কিছুদিন আগে কবিসভায় পোস্ট করা মৌসুমী [কাদেরের]-র একটা গানের অনুষ্ঠানের দাওয়াত নিয়া ভুলবোঝাবুঝি দেখা দেয় যে ইনি কি কলিকাতার মৌসুমী ভৌমিক নাকি আমগো কেউ। তখন কবি নির্মলেন্দু গুণ কবি সাজ্জাদ শরিফের একটা চিঠির উত্তরে জানান যে ইনি সেই মৌসুমী না...ওনার নিজের পরিচয় আছে। উনি শামীম আখতার পরিচালিত দুইটা সিনেমার (ইতিহাসকন্যা ও শিলালিপি) সঙ্গীত পরিচালনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এবং গুণদার দুইটা কবিতায়ও সুরারোপ করছেন। নজরুলের গানের একটা সিডি করছেন। গুণদা আরো জানাইলেন, মৌসুমী কাদেরের প্রকাশিতব্য সিডির দুয়েকটা গান ওনারা আজিজ মার্কেটের সুরের মেলায় দাঁড়াইয়া শুনছেন।
এরপরে গুণদা যোগ করলেন, "সবাই জানে, তুমি আরো ভালো করেই জানো যে, কবিতার মতোই গানের ভালোমন্দটাও আমি খুব কম বুঝি। আমি হইছি সেই লোক যে রজনীকান্তের ভক্তিমূলক গভীর গানের সিডি আর মমতাজের উল্টাপাল্টা (বুকটা ফাইট্টা যায়) গানের সিডি একই সঙ্গে কিনেছি।' এরপরে উনি মৌসুমী সম্পর্কে আরো কিছু বলছিলেন। সেইটা এই আলোচনায় আনলাম না।
তো গুণদার পোস্ট পইড়া কবি সুমন রহমান পরের একটা পোস্টে কিছু মন্তব্য করছিলেন। উনি বলছিলেন, "মমতাজের গান ওনাদের কাছে অনেক জরুরি একটা বিনোদন। কষ্টের পয়সা খরচ কইরা তার গান শোনেন এইসব গরীব মানুষেরা।...গুণদার উক্তিতে গরীব মানুষের রুচির প্রতি ব্যঙ্গভাব প্রকাশ পাইছে। গুণদা নিজে সাবঅল্টার্ন ঘরানার লোক। তসলিমা নাসরিন-এর 'ক' বইতে পড়েছি যে, গুণদা নিজেও এক সময় বস্তিতে থাকতেন। কিন্তু তারপরেও তিনি বস্তিবাসীর টেস্ট-কে 'উল্টাপাল্টা' মনে করেন। এলিটিজমের এমনি গুণ!"
এরপর পূর্বা হিবার্ট আমেরিকা থিকা লেখছেন, "অন্যান্য স্টেট-এর কথা কইতে পারমু না, আমগো (ওয়াশিংটন) ডিসিতে স্বয়ং রাষ্ট্রদূত সহ দূতাবাসের সকল কর্মচারীগণ, বিশ্বব্যাংক-এর কর্মরত কর্মচারী...মিলিয়ন ডলারের বাড়িতে থাকে, জামর্ানীর গাড়ি চালায় তারাও 30, 50, 100 ডলার কইরা টিকেট কাটিয়া মমতাজের গান হুনছে। মনোযোগ দিয়াই হুনছে।"
ওনাগো তিনজনের পোস্ট লইয়া এরপরে আমি কবিসভায় একটা পোস্ট পাঠাইছিলাম। [বলা ভালো, আমার পোস্টের পরেও অন্য পোস্ট আইছিল, কবিসভায় তা গেছে। এইখানে তা দিলাম না।] তো আমি যা বলছিলাম, আপনেগো লাইগা এইখানে তুইলা ধরতেছি :
1.
গুণদার কথা থিকা বোঝা যায় না যে উনি বস্তিবাসীর টেস্টরে উল্টাপাল্টা মনে করেন। বরং মমতাজের গানের সিডি তার নিজের কাছে উল্টাপাল্টা লাগছে। এবং সেই উল্টাপাল্টা লাগাটা আবার তার কাছে ভালো লাগাও। কারণ তিনি তো হোনবেন বইলাই সিডি কিনেন। মানে স্রেফ গবেষণাই নিশ্চয় তার কাম না। আদর কইরা যেমন মাইনষে ভালো পোলারেও পাগল কয় গুণদা মেবি হেইরকমই 'উল্টাপাল্টা' কইছেন।
আর বস্তিবাসীর টেস্টরে উল্টাপাল্টা মনে করলে কী সমস্যা। যদি ওই কাম এলিটিজম হয় কার কাছে এলিটিজম? ছোটলোকগো কাছে? বড়লোকগো কাছে? নাকি মধ্যবিত্তের কাছে? আমার ধারণা মধ্যবিত্তের কাছে। যদি তাই হয় তাইলে এর অর্থএই যে গুণদা মধ্যবিত্ত হইয়া ছোটলোকরে গাইল পাড়ার কারণে মধ্যবিত্তের কাঠগড়ায় জবাবদিহি করতে বাধ্য। (কোনো ছোটলোক যদি গুণদার কবিতারে উল্টাপাল্টা কইত তারে কোত্থাও জবাবদিহি করতে হইত না।)
তাইলে মধ্যবিত্ত মনে করতেছে যে সে তার শ্রেণীর বাইরে অন্য শ্রেণীর দায়িত্বও নিছে বটে। ছোটলোকে সে দায়িত্ব নিতে পারে না। বড়লোকে নিতে চায়ই না। এবং কোনো মধ্যবিত্ত যদি মধ্যবিত্ত হওয়া সত্ত্বেও মধ্যবিত্তের স্বভাবসুলভ অন্য শ্রেণীগুলির প্রতি সহনশীলতার যে ক্লাসিক আচরণ তা রপ্ত না করতে পারে তাইলে অগ্রসর মধ্যবিত্ত তারে ধমকাইয়া দিবে। কেননা গুণদা না কইয়া যদি কাঙ্গালিনী সুফিয়া কইত 'মমতাজের উল্টাপাল্টা সিডি' তাইলে তো আর সেইটা এলিটিজম হইত না। অর্থাৎ গুণদার মধ্যবিত্ত অবস্থান গুণদা কলুষিত করছেন ছোটলোকরে উল্টাপাল্টা বইলা। বলা যায় না, এই বলার কারণে তিনি হয়তো ইতিমধ্যে মধ্যবিত্ত পদমর্যাদা হারাইয়া ছোটলোকেই পরিণত হইয়া গেছেন। অন্তত ইন্টেলেকচুয়ালি! নাকি? অথচ কাঙ্গালিনি করলে এইটা হইত আন্তশ্রেণী সমালোচনা কর্ম। তাই মধ্যবিত্ত হিসাবে আমরা তাদের রুচিরে উল্টাপাল্টা বলার কারণে ছোটলোকগো কাছে আমগো মুখ দেখাইতে পারতেছি না, মরালি! ছোটলোক যদি মধ্যবিত্ত হইত তাইলে এই নিয়া না ভাবলেও আমগো চলতো। এমনকি মধ্যবিত্তের রুচিরে মধ্যবিত্ত যদি 'উল্টাপাল্টা' বলে সেইটাও তো আর এলিটিজম হয় না। এইভাবে ছোটলোকদের চেয়ে অধিক নৈতিকতার দাবিদার হওয়ার মারফতে আমরা মধ্যবিত্তেরা পুরা সমাজেরই বিবেকে পরিণত হইতেছি। আমাদের তাই এলিটিজম পোষায় না। ওইটা নীতিগতভাবে পশ্চাৎপদ। ছোটলোকরা চাইলে এলিটিস্ট কাম কাজ করতে পারে। (আর বড়লোকে তো নিজেই এলিট।) কিন্তু যেহেতু ওরা ছোটলোক তাই ওদের ওই কামরে এলিটিস্টও কওন যাইব না। ওইটা বড়জোর ঘোড়ারোগ।
গুণদা হয়তো ছোটলোকের কালচার বইলা কালচাররে আলাদা করতে চান না। যেমন মনে হইল পূর্বা হিবার্টও চায় না। কিন্তু গরীব বা ছোটলোক যেমন আছে, হের কালচারও তো আছে। সেইটার ভোক্তা তো বড়লোকেও হইতে পারে। বড়লোকের নানান ঢং-এর কালচারের ভোক্তাও কি ছোটলোকে হয় না, টিভি নাটক দেখতে দেখতে? তাই বইলা ওইসব প্যানপ্যানানি নাটক ফাটক কালচাররে গরীব ছোটলোকের কালচার কওন যায় না। মার্কিন দেশে মমতাজের গান আইসা বিল গেটস সাহেব হোনলেও ওইটা ছোটলোকেরই কালচার। আর পূর্বা হিবার্টরা যে মার্কিন মুল্লুকের গরীব মুসলমান ছোটলোক নাগরিক (বা হবু নাগরিক) সেইটা তো পূর্বারা জানেই। ফলে বাংলাদেশের মাঝারিলোকেদের উচ্চ রুচিবোধের ঘাপেলা তাগো না থাকনেরই কথা। ডলার খরচ কইরা মমতাজের গান তারা হোনতেই পারেন। পূর্বারা যখন মমতাজ হোনে তখন হেইটা ছোটলোকেরই শ্রবণদর্শন। ছোটলোকের প্রতি ছোটলোকের সাংস্কৃতিক-আধ্যাত্মিক আকর্ষণ।
গুণদার লেখালেখি পইড়া আমার মনে হয় না গুণদা যহন মমতাজ হোনেন নিজেরে বস্তিবাসী বা ছোটলোক ভাইবা হোনেন। সুমনের মতোই ওই গান হোনতে হোনতে বস্তিবাসীর টেস্টের উপরে একটা গবেষণাও উনি চালান বা চালাইতে পারেন। যেমন বস্তিবাসী ছোটলোকও যদি চায় মধ্যবিত্তের কি বড়লোকের নাটক ফাটক কালচারেরে উল্টাপাল্টা মনে করতে পারে। কেউ কেউ করে এবং বলেও তো। তখন তার ঐ উল্টানো পাল্টানো মনে করারে সুমন কোন সূত্রে সমালোচনা করবেন? নাকি উনারা গরীব বইলা করা যাইব না। নাকি গরীব নিজে সাবঅল্টার্ন বইলা তার মনে করাটারেও একটা গবেষণার উপাত্ত ধইরা মৃদু হাসি সহকারে স্নেহ করলেই চলবো।
আমার মত দেই। আমার অভিমত হইল ছোটলোক যদি বড়লোকরে উল্টাপাল্টা মনে করে কি খানকির পোলা বইলা গাইলও দেয় তবু সুমন সেইটার সমালোচনা করতে পারেন না, গুণদাও পারেন না। কারণ মধ্যবিত্ত (গুণদা) যেমন সামাজিক ভাবে মধ্যবিত্তের (সুমনের) কাছে দায়বদ্ধ, ছোটলোক বা সাবঅল্টার্ন সেই অর্থে মধ্যবিত্তের কাছে দায়বদ্ধ না। অন্য ছোটলোকের কাছে (এবং অবশ্যই রাষ্ট্র বা আইনের কাছে) বিধিবদ্ধ হইলেও হইতে পারে। ফলে সামাজিকভাবে (মধ্যবিত্তের যে সামাজিক বিধান তার আওতায়) ছোটলোকের কাজের ভালোমন্দ বিচার চলে না। তারে খালি আইনী বা বেআইনী শাসত্দি দেওন যায়। ছোটলোক সমাজে বাস করে না, সে থাকে বড়লোকদের তৈরি করা কন্ডিশনের মধ্যে। ফলে তার দায় নাই। যেহেতু সে ক্ষমতার অংশী নয় (দালাল হইতে পারে, যেমন পুলিশের দালাল বা বলা ভালো কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশও!) তাই বিবেচনার দায়ও তার নাই। যেই কারণে ছোটলোক যহন বড়লোকের রুচি লইয়া বিবেচকের ভঙ্গিতে হাসে তহন বড়লোক ওই হাসি লইয়াই হাসতে থাকে। আপনেরা দেখছেন নিশ্চয়ই।
2.
দেখা যাইতেছে গরীবরে বরং সুমন কতর্া ধরতে পারতেছেন না। হইতে পারে সুমন সমাজে তাদের গণনা করেন না সে কারণেই কর্তা মনে করেন না? হইতে পারে তাদের উনি অভয়ারণ্যে রাখতে চান। বরং গুণদাই গরীব কতর্ারে কতর্া ধইরা (এবং তারে ক্ষমতার ভাগ না দিয়াই) তার রুচিরে (বা তার শিল্পকলারে) উল্টাপাল্টা মনে কইরা আপন বিবৃতি দিতাছেন। এতে আর যাই হউক গরীবের রুচিরে (বা শিল্পরে) দুধভাত জ্ঞান করা হইতেছে না বটে। স্বীকার করা হইতাছে। অপছন্দ (বা পছন্দ) করার মারফতে সম্মানও করা হইতাছে। 'ওদেরও কালচার আছে,' 'ওদেরও রুচি আছে' এই বইলা বইলা এনজিওগুলা অনেক দিন যাবৎই গরীব সাবঅল্টার্নের রুচি ও কালচাররে পুতুল বানাইয়া রাখছে। গরীবের মনে এহন নাকি আদরকারী মধ্যবিত্তের প্রতি আর ঘৃণাও জন্মায় না!
3.
সাবঅল্টার্ন যে সাবঅল্টার্ন সেইটা সিভিল নাগরিকরা সাব্যস্ত করছেন। এবং বিচারক যেমন নিজের বিচারও করতে পারেন ফিলোসফিক্যালি (আইনত বোধহয় না) তেমনি সিভিল নাগরিকরা নিজেরাই নিজেদের সিভিল নাগরিক সাব্যস্ত করছেন। (সাবঅল্টার্ন আদৌ নাগরিক হয় কিনা সন্দেহ আছে)।
এমনিতে কেউ নিজেরে কয় না মনে হয় আমি সাবঅল্টার্ন? ফলে সাবঅল্টার্ন দর্শন এক ভূত দর্শন। অর্থাৎ সমাজের নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অন্যদের সাবঅল্টার্ন বইলা দেখতে পায়। এবং তাদেরকে উপকার করে, করুণা করে, তাদের অধিকার আদায় কইরা দিতে চায় সবের্াপরি তাদের নূ্যনতম শিক্ষা স্বাস্থ্য খাদ্য বাসস্থানের ব্যবস্থা তারা করতে চায়। যার দেখভাল করতে হয় তারে অবজ্ঞা তারে নিন্দা করা যায় নাকি!
4.
যাদের সাবঅল্টার্ন বলা হয় তারা নিজেদের পরিচয় হিসাবে ঐ তকমারে কতটা গ্রাহ্য করে সন্দেহ আছে। এবং কাউরে সাবঅল্টার্ন বিবেচনা করার যে চর্চা তা থিকা সুমন বা আমার বা এমনকি গুণদারও বাইরাইয়া আসন দরকার তো। কারণ উল্টাপাল্টা বলার অনেক আগে থিকাই যহনই আমি অন্যরে সাবঅল্টার্ন বিবেচনা করতে শুরু করছি তহনই আমার মইধ্যে এলিটিজমের খেলা চালু অবস্থায় আছে। গুণদা মুখ ফুইট্টা কইলেন 'উল্টাপাল্টা', সুমন রহমান ভাবলেন মনে মনে। এই ভাবনের ও কওনের অধিকার আমগো আছে তো। যেমন সাবঅল্টার্ন বস্তিবাসী চাইলে সিভিল সোসাইটির মায়রে (কিংবা বাপরে) চুদি বলতে পারে।
5.
এইখানে গিয়া সুমন রহমান, নির্মলেন্দু গুণ বা আমার কোনো একটা পক্ষে দাঁড়াইতে হয়। ছোটলোক যেহেতুঅধিকারের বা সুবিধার প্রশ্নে ছোট হইয়াই আছে তারে সমান না ভাইবা নিজে এলিটিস্ট হওয়ার কলঙ্ক মাথায় লইয়াই তার অসুবিধার জায়গাগুলিরে সমাধানের চেষ্টা করতে হইব। দুর্বলের পক্ষে দাঁড়ানো বা ছোটলোকের পক্ষে দাঁড়ানোর অর্থ নেহায়েত করুণা বা কৃপা নয়। এর অর্থ আত্ম সমালোচনা। আসলে দুর্বলের পক্ষে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আপনি নিবর্তনকারী শক্তির (এইখানে ছোটলোকের হাসি লইয়া হাস্যরত বড়লোক) বিরুদ্ধে দাঁড়াইছেন।
6.
কিন্তু ছোটলোক বা সাবঅল্টার্নের আর্ট কালচার বিচারের ক্ষেত্র ভিন্ন, ওইখানে ছাড় দেওয়ার কিছু নাই। খারাপ লাগলে তা অবশ্যই ঘৃণা নিন্দা অবজ্ঞা সহকারেই ব্যক্ত করা যায়। আর যাই হউক আমরা তো আর সাবঅল্টার্ন না! আমরা নিজেদের এবং সাবঅল্টার্নের অধিকার লইয়া কথা কইতে সক্ষম। যাতে একদিন ছোটলোকরাও মিডলক্লাসে বিবর্তিত হইয়া যাইতে পারে!
ঢাকা, 2-5/8/5
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



