
আমার যদি একটা গাড়ি থাকতো! আমি কি কোনো দিন গাড়ি কিনতে পারবো? আমার আত্মীয় স্বজন সবার'ই গাড়ি আছে। আমার আপন বড় ভাই এর গাড়ি আছে। আমার ছোট ভাইও নাকি গাড়ি কিনবে। ইদানিং গাড়ির খুব অভাব বোধ করছি। সুরভি নানান কাজে প্রায়ই বাইরে যায়। এমন কি তার বাবার বাড়িতেও তো মাসে দুই একবার যায়। বাস বা সিএনজি'র সার্ভিস তো ভালো নয়। বেচারির জন্য আমার খুব মায়া হয়। প্রিয় মানূষের জন্য কিছু করতে না পারার কষ্টটা অনেক বড়।
আমার জীবনে আমি গাড়ি নিয়ে অনেকবার অপমানিত হয়েছি। একই জাগায় যাচ্ছি, আমার পরিচিত আমাকে রেখে অন্যজনকে নিয়ে গাড়িতে করে চলে গেল আমার সামনে দিয়ে। এক বিয়ের অনুষ্ঠানে যাবো- এক আত্মীয়র কাছে গাড়ি চাইলাম দুই ঘণ্টার জন্য- গাড়ি দিল না। আত্মীয়র কথা কি বলব- নিজেই ভাইয়ের কাছেই গাড়ি চাইলে গাড়ি পাই না। নানান ধরনের কথা বার্তা। আব্বা যখন গাড়ির ব্যবসা করতো- তখন গাড়ি চাইলেই পেতাম।
ত্রিশ-পয়ত্রিশ বছর তো আমি লোকাল বাসে করেই কাটিয়ে দিলাম। এখন আর পারি না। দৌড়ে দৌড়ে বাসে উঠতে, নামতে। ঘন্টার পর ঘন্টা বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। যা-ও দুই একটা বাস আসে এমন ভীড়, এমন ধাক্কাধাক্কি, সবার সাথে আমি পেরে উঠি না। অসহায়ের মতো, এতিমের মতো দাঁড়িয়ে থাকি। মাইলের পর মাইল হাঁটি। রাতে পা ব্যাথায় ঘুমাতে পারি না। দিনের পর দিন যাতায়াত করতে সীমাহীন কষ্ট। আর ভালো লাগে না।
মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে একটা পুরান গাড়ি ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে কিনেই ফেলি। আবার ভাবি মাসে মাসে লোন শোধ করবো কিভাবে? যা বেতন পাই, তা দিয়ে ডাল ভাত খেয়ে বেঁচে আছি কোনো রকমে। যখনই ভাবি এই জীবনে আমার গাড়ি কেনা হবে না- তখন কষ্টে বুকটা ভেঙ্গে যায়। এক আকাশ হাহাকার আমার গলা টিপে ধরে। ছোটবেলা থেকেই গাড়ির প্রতি আমার এক আকাশ দুর্বলতা। নানান রকম খেলনা গাড়ি ছিল আমার। রিমোট ওয়ালা গাড়ি ছিল আমার। সারাদিন গাড়ি গাড়ি খেলতাম। এখনও খেলনার দোকানে গেলে গাড়ি গুলো হাতে নিয়ে দেখি। রাস্তায় যখন আমার সামনে দিয়ে কোনো গাড়ি শাঁ শাঁ করে চলে যায়। আমি হা করে তাকিয়ে দেখি। রাস্তায় প্রায়ই যত্রতত্র পারকিং করে রাখা গাড়ি গুলো ছুঁয়ে দেখি। কি যে আনন্দ পাই! মনে মনে ভাবি একদিন আমার নিজেরও একটা গাড়ি হবে। আমি অপেক্ষা করি। অপেক্ষা করতে আমার ভালই লাগে।
ভাবতেই তো ভালো লাগে- নিজের একটা গাড়ি! ড্রাইভার সালাম দিয়ে দরজা খুলে দিবে। ছুটির দিনে আমি আর সুরভি ''পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে'' গানটা শুনতে শুনতে কোনো বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে যাবো। অনেকে ড্রাইভারদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে। আমি কোনো দিনও ড্রাইভারদের সাথে খারাপ ব্যবহার করবো না। আসলে আমি খারাপ ব্যবহার করতে জানি'ই না। ড্রাইভারকে ভালো টাকা বেতন দিবো। বছরে দুই ঈদে দুইবার ফুল বোনাস দিবো। পহেলা বৈশাখেও কিছু দিয়ে দিব। দুপুরের খাবার দিবো। রাত দশটার পর ডিউটি করলে ওভারটাইম দিয়ে দিব।
যখন সুরভি'র সাথে চুটিয়ে প্রেম করতাম। বাসে, সিএনজিতে ঘুরে বেড়াতাম- তখন সুরভিকে আমি কথা দিয়েছিলাম দেখো, ''একদিন আমি গাড়ি কিনব।'' আমি কথা দিলে কথা রাখি- সুরভি খুব ভালো করেই জানে। অনেক কথাই রেখেছি। কিন্তু গাড়িটা মনে হয় আর কিনতে পারব না। জীবনের অনেক গুলো স্বপ্নের মতো এই গাড়ি কেনার ইচ্ছাটাও বোধহয় কোনো দিন সত্যি হবে না। সম্ভব না। একেবারেই সম্ভব না। শুধু মনে মনে 'গাড়ি কিনব' ভেবে এক রকমের শান্তি পাই। বাস্তব বড় কঠিন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমাকে লোকাল বাসে করেই চলাচল করতে হবে।
গতকালের একটা ঘটনা বলি- আমি আর সুরভি যাবো মিরপুর, পল্লবী। সুরভি'র বড় ভাইয়ের এনগেজমেন্টের অনুষ্ঠানে। বড় ভাই, আর ভাবিকে আগেই বলে রেখেছি গাড়ি লাগবে। আমি, সুরভি রেডি হয়ে নিচে নেমেছি ড্রাইভার আর আসে না। এক ঘন্টা অপেক্ষা করলাম ড্রাইভার আর আসে না। দুঃখে কষ্টে আমার চোখে পানি এসে পড়েছে। ভাবী-বড় ভাই ড্রাইভারকে ফোন দিচ্ছে ড্রাইভার ফোন ধরে না। শেষে ভাবী বলল- ও আজ তো শুক্রবার ড্রাইভার আসবে না। এদিকে সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। শেষে রাস্তার মোড়ে গিয়ে দাড়ালাম। একটাও সিএনজি নেই। এক ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর একটা সিএনজি পেলাম। সেই সিন এনজিওয়ালা বলল- চার শ' পঞ্চাশ টাকা দিতে হবে। কিন্তু ন্যায্য ভাড়া হলো- ২২০ টাকা।
গেলাম পল্লী। অনুষ্ঠান শেষে হতে হতে রাত বারোটা বেজে গেল। রাত বারোটায় পল্লবী থানার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। কোনো সিএনজি নেই, বাস নাই। যাও দুই একটা আছে আমার গন্তব্যে যাবে না। শীতের রাত। রাত সাড়ে বারোটা বেজে গেছে। সাথে সুরভি, তখন কেমন লাগে? এই রকম পরিস্থিতিতে নিজেকে খুব অসহায় লাগে। হতভাগা মনে হয়।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জানুয়ারি, ২০১৮ বিকাল ৩:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




