
আমার দাদা ছিলেন দিলদরিয়া মানুষ। সব কিছু নিয়েই বিলাসিতা করতেন। সামান্য জর্দা আনাতেন কোলকাতা থেকে। তার পাসপোর্ট লেখা ছিল ল্যান্ডলর্ড। ব্যবসার কাজে তিনি প্রায়ই কোলকাতা যেতেন। আমার দাদীর পাঁচ শ' ভরি গহনা ছিল। দাদী ছিলেন দারুন রুপসী। ঘরের মধ্যেও তিনি অলংকার পড়ে থাকতেন। অবশ্য তখনকার দিনে এটাই রেওয়াজ ছিল। তাছাড়া দাদা'র বাবা-মার হুকুমও ছিল। দাদী খুব ভালো গান গাইতেন। একদিন শীতের দুপুরে খবর এলো দাদীর বড় ফুপু খুব অসুস্থ। তিনি দাদা আর দাদীকে একবার দেখতে চান। সেবার বিক্রমপুরে বিখ্যাত শীত পড়েছিল।
দুপুরে দাদা-দাদী বাসে উঠলেন। যাবেন লোহজং থানার বালিগাও গ্রামে। যদিও খুব বেশি দূরের পথ না। কিন্তু দাদী খুব বেশি বের হতেন না বলেই তার কাছে মেলা দূরের পথ মনে হচ্ছে। দাদী জানালার কাছে বসে বাইরের দুনিয়াটা অবাক চোখে দেখছিলেন। তখন দারীর বয়স ছিল- সতের। আমার আব্বা ছিলেন দাদীর পেটে। যাই হোক, বাস চলছে। দাদী মনে মনে ভয় পাচ্ছে- তার গায়ে এত গহনা যদি পথে ডাকাত ধরে।
বাসে এক লোকের সাথে দাদার খুব খাতির হয়ে গেল। দু'জনে পুরো পথ গল্প করে যেতে লাগলেন। লোকটি দাদাকে বললেন- আপনারা যে পথে যাচ্ছেন, শুনেছি সে পথে নাকি খুব ডাকাতি হয়। এই কথা শুনে দাদী খুব ভয় পেয়ে গেলেন। বাস থামল সন্ধ্যার আগে। বাস থেকে নেমে বালিগাও দুই মাইলের হাঁটা পথ। গরুর গাড়ি যায় কিন্তু কাচা রাস্তায় গরুর গাড়িতে না উঠাই ভালো। শরীরের সমস্ত কলকব্জা নড়ে ওঠে। দাদা দাদী হেঁটেই রওনা দিলেন। এক আকাশ অজানা ভয়ে দাদীর মুখ কিছুটা গম্ভীর হয়ে রইল।
দাদা বললেন, কি ভাবছো? ফুপুর জন্য মন খারাপ?
দাদী বললেন, হুম।
তারপর আর কোনো কথা নেই। দুইজনই চুপচাপ। প্রচন্ড শীত। খুব কুয়াশা। দাদা ডানে বামে খুব চোখ রেখে হাঁটছেন। অবশ্য দেখার কিছু না। চারিদিকেই নির্জন মাঠ, গাছপালা, ধানী জমি আর ঝোপঝাড়। মাটির উচু-নিচু রাস্তা আর শীতের বেলা বলেই ধুপ করে চারপাশে অন্ধকার নেমে এলো। দূরে দুই একটা হারিকেনের আলোর আভা দেখা যাচ্ছিল। দাদী খুব ভয় পাচ্ছিলেন।
হঠাৎ দাদা বললেন, গয়না গুলো পড়ে আসাটা ভুল হয়েছে।
দাদী বললেন, হঠাৎ গয়নার কথা বলছো কেন?
এমনি বললাম। ভয় পেও না।
তুমি মোটেই এমনি-এমনি বলনি, ডাকাতের পাল্লায় পড়ব নাকি?
আরে না। আর ডাকাত ধরলেই কি? চলো। আমি তো আছি।
দাদী ভয় খাওয়া গলায় বললেন, আমাদের কি কোনো বিপদ হবে?
মনে হয় না। তবু তুমি যে ক'টা পার গয়না খুলে রাখো।
দাদী খুব তাড়াতাড়ি নেকলেস, বালা, দুল, আংটি আর বাজু খুলে দাদার দিতে দিয়ে দিলেন। তারপর কিছু অবশিষ্ট রয়ে গেল। দাদা গয়না গুলো রুমালে প্যাচিয়ে পাঞ্জাবির পকেটে রেখে দিলেন। ডান হাতে সুটকেস আর বাম হাতে দাদীর হাত ধরে হাঁটছেন। দাদা বললেন, বিপদ যদি এসেই পড়ে দৌড় দিও না। চুপ করে নিচু হয়ে বসে থেকো। এই কথা শুনে দাদীর ভয় আরও বেশি বেড়ে গেল। দাদী শক্ত করে দাদার হাত ধরে রাখলেন।
ঠিক এমন সময় সাত আট জন লোককে দৌড়ে আসতে দেখা গেল। তাদের মুখ কাপড় দিয়ে ঢাকা, হাতে দা, বল্লম, লাঠি। আমার দাদা লোক গুলো দেখে ঘাবড়ে গেলেন না। বলবান, শক্ত সমর্থ শরীর ছাড়া দাদার আর কোনো অস্ত্র ছিল না। তবে অসীম সাহস ছিল। বিপদের সাহস অনেক বড় অস্ত্র।
লোকগুলো মুহূর্তের মধ্যে দাদা আর দাদীকে ঘিরে ধরলো। তাদের একজন দাদার বুকে বল্লম ঠেকিয়ে বলল- যা কিছু আছে দিয়ে দে, তাহলে প্রানে বাঁচবি।
দাদা বললেন, কি চাও?
গয়না গুলো দে। তাড়াতাড়ি।
তাদের একজন দাদীকে দেখিয়ে বলল- এই মেয়ের কাছে অনেক গয়না থাকার কথা। একজন এগিয়ে এসে দাদীকে হ্যাঁচকা টান দিয়ে ফেলে দিল।
বোধহয়, দাদীকে ফেলে দিয়ে ডাকাত গুলো খুব বড় ভুল করেছিল। দাদীর গায়ে হাত না দিলে দাদা সব গুলো গয়না ডাকাতদের দিয়ে দিত। কোনো ঝামেলা করতো না।
দাদা তার হাতের ভারি স্যুটকেস দিয়ে প্রথম আঘাতটা করলো সর্দার লোকটাকে। সাথে সাথে সে মাটিতে পরে গেল। তারপর সর্দারের হাত থেকে লাঠিটা ছিনিয়ে নিয়ে- আমার দাদা যেন দশটা দাদা হয়ে গেলেন। কাঁদতে কাঁদতে, কাঁপতে কাঁপতে দৃশটা দেখলেন দাদী। ডাকাত গুলো দাদার অগ্নিরুপ দেখে দিশেহারা হয়ে গেল। দুই চারজন কখন মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছিল দাদী খেয়াল করেননি। বাকিরা দৌড়ে পালিয়ে গেল।
(আমার দাদা-দাদী দু'জনেই মরে গেছেন। তাদের মুখ থেকে শোনা চমৎকার সব গল্প আছে। এই গল্প গুলো আপনাদের সাথে শেয়ার করবো। আমার দাদা উত্তম কুমারের চেয়ে হাজার গুন বেশী সুদর্শন ছিলেন। একটুও বাড়িয়ে বলছি না। কিছু ছবি হয়তো আছে। ছবি গুলো হাতে পেলে আপনাদের দেখাবো। দাদাজান হুট করে পয়ত্রিশ বছরে বয়সে অন্ধ হয়ে যান। তারপর তিনি আর দৃষ্টি শক্তি ফিরে পান নি। দাদাজান পঁচাশি বছর বেঁচে ছিলেন।)
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জানুয়ারি, ২০১৮ সকাল ১১:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




