ঊনবিংশ শতাব্দীর মহান লেখক চেখভ , তুর্গেনেভ , দস্তয়েভ্‌স্কি , তলস্তয়ের নাম বিশ্ববাসীর কাছে সুপরিচিত। এই লেখকেরা - রাশিয়ার জাতীয় গৌরব । ঊনবিংশ শতাব্দীর রুশ লেখকদের মধ্যে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভবিষ্যতের স্পষ্ট বার্তা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৮ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:১৭



কারিনা ইস্যুতে যা ঘটেছে, তা শুধু একটি পরিবারের আত্মপক্ষ সমর্থন না- এটা জনমতের একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। যদি শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেই হেটস্পিচ আসতো, তাহলে কারিনার মা জানাজার পর... ...বাকিটুকু পড়ুন

রক্তের দাগে ধুয়ে যাওয়া আভিজাত্য: কারিনা কায়সারের বিদায় এবং আমাদের কিছু নির্মম শিক্ষা

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১৮ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৯



​বাঙালি সংস্কৃতির চিরায়ত নিয়মে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ সব বৈরিতা ভুলে যায়। জানাজার খাটিয়া সামনে রেখে স্বজনরা কেবল ক্ষমা চান, চিরবিদায়ের প্রার্থনা করেন। কিন্তু গতকাল আমরা এক অভূতপূর্ব ও হাহাকারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ড. ইউনুস শুধুমাত্র বাই বর্ন বাংলাদেশী!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১০


আমেরিকার সাথে চুক্তির কথাটি আসলেই ইউনুসের উপদেষ্টাসহ তার লোকজন বলে বিএনপি ও জামাতের সাথে আলোচনা করেই চুক্তিটি হয়েছে!
বিএনপি ও জামায়েতের সাথে আলোচনা করলেই কি এই চুক্তি সঠিক হয়ে যায়?

আপনাদের বিএনপি-... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিজেকে জানুন, নিজেকে গড়ুন

লিখেছেন মোঃ ফরিদুল ইসলাম, ১৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৭

"নিজেকে জানুন, নিজেকে গড়ুন — নীরবতা হোক আপনার শক্তির সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র।"
সব সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আপনার একার না। আপনি যদি বারবার বোঝান, কিন্তু কেউ বুঝতে না চায় — তাহলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×